এই যুদ্ধকে দূর থেকে দেখা খুব সহজ। সামাজিক মাধ্যমে কেউ ইরানের পক্ষে স্লোগান দেয়, কেউ আবার ইসরায়েলকে দোষ দেয়, কেউ আমেরিকার বিরুদ্ধে কথা বলে।
কিন্তু যুদ্ধকে যারা কাছ থেকে দেখে তারা জানে যুদ্ধ কোনো স্লোগান নয়। যুদ্ধ মানে আকাশে গর্জন, মাটিতে বিস্ফোরণ, আর শহরের পর শহর ধ্বংস হয়ে যাওয়া। মৃত্যু আর হাহাকার।
অনেকেই আমরা উপলব্ধি করতেই পারছি না কেমন চলছে এই যুদ্ধ। আমরা শুধু যে যাকে সমর্থন করছি তার গুনগান করছি। প্রকৃত যুদ্ধের ভয়াবহতা উপলব্ধি থেকে আসলে আমরা যোজন যোজন দূরে। তাই প্রকৃত পক্ষে কি হচ্ছে সেখানে তা বোঝাতে এই পোস্ট লিখার চেষ্টা করছি।
আজকের যুদ্ধ আগের যুগের যুদ্ধ নয়। এখন যুদ্ধ মানে শুধু বন্দুক বা ট্যাংক নয়। এখন যুদ্ধ মানে স্যাটেলাইট, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার প্রযুক্তি এবং হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে পরিচালিত নির্ভুল মিসাইল।
সোজা করে লিখবো।
শক্তির দিক দিয়ে আমেরিকা সুপারপাওয়ার সেটা মানি আর নাই মানি আমেরিকা কিন্তু সুপারপাওয়ার। সুপারপাওয়ার আমরা সহজে বলি কিন্তু বুঝতে চেষ্টা করি না সুপারপাওয়ার কি।
সুপারপাওয়ার মানে শুধু বড় সেনাবাহিনী না। সুপারপাওয়ার মানে এমন প্রযুক্তি যার মাধ্যমে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে বসেও একটি দেশের সামরিক ঘাঁটি বা কমান্ড সেন্টার ধ্বংস করা যায়। সুপারপাওয়ার মানে এমন নজরদারি ব্যবস্থা যা স্যাটেলাইট থেকে প্রতিটি চলাচল দেখতে পারে।
শুধু এইটুকু বলি, জাপানের হিরোশিমা নাগাসাকি শহরে কোন সালে বোমা মেরেছিল? এখন ২০২৬ সাল। তাহলে কত বছর আগে আমেরিকা এই বোমা আবিষ্কার করেছিল? অথচ ইরান এখনো বানাতে পারে নি। তাহলে কত আগ্রসর আমেরিকা?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে প্রযুক্তি ব্যবহার হয়েছিল সেটি ছিল ৮০ বছর আগের প্রযুক্তি। আজকের প্রযুক্তি সেই সময়ের তুলনায় বহু গুণ শক্তিশালী। এখন একটি মিসাইল হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে উড়ে এসে একটি নির্দিষ্ট ভবন বা ঘাঁটি লক্ষ্য করে আঘাত করতে পারে।
আরেকটা ছোট্ট ইঙ্গিত দিই। ইসরায়েলের কি পারমাণবিক বোমা নেই মনে করেন? যেহেতু তথ্য নেই তাই আমি ইসরায়েলের পারমাণবিক বোমা আছে বলতে পারি না। কিন্তু ইচ্ছে হয় সত্যিটা বলি। ইসরায়েলের কোন অস্ত্র নেই? কোন প্রযুক্তি নেই?
বিশ্ব রাজনীতিতে অনেক সময় কিছু বিষয় প্রকাশ্যে বলা হয় না। অনেক সামরিক শক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকারও করা হয় না। কিন্তু গোয়েন্দা বিশ্লেষণ এবং সামরিক পর্যবেক্ষণ বলছে, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিক দিয়ে ইসরায়েল পৃথিবীর অন্যতম উন্নত রাষ্ট্র।
দুই পরাশক্তি আমেরিকা আর রাশিয়ার সমস্ত অস্ত্র এবং প্রযুক্তি কারা বানিয়েছে একটু গুগল করে দেখুন। ইহুদি আর খ্রিস্টান ছাড়া অন্যরা যে বানায়নি তা বলছি না। কিন্তু তুলনা করলে নিতান্ত নগণ্য বলতে হয়। আর ইহুদি এবং খ্রিস্টানদের অনেক সূত্র থেকে তারা সেই পথে এগিয়েছে।
আধুনিক যুদ্ধের আরেকটি বড় শক্তি হলো গোয়েন্দা তথ্য। কোন শহরে কোন সামরিক ঘাঁটি আছে, কোথায় অস্ত্র মজুদ, কোথায় কমান্ড সেন্টার — এসব তথ্য অনেক সময় মাসের পর মাস ধরে সংগ্রহ করা হয়। তারপর একদিন নির্দিষ্ট মুহূর্তে হামলা চালানো হয়।
আপনার হাতের যে মোবাইল আছে সেটা মুহূর্তে বোমা হয়ে ফুটে যেতে পারে আর আপনি সেখানে শেষ। আপনার সামনে যে কম্পিউটার আছে সেটাও বোমা হতে পারে আর আপনি মুহূর্তে শেষ। কারণ যে কম্পিউটারের সফটওয়্যার আছে সেখানে কি আছে আপনি জানেন না। সেটা তারা বানিয়েছে। সুপারপাওয়ার শুধু বোমায় নয়, প্রযুক্তিতেও। হিজবুল্লাহদের ওয়াকিটকি ফুটে হিজবুল্লাহ নেতা মারা গিয়েছিল মনে আছে?
লেবাননে হিজবুল্লাহর যোগাযোগ যন্ত্র বিস্ফোরণের ঘটনাটি অনেক বিশ্লেষক আধুনিক প্রযুক্তিগত যুদ্ধের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এতে বোঝা যায় যুদ্ধ এখন শুধু মাটিতে নয়, প্রযুক্তির ভেতরেও লুকিয়ে থাকতে পারে।
আর বর্তমান যুদ্ধ?
শত শত বিমান উড়ে গিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলে দিচ্ছে। দিনে রাতে ফুটছে। ধসে পড়ছে শত শত বিল্ডিং। খবর অনুযায়ী IRGC সদস্যদের জন্য হাসপাতাল এবং মর্গ ভরে গেছে। রাখার আর জায়গা নেই। যে বোমা ফেলা হচ্ছে ইরানে একটিও আটকানো যাচ্ছে না। কারণ সে ক্ষমতা ইরানের নেই। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
IRGC বা Islamic Revolutionary Guard Corps ইরানের একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী। এটি শুধু সেনাবাহিনী নয়, ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোর একটি বড় অংশ। তাই এই বাহিনীর ঘাঁটি, কমান্ড সেন্টার এবং অস্ত্রভাণ্ডার লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলে সেটি একটি বড় সামরিক আঘাত হিসেবে দেখা হয়।
অন্যদিকে ইরানও হামলা করছে বটে। কিন্তু শত শত বিমান এই রকেট অর্ধেক পথে আটকাচ্ছে। আইরন ডোম আটকাচ্ছে। এখন আইরন ডোম তো আর উন্নত। তবে কিছু কিছু এসে ইসরায়েলে পড়ছে। মানুষও মরছে। কিন্তু ইরানের তুলনায় নগণ্য বলা যায়।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বহু স্তরের। আইরন ডোম স্বল্পপাল্লার রকেট আটকায়। অন্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মাঝারি ও দূরপাল্লার মিসাইল ধ্বংস করে। তাই অনেক সময় রাতের আকাশে মিসাইল আকাশেই বিস্ফোরিত হয় এবং আগুনের রেখা দেখা যায়।
যুদ্ধ যদি এক মাস দীর্ঘ হয় তাহলে ভিন্ন রূপ পাবে। ভয়াবহতা বাড়বে। তখন হয়তো IRGC সদস্যরাই লক্ষ্য হবে না। ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে। হয়তো সূর্যের আলো দেখা অনেক শহরের মানুষের হবে না। কালো ধোঁয়ায় আকাশ ঢাকা থাকবে।
যুদ্ধ দীর্ঘ হলে প্রথমে সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস হয়। তারপর বিদ্যুৎ কেন্দ্র, তেল শোধনাগার, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সেতু — সব লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। তখন একটি শহরের জীবন থেমে যায়। মানুষ বাঙ্কারে আশ্রয় নেয়। রাতের আকাশে আগুনের আলো দেখা যায়।
এটাই যুদ্ধের বাস্তবতা। দূর থেকে আমরা শুধু স্লোগান দেখি। কিন্তু যে মানুষ সেই আকাশের নিচে থাকে তার কাছে যুদ্ধ মানে প্রতিটি রাত একটি অনিশ্চিত রাত।
একটি সাইরেন বাজে। মানুষ দৌড়ে আশ্রয়ে যায়। তারপর কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা।
তারপর বিস্ফোরণ।
মাটি কেঁপে ওঠে।
তারপর আবার নীরবতা।
এই নীরবতার মাঝেই মানুষ অপেক্ষা করে পরের বিস্ফোরণ কোথায় হবে সেই দুচিন্তায়।