আজকের সবচেয়ে শক্তিশালী মোল্লা রাষ্ট্র হচ্ছে ইরান। কিভাবে এই একটি নন-মুসলিম দেশ ঘোরতর মোল্লা রাষ্ট্রে পরিণত হল তা নিয়ে অনেকে জানি বা অনেকে জানি না। চলুন সংক্ষেপে সহজ করে দেখি।
পারস্য ছিল এক সময়ের অন্যতম প্রাচীন ও শক্তিশালী সভ্যতা।
ইসলামের জন্মের বহু আগেই সেখানে গড়ে উঠেছিল সংগঠিত রাষ্ট্র, আইন, প্রশাসন ও ধর্মীয় দর্শন। পারস্যের রাষ্ট্রধর্ম ছিল জরথুস্ত্রবাদ। এই ধর্মে আগুনকে ঈশ্বর নয়, বরং সত্য ও পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে মানা হতো। নৈতিকতা, সত্যবাদিতা ও দায়িত্ববোধ ছিল এর মূল শিক্ষা।
৭ম শতকে আরব উপদ্বীপে ইসলামের উত্থান ঘটে।
নবী মুহাম্মদের মৃত্যুর পর ইসলাম শুধু ধর্ম হিসেবে নয়, রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা হিসেবেও বিস্তার লাভ করতে থাকে। আরব মুসলিম বাহিনী একের পর এক প্রতিবেশী অঞ্চল দখল করতে শুরু করে। এই বিস্তারের অংশ হিসেবেই পারস্য আক্রমণের মুখে পড়ে।
৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে পারস্যে প্রথম বড় আক্রমণ শুরু হয়।
তখন পারস্য শাসন করছিল সাসানীয় সাম্রাজ্য। দীর্ঘ যুদ্ধ, অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও প্রশাসনিক সংকটের কারণে পারস্য ধীরে ধীরে পরাজিত হয়। ৬৫১ খ্রিস্টাব্দে শেষ সাসানীয় সম্রাট নিহত হন। এর মাধ্যমে পারস্যের রাজনৈতিক স্বাধীনতা শেষ হয়।
ক্ষমতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে জরথুস্ত্রবাদও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা হারায়। নতুন শাসকের ধর্ম ছিল ইসলাম।
তবে প্রথম ধাপে সবাইকে জোর করে মুসলমান বানানো হয়নি। কিন্তু যারা মুসলমান ছিল না, তাদের আলাদা কর দিতে হতো। এই করের নাম ছিল জিজিয়া। মুসলমান হলে এই কর দিতে হতো না।
অমুসলিমদের প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও ক্ষমতার কাঠামো থেকে ধীরে ধীরে বাদ দেওয়া হয়। সমাজে মুসলমান হওয়াই হয়ে ওঠে সুবিধাজনক পরিচয়। কয়েক প্রজন্মের মধ্যে এই চাপ, বৈষম্য ও বাস্তবতার কারণে অধিকাংশ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে।
অনেক জরথুস্ত্রী এই পরিস্থিতি মেনে নিতে পারেননি। তারা পারস্য ছেড়ে চলে যান। তাদের একটি বড় অংশ ভারতে আশ্রয় নেয়। আজকের পার্সি সম্প্রদায় সেই ইতিহাসেরই ফল।
এইভাবে পারস্য ইসলামীকরণ হয়। এটি হঠাৎ নয়, শতাব্দী ধরে চলা একটি প্রক্রিয়া। যুদ্ধ দিয়ে শুরু, শাসন ও সমাজের মাধ্যমে সম্পন্ন।
এবার আসি আধুনিক ইরানে।
২০শ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইরান ছিল রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। শেষ রাজা ছিলেন শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি।
তিনি পশ্চিমাপন্থী ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন। কিন্তু তার শাসন ছিল কর্তৃত্ববাদী। গোপন পুলিশ, দমন-পীড়ন ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল ব্যাপক।
এই পরিস্থিতিতে ধর্মীয় নেতারা জনগণের ক্ষোভকে কাজে লাগান। আয়াতুল্লাহ খোমেনি বিদেশ থেকে বিপ্লবের ডাক দেন। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব ঘটে।
শাহ ক্ষমতাচ্যুত হন। ইরান নিজেকে ঘোষণা করে “ইসলামিক রিপাবলিক”।
এই বিপ্লবের পর রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী পদ হয় “সুপ্রিম লিডার”।এই পদে প্রথম বসেন আয়াতুল্লাহ খোমেনি।
খোমেনির মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সালে এই পদে আসেন আলী খামেনি। তিনি তখন খুব পরিচিত বা শক্তিশালী ধর্মগুরু ছিলেন না। কিন্তু বিপ্লবী অভিজাত গোষ্ঠীর সমর্থন তাকে ক্ষমতায় বসায়।
খামেনির ক্ষমতা নির্বাচনের মাধ্যমে নয়। তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব। তার অধীনে রয়েছে সেনাবাহিনী, বিপ্লবী গার্ড, বিচার বিভাগ ও মিডিয়া। রাষ্ট্রপতি থাকলেও শেষ সিদ্ধান্ত খামেনির।
খামেনি ধর্মকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। নারী পোশাক, মতপ্রকাশ, রাজনীতি—সবকিছুতে ধর্মীয় আইন চাপিয়ে দেওয়া হয়। বিরোধিতা করলে দমন, কারাবাস বা নির্বাসন হয়।
আজকের ইরানে ইসলাম শুধু ধর্ম নয়। এটি ক্ষমতার কাঠামো। রাষ্ট্র, সেনা ও ধর্ম একত্র হয়ে একটি শাসনব্যবস্থা তৈরি করেছে।
এ কারণেই বহু ইরানি আজ ইসলামি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলেন। তাদের বিরোধিতা ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। তাদের বিরোধিতা ধর্মের নামে শাসনের বিরুদ্ধে।
এই ইতিহাস বোঝা গেলে বর্তমান ইরানের ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও বিভাজন বোঝা সহজ হয়।