
সাংবাদিক সালিম সামাদ নিয়ে লেখার আমার কোনো যোগ্যতা নেই। তাই তাকে বিশ্লেষণ করার দুঃসাহস আমি দেখাবো না। বরং তাকে ঘিরে পাহাড়ে যে অস্বস্তি, যে অস্বীকার, যে অদৃশ্য পরাজয়—সেটলার বাঙালী ও সামরিক মানসিকতার যে নীরব স্বীকারোক্তি—তা নিয়েই কিছু বলবো।
আমার লেখায় আবার কারো কারো প্রচণ্ড এলার্জি হয়। লেখা পড়া তো দূরের কথা, আমার লেখা নাম শুনলেও তাদের চুলকানি শুরু হয়। নাক-কান লাল হয়ে যায়। অবশ্যই সেই তালিকায় সেটলার আর মৌলবাদীরা প্রথম সারিতে। কারণ সত্য কখনো আরামদায়ক নয়। সত্য চামড়ায় লাগে, স্নায়ুতে লাগে, ইতিহাসে লাগে।
সেটলার কারা সেটা আমরা জানি। তারাও জানে। কিন্তু আমার লেখা পড়ার পর তাদের প্রথম কমেন্ট হয়, “পাহাড় কারোর বাপের নয়।” এই বাক্যটি আসলে যুক্তির ভাষা নয়, অস্বস্তির ভাষা। যখন ইতিহাসের সামনে দাঁড়ানোর সাহস থাকে না, তখন স্লোগান ছুড়ে দেওয়া হয়। চুলকানি বাড়লে মানুষ যেমন অস্থির হয়ে ওঠে, তেমনি ইতিহাসের প্রশ্ন উঠলে তারা অস্থির হয়ে ওঠে।
তাদের এই প্রতিক্রিয়া দেখে আমারও একধরনের এলার্জি হয়। তবে সেটা রাগের নয়, বিদ্রূপের। আমি হাসি। কারণ যে বাক্যটি তারা বলে, সেটিই তাদের ভেতরের ভয়কে প্রকাশ করে। যে ভূখণ্ড নিয়ে এত জোরে বলা লাগে “কারোর বাপের নয়”, সেখানে নিশ্চয়ই ইতিহাস আছে আর সেই ইতিহাসের মালিকানা নিয়েই তো সংকট।
তাই বলি, সাংবাদিক সালিম সামাদ সম্পর্কে পড়ুন। কেন তিনি পাহাড়ে সম্মানিত ছিলেন তা জানুন। পাহাড় কখনো বাঙালী-বিরোধী ছিল না। পাহাড়ি আদিবাসীরা কখনো জাতিগত ঘৃণার রাজনীতি করেনি। ইতিহাস সাক্ষী—সমতল থেকে বাঙালী মানুষ ডেকে এনে প্রশাসন, রাজকার্য, ব্যবসা—সব ক্ষেত্রেই কাজ দিয়েছে পাহাড়ের রাজারা। সহাবস্থান ছিল বাস্তবতা।
কিন্তু পাহাড়িরা কেন সেটলারদের বিরোধী?
ওই যে সেটলারদের সেই উচ্চারণ, “পাহাড় কারোর বাপের নয়।”
কে বলে পাহাড় কারোর বাপের নয়?
পাহাড় পাহাড়ি আদিবাসীদের বাপদাদাদের। মানুষ স্বীকার করুক আর না-ই করুক, ইতিহাস তার সাক্ষ্য দেয়। দলিল আছে, প্রথা আছে, মৌখিক ঐতিহ্য আছে, ব্রিটিশ নথি আছে, ভূমি ব্যবস্থার প্রমাণ আছে। মালিকানার প্রশ্ন আবেগের নয়—ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার।
সালিম সামাদও এই কথাটাই বলেছিলেন। পাহাড়ে এমনি এমনি শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা অস্ত্র ধরেনি। অস্তিত্বের সংকটে, অধিকার হরণের বাস্তবতায়, ভূমি হারানোর যন্ত্রণায় তারা সেই পথে গেছে। তিনি তার দীর্ঘ সাংবাদিক জীবনে এই প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন। তিনি সংঘাতকে রোমান্টিক করেননি। কিন্তু কারণকে অস্বীকারও করেননি। এটাই তার শক্তি।
আজ দেখি, সেটলারদের ভেতরেও অনেক সাংবাদিক নামধারী লোক আছে। কিন্তু তারা সত্যের অনুসন্ধান করে না; তারা অবস্থানের সাফাই লেখে। তারা বলে আদিবাসীরা নাকি মিয়ানমার বা থাইল্যান্ড থেকে এসেছে। অথচ নিজেদের বংশপরিচয়ের ইতিহাস—নদীভাঙা বাস্তুচ্যুতি, রাজনৈতিক প্রকল্প, প্রশাসনিক পুনর্বাসন—এসব নিয়ে নীরব থাকে। সরকার কীভাবে পাহাড়ে জনসংখ্যা স্থানান্তর করেছে, কীভাবে ভূমির ভারসাম্য বদলেছে—সে আলোচনায় তাদের আগ্রহ নেই।
হ্যাঁ, একজন আধুনিক মানুষ হিসেবে আমি বুঝি বর্তমান সেটলার নাতি-পুতিদের ব্যক্তিগত দোষ নেই। রাষ্ট্র এনেছে, নীতি এনেছে, প্রকল্প এনেছে। কিন্তু ইতিহাসের সত্য স্বীকার না করলে কোনো সমাধান হয় না। বরং স্বীকারোক্তিই হতে পারত সহাবস্থানের প্রথম ধাপ। সত্য মানলে সম্প্রীতির পথ খোঁজা যেত।
কিন্তু যখন স্থানীয় আদিবাসীদেরই “বিদেশি” বলা হয়, তখন প্রশ্ন ঘুরে দাঁড়ায়। তখন সেটলার পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কেউ কেউ ভাসানচরের কথা বলে—এটা আবেগের প্রতিক্রিয়া নয়। আমি বলি বাস্তবতা।
হ্যাঁ, বাস্তব সমাধান আবেগ দিয়ে হয় না তাও পাহাড় বুঝে। তবে এটাও সত্য—পরিস্থিতি চিরস্থায়ী নয়। ইতিহাস স্থির থাকে না। তাই ভবিষ্যতের আগে বর্তমানকে স্বীকার করা বুদ্ধিমানের কাজ।
সেটলারদের স্বীকার করতে হবে যে তারা স্থানীয় নয়। আবার এটাও স্বীকার করতে হবে—মানবিক সমাধান ছাড়া কোনো পথ নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি সত্যের উপর দাঁড়িয়ে সমাধান চাই, নাকি অস্বীকারের উপর দাঁড়িয়ে সংঘাত টিকিয়ে রাখতে চাই?
তাই সালিম সামাদ থেকে শিখুন। তিনি ঘৃণার পক্ষ নেননি। তিনি পক্ষ নিয়েছিলেন প্রেক্ষাপটের। তিনি শিখিয়েছেন, অস্ত্রের পেছনে ইতিহাস থাকে, আর ইতিহাসের পেছনে থাকে অধিকার। যে সমাজ এই স্তরগুলো বুঝতে শেখে, সে সমাজই একদিন সংঘাতের বদলে ন্যায়বিচারের ভাষায় কথা বলতে পারে।
সেটলাররা বুঝবে কি?

