আরও একবার ফিরে এলাম

মার্চ ১২, ২০২৬। সকাল ৬টা ৩০ মিনিট। টোকিওতে তাপমাত্রা ৭ ডিগ্রি।

একটি কল করলাম। ওয়ালের দরজা খুলে গেল। ভেতরে ঢুকতেই দরজাটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম।

সব ঠিক ছিল।

এখন ফেরার পালা।

বোতাম টিপলাম।

কাজ করছে না।

আরও জোরে টিপলাম। বারবার টিপলাম।

কিছুই হলো না।

পকেট থেকে যন্ত্রটা বের করলাম। নেটওয়ার্ক নেই।

একটা মুহূর্তে বুঝলাম, আমি আটকে গেছি।

চারপাশ বন্ধ। বের হওয়ার কোনো পথ নেই।

এই ছোট্ট যন্ত্রটাই যদি কাজ না করে, তাহলে এখানেই সব শেষ।

না—এই চিন্তা আমি শেষ পর্যন্ত নিতে চাই না।

কারণ মৃত্যুর সাথে আমার লড়াই নতুন কিছু না।

আমি বহুবার সেই দরজার সামনে দাঁড়িয়েছি।

আর প্রতিবারই ফিরে এসেছি।

শরণার্থী জীবনে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে যখন অচেতন হয়ে পড়েছিলাম, জ্ঞান ফিরে দেখি—চারপাশে কান্না। আমার পরিবার ধরে নিয়েছিল, আমি আর ফিরব না।

কিন্তু ফিরেছিলাম।

নিজ বাড়িতে ইউপিডিএফ-জেএসএসের নামে মিথ্যা সংঘর্ষ সাজিয়ে যে রাতে আমাকে গুলি করার কথা ছিল, সেদিন সন্ধ্যায় দুই বন্ধু জোর করে আমাকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায়।

আমি বেঁচে যাই।

আরেকদিন, সেই একই দলের এক বন্ধু দায়িত্ব নেয় আমাকে শেষ করে দেওয়ার। অন্য কেউ মারুক সে তা চায়নি।

তার হাতে থাকা অস্ত্র কাজ করেনি। ব্রাশে jam হয়ে গিয়েছে।

আমি আবার বেঁচে যাই।

তারপর আসে সেই দিন যেটা আজও ভুলতে পারি না।

চাকমা সমাজের এক গুরুত্বপূর্ণ বন্ধুর সাথে আমরা ধরা পড়ি।

আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলা হলো, পাঁচ মিনিট সময়।

শেষ ইচ্ছা বলার সময়।

তারপর ট্রিগার টানা হবে।

আমার অপরাধ—আমি খ্রিস্টান।

আমার বন্ধু তখন বাকরুদ্ধ।

আমার জীবন কষ্টের ভেতর দিয়ে এতটা এগিয়ে গিয়েছিল যে, তখন জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে কোনো পার্থক্যই ছিল না। বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়া আমার কাছে সমান ছিল। তাই আমি শান্ত ছিলাম।

ওপারের গ্রামে খবর ছড়িয়ে পড়ে—আমাকে নাকি রাস্তায় গুলি করা হয়েছে।

মানুষ পালাতে শুরু করে।

পাঁচ মিনিটের মধ্যে পুরো গ্রাম ফাঁকা হয়ে যায়।

পুলিশ-আর্মি আসছে—এই গুজব ছড়িয়ে পড়ে।

শেষ পর্যন্ত তারা ট্রিগার টানেনি।

পালিয়ে গেছে।

আমি আবার বেঁচে যাই।

আজ—টোকিও।

একটা বন্ধ জায়গায় দাঁড়িয়ে, আবার সেই একই প্রশ্ন সামনে।

এইবার কি শেষ?

এইসব ভাবতে ভাবতেই আমার সেই ছোট যন্ত্রে স্যাটেলাইট নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল।

স্ক্রিনে ভেসে উঠল—“Satellite SOS”

কিন্তু কোনো মেসেজ sent দেখাচ্ছে না।

কলও যাচ্ছে না।

আমি দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম—

জীবন আসলে কী?

আমি যদি এখন মরে যাই, কে আমাকে মনে রাখবে?

হয়তো ২৫০০ ফেসবুক বন্ধুর মধ্যে ১০ জন “RIP” লিখবে।

তারপর ধীরে ধীরে আমাকে আনফ্রেন্ড করে দেবে।

কারণ মৃত মানুষের প্রোফাইল কেউ রাখতে চায় না।

তখনই মনে হলো—

বেঁচে থাকলে কিছু রেখে যেতে পারলে উত্তম।

দেশের জন্য, জাতির জন্য—

এমন কিছু, যা মানুষ মনে রাখবে।

যুগের পর যুগ।

ঠিক তখনই—

দরজা খুলল।

কোট পরা কয়েকজন লোক, হাতে টর্চ।

তারা দ্রুত আমাকে বের করে নিয়ে গেল।

জানলাম—

৩০টা মেসেজের মধ্যে ৫টা মেসেজ ঠিক জায়গায় পৌঁছেছিল।

হয়তো সেই কারণেই—

আমি আবার ফিরে এলাম।

মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে বুঝেছি, টাকা ও সম্মান সব শেষ হয়ে যায়। শুধু থেকে যায় আপনি জাতির জন্য কী করেছেন।

তাই বাঁচতে চাইলে কিছু রেখে যান, যা আপনাকে যুগের পর যুগ বাঁচিয়ে রাখবে।

(নোটঃ অতীতের ঘটনাগুলোর সঙ্গে যারা জড়িত তাদের আমি ক্ষমা করে দিয়েছি। এটা শুধু মৃত্যুর অভিজ্ঞতা বুঝাতে সত্যি ঘটনাগুলো প্রকাশ করলাম)

Leave a Reply