আমার অনেক পাগলামি আছে। ছোটকাল থেকে অনেকে এজন্য আমাকে এক ধরনের পাগল বলে মনে করে। অবশ্যই আমি কখনো পরোয়া করি নি। এখনো করি না। অনেকে সখ বলে। তবে আমারগুলো নিঃসন্দেহে পাগলামি।
এরকম শত পাগলামির কয়েকটি হচ্ছে, বই পড়া, ভারত-রামায়নের গল্প শোনা, বৃষ্টির দিনে দৌড়ানো, সাইকেল চালা, বাইক চালা, শিকার করা, গহীন জঙ্গলে একাকী আনমনে ঘুরে বেড়ানো, পরিচয় গোপন করে হঠাৎ নতুন কোন জায়গায় দুয়েক দিন থাকা, মানুষের জীবনের গল্প শোনা, চুরির রহস্য উদ্ঘাতন করা।
আমি জানতাম না তখন এসব পাগলামি আসলে নিজের ভেতরের আগুন থেকে পালানোর সেরা পথ।
এসএসসি আমার রেজাল্ট খারাপ হল। আমি স্ট্যান্ড করতে পারি নি। স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল। পাগলামি বেড়ে গেল।
মানুষ যখন হতাশ হয় রোগের উপসর্গ বেড়ে যায়। আমারও তাই হল। চট্টগ্রাম থেকে শরণার্থী শিবিরে ফিরে এলাম। খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, বুন্ধু-বান্ধব সব বাদ দিলাম। কোথায় থাকি, কি করি, দিন নাকি রাত আমি কিছুই বুঝতে পারি না।
আমার ভিতরে তখন হতাশার শব্দগুলো ঘুরে বেড়াত—আমি কি অযোগ্য। আমি ব্যর্থ। আমার স্বপ্ন শেষ।
বৃষ্টি হলে বৃষ্টিতে দৌড় দিতাম। দুর্বল হলে হাঁটতাম। অনেকে পাগল বলে এসে দেখত। কিন্তু বছরে তো আর ৩৬৫ দিন বৃষ্টি হয় না। বর্ষা কয়েকমাস পর শেষ হয়।
দেড় বছর পর একদিন হঠাৎ মনে হল, আমি এভাবে আমি নিজেকে শেষ করছি কেন, আমি তো একা এর জন্য দায়ী নয়। আমার পরীক্ষায় আমাকে মানসিকভাবে নিপীড়ন করা না হলে আমি আমার লক্ষ্য অর্জন করতাম। অন্য দশ জনের মত আমাকে সেই সুযোগ দেওয়া হয় নি। পরীক্ষাতে আমাকে আসামির মত ব্যবহার করা হয়েছিল।
সেদিন প্রথমবার মনে হল, অপমানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোও এক ধরনের বিপ্লব আর এই বিপ্লব হচ্ছে বেঁচে থাকা।
যা ভাবা তেমন কাজ। ঠিক করলাম ১০ বছর আগে পরিচিত এক স্থানীয় রামায়ন রিয়াং দাদুর সাথে দেখা করবো। রামায়ন মুখস্ত পারতেন বলে লোকে তাকে রামায়ন দাদু বলে ডাকতো।
তার সাথে আমার রক্তের কোন সম্পর্ক নেই। ছোটকালে তাকে আমার খুব আপন মনে হত। হেঁটে যেতে হয়। তিন ঘণ্টা পথ। বেঁচে আছে কিনা কে জানে। কেউ তাকে চিনে না। এক বৃষ্টির দিনে দৌড়াতে দৌড়াতে তার সাথে পরিচয় হয়েছিল। তখন থেকে মনে হয়েছিল খুব আপন। দশ বছর তো দেখায় হয় নি।
কিন্তু তখন আমার শরীর খুব দুর্বল। ১৫ মিনিট একটানা হাঁটা অসম্ভব ছিল। তবু যাবো। কাক ডাকা ভোরে রওয়ানা দিলাম। দুপুরে পৌঁছলাম। আধমরা অবস্থা। রিয়াং দাদুর ঘর মাছাং ঘর। সাকো দিয়ে উঠতে হয়। সাকো উঠতে পারি নি। তিনি প্রথমে চিনতে পারেন নি। পরে চিনে কেঁদে ফেললেন।
তার নাম অমৃত রিয়াং। খুব রসিক মানুষ। সম্ভ্রান্ত পরিবারে তার জন্ম। তিনি দূরের এক গ্রামে গিয়ে এক ধনী জুম চাষি রিয়াং তরুণীকে দেখে প্রথম দেখাতে প্রেমে পড়ে যান। সেই ব্রিটিশ আমলে তিনি কলিকাতা থেকে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। তখন মেট্রিকুলেশন পাস করা মানে বিরাট কিছু।
তিনি জনসংখ্যা জরিপের জন্য করবুকের পশ্চিমে যান। গ্রামে পৌছতে বিকেল হয়। উঁচু পাহাড়। সেখানে সবাই জুম করত। জুমে অনেক আগে ধান তোলা শেষ। কিন্তু পুরানো জুমে কুমড়া গুলো পেকে সাদা হয়ে আছে। জুমের সবজি গুলো ফুল ধরে পেকে গেছে। কিছু বন্য ফুল ফুটে আছে। এলাকা নাম না জানা বুনোফুলের সুগন্ধিতে ভরে গেছে। এ সময় পরিবেশে এক ধরনের খুশির আমেজ ছড়িয়ে থাকে। পাহাড়ের মানুষ ছাড়া এই মনোরম পরিবেশ অনুভব করা সম্ভব নয়।
এ সময় পাহাড় উঠতে প্রচুর পানি পিপাসা হয়। পুরানো জুমের ছায়াহীন পথে ওপরে উঠতে তৃষ্ণার্ত ক্লান্ত অমৃত এক ঢোক পানি পেতে মরিয়া। তখন সীতা রিয়াংকে দেখে তিনি নির্বাক হয়ে যান। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। যতক্ষণ না সীতা দুষ্টামি করে তার বহন করা মাটির কলসি থেকে পানি হাতে নিয়ে অমৃতের গায়ে ছিটিয়ে দেন, ততক্ষণ তিনি নির্বাক ছিলেন।
ঠাণ্ডা পানির ফোঁটা আর সীতার কলকল হাসিতে অমৃত সম্বিত ফিরে পান। সেই হাসি তার জীবনের মোড় বদলে দেয়।
সীতার প্রেমে পড়ে যান। কিন্তু সীতা তাকে গ্রহণ করেনি। স্বপ্ন ভেঙে যায়। তিনি মনে করেন সীতাকে ছাড়া তার বেঁচে থাকা অর্থহীন। তবু আত্মহত্যা করেন নি।
তিনি ত্রিপুরা ছেড়ে কলকাতা গেলেন। পুরনো বন্ধুদের সাথে সময় কাটালেন। কিন্তু বুঝলেন, তাঁর জীবন অর্থহীন। তার সীতাকে চায়। স্বপ্নেও সীতা, ভাবনায়ও সীতা। ডায়েরি সীতাকে লেখা চিঠিতে ভরে গেছে। অথচ কোন চিঠি তিনি পাঠাতে পারেন নি।
ভারতে তখন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন চরমে। ভাবলেন সীতার জন্য জীবন না দিয়ে দেশের স্বাধীনতায় জীবন দিবেন। তাই যোগ দিলেন সুভাষ চন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজে। কলকাতা থেকে ত্রিপুরা না এসে সরাসরি ইম্ফল হয়ে বার্মা সীমান্তে গেলেন।
ইম্ফল, কোহিমাসহ অনেক জায়গায় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন। রাতে গুলির শব্দে ঘুম ভাঙত, কিন্তু মনে পড়ত সীতার হাসি। তিনি বুঝেছিলেন, প্রেম মানুষকে দুর্বল করে না, শক্ত করে।
একদিন দোকানে চাল কিনতে গেলে ধরা পড়ে যান। সাথে অস্ত্র ছিল না। বিনা অস্ত্রে মারামারি করলেন। কিন্তু এত জনের সাথে কি পারা যায়? তাকে কলকাতার জেলে নেওয়া হয়। জেলে কাটে তার জীবন।
স্বাধীনতার পরে তিনি মুক্তি পান। জেলের গেটে তাকে অভ্যর্থনা জানাতে কেউ আসবে তিনি ভাবতে পারেন নি। কিন্তু গেটের বাইরে এসে তিনি অবাক। লম্বা লাইনের প্রথমে ফুল হাতে যে যুবতী দাঁড়ানো—তিনি সীতা। মুখে হাসি, চোখে অশ্রু। তাকে দেখা মাত্র ফুল মাটিতে ফেলে দিয়ে দৌড়ে এসে জড়িয়ে তাকে ধরল।
ফিরে এলেন সীতাদের বাড়িতে। বিয়ে হল। সীতা অনেক আগে মারা গেছেন। সংসারে চার ছেলে আর এক মেয়ে। অনেক নাতিপুতি তার। সবাই আছে কিন্তু সীতা নেই। তিনি আর বিয়ে করেন নি। সীতার স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন।
প্রথম দেখা সেই আম গাছের নিচে গল্প শেষ। এক সপ্তাহ পর বাড়ি ফিরলাম। আমি এই এক সপ্তাহে অনেক সুস্থ। আমার হাঁটা বদলে গিয়েছিল। চোখে নতুন আগুন ছিল। আমি বুঝলাম, ব্যর্থতা মানুষকে মারে না, আত্মসমর্পণ মারে।
আমি মরে গেলে এটা লেখা হত না। বেঁচে আছি বলেই সম্ভব হয়েছে। বেঁচে থাকার অর্থ অতুলনীয়।
তাই, ব্যর্থতা যে কারণে হোক না কেন বাঁচুন। মেয়ের জন্য হলে বিপ্লবে যোগ দিন। কিন্তু বুঝবেন—বিপ্লব শুধু প্রেমের জন্য নয়, নিজের মর্যাদার জন্য। দেখবেন মেয়ের চেয়েও বিপ্লব বড়।
কে জানে হয়তো আপনি বিপ্লবে আপনার সীতাকে পেতে পারেন।
কারণ বিপ্লবে আপনার সৌন্দর্য প্রকাশ পাবে।
আর পাহাড়ের যুবক, মনে রাখবেন—আপনি পরাজিত নন। আপনি শুধু এখনো দাঁড়ান নি। দাঁড়ান। দেখবেন আপনার ভিতরের মানুষটাই সবচেয়ে সুন্দর।


