ভাগাভাগির ক্ষমতা নাকি কামড়া-কামড়ির অপেক্ষা?

নির্বাচন হলো। সব শান্ত। বাইরে থেকে দেখলে মনে হচ্ছে সব কিছু ঠিকঠাক। কিন্তু এই ‘ঠিকঠাক’ গল্পের চাপায় পড়ে কত না বলা কাহিনী যে বাকরুদ্ধ হয়ে আছে, তা আমরা জানি না।

সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও কোথাও যেন একটা অস্বস্তি রয়ে গেছে। বাজ পড়ার আগে যেমন অস্বাভাবিক নীরবতা নামে, তেমন এক নিস্তব্ধতা চারপাশে।

সেনা এখনো মাঠে আছে। কথা অনুযায়ী তারা ব্যারাকে ফিরবে। মানুষ রাস্তায় নামবে। বাড়ির মানুষ আবার পেটের খিদে বুঝতে শুরু করবে।

তারপর ধীরে ধীরে চাপা পড়া কাহিনীগুলো বেরিয়ে আসবে। সেনা ও সরকারের পরিকল্পনাও প্রকাশ পেতে শুরু করবে। শোনা যাচ্ছে দুই দলকে নিয়ে গোপনে গোপনে একটি ঐকমত্যের সরকার গড়ার চিন্তা চলছে। তার মানে হচ্ছে ভেতরে ভেতরে ভাগাভাগি করে ক্ষমতা, ভাগাভাগি করে সম্পদ—এমন হিসাব কি সত্যিই টেকসই?

কিন্তু পেছনের গল্পটা তারা হয়তো জানে না। ঠিক রাখতে পারলে ভালো। কিন্তু রাখতে না পারলে বিপদ গভীর হবে। যারা দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির ভেতরের স্রোত দেখেছে, তারা জানে এই ধরনের সমঝোতা ভেঙে গেলে তার ফল শুধু রাজনৈতিক থাকে না, তা হয়ে ওঠে অস্থিরতার সূত্র।

বিষয়টি পরিষ্কার করতে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের একটি সহজ উদাহরণ দিই।

একই গৃহের দুই কুকুর যখন গুই ধরে, একটি ঘাড়ে আর অন্যটি লেজে কামড় মারে। পরে মালিক এসে তাদের সাহায্য করে। শিকার নিয়ে তাদের মধ্যে বড় ঝগড়া হয় না। তারা আবার একসাথে এক বাটিতে ভাতও খায়।

কিন্তু সবসময় তা হয় না। অনেক সময় একই গৃহের দুই কুকুরও এক বাটিতে ভাত খেতে পারে না। পেটে খিদে যখন বেশী থাকে তখন কামড়া-কামড়ি শুরু হয়।

বাংলাদেশের শাসনের চিত্রও সেই রকম হতে পারে। কারণ এই শক্তিগুলো কখনো প্রকৃত অর্থে ভাগাভাগি করতে শেখেনি। কে কার বস, কে কার চেয়ে বেশি পাবে—এই প্রতিযোগিতাই শেষ পর্যন্ত দ্বন্দ্ব ডেকে আনে।

ইউনুস সরকারের দুর্নীতির ইতিহাসও একসময় সামনে আসবে। এখন অনেকের কাছে ইউনুস সাহেবকে বেশ নিষ্পাপ মনে হচ্ছে।

কিন্তু ক্ষমতার ভেতরের কামড়া-কামড়ি শুরু হলে সেই চিত্রও বদলে যেতে পারে। দেশ না ছাড়লে তার অবস্থাও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

যাক, দেখার অপেক্ষা।

১৪ ফেব্রুয়ারি: গোলাপের আড়ালে লুকানো এক বিদ্রোহের গল্প

ভ্যালেন্টাইনস ডে’র গল্পটা আসলে শুধু গোলাপ আর চকলেটের গল্প নয়। রোমান সাম্রাজ্যে এক অস্থির সময়ে এই দিনটি শুরু।

তখন সম্রাট ছিলেন Claudius II। যুদ্ধ চলছিল। সম্রাট মনে করতেন, অবিবাহিত পুরুষেরা নাকি বেশি ভাল সৈনিক হয়। তাই তরুণদের বিয়ে নিষিদ্ধ করা হলো।

কিন্তু সবাই চুপ করে থাকেনি।

রোমের এক খ্রিস্টান যাজক ছিলেন। তার নাম ছিল Saint Valentine। তিনি এই সিদ্ধান্ত মানেননি।

তিনি বিশ্বাস করতেন, ভালোবাসা কোনো আদেশে থামানো যায় না। তাই গোপনে তিনি প্রেমিক-প্রেমিকাদের বিয়ে পড়াতেন। কোনো প্রচার ছিল না। ছিল শুধু ঝুঁকি।

অবশেষে তিনি ধরা পড়লেন। কারাগারে নিক্ষেপ করা হলো। কিংবদন্তি বলে, মৃত্যুর আগে তিনি জেলারের কন্যাকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। চিঠির শেষে সই করেছিলেন, “তোমার ভ্যালেন্টাইন”। সত্য হোক বা গল্প হোক এই বাক্যটাই পরে প্রেমপত্রের ভাষা হয়ে গেল।

কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।

রোমে এর আগেও ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি “Lupercalia” নামে এক বসন্ত উৎসব হতো। পরে খ্রিস্টধর্ম শক্তিশালী হলে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইনের স্মরণ দিবস করা হয়।

শত শত বছর পরে, মধ্যযুগে, ইউরোপে বিশ্বাস জন্মাল, এই সময় পাখিরা জোড়া বাঁধে। কবিরা লিখলেন প্রেমের কবিতা। দিনটি বদলে গেল। শহীদের স্মরণ থেকে দিনটি প্রেমের প্রতীকে রূপান্তরিত হলো।

আজ আমরা ফুল দিই, কার্ড দিই, চকলেট দিই। কিন্তু এই দিনের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক সাহসী মানুষের গল্প—যিনি ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ভালোবাসা অপরাধ নয়।

সত্য আর কিংবদন্তি মিশে গেছে। ইতিহাস আর কল্পনা হাত ধরেছে।

তবুও প্রশ্নটা রয়ে যায়, যদি সেই যাজক গোপনে বিয়ে না পড়াতেন, আজ কি ১৪ ফেব্রুয়ারি শুধু ক্যালেন্ডারের আরেকটা সাধারণ দিনই থাকত?

এই কারণেই ভ্যালেন্টাইনস ডে শুধু প্রেমের দিন নয়—এটা এক প্রতিরোধের গল্প। তাই শুধু প্রেমের দিন হিসেবে না দেখে পাহাড়ে দিনটি শাসকের অত্যাচারের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে বাঁচার দিন হোক।

খাগড়াছড়িতে মারমা পাওয়ার

মারমা পাওয়ার

ফেইসবুকে ” পোস্ট ৮ঃ তিন পার্বত্য জেলায় ভোটের জাল” শিরোনামে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। কে শুনে কার কথা। কিন্তু পোস্টটি লিঙ্ক দিলাম। পড়তে পারেন। নির্বাচন তো বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা নয়। নির্বাচন হচ্ছে কূটনীতি, ঐক্য এবং কোশল। যা হবার হয়ে গেল।

মারমা রাজা আসেন নি। তাই চাকমারা হেরে গেছেন। ছবি দেখে কাঁদুন। আর যেটুকু চোখের জল বাকি থাকে তা আগামী নির্বাচনের জন্য রাখুন।

পোস্ট ৮ঃ তিন পার্বত্য জেলায় ভোটের জাল

এই লেখাটি কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়, কোনো দলীয় প্রচারণাও নয়। এটি কেবল মাঠের হিসাব, শক্তির ভারসাম্য, এবং ভুল সিদ্ধান্ত নিলে তার সম্ভাব্য পরিণতির একটি বাস্তব বিশ্লেষণ। আবেগ দিয়ে নয়, বরং সংখ্যা, ক্ষমতা আর কৌশলের জায়গা থেকেই বিষয়গুলো দেখার চেষ্টা।

আমরা জানি রাঙামাটি বিএনপি প্রায় নিশ্চিত। প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকলে সেটা ৯০% নিশ্চিত বলা যায়। বান্দরবান বিএনপিকে এগিয়ে মনে হলেও ভেতরের অবস্থা এখানে আসলে ভিন্ন। বলা যায়, একটু ব্যতিক্রম হলে পুরো উল্টো ফলাফল হবে।

এবার আসি সবচেয়ে জটিল মাঠে, আর সেটা হচ্ছে খাগড়াছড়ি। বড় খেলোয়াড় দুটি বড় দল বিএনপি আর জামায়াত হলেও খেলা এখানে ভিন্ন। এখানে বড় খেলোয়াড় তিনজন। তারা ওয়াদুদ, সমীরণ এবং ইয়াকুব।

খাগড়াছড়িতে ভোট কত?

হিসাব তো জানি। বাঙালি ভোটার: ২,৮২,১৮৬ জন। জুম্ম ভোটার: ২,৭১,১২৭ জন। পৌরসভাগুলোতে ভোট বেশি, আর সঠিকও হয় বেশি। কারণ এখানেই প্রশাসনিক নজর, মিডিয়া উপস্থিতি এবং কেন্দ্রভিত্তিক হিসাব তুলনামূলক স্বচ্ছ থাকে। গ্রাম এবং সীমান্ত এলাকায় ভোট কাস্ট কম হয় বেশি, সেখানে প্রভাব, ভয় আর অনিয়মের জায়গা বেশি থাকে। এদিক থেকে হিসাব করলে লড়াইটা ওয়াদুদ এবং সমীরণের মাঝে।

এর আরও কিছু ফ্যাক্টর আছে।

প্রথম ফ্যাক্টর হচ্ছে ঘোড়া। ঘোড়া ৬০ হাজার ভোট কাটলে খেলা হতম। তার মানে ঘোড়া যত ভোট কাটবে, তত ‘ওয়াদুদ হঠাও’ মানুষের পরাজয় বেশি। এখানে ঘোড়ার ভূমিকা কাউকে জেতানো নয়, বরং কাউকে হারানো এবং এটাই এই নির্বাচনের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক।কারণ এর আগে প্রসিত, উজ্জ্বল কেউ নির্বাচনে জয়ী হতে পারেন নি। তাই অনেকের মতে ধর্মবাবুর জেতার সম্ভাবনাও কম।

দ্বিতীয় ফ্যাক্টর দালাল জুম্ম। এই দালালেরা যত বেশি অপ্রতিরোধ্য হবে, তত ওয়াদুদ শক্তিশালী হবে। এদের বক্তব্যগুলোও বিভ্রান্তিকর। এদের কিছু করা যাবে না—সেটা ঠিক। তবে তাদের বক্তব্যের প্রত্যুত্তর দিয়ে তাদের মুখোশ খুলে দিতে না পারলে সমস্যা বেশি বাড়বে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই দালালেরা কি সত্যিই নিজেদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করছে, নাকি কেবল অন্যের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার যন্ত্র হয়ে আছে?

তৃতীয় ফ্যাক্টর হচ্ছে জুম্মদের মাঝে বিভ্রান্তি—কেন ওয়াদুদ রুখতে হবে। সেই বিষয়ে সামাজিক মিডিয়াসহ রুট-লেভেলে এখনো শক্ত অবস্থান গড়া যায়নি। এই বিষয়টি নিয়ে ‘ওয়াদুদ হঠাও’ সমীরণ গ্রুপ শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি। এখানে ব্যর্থতা কেবল প্রচারের নয়, এটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যার ব্যর্থতা।

তবে, ‘ওয়াদুদ হঠাও’ গ্রুপের আরেকটি সুন্দর কৌশল আছে। ওয়াদুদ সাধারণত তার একচ্ছত্র নেতৃত্বকে টিকিয়ে রাখতে শুধু চাকমা, মারমা এবং ত্রিপুরা ফ্যাক্টর ব্যবহার করে না। তিনি চাকমাদের মধ্যে দুটি গ্রুপ, মারমাদের মাঝে দুটি গ্রুপ এবং ত্রিপুরাদের মাঝে দুটি গ্রুপ করে রাখেন। বিভক্ত সমাজে নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখা সহজ হয়—এটাই তার পুরোনো পদ্ধতি।

এগুলো সব বলার দরকার নেই। যারা খাগড়াছড়িতে ওয়াদুদ হঠাও নিয়ে কাজ করছেন, তারা জানেন। তবে বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য একটি মূল বিষয় বলতে হবে। সেটিও অভ্যন্তরীণ কৌশল। তা হচ্ছে রিঙ্কু গ্রুপ এবং ম্রাসাতোয়াই গ্রুপ। পদ হচ্ছে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান।

এ বিষয়টি এত জটিল যে সাধারণভাবে বোঝা সম্ভব নয়। এটি অনেকজনের মতামত নিয়ে বিশ্লেষণ করছি।

এই পদ কিন্তু রিঙ্কু পাবেন। কারণ তার আগামীতে খাগড়াছড়ি আসন থেকে এমপি প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা ম্রাসাতোয়াই থেকে কম। ম্রাসাতোয়াইয়ের শুধু লোকবল এবং যোগ্যতাই নয়, তার বিশাল একটি সম্মান আছে। পাহাড়ি-বাঙালি, চাকমা-ত্রিপুরা বা মারমা সমাজে তার কদর অন্যসব বাঘা বাঘা বুদ্ধিজীবীদের চেয়েও কোনো অংশে কম নয়। বরং বলা যায়, তিনি একদম শীর্ষে। ওয়াদুদের বিপরীতে সমীরণের মতো নির্বাচন করলে তিনি নিঃসন্দেহে ওয়াদুদকে পরাজিত করতেন। এখানেই খাগড়াছড়ির রাজনীতির সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি—যোগ্যতা নয়, ভয় সিদ্ধান্ত নেয়।

আর এই কারণেই ম্রাসাতোয়াইয়ের জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়ার বাধা। কারণ ওয়াদুদ কোনো কারণেই তার আগামী নির্বাচনে তার দলের কাউকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলতে চান না। তাই জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ম্রাসাতোয়াই বাবু পাবেন না। এই বিষয়ে খাগড়াছড়ির অনেক বুদ্ধিজীবী একপ্রকার নিশ্চিত।

তাই ‘ওয়াদুদ হঠাও’ গ্রুপের কাছে একটি সমাধান আছে। তা হচ্ছে ম্রাসাতোয়াই বাবুকে দলে নিয়ে আসা। প্রতিশ্রুতি দেওয়া যে তিনি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হবেন এবং আগামী নির্বাচনে তিনি খাগড়াছড়ি আসনে প্রার্থী হবেন। তাকে দলমত নির্বিশেষে সমর্থন দেওয়া হবে। এটি সফল হলে খাগড়াছড়ির রাজনীতির মানচিত্রই বদলে যেতে পারে।

আর এটা করতে না পারলে হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জাপান নীতি—নিজে মরে শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করা। বিশ্বের ইতিহাসে আমেরিকায় প্রকৃত পক্ষে হামলা করার একমাত্র দেশ জাপান। তাই ওয়াদুদ হঠাওদের প্ল্যান হচ্ছে জামায়াতকে জয়ী করা। ম্রাসাতোয়াইকে বোঝাতে না পারলে জামায়াতের জয়। এতে পাহাড়ের সব আঞ্চলিক দলের বিরোধ যেমন বন্ধ হবে, তেমনি সব জুম্ম দালালদের ষড়যন্ত্রও শেষ। মানে এখানে ম্রাসাতোয়াই, রিঙ্কু—সব শেষ। চলুক।

এক কথায় সবাই শেষ। জামাত জয়ী হোক। ১৯৭১এর স্বাধীনতার পর জামাত খাগড়াছড়ির কোন জুম্ম ঘর কিংবা গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় নি। কাজেই ওয়াদুদের চেয়ে জামাত হাজারোগুনে বিশুদ্ধ বলা যায়।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই লড়াই কেবল একটি নির্বাচনের জন্য, নাকি খাগড়াছড়ির রাজনীতির ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, সেই সিদ্ধান্তের জন্য?

খাগড়াছড়ি-২৯৮: আবেগ নয়, অঙ্ক বলছে কে এগিয়ে

এখানে "যদি চাকমা ভোটের ৫০ শতাংশ না হয়ে ৬৫ শতাংশ, বাঙালি ভোটের ৫ শতাংশ এবং মারমা ভোটের ১০ শতাংশ “বল” প্রতীকে আসে  সেই হিসাব করা হয় নি।আপনি হিসাব করে দেখুন)
এখানে “যদি চাকমা ভোটের ৫০ শতাংশ না হয়ে ৬৫ শতাংশ, বাঙালি ভোটের ৫ শতাংশ এবং মারমা ভোটের ১০ শতাংশ “বল” প্রতীকে আসে সেই হিসাব করা হয় নি।আপনি হিসাব করে দেখুন)

খাগড়াছড়ি-২৯৮ আসনের নির্বাচনকে অনেকেই আবেগ দিয়ে দেখছেন। কিন্তু এই নির্বাচন আসলে একটি সরল অঙ্ক। সংখ্যা বুঝলেই সমীকরণ পরিষ্কার হয়ে যায়।

এই আসনে মোট ভোটার প্রায় ৫ লাখ ৪৫ হাজার ৬৮৮ জন। ২০২২ সালের আদমশুমারির অনুপাত ধরলে বোঝা যায়, বাঙালি ভোটার প্রায় ২ লাখ ৭৮ হাজার, চাকমা প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার, ত্রিপুরা প্রায় ৭৫ হাজার এবং মারমা প্রায় ৫৬ হাজারের মতো। এগুলো আনুমানিক হিসাব, তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝার জন্য যথেষ্ট।

এখন অঙ্কটা দেখি।

ধরা যাক ত্রিপুরা ভোটের ৪০ শতাংশ পাল্লায় যায়, ৪০ শতাংশ ধানে যায় এবং ২০ শতাংশ ফুটবলে যায়। তাহলে ৭৫ হাজার ত্রিপুরা ভোটের মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার পাল্লা, ৩০ হাজার ধান এবং ১৫ হাজার ফুটবল পেতে পারে।

মারমা ভোট যদি ৬০ শতাংশ ধানে যায় এবং ৪০ শতাংশ পাল্লায় যায়, তাহলে ৫৬ হাজার মারমা ভোটের মধ্যে প্রায় ৩৩ হাজার ধান এবং ২২ হাজার পাল্লা পেতে পারে।

চাকমা ভোট এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যদি ১ লাখ ৩৩ হাজার চাকমা ভোটের বড় অংশ ধানের বাইরে যায়, ধরা যাক অর্ধেক ফুটবল বা পাল্লায় যায় তাহলে ধানের ঘাটতি তৈরি হবে। উদাহরণ হিসেবে যদি চাকমা ভোটের ৫০ শতাংশ ফুটবলে যায়, ৩০ শতাংশ পাল্লায় যায় এবং ২০ শতাংশ ধানে যায়, তাহলে ফুটবল প্রায় ৬৬ হাজার, পাল্লা প্রায় ৪০ হাজার এবং ধান প্রায় ২৬ হাজার পাবে।

সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর বাঙালি ভোট। যদি ২ লাখ ৭৮ হাজার বাঙালি ভোটের মধ্যে ধান ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশের বেশি না পায়, তাহলে সেটি প্রায় ৮৩ থেকে ৯৭ হাজার ভোটের মধ্যে সীমিত থাকবে। বাকি ভোট পাল্লা ও ফুটবলের মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে।

এই হিসাব একত্র করলে দেখা যায়—ধান যদি বাঙালি ভোটে বড় ব্যবধানে এগোতে না পারে এবং চাকমা ভোটে ক্ষতি হয়, তাহলে জেতা কঠিন হয়ে যায়। পাল্লা যদি বাঙালি ভোটের বড় অংশ পায় এবং পাহাড়ি ভোটের একটি অংশও পায়, তাহলে সে এগিয়ে যেতে পারে। আর ফুটবল যদি চাকমা ভোটের বড় অংশ পায় এবং ত্রিপুরা ভোটের অংশ ধরে রাখতে পারে, তাহলে সে-ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবে।

অর্থাৎ এই নির্বাচনের মূল সমীকরণ দুটি জায়গায়। এক, বাঙালি ভোট কতটা একদিকে যায়। দুই, পাহাড়ি ভোট কতটা একত্র হয়।

এই আসনে কেউ এককভাবে খুব বড় ব্যবধানে এগিয়ে নেই বরং ভোটের বিভাজনই ফল নির্ধারণ করবে। অঙ্ক বলছে, ভোট যত বেশি ভাগ হবে, ফল তত অনিশ্চিত হবে। আর যদি কোনো একটি পক্ষ পাহাড়ি ভোটে সামান্য হলেও ঐক্য আনতে পারে, তাহলে পুরো ফলাফল বদলে যেতে পারে।

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবে ভোটের দিন কার সমর্থক বেশি কেন্দ্রে যায়। আবেগ নয়, এবার খাগড়াছড়ির নির্বাচন নির্ধারণ করবে সংখ্যা।

তবে যদি, চাকমা ভোটের ৫০ শতাংশ না হয়ে ৬৫ শতাংশ, বাঙালি ভোটের ৫ শতাংশ এবং মারমা ভোটের ১০ শতাংশ “বল” প্রতীকে আসে তাহলে হিসাব পুরো বদলে যায়। সে ক্ষেত্রে বল প্রতীক প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার ভোটের ভিত্তি পায়, যা একটি ত্রিমুখী লড়াইয়ে তাকে এগিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট হতে পারে।

তবে এটিই চূড়ান্ত ফল নয়। কারণ তিনটি বিষয় এখনও অনিশ্চিত—ভোটের দিন মোট টার্নআউট কত হবে, ত্রিপুরা ভোট কোনদিকে বেশি যাবে, এবং বাঙালি ভোট ৫ শতাংশেই সীমিত থাকবে নাকি ৮–১২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। এই তিনটির যেকোনো একটিতে পরিবর্তন এলে সমীকরণও পাল্টে যেতে পারে।

অর্থাৎ অঙ্ক অনুযায়ী বল প্রতীক বর্তমানে এগিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু জয় নিশ্চিত নয়। পাল্লা এখনও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী, বিশেষ করে যদি বাঙালি ভোটের বড় অংশ তার দিকে যায়। আর পাহাড়ি ভোট যদি একদিকে পুরোপুরি একত্র না হয়( যদি পাল্লা আর ধানের শীষে না পড়ে ঘোড়ায় পড়লে সমস্যা নেই। তবে বলে পড়লে আরো বল শক্তিশালী) তাহলে ব্যবধান আরও কমে আসতে পারে।

সব মিলিয়ে, খাগড়াছড়ি-২৯৮ এখন আর একতরফা লড়াই নয়। এখানে ফল নির্ধারণ করবে ভোটের ভাগাভাগি, উপস্থিতি এবং শেষ মুহূর্তের সমীকরণ। আবেগ নয়, এই নির্বাচনে শেষ কথা বলবে সংখ্যা।

বিদ্রঃ আমি কারো পক্ষে নই। পোস্টটি পুড়ুন এবং চিন্তা করুন। বাস্তবতা আছে কিনা বলুন। চাকমাদের মধ্যে কি ১৫ হাজার বিএনপি আছে? তাহলে চাকমাদের ৩৫% বাদ যাবে না। গত ৩৬ ঘণ্টার ফল আমি প্রকাশ করি নি। কারণ বিষয়টি স্পর্শকাতর। একজন বিশিষ্ট নেতার এক বিন্দু হঠাৎ মুখ থেকে সত্য খচে পড়লে খারাপ না হয়ে ভাল হয় বলা যায়। সবায়কে ধন্যবাদ।)

পাহাড়ে ভীমরাজ নীতি বিলুপ্তি চাই

ভীমরাজ না চিনলেও ছবিটা দেখলেই চিনে ফেলবেন। পাহাড়ের আদিবাসীরা একে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় ভিন্ন নামে ডাকে। বাংলায় পরিচিত নামগুলোর মধ্যে “ভীমরাজ” একটি।

এই জানেবাজ পাখিকে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা—সবাই পাখির রাজা বলে জানে। কিন্তু এই রাজত্বের বৈশিষ্ট্য কী? অন্য পাখির কাছ থেকে খাবার কেড়ে খাওয়া। নিজেরা শিকার করে বাঁচে না, চুরি করে বাঁচে। অলসতা এদের স্বভাব।

এই স্বভাবটাই পাহাড়ে বহু আদিবাসী নেতার চরিত্র হয়ে উঠেছে। তারা মনে করে—রাজা মানে সাধারণ মানুষের ঘাম ঝরানো খাবার কেড়ে খেয়েও দিব্যি বেঁচে থাকা।

কিন্তু সত্যিকারের পাখির রাজা কে?

ইগল।

নিজের খাবার নিজেই খুঁজে আনে। কারও খাবার কেড়ে বাঁচে না। শক্তি, সাহস আর আত্মনির্ভরতার প্রতীক।

তাহলে ভীমরাজ কে?

রাজা নয়—গুণ্ডা পাখি।

আর পাহাড়ে যারা নিজেদের ভীমরাজ ভেবে রাজা সেজে আছে, যারা সাধারণ মানুষের খাবার কেড়ে খেয়ে বেঁচে থাকে—তারা নেতা নয়। তারা গুণ্ডা।

অথচ চড়ুই কত ছোট। তবু কী সুন্দর তার স্বভাব। ঐক্য আছে, সহমর্মিতা আছে। একসঙ্গে থাকে। কারও খাবার না থাকলে ভাগ করে খায়।

এবার মূল কথায় আসি।

একজন সাধারণ মানুষ যখন ১০০ টাকার বিনিময়ে দাঁড়ি-পাল্লার নির্বাচনী প্রচারণায় যায়, শুধু এই আশায় যে সন্ধ্যায় তার পরিবার দুমুঠো নুনভাত খেতে পারবে—তখন সে হয়ে যায় ‘জাতিবিরোধী’।

আর যার গাড়ি আছে, বাড়ি আছে, নিরাপদ জীবন আছে—সে যখন মাথা দুলিয়ে মিথ্যে আশ্বাস দেয়, ধানের শিষে ভোট চেয়ে জুম্ম জাতির অধিকারের নামে বিভ্রান্তি তৈরি করে—তখন তার সমালোচনা করার কেউ থাকে না। তখন সে হয়ে ওঠে ‘নেতা’।

যখন কেউ সেনানিবাসে বসবাস করে সেনাবাহিনী বা সরকারের বিরুদ্ধে একটি কথাও না বলে, বরং বিপক্ষের স্বজাতি ভাইয়ের বিরুদ্ধে দিনরাত বিষোদগার করে—তখনও সে নেতা।

আর কেউ সরকারের দালানকোঠায় থেকেও সরকারের বিরুদ্ধে নীরব থাকে, অথচ নিজেকে বিপ্লবী নেতা বলে পরিচয় দেয়—তখন জনগণ যাবে কোথায়?

মানুষ তো দিশেহারা হবেই।

তখন যার যা ইচ্ছে তা করবে। নেতাদের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মাবে। কেউ হোটেলে দেহ বিক্রি করবে। কেউ চীনে গিয়ে নিজেকে বিক্রি করবে। কেউ সমুদ্র পাড়ে গিয়ে নিজেকে বাঙালির হাতে তুলে দেবে। উপায় তো আর থাকে না।

কখনো ভেবে দেখেছেন, কতটা অসহায় হলে একজন নারী নিজের সম্মান বিসর্জন দেয়? কতটা অসহায় হলে একজন নারী বিদেশির কাছে নিজেকে বিক্রি করতে বাধ্য হয়?

এই অসহায়তা বোঝার ক্ষমতা আপনাদের নেই।

মানুষ জঙ্গলে আলু বিক্রি করলে আপনারা একভাগ পান। হাজারো মানুষের রক্তের টাকায় আপনারা ভালো থাকেন। সেই রক্তক্ষরণের ওপর দাঁড়িয়ে আপনাদের ছেলে-মেয়েরা বিদেশে পড়ে।

আর যারা রক্ত পানি করে আপনাদের এই টাকা জোগায়, তাদের সন্তানরা বছরে একটি পছন্দের পোশাকও কিনতে পারে না।

এই ভীমরাজ নীতির জন্য আপনাদের ধিক্কার।

পাহাড়ে যেসব দৃশ্য আজ হঠাৎ চোখে পড়ছে, সেগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। এগুলো বহুদিন ধরে জমে থাকা এক সামাজিক বাস্তবতার বহিঃপ্রকাশ।

বাইরে থেকে মনে হতে পারে মানুষ বদলে গেছে। কিন্তু ভেতর থেকে দেখলে বোঝা যায় পাহাড়ের নীতিই মানুষকে বদলাতে বাধ্য করেছে।

দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ে একটি নীরব বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে—নিজের পরিচয়, নিজের মানুষ, নিজের সমাজ টিকে থাকার নিশ্চয়তা নয়। টিকে থাকতে হলে অন্য কিছু ধরতে হবে।

এই বার্তাটা প্রথম গ্রহণ করেছে যারা সুযোগের কাছাকাছি ছিল—শহরে থাকা, শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত, ক্ষমতার সঙ্গে যোগাযোগ থাকা মানুষরা। তারাই দেখিয়েছে, সুবিধা পেতে গেলে অবস্থান বদলানো দোষের নয়।

ফলে গ্রাম, দুর্গম এলাকা আর চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা মানুষদের সামনে নৈতিকতার বিলাসিতা আর থাকে না। তারা দেখে—যারা আগে পথ দেখাত, তারাই এখন দরকষাকষির অংশ।

বিশ্বাস ভেঙে যায়। আর সেই শূন্যতায় ঢুকে পড়ে যে কোনো শক্তিশালী প্রভাব।

পাহাড়ে যে জনসমাগম দেখা যায়, তা অনেক সময় আদর্শের কারণে নয়—প্রয়োজনের কারণে। এটা বিশ্বাসের গল্প নয়, বেঁচে থাকার গল্প। এখানে মানুষ প্রশ্ন করে না, “এটা ঠিক না ভুল”—প্রশ্ন করে, “এতে আজকের দিনটা যাবে তো?”

সবচেয়ে বিপজ্জনক সত্য হলো এই প্রক্রিয়ায় কাউকে একা দায়ী করা যায় না। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দায় ছড়িয়ে গেছে। নেতৃত্ব দিয়েছে সুবিধাভোগীরা, অনুসরণ করেছে অসহায়রা। মাঝখানে হারিয়ে গেছে সমাজ, হারিয়ে গেছে পরিচয়ের ভারসাম্য।

শেষ পর্যন্ত পাহাড় আমাদের এক অস্বস্তিকর সত্য হচ্ছে যখন অর্থ আর সুযোগই একমাত্র নিরাপত্তা হয়ে দাঁড়ায়, তখন মানুষ আদর্শ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় না।

তখন বিক্রি হওয়াটা চরিত্রের ব্যর্থতা নয় বরং নীতি হয়ে ওঠে। দল, নেতারা যা বলে তার বিপরীতে যাবে। কারণ তারা আর ভীমরাজ পাখির কাছে খাবার হারাতে চায় না।

তাই ভীমরাজ হয়ে রাজা সাজার চেষ্টা নয় বরং চড়ুই হওয়ার চেষ্টা করুন।

নইলে পাহাড়ে আদিবাসী অস্তিত্ব থাকবে না। মানুষ আরো বেপরোয়া হবে।

পোস্ট ৭ঃ কোন সরকারই বেশি দিন টিকবে না কেন?

বাংলাদেশে আইন এখন ঘুমন্ত। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ হচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আছে, কিন্তু তারা দায়িত্ব পালন করছে না। কারণ কেউ তাদের আর পাত্তাই দিচ্ছে না।

এটা কোনো তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নয়। থানায়, আদালতে, রাস্তায় সাধারণ মানুষ প্রতিদিন এই বাস্তবতা দেখছে এবং ভোগ করছে।

এই সব কিছু মিলেই মানুষ বুঝে যায়, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি অরাজক দেশে পরিণত হয়েছে। যদিও দেশের মানুষ মনে মনে এই সত্য মেনে নেয়, তবু কথাটা মুখে স্বীকার করতে আত্মসম্মানে লাগে। ভয়, অভ্যাস আর “আর কীই বা করা যাবে”—এই মানসিকতাই মানুষকে নীরব করে রাখে।

এবার যে কথায় আসছিলাম, সেখানে ফিরে আসি।

অনেকেই বলছে, বাংলাদেশে নির্বাচন হলে দেশ আবার সুন্দর করে চলবে। কারণ বিরোধী দল তো নেই বললেই চলে। দেশে এখন কার্যত বিএনপি আর ইসলামি জামায়াতের জোট।

এরা বহু বছর ধরেই একসাথে ঘুমাচ্ছে, খাচ্ছে, বেড়াচ্ছে। একসাথে লীগ সরকার উৎখাত করেছে, লীগকে ধ্বংস করেছে। সুতরাং এবার একসাথেই দেশ চালাবে। তাদের মধ্যে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

তাই ভাগ-বাটোয়ারা করে দেশ চালাবে, অর্থাৎ খেয়ে ফেলবে—এই ধারণাটাই অনেকের।

কিন্তু বাস্তব রাজনীতি এত সহজ নয়। ক্ষমতার ভাগাভাগি শুনতে সহজ হলেও, ক্ষমতার ভেতরের দ্বন্দ্ব কখনো এত শান্তভাবে মেটে না। বাংলাদেশের বাঙালীদের মধ্যে তা একেবারে অসম্ভব।

এই যুক্তিটা ভালোভাবে বোঝার জন্য একটু পিছনে যাওয়া দরকার।

নির্বাচন ঘোষণার আগে ইউনুস সর্বদলীয় জোট গঠনের চেষ্টা করেছিলেন। বলা যায়, তিনি লাখবার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পারেন নি।

সর্বদলীয় জোট হলে তিনিও তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে আরও কিছুদিন ক্ষমতায় থাকতে পারতেন। তিনি ব্যর্থ হন। সময় গড়িয়েছে, চাপ বেড়েছে, আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত চাপে পড়ে তিনি নির্বাচনের নাটক শুরু করেন।

এই নির্বাচনের নাটকের ভেতরে তার হিসাব ছিল আলাদা। তিনি ভেবেছিলেন, বিএনপি আর জামায়াত জোট মিলে দেশ চালাবে, আর তিনি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে যাবেন। ক্ষমতার কেন্দ্র থাকবে, শুধু ভারসাম্য বদলাবে। সর্বদলীয় সরকার হলে যতটা সুবিধা রাখা যেত, নির্বাচিত জোট সরকারে সেটা কম হবে—এই বাস্তবতাও তিনি জানতেন।

বিষয়টি আরো একটু সহজ করে বলি। বিশ দিন অভুক্ত প্রাণী যখন রাজভাণ্ডারে খাবার দেখে, তখন সে লোক মনে করে সব খাবার সে একাই খেয়ে ফেলবে। সে ভুলে যায়, যত ক্ষুধাই লাগুক না কেন, মানুষের পেট রাজভাণ্ডার খালি করতে পারে না।

রাষ্ট্রও ঠিক তেমন। ক্ষমতা দেখলে অসীম মনে হয়, কিন্তু বাস্তবে তার সীমা আছে।

একইভাবে, প্রাণীর মধ্যেও পার্থক্য আছে। কেউ আস্তে আস্তে খায়। কেউ আবার কামড়া-কামড়ি করে খায়। ফলে যা হয় – খাওয়ার চেয়ে খাবার নষ্ট হয় বেশি। বিএনপি আর জামায়াত জোটের অবস্থাও অনেকটা সেরকম। দীর্ঘ দুই দশক ধরে তারা কার্যত না খেয়েই আছে।

তাই এখন তারা ভাগাভাগি করে খাবে এমন আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। অন্তত আমার মনে হয় না। আর এই কামড়া-কামড়ির ভিড়েই সবচেয়ে আগে ছিঁড়ে যায় রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা আর মানুষের আস্থা।

এই অবস্থাতেই দেশের আইন-শৃঙ্খলা আরও অবনতি হবে। মারামারি বাড়বে। শাসন থাকবে, কিন্তু শাসন করার সক্ষমতা ও নৈতিক বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। ফলে অবধারিতভাবেই নতুন করে নির্বাচনের ডাক উঠবে। কয়েক মাস বা কয়েক বছরের মধ্যেই সরকার ভেঙে পড়বে এবং আবার নতুন নির্বাচন হবে। পাঁচ বছর সরকার টিকতে পারবে না।

তাই এই বাস্তবতাকে এখন থেকেই চোখে রেখে চলতে পারলে পাহাড়ে আগাম বড় বিপদের কিছুটা অন্তত পথ রোধ করা যাবে। দালাল এক দিনে উধাও হবে না, তবে আজকের অবস্থান থেকে অন্তত একটু ভালো জায়গায় থাকা সম্ভব। এই সময় অন্ধ আনুগত্য বা ভুল পক্ষ বেছে নেওয়ার মাশুল ভবিষ্যতে পাহাড়কে অনেক বড় করে দিতে পারে—এই বোধটুকু মনে রাখা দরকার।

সবচেয়ে বড় কথা, সর্বদলীয় সরকার হোক বা নির্বাচিত সরকার—এই সরকারের মেয়াদ হবে খুবই অল্প।

পোস্ট ৬: খাগড়াছড়িতে মারমা এমপি চাই

খাগড়াছড়ি জেলায় চাকমা, ত্রিপুরা, এমনকি বাঙালী সম্প্রদায় থেকেও এমপি হয়েছে। কিন্তু একটি জনগোষ্ঠী আজও বঞ্চিত মারমারা। একজনও মারমা এমপি খাগড়াছড়ি কখনো পায়নি। এটা কাকতাল নয়, এটা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কাঠামোর ফল।

মারমারা অযোগ্য নয়। বরং তারা শান্তিপ্রিয়, বিশ্বাসযোগ্য এবং কথা দিলে কথা রাখে এমন মানুষ। সামাজিকভাবে তাদের মধ্যে ঐক্যের অভাব নেই। কিন্তু রাজনীতির মাঠে এসে সেই ঐক্য বারবার ভেঙে পড়ে—বিশেষ করে বিএনপির ভেতরের বিভাজনের কারণে। এটি কিন্তু অনেকে স্থানীয় নেতাদের একটি কূটচাল বলে অনেকে মনে করে।

বর্তমানে মারমা সমাজের মধ্যে বিএনপি সমর্থনে দুটি গ্রুপ দেখা যায়। এটা আসলে মারমাদের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তারই প্রকাশ। অথচ তারা ঐক্যবদ্ধ হলে এমপি প্রার্থী দাঁড় করানোর মতো শক্তি ও জনসমর্থন—দুটোই রয়েছে।

তবু বাস্তবতা হলো, বিএনপির ভেতরে মারমাদের এমপি হওয়ার সুযোগ কার্যত বন্ধ। ওয়াদুদ বহুবার নির্বাচনে ব্যর্থ হলেও তিনি কাউকে সুযোগ দিতে রাজি নন। এই একচেটিয়া রাজনীতির ফলেই সমীরণ দেওয়ান বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন এবং তার জয়ের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

অন্যদিকে, মারমাদের একটি বড় অংশ এখনো ওয়াদুদের পেছনে পড়ে আছে। এই নির্বাচনে ওয়াদুদ হারলেও ভবিষ্যতে মারমা প্রার্থীর সুযোগ তৈরি হবে এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং ওয়াদুদ নিজে না দাঁড়ালেও তার স্ত্রীকে প্রার্থী করার সম্ভাবনাই বেশি।

আমার পর্যবেক্ষণ হলো এই নির্বাচনের পর যে সরকারই আসুক না কেন, তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। বড়জোর কয়েক মাস থেকে দেড় বছর। রাজনৈতিক সংকট, আঞ্চলিক চাপ এবং প্রতিবেশী ভারতের প্রতিক্রিয়া মিলিয়ে এই সরকার শুরুতেই চাপে পড়বে। ফলে এই নির্বাচন শেষ হওয়ার আগেই তার বৈধতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

এই বাস্তবতায় মারমাদের সামনে প্রশ্নটা আরও জরুরি, তারা কি খাগড়াছড়ির বিএনপিকে একটি পারিবারিক রাজনীতির গণ্ডি থেকে বের করে আনতে পারবেন? এজন্য বিএনপি ছাড়তে হবে না, কিন্তু স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নিতে হবে।

শেষ প্রশ্নটা থেকেই যায়, মারমা বুদ্ধিজীবীরা কি সেই সাহস নিতে পারবেন?

পোস্ট ৫ঃ পাহাড় RAW আর ISI খেলা

শিরোনাম দেখে ঠোঁটের ফাঁকে বিদ্রূপের হাসি তুলে আমাকে বিদ্রূপ করতে পারেন। অবিশ্বাস করতে পারেন। কিন্তু তাতে সত্য বদলাবে না।

পাহাড়ে যা হচ্ছে হাসিনা পতনের পর সমতলেও হচ্ছে। পার্থক্য শুধু অস্তিত্ব আর ক্ষমতা। পাহাড়ে অস্তিত্বের প্রশ্ন আর সমতলে মানুষ বলে ক্ষমতার লড়াই।

ভারতের চাপে পার্বত্য চট্টগ্রামে চুক্তি হয়েছে তা কমবেশি সত্য। কিন্তু চুক্তিকে বাতিল করে ভারতের চালকে রুখে দেওয়া ছিল পাকিস্তানের চাল। অবশ্যই অনেকে সেটা ভুল করে বিএনপি’র ওপর চাপিয়ে দেয়। বিএনপি মাত্র উপাদান। বিএনপি এখানে ব্যবহৃত হয়েছে মাত্র।

এখনো অনেকের বুঝার বাইরে আছে। অনেকে শুধু দেখে বিশ্বাস করে। আবার অনেকে শুনে বিশ্বাস করে। অনেকে আবার সব থিওরি মিলিয়ে বিশ্বাস করে।

হয়তো প্রমাণ চাইবেন। তাও আমি জানি। হাজারো প্রমাণ আছে। কিন্তু পরিস্থিতি এবং পরিবেশ দেখে না বুঝলে হাজারো প্রমাণও অকেজো।

পাহাড়ে বর্তমানে অনেক আঞ্চলিক দল। এগুলো এই দুয়ের উপসর্গ মাত্র।দলের মুল কতিপয় নেতা ছাড়া বাকিরা জানার কথা নয়।

তাহলে তারা জেনে এটা করছেন কেন?

প্রশ্ন তো সেটাই। ক্ষমতার লড়াই।

তবে এইটুকু বলবো যে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে। ভারত এবং বাংলাদেশে নেতাদের মধ্যে হয়তো অনেকে হারিয়ে যেতে পারে। ভাগ্য ভাল হলে গ্রেপ্তার হবে। আর খারাপ হলে হারিয়ে যাবে।

তখন বুঝতে দেরি হবে না যুদ্ধ ঘনিয়ে আসছে। দেড় বছর আগে হতে আমরা শুনে আসছি ভারত-বাংলাদেশ যুদ্ধ অনিবার্য। হ্যাঁ, অনিবার্য। এটাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়তো একেবারে অসম্ভব।

এটা লিখছি একারণে যে নির্বাচন নিয়ে অনেক হুমকি দুমকি চলছে। আসলে পাহাড়ে নির্বাচন ভোটে ঠিক হবে না। প্রার্থী ঠিক করবে অন্য কেউ। তাই নির্বাচন-সংক্রান্ত বিষয়ে যেন সব সাধারণ মানুষ যেন একটু সংযত থাকে সেই অনুরোধ করি।

আমি জানি আমি কেউ নই। আমি সাধারণ মানুষ। সংযত সতর্কতা দলগুলির করা দরকার। কিন্তু তারা করবেন না। কারণ সেটার মূল্য কেউ দিবে না।

অবশ্যই সাধারণ মানুষের অনেকে বিষয়টি জানে। কিন্তু ভয়ে বলতে পারছে না।

আমি সাধারণ মানুষ বলে সাধারণ মানুষের কষ্টকে বুঝি। তাই পাহাড়ের প্রতিটি জীবন বাঁচুক সেই কামনা করি।

হ্যাঁ, এবারে হয়তো অনেকে ভাবছি বিএনপি সরকার গঠন করবে। কিন্তু যদি জামাত আসে তাহলে কি হতাশ হবেন? হতেও তো পারে। যে জামাত লীগের মত একটি শক্তিশালী সরকারকে কয়েকদিনে পতন ঘটাতে পারে সেই জামাত নির্বাচনে জয়লাভ করা তো অসম্ভব কিছু নয়।

সেই একি সূত্রে যদি রাঙ্গামাটি বাদে বান্দরবান এবং খাগড়াছড়িতে জামাত জোট ক্ষমতায় আসে তাও অসম্ভব নয়।

ভাল থাকবেন। সুখী থাকবেন। মাথা ঠাণ্ডা রাখবেন। নির্বাচন আমাদের কিছু বদলে দিবে না। বদলাতে হলে আমাদের চিন্তাশক্তি বদলাতে হবে। ঠিক করতে হবে আমরা কোন পথে হাঁটবো।

সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের মাঝে বিভাজন দূর করতে হবে। শুধু দল বা নেতা দেখে রাজনীতি করলে হবে না। জুম্মজাতীয় অস্তিত্ব দেখে ভাবতে হবে।

পোস্ট ৪ঃ খাগড়াছড়িতে ভোট নয়, দৃষ্টিভঙ্গির লড়াই

খাগড়াছড়ির নির্বাচনী মাঠে এবার লড়াইটা পোস্টার আর মাইকের নয়। এটি আসলে দুই ধরনের রাজনীতির মুখোমুখি দাঁড়ানো।

এক রাজনীতি বিশ্বাস করে, রাজনীতি মানে দৃশ্যমান হওয়া। বড় সভা, উচ্চস্বরে ঘোষণা, ব্যানার আর শ্লোগানে শক্তির জানান দেওয়া। মাঠে নামলেই যেন বোঝাতে হবে—কে কত বড়, কে কত শক্তিশালী।

হ্যাঁ, ওয়াদুদ ভুঁইয়ার প্রচারণা এই ধারারই প্রতিনিধি। সংগঠন, উপস্থিতি আর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে তিনি নির্বাচনী মাঠে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করছেন।

অন্য রাজনীতিটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হাঁটে। এখানে রাজনীতি মানে কাছে যাওয়া। কথা বলা নয়, কথা শোনা। কোনো ঘোষণা নেই, কোনো প্রদর্শন নেই।

এটি সমিরণ দেওয়ানের প্রচারণার সেই নীরব ধারা। তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে মানুষকে দেখান না। বরং তিনি মানুষের পাশে বসে তাদের কথা বোঝার চেষ্টা করেন। প্রচারণা এখানে অনুষ্ঠান নয়, সম্পর্ক।

এই দুই পথের পার্থক্য এখন আর গোপন নেই। একদিকে রয়েছে “আমাকে দেখো” ধরনের রাজনীতি।

আর অন্যদিকে “তোমার কথা শুনি” ধরনের রাজনীতি। একটিতে শক্তি আগে, মানুষ পরে। অন্যটিতে মানুষ আগে, শক্তি পরে।

খাগড়াছড়ির মানুষ এই বৈপরীত্য খুব ভালোভাবেই বুঝছেন। তারা দেখছেন, কে সমর্থন চাইছে, আর কে বিশ্বাস তৈরি করছে। কে বক্তৃতা দিচ্ছে, আর কে প্রশ্ন নিচ্ছে। কে আজকের জন্য ভোট চাইছে, আর কে আগামী দিনের সহাবস্থানের কথা বলছে।

এই নির্বাচন তাই শুধু দুই প্রার্থীর প্রতিযোগিতা নয়। এটি আসলে সিদ্ধান্ত, আমরা কোন ধরনের রাজনীতি চাই। দৃশ্যমান শক্তির রাজনীতি, নাকি নীরব কিন্তু গভীর আস্থার রাজনীতি।

খাগড়াছড়ির ভোটাররা এবার শুধু ভোট দিচ্ছেন না। তারা একটি পথ বেছে নিচ্ছেন। কোন পথ শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সময় যত এগোবে ততই বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে।