শনিবার সকালে তেহরানের আকাশ ছিল শান্ত। শহরের মানুষ তাদের স্বাভাবিক জীবনে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই আকাশ থেকে নেমে এলো এমন এক আগুন, যা মুহূর্তের মধ্যে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রকে কাঁপিয়ে দিল।
৫ মার্চ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মার্কিন পত্রিকা New York Post দাবি করেছে, এই হামলায় ব্যবহার করা হয়েছিল “ব্লু স্প্যারো” নামে একটি বিশেষ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র। এটি প্রথমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অনেক উঁচুতে উঠে প্রায় মহাকাশের সীমানা ছুঁয়ে যায়, তারপর ভয়ংকর গতিতে আবার নিচে নেমে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কম্পাউন্ড। তেহরানের পাস্তুর স্ট্রিট এলাকায় অবস্থিত এই কম্পাউন্ড বহু বছর ধরেই ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
খবরে বলা হয়েছে, এই আক্রমণ ছিল একটি বড় সামরিক অভিযানের অংশ। হামলার শক্তি এতটাই বেশি ছিল যে বিস্ফোরণের ধ্বংসাবশেষ পশ্চিম ইরাক পর্যন্ত গিয়ে পড়েছিল বলে ইসরায়েলি সূত্র দাবি করেছে।
প্রতিবেদন আরও বলছে, এই হামলার পরিকল্পনা হঠাৎ করে করা হয়নি। বরং এটি দীর্ঘদিনের গোপন প্রস্তুতির ফল। হামলার আগে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকর্তারা এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন যাতে মনে হয় সেনাবাহিনী সপ্তাহান্তে বিশ্রামে যাচ্ছে।
এমনকি কিছু ছবি ও তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছিল যেখানে দেখা যায় অনেক কর্মকর্তা শাবাতের ডিনারের জন্য বাড়ি ফিরছেন। কিন্তু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাস্তবে সেই কর্মকর্তারাই পরে গোপনে আবার সদর দপ্তরে ফিরে এসে অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
হামলার সময়ও শেষ মুহূর্তে বদলানো হয়। প্রথমে এটি রাতের জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু পরে সময় পরিবর্তন করে শনিবার সকালে করা হয়, কারণ তখন তেহরানে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের একটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল।
খবরে বলা হয়েছে, আয়াতুল্লাহ খামেনি সাধারণত নিরাপত্তার কারণে গভীর ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে থাকতেন। তবে ওই সকালে তিনি নিজের কম্পাউন্ডেই উপস্থিত ছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
এই হামলার পেছনে গোয়েন্দা নজরদারির বড় ভূমিকা ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে ওই কম্পাউন্ডের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নজর রাখছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
কে কখন আসে, কোথায় নিরাপত্তা বাহিনী অবস্থান নেয়—এসব তথ্য নাকি নিয়মিতভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছিল। আশপাশে বসানো একটি নজরদারি ক্যামেরাও নাকি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করেছিল।
এসব তথ্য তেলআবিবে পাঠানো হচ্ছিল যাতে হামলার সঠিক সময় নির্ধারণ করা যায়।
হামলার দিন সকাল সাড়ে সাতটার দিকে ইসরায়েলের এফ-১৫ যুদ্ধবিমানসহ কয়েকটি বিমান আকাশে ওঠে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় দুই ঘণ্টা পরে খামেনির কম্পাউন্ডের দিকে প্রায় ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়, যার মধ্যে ব্লু স্প্যারোও ছিল।
ব্লু স্প্যারো মূলত এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে এটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে উড়ে শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে যেতে পারে। প্রথমে এটি অনেক উঁচুতে উঠে, তারপর নিচে নেমে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে।
প্রতিবেদন আরও বলছে, হামলার সময় খামেনির কম্পাউন্ডের আশপাশের কয়েকটি মোবাইল ফোন টাওয়ারও অচল করে দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত কোনো সতর্ক বার্তা আদান-প্রদান করতে পারেনি।
একই সময়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পর্যবেক্ষণ কক্ষ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরায়েলি সূত্রের দাবি অনুযায়ী, এই হামলায় ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের ৪০ জনের বেশি কর্মকর্তা নিহত হন। তাদের মধ্যে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আব্দোলরহিম মুসাভির নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খামেনির পরিবারের কয়েকজন সদস্যও ওই হামলায় নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, এই হামলার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং দ্রুত বাড়তে থাকা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি। তাদের আশঙ্কা ছিল, এসব কর্মসূচি ভবিষ্যতে অঞ্চলজুড়ে বড় নিরাপত্তা সংকট তৈরি করতে পারে।
এই ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এর ফলে অঞ্চলের সংঘাত নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
নোটঃ Blue Sparrow একটি এয়ার-লঞ্চড মিসাইল, যা সাধারণত যুদ্ধবিমান থেকে ছোড়া হয়। এটি প্রথমে প্রায় ৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত উপরে উঠে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের প্রান্তে পৌঁছে যায়। এরপর এটি উচ্চগতিতে আবার নিচে নেমে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে। এই ধরনের মিসাইল মূলত শত্রুর ব্যালিস্টিক মিসাইলের মতো পরিস্থিতি তৈরি করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরীক্ষা করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।




