আন্তর্জাতিক আইন দুর্বলদের জন্য। শক্তিশালীদের জন্য নয়। এই বাস্তবতা না বুঝলে আজকের বিশ্ব বোঝা যাবে না।
যে রাষ্ট্র বারবার আন্তর্জাতিক নীতি মানে না, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন চালায়, বিচারহীনতা টিকিয়ে রাখে—বিশ্ব বাস্তবে তাদের কিছুই করতে পারে না। নিন্দা হয়। বিবৃতি আসে। রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। কিন্তু কার্যকর শাস্তি হয় না। এটাই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নির্মম সত্য।
একইভাবে ইসরাইল–এর ওপর সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে আরব বিশ্ব থেকে রকেট হামলা চালানো আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। কোনো রাষ্ট্র বা সশস্ত্র গোষ্ঠী অন্য রাষ্ট্রের আকাশসীমা ভেঙে নির্বিচারে রকেট ছুঁড়তে পারে না। এটাকে আত্মরক্ষা বলা যায় না।
আজ যদি ইসরাইলের আকাশে রকেট ছোড়া স্বাভাবিক হয়ে যায়, কাল যে কোনো রাষ্ট্রের সীমান্তই অর্থহীন হয়ে পড়বে। তবুও বিশ্ব এখানেও কার্যকরভাবে কিছু করতে পারে না—নিন্দা আর বিবৃতির বাইরে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি আরও গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী। এখানে সীমান্ত পেরিয়ে হামলা নয়, রাষ্ট্রের ভেতরেই সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন চলে। ভূমি দখল, ধর্মীয় হামলা, সহিংসতা, নিরাপত্তাহীনতা ও বিচারহীনতা বছরের পর বছর চলমান। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা।
বাংলাদেশ আদিবাসী বিষয়ে জাতিসংঘ–এর নীতিমালা লঙ্ঘন করে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আদিবাসী অধিকারের নীতি অনুযায়ী আদিবাসীদের অস্তিত্ব, পরিচয়, ভূমি ও সাংস্কৃতিক অধিকার স্বীকার করা রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা।
অথচ বাংলাদেশ আজও রাষ্ট্রীয়ভাবে “দেশে আদিবাসী রয়েছে”—এই বাস্তব সত্য স্বীকার করতে চায় না। যে রাষ্ট্র অস্তিত্বই অস্বীকার করে, সে অধিকার রক্ষা করবে—এই আশা নিজেই একটি ভ্রান্তি।
যেখানে আদিবাসীর অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়, সেখানে পাহাড়, বন, জমি ও ধর্মীয় স্থান একে একে হাতছাড়া হয়। অভিযোগ ওঠে, কিন্তু বিচার হয় না। এই নীরবতা ও রাষ্ট্রীয় সহনশীলতাই নিপীড়নকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। প্রশ্নটা এখানে খুব সরল—যে রাষ্ট্র নিজের নাগরিকের অস্তিত্বই মানে না, সে রাষ্ট্র সার্বভৌমত্ব দাবি করে কোন নৈতিকতায়?
সমস্যা হলো, আন্তর্জাতিক আইনের নিজস্ব কোনো বলপ্রয়োগকারী শক্তি নেই। জাতিসংঘের কাঠামো ভেটোর রাজনীতিতে প্রায়ই অচল। আইন থাকে কাগজে, বাস্তবে নয়। এখানেই তৈরি হয় এক গভীর শূন্যতা।
এই শূন্যতার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র সামনে আসে। আমেরিকা নিজেকে নিয়ম রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে তুলে ধরে। তারা বলে—যখন আন্তর্জাতিক আইন কাজ করে না, তখন শক্তি ব্যবহার অনিবার্য। তাদের ভাষায় এটি আগ্রাসন নয়, বরং ব্যবস্থা ঠিক করার চেষ্টা।
ভেনেজুয়েলা এই যুক্তির সবচেয়ে নগ্ন উদাহরণ। ভেনেজুয়েলা–তে সরকার আন্তর্জাতিক নীতি মানছে না, গণতন্ত্র ভেঙে পড়েছে—এই অভিযোগ তুলে আমেরিকা বলে, এই রাষ্ট্র নিজ জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।
তাই এই সরকারকে রক্ষা করার দায় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নেই। তারা জানে, আইন মানুক বা না মানুক—আইন প্রয়োগ করার ক্ষমতা একমাত্র তাদেরই আছে।
এই যুক্তিতে দায়ের জায়গা পুরোপুরি বদলে যায়। প্রশ্ন আর থাকে না—আমেরিকা কেন হস্তক্ষেপ করছে। প্রশ্ন হয়ে ওঠে—রাষ্ট্রগুলো কেন এমন জায়গায় পৌঁছাল, যেখানে তাদের সার্বভৌমত্বই বিতর্কিত হয়ে গেল। ব্যর্থতা এখানে হস্তক্ষেপকারীর নয়, রাষ্ট্রের নিজের—এটাই বলা হয়।
বাংলাদেশ যদি সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের অস্তিত্ব স্বীকার করত, যদি তাদের জীবন, ভূমি ও মর্যাদা রক্ষা করত, যদি বিচারব্যবস্থা কার্যকর হতো—তাহলে কোনো বিদেশি চাপ বা হস্তক্ষেপের জায়গাই তৈরি হতো না। নিপীড়ন অস্বীকার করে সার্বভৌমত্বের দাবি আজ আর টেকে না।
এই বাস্তবতায় সার্বভৌমত্ব আর প্রশ্নহীন অধিকার নয়। এটি দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত। রাষ্ট্র যখন নিজের নাগরিকদের—বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের—সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন তার সার্বভৌমত্ব নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
তাই বলা হয়, যে সব দেশ আন্তর্জাতিক নীতি মানে না, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু নিপীড়নকে স্বাভাবিক করে তোলে, বিশ্ব তাদের থামাতে পারে না। শেষ পর্যন্ত আমেরিকার মতো শক্তি এগিয়ে আসে। এটা ন্যায়বিচার নয়। এটা সুন্দরও নয়। কিন্তু শক্তির রাজনীতিতে এভাবেই বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করা হয়।
এই দৃষ্টিতে বাংলাদেশে যদি চাপ আসে, হস্তক্ষেপের আলোচনা ওঠে, বা আন্তর্জাতিকভাবে কড়া অবস্থান দেখা যায়—তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটি হঠাৎ নয়। এটি বছরের পর বছর ধরে চলা অস্বীকার, নিপীড়ন এবং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার পরিণতি।
এটা নৈতিক গল্প নয়।আদর্শের পাঠও নয়।
কঠিন সত্য একটাই, এই বিশ্বে নিয়ম ভাঙা সবচেয়ে বড় অপরাধ নয়। দুর্বল হওয়াটাই সবচেয়ে বড় অপরাধ।