খাগড়াছড়িতে হঠাৎ করে “ওয়াদুদ হঠাও” শ্লোগান উঠেছে। আসলে এটা কোনো হঠাৎ আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়।
এটা দীর্ঘদিন জমে থাকা প্রশ্ন আর হতাশার প্রকাশ। মানুষ এখন আর শুধু দল দেখে ভোট দিতে চায় না। তারা প্রার্থীর রেকর্ড আর ভূমিকা দেখতে চায়।
ওয়াদুদ ভূঁইয়া দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে আছেন। কিন্তু তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মামলার ইতিহাস, দুর্নীতির অভিযোগ—এসব বিষয় সাধারণ মানুষের মন থেকে কখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি।
আদালতে খালাস পাওয়া এক বিষয়। কিন্তু রাজনীতিতে মানুষের বিশ্বাস ও গ্রহণযোগ্যতা আরেক বিষয়।
এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে আরেকটি গুরুতর অভিযোগও ঘুরে ফিরে আসছে। পাহাড়ি জমি দখল করে তাঁর নামে ‘ওয়াদুদ পল্লী’ বানানো হয়েছে—এমন অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ সত্য কি না সেটাই একমাত্র প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, মানুষের জমির ওপর গ্রামের নাম একজন রাজনীতিকের নামে কেন হবে? এই প্রশ্নের স্পষ্ট কোনো জবাব আজও মানুষ পায়নি।
আরেকটি প্রশ্ন আরও গভীর। যদি একজন মানুষ বারবার পদ আঁকড়ে ধরে থাকেন, তাহলে নতুন ও যোগ্য নেতৃত্ব উঠে আসবে কীভাবে?
গত প্রায় ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে একই নাম ক্ষমতার আশেপাশে ঘুরছে। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে খাগড়াছড়ির সাধারণ মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে—এই প্রশ্নও উঠছে।
এই প্রশ্নগুলো সবচেয়ে বেশি তুলছে তরুণরা। যারা প্রথম বা দ্বিতীয়বার ভোট দিতে যাচ্ছে, তারা চায় নতুন নেতৃত্ব, কম বিতর্ক, কম অহংকার। তাদের চোখে রাজনীতি মানে আর উত্তরাধিকার নয়, জবাবদিহি।
এই পরিস্থিতিতেই এবার ভিন্ন একটি বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। খাগড়াছড়ি জেলার মারমা জনগোষ্ঠীর একজন পাহাড়ি–বাঙালি সমন্বয়পন্থী নেতা ছিলেন, যিনি সুযোগ পেলে বিএনপিকে সহজেই জয়ের পথে নিতে পারতেন—এমন বিশ্বাস অনেকের ছিল।
কিন্তু দলীয় কাঠামোয় সেই সুযোগ তৈরি হয়নি। ফলে সমীরণ দেওয়ান বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এর প্রভাব ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপি এখন কয়েকভাগে বিভক্ত। যদি মারমা জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ সমীরণের পক্ষে দাঁড়ায়, তাহলে ওয়াদুদ ভূঁইয়ার পরাজয় নিশ্চিত—এমন বিশ্লেষণও শোনা যাচ্ছে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। বিদ্রোহী প্রার্থীকে ভোট দেওয়া মানেই দলবিরোধিতা নয়। অনেক সময় এটি দলকে শোধরানোর একটি রাজনৈতিক বার্তা। নির্বাচনের ইতিহাসে এমন হাজারো নজির আছে।
আজ খাগড়াছড়ির মানুষ ভয় দেখাতে চায় না, তারা ভোটের মাধ্যমে কথা বলতে চায়। তারা বলতে চায়—ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। একই মানুষ বারবার সুযোগ নিলে যোগ্য নেতৃত্ব বারবার বঞ্চিত হয়।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি না আসে, তাহলে “ওয়াদুদ হঠাও” শুধু শ্লোগান থাকবে না—এটা রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হবে।
আজ জানুয়ারী ২৪।। সব টিকটাক থাকলে ভোট হবে ১২ ফেব্রুয়ারী। কিন্তু অনেকের মত এখনো ভোটের পরিবেশ নেই। ভোট হবে কিনা বিজ্ঞ মহলে এখনো সন্দেহ রয়ে গেছে।
এই লেখাটি কোনো ব্যক্তিকে জেতানো বা হারানোর প্রচারণা নয়। এটি পাহাড়ের ভেতরে দীর্ঘদিন জমে থাকা এক অদৃশ্য দ্বন্দ্ব, বিভাজন ও নেতৃত্ব সংকট নিয়ে কথা বলার চেষ্টা। যারা ভাবছেন এটা শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক লেখা, তারা আসলে সমস্যার গভীরে তাকাচ্ছেন না।
হ্যাঁ, পাহাড়ও থেমে নেই। রাঙ্গামাটিতে বিজয়ী প্রায় নিশ্চিত হওয়া গেলেও বান্দরবানে জেরি বাবু একটু এদিক ওদিক হলে হেরে যেতে পারেন। NCP-র বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশী।
কিন্তু খাগড়াছড়ি অবস্থা চরমে। আদিবাসীদের মধ্যে ভোট কে জিতবে তা নিয়ে এই চরম উদ্বেগ নয়। বরং এখানে সমীরণ বনাম ধর্মজ্যোতি। সোজা করে বললে বলতে হ, PCJSS বনাম UPDF।
অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০০১ সালের কথা মনে আছে কি?
অক্টোবর ১, ২০০১ সালে এটি অনুষ্ঠিত হয়। UPDF নির্বাচনে যোগ দেয়। PCJSS নির্বাচন না করলেও উপেন্দ্রলালকে সমর্থন দেয়। ভোট যুদ্ধ তুমুল হয়।
অনেকের মতে, আসলে এটা শুধু ভোট যুদ্ধ ছিল না। কারণ এ ভোট যুদ্ধের সাথে সাথে অস্ত্রযুদ্ধ প্রকট হয়ে উঠে।
সেই সময় রাষ্ট্র বা প্রশাসন কার্যকর কোনো মধ্যস্থতা না করে বরং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার আগুনে ঘি ঢেলে দিয়ে ধীরে ধীরে সহিংস সংঘাতে রূপ দেয় এবং দুই বলদের লড়ায়ের মত আনন্দ উপভোগ করে। অথচ পাহাড় এই বিভেদে ভাইয়ের বুকের তাজা রক্তের মূল্য আজও পাহাড় বহন করছে।
এই অস্ত্র যুদ্ধ প্রায় তিন দশকে পা দিয়েছে।
পাহাড় আজ সেই ২০০১ সালের পুনরাবৃত্তি দেখছে। তাই এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও আসলে নির্বাচনে কে জিতবে বা কে হারবে সেটা নয়। এটা হচ্ছে কে থাকবে আর কে থাকবে না সেই উপসর্গ।
বুঝতে পেরেছেন কি বলছি নিশ্চয়।
এবার একটু সহজ করে বলি।
ধরুন, একি গ্রামে দুজন ছোট বালক একে ওপরের কাছে হার মেনে নিতে চায় না। সব সময় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে।
তখন গ্রামের মুরুব্বিরা কি করে তাদের সেই বিরোধ মীমাংসা করে?
আমি সেই সেরকম অনেক ঘটনা দেখেছি। পাহাড়ি গ্রামে এটা সমাধান করার বংশ পরস্পরায় প্রচলিত একটি সহজ উপায় আছে। তা হচ্ছে সকলের সামনে দুজনকে “বোদাবুদি”র মাধ্যমে হার জিত নির্ণয় করা। বারবার যে তিন বার জিতে সেই জয়ী। আর যে হারে তার সে হার মেনে নেয়।
হার-জিত নির্ণয়ে এটি পাহাড়ে আদিবাসীদের যুগযুগ ধরে প্রচলিত প্রথা।
কিন্তু বাস্তবে আজ পাহাড়ের রাজনীতি আর গ্রামের উঠোনে সীমাবদ্ধ নেই। এখানে অস্ত্র, সীমান্ত, রাষ্ট্রীয় কৌশল এবং আন্তর্জাতিক বাস্তবতা জড়িয়ে গেছে। তাই রায় যত দেরিতে আসবে, ক্ষতিও তত গভীর হবে।
আজ সেই দুই বালক যদি একজন PCJSS আর আরেকজন UPDF হয় আমরা কি সেই একি নিয়ম মেনে হার জিত নির্ণয় করতে পারি না ?
উন্নয়ন বাদ দিন। পাহাড়ে কি উন্নতি হয়ে তা বাদ দিন। আগে বিবাদ মীমাংসা করি। সেই ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর থেকে আজ ২৬ সালের জানুয়ারী ২৪ তারিখ হিসেব করে দেখি কে জিতেছে?
সংক্ষেপে দেখি-
১) PCJSS- এর আঞ্চলিক পরিষদ আছে (দেশে)
UPDF-এর সে রকম কিছু নেই
২) PCJSS আন্তর্জাতিকভাবে পাহাড়ের কথা UN পর্যন্ত প্রতিনিধি পাঠায়
UPDF আজ পর্যন্ত কাউকে পাঠাতে পারে নি
৩) PCJSS অন্তত একবার MP নির্বাচনে জয় লাভ করেছে
UPDF বারবারই ফেল করেছে
৪) PCJSS দুভাবে বিভক্ত হয়েছে কিন্তু কোন ভাগ UPDF এ যোগ দেয় নি
UPDF দুভাবে বিভক্ত হয়েছে কিন্তু একভাবে PCJSS যোগ দিয়েছে
৫) আগের অনেক অঞ্চল এখন PCJSS-এর দখলে
৬) ভারতের নির্ভরতা PCJSS- এর ওপর বেশী (এই পয়েন্টে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে যা এখনো হয়তো খুলে বলা যাচ্ছে না)।
এবার তাহলে জনগণ সিদ্ধান্ত দিক এখানে জয়ী কে?
UPDF হার মেনে নিতে পারবে না। কারণ তাদের মধ্যে সেই দুরদুরশিতা নেই। থাকলে তারা এতদূর এগুত না। অনেকদিন আগে হাত মিলিয়ে বসে যেত। আমি বলছি না PCJSS সব ক্ষেত্রে সঠিক।
কিন্তু সাধারণ জনগণের দৃষ্টিতে দেখলে PCJSS-এর হাতে আগের মত পার্বত্য চট্টগ্রামের সংগ্রামকে তুলে দেওয়া দরকার। কারণ ভারত এবং আন্তর্জাতিক সাহাস্য ছাড়া পাহাড়ে অধিকার ফিরবে না।
পরিশেষে এইটুকু বলে রাখি, ৩০ বছর PCJSS ছিল কিন্তু এবারের মত শক্তিশালী ছিল না। হঠাৎ করে এই দল এই শক্তি পেল কোথায় সেই ইঙ্গিত যদি UPDF কর্মীদের মাথায় না থাকে কিছু করার নেই।
হ্যাঁ, আমি PCJSS-এর কর্মী নই। UPDF -এর বিরোধী নই। অন্যদের মত তিন দশক আমিও চুপ ছিলাম। হার-জিত নিয়ে কোন টু শব্দ করি নি।
হ্যাঁ, আমিও অন্যসব মানুষের মত সাধারণ একজন মানুষ। আমিও পাহাড়ে জন্মেছি। পাহাড় নিয়ে সাধারণ মানুষের মত ভাবি। কাজেই আমি মনে করি, PCJSS ১০০% সঠিক না হলেও পাহাড়ে এই দল ছাড়া মুক্তি নেই। অস্ত্র সংগ্রামে হোক বা গণতান্ত্রিক সংগ্রামে হোক পাহাড়ের অধিকার আদায়ে এই দলের নিকট পাহাড়ের নেতৃত্ব তুলে দেওয়া দরকার।
আর যদি নাও হয়, তবে প্রাণহানি ঘটবে। দেরি হলেও UPDF-এর জয়ের সম্ভাবনা একদম নেই বললে চলে।
না, হয়তো ভাবছেন, যে যার দলের অবস্থানে থেকে অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চলবে। আপাতত তা মনে হচ্ছে না। গণতন্ত্রের দেশ থাকি কিন্তু গেরিলা দলে আপাতত গণতন্ত্র নেই। আগে সফলতা তারপর গণতন্ত্র।
জনগণ যত তাড়াতাড়ি এই গ্রামের বালকদের মত “বোদাবুদি”র রায় দিতে পারবে তত পাহাড়ের মঙ্ঘল।
তাই সমীরণ বা ধর্মজ্যোতির হার জিত নিয়ে ভোট বিষয় নয়। এই বিষয়টা পাহাড়ের নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে সেটার লড়াই। কেউ না শুনলে হয়তো অঘটনও ঘটে যেতে পারে। তাই আমি মনে করি, সাধারণ মানুষের এখানে ভোটের বিষয়ে নীরব থেকে রায় দেওয়া উচিত।
ইতিহাস সাক্ষী, পাহাড়ে বিভক্ত নেতৃত্ব কখনো আদিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। বিভাজনের সুযোগে সব সময় তৃতীয় পক্ষ শক্তিশালী হয়েছে। আজও সেই ঝুঁকি রয়ে গেছে।
চুক্তির পর থেকে এবারের নির্বাচন আগের যেকোনো নির্বাচনের চেয়ে আলাদা। কিন্তু এই বিষয়টি বেশিরভাগ মানুষের খেয়ালের বাইরে রয়ে গেছে। দেশে যেমন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে, তেমনি নির্বাচনেও কেউ আর আইন মানবে—এমন প্রত্যাশা করার সুযোগ নেই।
পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিস্থিতি আরও বেশি ভয়াবহ। এই নির্বাচন আগে যেমন সেনা-নিয়ন্ত্রিত ছিল, তেমনি এখনো আছে। বরং বলা যায়, এবার তারা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করবে। এটি আর সাধারণ মানুষের হাতে নেই। বাঙালি জাতীয় দলের প্রার্থী হলে হয়তো সামান্য এদিক-সেদিক হতে পারে—এর বাইরে বাস্তবতা বদলানোর সুযোগ নেই।
নিজের ভোটাধিকার আছে ঠিকই, কিন্তু তা কার্যকর হবে না। তাই পাহাড়ে প্রতিটি সাধারণ আদিবাসীর প্রথম করণীয় হলো নির্বাচনের প্রার্থীদের কোন্দল থেকে নিজেকে দূরে রাখা।
কারণ সমীরণ দেওয়ান কিংবা ধর্মজ্যোতি চাকমা—এই পরিস্থিতিতে কারও জয়ের বাস্তব সম্ভাবনা নেই। (একটি ভিন্ন উপায় আছে, সেটি পরে লিখবো।)
আর ধরুন, তাদের দুজনের কেউ একজন জিতলেও, তিনি সবার জন্য কিছু করতে পারবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। তারা হয়তো আপানাকে চেনেনই না। তারা সবায়কে চাকুরী দিতে পারবেন না। হয়তো কিছুই করতে পারবেন না যা অন্যন্যা প্রার্থীদের আমরা দেখেছি। গুটিকয়েক সুবিদে পেতে পারে।
তাই, আমাদের মত সাধারণ মানুষের বাস্তব লাভ খুব সীমিত। তার চেয়ে বরং জুম চাষ করুন, মাছ ধরুন। আনন্দে থাকুন। বাড়ির যেসব কাজ পড়ে আছে, সেগুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকুন। দেখবেন, আগামী বছরে আপনি অনেক এগিয়ে যাবেন। আর এগিয়ে না গেলেও অন্তত স্বজাতি ভাইদের হুমকি থেকে বেঁচে যাবেন। শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন।
নিজে ভেবে দেখুন, এই নির্বাচন আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে আসলে কী দেবে? সামগ্রিক বিষয় আপাতত বাদ দিন। দুর্ঘটনায় নিজের যখন একটি পা ভেঙে যায়, ব্যথা আমি একাই পাই। কেউ সেই ব্যথার ভাগ নেয় না। এই নির্বাচন আসলে সেই রকম একটি দুর্ঘটনার সাথে উল্লেখ করা যায়। ভোটের সময় ভোট দিন যাকে খুশি। তা আমি না দিতে বলছি না।
হ্যাঁ, সামগ্রিক স্বার্থের কথা আপাতত বাদ দিন। সেটা সাধারণ খেতে খাওয়া আমাদের মত মানুষের এই নির্বাচনে ভাবার দরকার নেই।
সামগ্রিক চিন্তা নিয়ে আলাদা পোস্ট লিখবো, সেখানে আরও অনেক ঝট খুলে বলব। আপাতত এটুকুই—কোনো প্রার্থীর হয়ে বা কোনো দলের সঙ্গে চ্যালেঞ্জে না জড়িয়ে শান্তিতে থাকুন। এবারে অনেক প্রাণহানির আশঙ্কা আছে। এর সঙ্গে বড় কিছু ঘটছে, যা আমরা এখনো পুরোপুরি টের পাচ্ছি না।
গরিবের ঘরেই আমার জন্ম। এ নিয়ে আমার কোনো লজ্জা নেই বরং আমি গর্ব করি। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামে গরিব মানুষের সংখ্যাই বেশি। আদিবাসীদের মধ্যেও আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।
ছোটবেলা থেকেই বড়লোকদের প্রতি আমার এক ধরনের বিতৃষ্ণা ছিল। হয়তো স্বর্গীয় যতীন্দ্রলাল চাকমার সান্নিধ্য না পেলে এই বিতৃষ্ণা সেটলার-বিরোধী ঘৃণার মতোই তীব্র আকার নিত। সমাজে ধনী-গরিবের বৈষম্য আমি যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করেছি, তা কেউ আমাকে আলাদা করে শেখাতে পারবে বলে মনে হয় না।
২০২৫ সালেও এসে সেই সাধারণ মানুষ ও বড়লোক, ধনী ও গরিবের শ্রেণিবিভাজন কমেনি। বরং এখন এই ব্যবধান আরও স্পষ্ট। ধনী হওয়া এখন সহজ। খুব সহজে ধনী হওয়া যায়।
এই ধনী-গরিবের সামাজিক ব্যবধানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তথাকথিত দেশপ্রেমী দলগুলো। ধনী হওয়ার সহজ পথ হলো দল করা। সবাই নিজেকে দেশপ্রেমী, জুম্মপ্রেমী বলে দাবি করে।
কিন্তু কেউ যদি প্রশ্ন করে, এত দল, এত জুম্মপ্রেমের দাবি সত্ত্বেও পাহাড়ের এই অবস্থা কেন তাহলে উত্তর আসে, ‘ওদের জন্য’। সব কিছুর জন্য ‘ওরা’ দায়ী। নিজেদের দোষ কেউই দেখতে চায় না।
আমি বরাবরই এই প্রবণতার বিরোধী। নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে ‘ওদের জন্য’ বলে দায় চাপানোর বিরোধী, সেটা যে দলই করুক না কেন। এই কারণেই আমি সব দলের কাছেই বিরোধী।
আসলে আমি সব দলের বিরোধী। কারণ আমি জনগণের পক্ষে। তাই আমার পোস্টগুলোতে সাধারণ মানুষই বেশি সাড়া দেয়।
এখন নির্বাচন নিয়ে আলোচনা চলছে। বরাবরের মতো এবারও সাধারণ মানুষ বুঝে উঠতে পারছে না—আসলে কী হচ্ছে, কে সত্য কথা বলছে, বিষয়টা কী। দলগুলো সাধারণ মানুষকে নিজেদের মতো করে, নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করছে।
আর জাতীয় রাজনীতিতে যারা সম্পৃক্ত, তারা অনেক আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। তারা জনগণকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে জনগণের মাথা বিক্রি করে—যেমন আগে ছাগল বাঁধার খুঁটি দেখিয়ে ছাগল বেপারীর কাছে বিক্রি করা হতো। এখন শুধু ছাগলের জায়গায় মানুষ, আর খুঁটির জায়গায় মানুষের মাথা। পার্থক্য এটুকুই। বিনিময়ে মাল আর টাকা—সবই একই।
তাই নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে জনগণের কী করা উচিত, তা নিয়ে আমি ধীরে ধীরে লিখব। এই পথে আমার বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ উঠবে—বিক্রি হওয়ার অভিযোগ, গালিগালাজ। তবু সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে সেগুলো মেনে নেব।
তবে এসব লেখা শুরু করার আগে বিনয়ের সঙ্গে, হাত জোড় করে একটি কথা স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমি আমার বিবেক, আমার কলম, আমার কণ্ঠ কখনো বিক্রি করি না। আগে অভাবের সময়ও করিনি, আর এখন তো সেই প্রশ্নই ওঠে না। পাহাড় থেকে যে সব জুম্ম আজ বিদেশে ভালো আছে বলে মনে হয়, তাদের তালিকা করলে আমার অবস্থান দশ নম্বরের নিচে হবে না।
তাই লেখা বিক্রির অভিযোগ আসার আগেই তার খণ্ডন করে রাখলাম। যারা টাকার জন্য বিক্রি হয়, তাদের টাকা দিয়ে মাপা যায়। কিন্তু আমি আলাদা।
এবার একটু ইঙ্গিত দিই, আমি কোন বিষয়ে লিখতে চাই। নির্বাচনে দেখলে মনে হয় পাহাড়ে বিরাট চারটি দল। কিন্তু আমার মূল্যায়নে বাস্তবে মূলত দুটি শক্তি—বিএনপি ও জামাত। বাকি যাদের চুক্তিপক্ষ ও চুক্তিবিরোধী হিসেবে দেখা হচ্ছে, তারা আসলে নির্বাচনের উপসর্গমাত্র।
এই সবের মাঝখানে আছে জনগণের কষ্ট ও বিভ্রান্তি। সেই বিষয়গুলো নিয়েই পরবর্তী পোস্টগুলো লিখব।
যে বিপ্লবে নারীদের সম্পৃক্ত করা যায় না, সেই বিপ্লব কখনোই সত্যিকার অর্থে গতিশীল হয় না। পাহাড়ে এই কথাটি আজ নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। কারণ সময় বদলেছে, বাস্তবতা বদলেছে, কিন্তু আমাদের চিন্তার কাঠামো অনেক জায়গায় এখনো থমকে আছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বিপ্লবের ইতিহাস আজকের নয়। এটি প্রায় শতাব্দীজুড়ে বিস্তৃত। এই দীর্ঘ ইতিহাসে পাহাড়ি আদিবাসী নারীরা শুধু দর্শক ছিল না। তারা বিভিন্নভাবে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল—খাদ্য জোগানো, বার্তা বহন, আশ্রয় দেওয়া, এমনকি সশস্ত্র সংগ্রামের গল্পও আমরা শুনেছি। শান্তিবাহিনী গঠনের সময় নারী সশস্ত্র কর্মীর কথা লোকমুখে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে তাদের উপস্থিতি ছিল সীমিত, দৃশ্যমান ছিল না। হয়তো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে, হয়তো তৎকালীন বাস্তবতায় নারীদের সেই জায়গা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় এখন পেরিয়ে গেছে।
আজ পৃথিবী নারী ও পুরুষকে আর আলাদা করে বিচার করে না। শুধু সংখ্যায় নয়, শক্তিতে, মেধায়, সাহসে এবং অধিকারেও তারা সমান। পাহাড়ের দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হয়। অনেক জায়গায় নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়েও বেশি। তাহলে এই বিশাল শক্তিকে বাদ দিয়ে কোনো আন্দোলন কীভাবে সফল হতে পারে? বড় একটি অংশকে উপেক্ষা করে কোনো সংগ্রাম কখনোই পূর্ণতা পায় না—এটা শুধু তত্ত্ব নয়, বাস্তব সত্য।
আবেগ থেকে নয় বরং বেঁচে থাকার তাগিদ থেকে পাহাড়ি নারীরা আন্দোলনে যুক্ত হতে চায়। জমি হারানোর যন্ত্রণা, নিরাপত্তাহীনতা, পরিবার ভাঙনের ভয়—এসব তারা প্রতিদিন নিজের শরীরে বহন করে। পুরুষের চেয়ে নারীর জীবন পাহাড়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তাদের সংগ্রামে আগ্রহ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন। এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে কোনো আন্দোলন দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।
তবুও পাহাড়ের সমাজ এখনো গভীরভাবে পুরুষতান্ত্রিক। নারীদের দুর্বল ভাবা হয়। তাই তাদের আন্দোলনের কেন্দ্র থেকে দূরে রাখা হয়। অথচ বাস্তবতা হলো, নারীরাও এই সংগ্রামে যুক্ত হতে চায়। একজন পুরুষ যেমন তার জাতি, ভূমি ও অস্তিত্বকে ভালোবাসে, একজন নারীও ঠিক তেমনই ভালোবাসে। তারা আগ্রহ দেখালে তাদের “না” বলা আসলে নৈতিকভাবে সঠিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও দূরদর্শী নয়।
আজ পাহাড়ে আমরা দলের দুর্নাম শুনি—দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার। এগুলো কেবল ব্যক্তিগত চরিত্রের সমস্যা নয়, এগুলো কাঠামোগত সমস্যা। বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পুরুষদের একচেটিয়া বলয়ের ভেতরে এসব প্রবণতা সহজে জন্মায়। নারীরা পাশে থাকলে অনেক সময় এই প্রবণতা কমে আসে। কারণ নারীরা শুধু সহানুভূতির প্রতীক নয়, তারা সংযম, জবাবদিহি এবং দায়িত্ববোধের শক্তিশালী উপস্থিতি। সংগ্রামে নারী কর্মীরা অনেক সময় শুধু কাজের শক্তি নয়, বরং সান্ত্বনা ও গভীর অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।
আরেকটি কঠিন সত্য হলো, নারীদের বাদ পড়ার পেছনে শুধু সমাজ নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পুরুষ নেতৃত্বও দায় এড়াতে পারে না। অনেক নারী এগিয়ে আসতে চাইলেও তাদের সামনে রাখা হয় অবিশ্বাস, সন্দেহ আর নীরব ভয়। আন্দোলনে যুক্ত হলে নারীদের চরিত্র নিয়ে গুজব ছড়ানো হয়, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এই সামাজিক শাস্তির ভয় অনেক নারীকেই পেছনে সরিয়ে রাখে। এটা নারীদের দুর্বলতা নয় বরং এটা আন্দোলনের নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়ার ফল।
কাজ না থাকলে মানুষ বিপথে যায় আর এটা পাহাড়েও সত্য।
আজ প্রশ্ন হচ্ছে, নারীরা কী করবে? আমরা কি তাদের সমাজের কাজে, জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে যুক্ত হওয়ার কোনো বাস্তব পথ খুলে দিতে পেরেছি? যদি না পারি, তাহলে তারা যখন ভিন্ন পথ বেছে নেয়, তখন শুধু দোষারোপ করলেই কি আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়?
আমরা একই কলেজে পড়েছি, একই ডিগ্রি নিয়ে পাশ করেছি। আমি পুরুষ বলে রাজনীতি করি, দল করি, নেতা হই। কেউ টাকার জোরে বড় পদে বসি, কেউ দেশ ছেড়ে বিদেশে থাকি, কেউ ব্যবসা, গাড়ি, বাগান আর সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকি, কেউ অস্ত্র ধরে নিজেকে বড় বিপ্লবী বানাই। কিন্তু নারীরা এসবের কোনোটাই সহজে করতে পারে না। তারা ভান্তে হতে পারে না, দল করে নেতা হতে পারে না, আপনার মতো দেশ ছেড়ে পালাতে পারে না, সেনা ক্যাম্পের ছায়ায় বিপ্লবী সাজতে পারে না, বন্দুক হাতে চাঁদা তুলে জীবন চালাতে পারে না।
তাদেরও স্বপ্ন আছে। বড় হওয়ার স্বপ্ন, নেতৃত্ব দেওয়ার স্বপ্ন, একটু ভালোভাবে বাঁচার স্বপ্ন। এই স্বপ্নগুলোর জন্য আমরা যদি কোনো সম্মানজনক পথ না রাখি, তাহলে তারা যখন অন্য জাতির পুরুষের হাত ধরে চলে যায়, নামের শেষে আদিবাসীর টাইটল বাদ দিয়ে অন্য টাইটলে পরিচিত হয় তখন আমরা শুধু একজন মানুষকে হারাই না। আমরা হারাই আমাদের ভবিষ্যতের এক বড় শক্তিকে।
এই নারীরাই আমাদের জন্য ভাত রান্না করতে পারত, জঙ্গলে অসুস্থ হলে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে পারত, জাতির অস্তিত্ব রক্ষার পরিকল্পনার সমান অংশীদার হতে পারত। আমরা যা পারি, তারাও তা পারে। একজন অসুস্থ সৈনিকের পাশে একজন নারী সৈনিকের গুরুত্ব কতটা, তা সৈনিক না হলে বোঝা কঠিন।
বিশ্বে ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে অনেক সময় একজন পুরুষ সৈনিকের সঙ্গে একজন নারী সৈনিক রাখা হয় যেন মিশন যেন সফল হয়। একজন পুরুষ সহজে একজন নারী সহযোদ্ধাকে ফেলে যায় না, যেমন একজন নারীও সহজে একজন পুরুষ সহযোদ্ধাকে ছেড়ে যায় না। এই বাস্তবতার কারণেই অনেক দেশ, বিশেষ করে ইসরায়েল, এই নীতিকে গুরুত্ব দেয়। এটি কোনো আবেগী ধারণা নয়, এটি পরীক্ষিত কৌশল।
আজ পাহাড়ি কিশোরী মেয়েরা এই আন্দোলনের দিকে তাকিয়ে কী শিখছে, সেটাও আমাদের ভাবা দরকার। তারা কি শিখছে যে এই সংগ্রাম শুধু পুরুষদের জন্য? তারা কি ভাবছে, এখানে আমার কোনো জায়গা নেই? যদি আজ আমরা এই বার্তাই দিই, তাহলে দশ বছর পরে পাহাড়ের আন্দোলন আরও সংকীর্ণ, আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। তখন শুধু নারীরা নয়, পুরো একটি প্রজন্ম আমাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।
পাহাড়ে বিষয়টি এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার নয়।
নারীদের দূরে ঠেলে নয়, কাছে টেনে নিতে হবে। তাদের শুধু সহযোগী হিসেবে নয়, সিদ্ধান্তের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। বিপ্লবকে যদি সত্যিকার অর্থে জীবিত, বিশ্বাসযোগ্য ও টেকসই করতে চাই, তাহলে আজই এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। বিপ্লব সফল করতে হলে নারীদের জায়গা আজই তৈরি করতে হবে—আগামীকালের জন্য নয়, এখনই।
গ্রীনল্যান্ড নিয়ে বিরাট হৈচৈ। কিন্তু ভেনেজুয়েলা, ইউক্রেন আর ইরান নিয়ে এখন বেশী বিশ্ব উত্তপ্ত থাকায় গ্রীনল্যান্ড বিষয়টি চাপা পড়েছে। কিন্তু ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির মত যেকোন সময় বিষয়টি ফুঁসে উঠতে পারে।
চলুন সহজ করে এবিষয় দেখি।
গ্রীনল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ, কিন্তু এটি কোনো স্বাধীন দেশ নয়। এটি ডেনমার্কের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। ভৌগোলিকভাবে গ্রীনল্যান্ড উত্তর আমেরিকার কাছাকাছি, কানাডার উত্তর-পূর্বে এবং উত্তর মেরুর খুব কাছে অবস্থিত।
জনসংখ্যা খুবই কম—প্রায় ৫৬ হাজার—এবং বেশিরভাগ মানুষ ইনুইট আদিবাসী। দ্বীপের প্রায় পুরোটা বরফে ঢাকা। বাইরে থেকে নির্জন ও দূরবর্তী মনে হলেও, বাস্তবে গ্রীনল্যান্ড আজ বিশ্বরাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
এই দ্বীপটির গুরুত্ব প্রথমে বোঝা যায় এর অবস্থান দেখে। গ্রীনল্যান্ড আর্কটিক অঞ্চলের মাঝামাঝি এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখান থেকে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ এবং রাশিয়ার দিকে একসাথে নজর রাখা যায়।
আধুনিক যুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার এবং আকাশ নজরদারির ক্ষেত্রে এই ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শীতল যুদ্ধের সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্র এখানে সামরিক সুবিধা গড়ে তুলেছে।
এই কারণেই Donald Trump গ্রীনল্যান্ড কেনার কথা প্রকাশ্যে বলেছিলেন। অনেকেই তখন এটিকে অদ্ভুত বা হাস্যকর মনে করলেও, বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ কৌশলগত। যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে গ্রীনল্যান্ডকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।
এখানে যুক্তরাষ্ট্রের থুলে এয়ার বেস রয়েছে, যা রাশিয়া দিক থেকে আসতে পারে এমন ক্ষেপণাস্ত্র আগাম শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়। পুরো গ্রীনল্যান্ডের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকলে যুক্তরাষ্ট্র আর্কটিক অঞ্চলে আরও শক্ত অবস্থান নিতে পারত।
আরেকটি বড় কারণ হলো প্রাকৃতিক সম্পদ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গ্রীনল্যান্ডের বরফ ধীরে ধীরে গলছে। এতে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর কাছে এটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। বরফের নিচে রয়েছে রেয়ার আর্থ খনিজ, ইউরেনিয়াম, তেল ও গ্যাস।
আধুনিক প্রযুক্তি, সামরিক সরঞ্জাম এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য এই খনিজগুলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। যুক্তরাষ্ট্র চায় না এসব সম্পদের ওপর অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র একক প্রভাব তৈরি করুক।
এখানেই আসে China–এর প্রসঙ্গ। চীন আর্কটিক অঞ্চলকে ভবিষ্যতের বাণিজ্য ও শক্তির নতুন ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে। তারা গ্রীনল্যান্ডে অবকাঠামো ও খনিজ খাতে আগ্রহ দেখিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং সরাসরি নিরাপত্তার প্রশ্ন।
কারণ যেখানে চীনের অর্থনৈতিক উপস্থিতি বাড়ে, সেখানে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাবও বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
একইভাবে Russia আর্কটিক অঞ্চলে দ্রুত সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে। নতুন ঘাঁটি, যুদ্ধজাহাজ এবং নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলছে তারা। গ্রীনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকলে রাশিয়ার এই তৎপরতা পর্যবেক্ষণ ও মোকাবিলা করা অনেক সহজ হতো।
তবে গ্রীনল্যান্ড যেহেতু ডেনমার্কের অধীন, তাই Denmark ট্রাম্পের প্রস্তাব স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করে। ডেনমার্ক এবং গ্রীনল্যান্ডের স্থানীয় সরকার দু’পক্ষই জানিয়ে দেয়—গ্রীনল্যান্ড কোনো বিক্রির বস্তু নয়, এবং এর ভবিষ্যৎ এখানকার মানুষই নির্ধারণ করবে।
সব মিলিয়ে গ্রীনল্যান্ড কোনো বরফে ঢাকা নির্জন দ্বীপ নয়। এটি সামরিক নিরাপত্তা, প্রাকৃতিক সম্পদ, নতুন বাণিজ্যিক নৌপথ এবং চীন–রাশিয়ার প্রভাব ঠেকানোর প্রশ্নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্পের আগ্রহ আসলে এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। গ্রীনল্যান্ডকে ঘিরে যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তা ভবিষ্যতের বিশ্বরাজনীতিতে আর্কটিক অঞ্চলের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে দেয়।
আজকের সবচেয়ে শক্তিশালী মোল্লা রাষ্ট্র হচ্ছে ইরান। কিভাবে এই একটি নন-মুসলিম দেশ ঘোরতর মোল্লা রাষ্ট্রে পরিণত হল তা নিয়ে অনেকে জানি বা অনেকে জানি না। চলুন সংক্ষেপে সহজ করে দেখি।
পারস্য ছিল এক সময়ের অন্যতম প্রাচীন ও শক্তিশালী সভ্যতা।
ইসলামের জন্মের বহু আগেই সেখানে গড়ে উঠেছিল সংগঠিত রাষ্ট্র, আইন, প্রশাসন ও ধর্মীয় দর্শন। পারস্যের রাষ্ট্রধর্ম ছিল জরথুস্ত্রবাদ। এই ধর্মে আগুনকে ঈশ্বর নয়, বরং সত্য ও পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে মানা হতো। নৈতিকতা, সত্যবাদিতা ও দায়িত্ববোধ ছিল এর মূল শিক্ষা।
৭ম শতকে আরব উপদ্বীপে ইসলামের উত্থান ঘটে।
নবী মুহাম্মদের মৃত্যুর পর ইসলাম শুধু ধর্ম হিসেবে নয়, রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা হিসেবেও বিস্তার লাভ করতে থাকে। আরব মুসলিম বাহিনী একের পর এক প্রতিবেশী অঞ্চল দখল করতে শুরু করে। এই বিস্তারের অংশ হিসেবেই পারস্য আক্রমণের মুখে পড়ে।
৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে পারস্যে প্রথম বড় আক্রমণ শুরু হয়।
তখন পারস্য শাসন করছিল সাসানীয় সাম্রাজ্য। দীর্ঘ যুদ্ধ, অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও প্রশাসনিক সংকটের কারণে পারস্য ধীরে ধীরে পরাজিত হয়। ৬৫১ খ্রিস্টাব্দে শেষ সাসানীয় সম্রাট নিহত হন। এর মাধ্যমে পারস্যের রাজনৈতিক স্বাধীনতা শেষ হয়।
ক্ষমতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে জরথুস্ত্রবাদও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা হারায়। নতুন শাসকের ধর্ম ছিল ইসলাম।
তবে প্রথম ধাপে সবাইকে জোর করে মুসলমান বানানো হয়নি। কিন্তু যারা মুসলমান ছিল না, তাদের আলাদা কর দিতে হতো। এই করের নাম ছিল জিজিয়া। মুসলমান হলে এই কর দিতে হতো না।
অমুসলিমদের প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও ক্ষমতার কাঠামো থেকে ধীরে ধীরে বাদ দেওয়া হয়। সমাজে মুসলমান হওয়াই হয়ে ওঠে সুবিধাজনক পরিচয়। কয়েক প্রজন্মের মধ্যে এই চাপ, বৈষম্য ও বাস্তবতার কারণে অধিকাংশ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে।
অনেক জরথুস্ত্রী এই পরিস্থিতি মেনে নিতে পারেননি। তারা পারস্য ছেড়ে চলে যান। তাদের একটি বড় অংশ ভারতে আশ্রয় নেয়। আজকের পার্সি সম্প্রদায় সেই ইতিহাসেরই ফল।
এইভাবে পারস্য ইসলামীকরণ হয়। এটি হঠাৎ নয়, শতাব্দী ধরে চলা একটি প্রক্রিয়া। যুদ্ধ দিয়ে শুরু, শাসন ও সমাজের মাধ্যমে সম্পন্ন।
এবার আসি আধুনিক ইরানে।
২০শ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইরান ছিল রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। শেষ রাজা ছিলেন শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি।
তিনি পশ্চিমাপন্থী ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন। কিন্তু তার শাসন ছিল কর্তৃত্ববাদী। গোপন পুলিশ, দমন-পীড়ন ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল ব্যাপক।
এই পরিস্থিতিতে ধর্মীয় নেতারা জনগণের ক্ষোভকে কাজে লাগান। আয়াতুল্লাহ খোমেনি বিদেশ থেকে বিপ্লবের ডাক দেন। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব ঘটে।
শাহ ক্ষমতাচ্যুত হন। ইরান নিজেকে ঘোষণা করে “ইসলামিক রিপাবলিক”।
এই বিপ্লবের পর রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী পদ হয় “সুপ্রিম লিডার”।এই পদে প্রথম বসেন আয়াতুল্লাহ খোমেনি।
খোমেনির মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সালে এই পদে আসেন আলী খামেনি। তিনি তখন খুব পরিচিত বা শক্তিশালী ধর্মগুরু ছিলেন না। কিন্তু বিপ্লবী অভিজাত গোষ্ঠীর সমর্থন তাকে ক্ষমতায় বসায়।
খামেনির ক্ষমতা নির্বাচনের মাধ্যমে নয়। তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব। তার অধীনে রয়েছে সেনাবাহিনী, বিপ্লবী গার্ড, বিচার বিভাগ ও মিডিয়া। রাষ্ট্রপতি থাকলেও শেষ সিদ্ধান্ত খামেনির।
খামেনি ধর্মকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। নারী পোশাক, মতপ্রকাশ, রাজনীতি—সবকিছুতে ধর্মীয় আইন চাপিয়ে দেওয়া হয়। বিরোধিতা করলে দমন, কারাবাস বা নির্বাসন হয়।
আজকের ইরানে ইসলাম শুধু ধর্ম নয়। এটি ক্ষমতার কাঠামো। রাষ্ট্র, সেনা ও ধর্ম একত্র হয়ে একটি শাসনব্যবস্থা তৈরি করেছে।
এ কারণেই বহু ইরানি আজ ইসলামি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলেন। তাদের বিরোধিতা ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। তাদের বিরোধিতা ধর্মের নামে শাসনের বিরুদ্ধে।
এই ইতিহাস বোঝা গেলে বর্তমান ইরানের ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও বিভাজন বোঝা সহজ হয়।
আন্তর্জাতিক আইন দুর্বলদের জন্য। শক্তিশালীদের জন্য নয়। এই বাস্তবতা না বুঝলে আজকের বিশ্ব বোঝা যাবে না।
যে রাষ্ট্র বারবার আন্তর্জাতিক নীতি মানে না, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন চালায়, বিচারহীনতা টিকিয়ে রাখে—বিশ্ব বাস্তবে তাদের কিছুই করতে পারে না। নিন্দা হয়। বিবৃতি আসে। রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। কিন্তু কার্যকর শাস্তি হয় না। এটাই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নির্মম সত্য।
একইভাবে ইসরাইল–এর ওপর সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে আরব বিশ্ব থেকে রকেট হামলা চালানো আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। কোনো রাষ্ট্র বা সশস্ত্র গোষ্ঠী অন্য রাষ্ট্রের আকাশসীমা ভেঙে নির্বিচারে রকেট ছুঁড়তে পারে না। এটাকে আত্মরক্ষা বলা যায় না।
আজ যদি ইসরাইলের আকাশে রকেট ছোড়া স্বাভাবিক হয়ে যায়, কাল যে কোনো রাষ্ট্রের সীমান্তই অর্থহীন হয়ে পড়বে। তবুও বিশ্ব এখানেও কার্যকরভাবে কিছু করতে পারে না—নিন্দা আর বিবৃতির বাইরে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি আরও গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী। এখানে সীমান্ত পেরিয়ে হামলা নয়, রাষ্ট্রের ভেতরেই সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন চলে। ভূমি দখল, ধর্মীয় হামলা, সহিংসতা, নিরাপত্তাহীনতা ও বিচারহীনতা বছরের পর বছর চলমান। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা।
বাংলাদেশ আদিবাসী বিষয়ে জাতিসংঘ–এর নীতিমালা লঙ্ঘন করে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আদিবাসী অধিকারের নীতি অনুযায়ী আদিবাসীদের অস্তিত্ব, পরিচয়, ভূমি ও সাংস্কৃতিক অধিকার স্বীকার করা রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা।
অথচ বাংলাদেশ আজও রাষ্ট্রীয়ভাবে “দেশে আদিবাসী রয়েছে”—এই বাস্তব সত্য স্বীকার করতে চায় না। যে রাষ্ট্র অস্তিত্বই অস্বীকার করে, সে অধিকার রক্ষা করবে—এই আশা নিজেই একটি ভ্রান্তি।
যেখানে আদিবাসীর অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়, সেখানে পাহাড়, বন, জমি ও ধর্মীয় স্থান একে একে হাতছাড়া হয়। অভিযোগ ওঠে, কিন্তু বিচার হয় না। এই নীরবতা ও রাষ্ট্রীয় সহনশীলতাই নিপীড়নকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। প্রশ্নটা এখানে খুব সরল—যে রাষ্ট্র নিজের নাগরিকের অস্তিত্বই মানে না, সে রাষ্ট্র সার্বভৌমত্ব দাবি করে কোন নৈতিকতায়?
সমস্যা হলো, আন্তর্জাতিক আইনের নিজস্ব কোনো বলপ্রয়োগকারী শক্তি নেই। জাতিসংঘের কাঠামো ভেটোর রাজনীতিতে প্রায়ই অচল। আইন থাকে কাগজে, বাস্তবে নয়। এখানেই তৈরি হয় এক গভীর শূন্যতা।
এই শূন্যতার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র সামনে আসে। আমেরিকা নিজেকে নিয়ম রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে তুলে ধরে। তারা বলে—যখন আন্তর্জাতিক আইন কাজ করে না, তখন শক্তি ব্যবহার অনিবার্য। তাদের ভাষায় এটি আগ্রাসন নয়, বরং ব্যবস্থা ঠিক করার চেষ্টা।
ভেনেজুয়েলা এই যুক্তির সবচেয়ে নগ্ন উদাহরণ। ভেনেজুয়েলা–তে সরকার আন্তর্জাতিক নীতি মানছে না, গণতন্ত্র ভেঙে পড়েছে—এই অভিযোগ তুলে আমেরিকা বলে, এই রাষ্ট্র নিজ জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।
তাই এই সরকারকে রক্ষা করার দায় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নেই। তারা জানে, আইন মানুক বা না মানুক—আইন প্রয়োগ করার ক্ষমতা একমাত্র তাদেরই আছে।
এই যুক্তিতে দায়ের জায়গা পুরোপুরি বদলে যায়। প্রশ্ন আর থাকে না—আমেরিকা কেন হস্তক্ষেপ করছে। প্রশ্ন হয়ে ওঠে—রাষ্ট্রগুলো কেন এমন জায়গায় পৌঁছাল, যেখানে তাদের সার্বভৌমত্বই বিতর্কিত হয়ে গেল। ব্যর্থতা এখানে হস্তক্ষেপকারীর নয়, রাষ্ট্রের নিজের—এটাই বলা হয়।
বাংলাদেশ যদি সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের অস্তিত্ব স্বীকার করত, যদি তাদের জীবন, ভূমি ও মর্যাদা রক্ষা করত, যদি বিচারব্যবস্থা কার্যকর হতো—তাহলে কোনো বিদেশি চাপ বা হস্তক্ষেপের জায়গাই তৈরি হতো না। নিপীড়ন অস্বীকার করে সার্বভৌমত্বের দাবি আজ আর টেকে না।
এই বাস্তবতায় সার্বভৌমত্ব আর প্রশ্নহীন অধিকার নয়। এটি দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত। রাষ্ট্র যখন নিজের নাগরিকদের—বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের—সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন তার সার্বভৌমত্ব নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
তাই বলা হয়, যে সব দেশ আন্তর্জাতিক নীতি মানে না, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু নিপীড়নকে স্বাভাবিক করে তোলে, বিশ্ব তাদের থামাতে পারে না। শেষ পর্যন্ত আমেরিকার মতো শক্তি এগিয়ে আসে। এটা ন্যায়বিচার নয়। এটা সুন্দরও নয়। কিন্তু শক্তির রাজনীতিতে এভাবেই বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করা হয়।
এই দৃষ্টিতে বাংলাদেশে যদি চাপ আসে, হস্তক্ষেপের আলোচনা ওঠে, বা আন্তর্জাতিকভাবে কড়া অবস্থান দেখা যায়—তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটি হঠাৎ নয়। এটি বছরের পর বছর ধরে চলা অস্বীকার, নিপীড়ন এবং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার পরিণতি।
এটা নৈতিক গল্প নয়।আদর্শের পাঠও নয়।
কঠিন সত্য একটাই, এই বিশ্বে নিয়ম ভাঙা সবচেয়ে বড় অপরাধ নয়। দুর্বল হওয়াটাই সবচেয়ে বড় অপরাধ।
অনেকে প্রশ্ন করেছেন নিকোলাস মাদুরোর ভুলগুলো কি। ভেবেছিলাম লিখবো না। কারণ আমার থেকে সবাই ভাল জানেন। তবে কেউ যদি না জেনে থাকেন সহজ করে তাদের জন্য লিখলাম। আশা করি, ভেনেজুয়েলা সাধারণ মানুষের কথা জানতে এটি পড়বেন।
নিকোলাস মাদুরো বর্তমান প্রেসিডেন্ট। তিনি ক্ষমতায় আসেন ২০১৩ সালে। তার আগে দেশটির নেতা ছিলেন হুগো চাভেজ।
ভেনেজুয়েলা একসময় লাতিন আমেরিকার অন্যতম ধনী দেশ ছিল। তেলের কারণে দেশটি প্রচুর আয় করত।রাষ্ট্র সামাজিক খাতে খরচ করত। মানুষের জীবন ছিল তুলনামূলক স্থিতিশীল।
চাভেজ ১৯৯৯ সালে ক্ষমতায় আসেন। তিনি সমাজতন্ত্রের কথা বলেন। তিনি গরিবদের জন্য জনপ্রিয় হন। কিন্তু তিনি রাষ্ট্রের ক্ষমতা ধীরে ধীরে এক হাতে কেন্দ্রীভূত করেন।
চাভেজ মারা যান ২০১৩ সালে। তারপর মাদুরো প্রেসিডেন্ট হন। এখান থেকেই সমস্যাগুলো পরিষ্কার হতে শুরু করে।
প্রথম বড় ভুল শুরু হয় ২০১৩–২০১৪ সাল থেকে। মাদুরোর অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল খুব সীমিত। তিনি সরকারি খরচ বাড়ান। কিন্তু উৎপাদন বাড়াতে পারেননি।
২০১৪ সাল থেকে তেলের দাম কমতে শুরু করে। রাষ্ট্রের আয় হঠাৎ কমে যায়। কিন্তু সরকার খরচ কমায় না। বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ছাপানো বাড়ে।
এর ফল আসে ২০১৫–২০১৬ সালে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে থাকে। টাকার মূল্য দ্রুত কমে যায়। মানুষের বেতন মূল্যহীন হয়ে পড়ে।
২০১৭ সালে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়। ভেনেজুয়েলা হাইপারইনফ্লেশনে ঢুকে পড়ে। দোকানে খাবার থাকে না। ওষুধ পাওয়া যায় না।
এই সময় মানুষ রাস্তায় নামে। ২০১৪, ২০১৭ এবং ২০১৯ সালে বড় বড় বিক্ষোভ হয়। মানুষ খাবার চায়। তারা কাজ চায়। সম্মান চায়। পারিবার বাঁচাতে চায়।
মাদুরোর দ্বিতীয় বড় ভুল এখানেই। তিনি এই বিক্ষোভকে রাজনৈতিক শত্রুতা হিসেবে দেখেন। পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী নামানো হয়। গ্রেপ্তার শুরু হয়। অনেককে মেরে ফেলা হয়।
২০১৪ সাল থেকে বহু মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। অনেক মানুষ আহত হয়। অনেকে নিহত হয়। ভয় ও আতঙ্ক সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।
তৃতীয় বড় ভুল ঘটে ২০১৫ সালে। সে বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিরোধীরা জয় পায়। এটি ছিল মাদুরোর জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা।
সংসদ তখন সরকারকে প্রশ্ন করতে শুরু করে। কিন্তু ২০১৭ সালে সরকার সংসদের ক্ষমতা কার্যত কেড়ে নেয়। আদালতের মাধ্যমে সংসদ দুর্বল করা হয়।
এরপর ২০১৭ সালেই একটি নতুন “কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি” গঠন করা হয়। এই সভা পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। নির্বাচিত সংসদ গুরুত্ব হারায়।
এখান থেকেই একনায়কতন্ত্রের অভিযোগ জোরালো হয়। কারণ আইনসভা আর স্বাধীন থাকে না।
চতুর্থ বড় ভুল হলো নির্বাচন নিয়ে বিশ্বাস নষ্ট করা। ২০১৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়। অনেক বিরোধী দল অংশ নেয়নি। অনেক দেশ ফলাফল মানেনি।
২০২৪ সালের নির্বাচনেও একই প্রশ্ন ওঠে। ফল ঘোষণার স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ থাকে। মানুষ মনে করতে শুরু করে—ভোটে কিছু বদলাতে পারে নি।
গণতন্ত্রে এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থা। কারণ তখন শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের পথ বন্ধ হয়ে যায়।
পঞ্চম বড় ভুল হলো আদালত ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ। ২০১৬–২০১৭ সালের পর আদালতের সিদ্ধান্ত প্রায়ই সরকারের পক্ষে যায়। রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ— আইনসভা, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ—একটি হাতে চলে আসে।মানে তার নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
এটাই একনায়কতন্ত্রের মূল বৈশিষ্ট্য।
ষষ্ঠ বড় ভুল হলো বাস্তবতা অস্বীকার করা। সরকার বহু বছর ধরে বলেছে, সব সংকট বিদেশি ষড়যন্ত্র। সব সমস্যা নিষেধাজ্ঞার ফল।
কিন্তু দেশের ভেতরের ভুল নীতির কথা স্বীকার করা হয়নি।
এর ফল ভয়াবহ হয়। ২০১৫ সাল থেকে লাখ লাখ মানুষ দেশ ছাড়ে। ২০২০ সালের মধ্যে কোটি মানুষ ভেনেজুয়েলা ছেড়ে পালায়। এটি লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটে পরিণত হয়।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের। শিশুরা অপুষ্টিতে ভোগে। হাসপাতালে ওষুধ থাকে না। শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
এ কারণেই আজ মাদুরোকে “একনায়কতন্ত্রের নায়ক” বলা হয়।
কারণ তিনি ২০১৩ সাল থেকে ক্ষমতায় আছেন। তিনি ক্ষমতা ছাড়াকে ভয় পান। তিনি সংসদকে দুর্বল করেছেন। নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে দিয়েছেন। ভিন্নমতকে দমন করেছেন।
এটি কোনো একদিনের ভুল নয়। ২০১৩ থেকে ২০২৪, একটির পর একটি সিদ্ধান্ত ভেনেজুয়েলাকে এই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
এই লেখার উদ্দেশ্য কাউকে ঘৃণা শেখানো নয়। উদ্দেশ্য একটাই আর তা হচ্ছে ক্ষমতা যখন জবাবদিহি হারায়,
তখন একজন নেতা কীভাবে ধীরে ধীরে একনায়কে পরিণত হয় তা বোঝাতে আমার জুম্ম আদিবাসীদের জন্য লিখা।
ইরানের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে।দেশটিতে মূল্যস্ফীতি এখন ৪০ শতাংশেরও বেশি। মুদ্রার মান দ্রুত পড়ছে।রিয়াল এখন ডলারের সামনে প্রায় মূল্যহীন।
নিত্যপণ্যের দাম মানুষের নাগালের বাইরে। খাবার কেনা অনেকের জন্য অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীরা রাস্তায় নেমেছেন প্রতিবাদে। রাষ্ট্র তাদের জবাব দিয়েছে গুলিতে।
এই দমননীতিতে প্রাণ গেছে সাধারণ ব্যবসায়ীদের। সরকার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ভয় বেছে নিয়েছে। প্রতিবাদের মূল্য এখন মৃত্যু।
ইরানের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে ছিল তেল ও গ্যাসে।নিষেধাজ্ঞার পর সেই আয়ের পথ সংকুচিত হয়েছে।রপ্তানি কমেছে। রাজস্ব ভেঙে পড়েছে।
দেশটির বড় অংশ এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে।জনসংখ্যার বেশিরভাগই জীবনযুদ্ধে পরাজিত। এক সময়ের শক্তিশালী রাষ্ট্র আজ অচল।
১৯৭৯ সালের পর থেকে এই পতনের শুরু। ধর্মের নামে রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু হয়। গণতন্ত্র ধীরে ধীরে উধাও হয়।
ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় এক গোষ্ঠীর হাতে।
রাষ্ট্র আর নাগরিকের নয়। রাষ্ট্র এখন শাসকের নিরাপত্তা কাঠামো। ভিন্নমত মানেই শত্রু। প্রতিবাদ মানেই রাষ্ট্রদ্রোহ।
অর্থনীতি ভেঙে পড়লেও যুদ্ধের নেশা ছাড়েনি সরকার।
খাবার সংকটের মধ্যেই সামরিক উত্তেজনা বাড়ানো হয়েছে। এর মূল্য দিয়েছে সাধারণ মানুষ।
মুদ্রার দর এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে ন্যূনতম খাদ্যও বিলাস। দুর্ভিক্ষের ছায়া স্পষ্ট।
এই অবস্থায় সারা দেশে স্লোগান উঠছে। একনায়কতন্ত্র চাই না। মোল্লা শাসন চাই না।
২০২২ সালের ঘটনার পর এই আন্দোলন সবচেয়ে বড় আকার নেয়। শহর থেকে শহরে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষোভ। ভয় হারিয়ে রাস্তায় নামে মানুষ।
রাষ্ট্র একা হয়ে যাচ্ছে। বন্ধু কমছে। বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে।
যে কেউ প্রশ্ন তুললেই তার পরিণতি হয় ভয়াবহ। এই শাসন টিকে আছে রক্তের উপর।
এক সময়ের সম্ভাবনাময় দেশ আজ ব্যর্থ রাষ্ট্রের পথে। এই পথ নতুন নয়। এই পথ আগেও দেখা গেছে।
ধর্মীয় রাজনীতি যেখানে রাষ্ট্র দখল করে সেখানে অর্থনীতি, গণতন্ত্র—দুটোই ভেঙে পড়ে। ইরান তারই উদাহরণ।
আজ ইরানের রাজপথে একটাই কথা ঘুরছে— “শাসকের পতন চাই।”
এই আগুন নিভছে না। দিনে দিনে বাড়ছে। তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। ইরানের মোল্লার দিন শেষ।
সত্য চাপা দেওয়া যায়। কিন্তু জনগণের অধিকার মুছে ফেলা যায় না।