অনেকে প্রশ্ন করেছেন নিকোলাস মাদুরোর ভুলগুলো কি। ভেবেছিলাম লিখবো না। কারণ আমার থেকে সবাই ভাল জানেন। তবে কেউ যদি না জেনে থাকেন সহজ করে তাদের জন্য লিখলাম। আশা করি, ভেনেজুয়েলা সাধারণ মানুষের কথা জানতে এটি পড়বেন।
নিকোলাস মাদুরো বর্তমান প্রেসিডেন্ট। তিনি ক্ষমতায় আসেন ২০১৩ সালে। তার আগে দেশটির নেতা ছিলেন হুগো চাভেজ।
ভেনেজুয়েলা একসময় লাতিন আমেরিকার অন্যতম ধনী দেশ ছিল। তেলের কারণে দেশটি প্রচুর আয় করত।রাষ্ট্র সামাজিক খাতে খরচ করত। মানুষের জীবন ছিল তুলনামূলক স্থিতিশীল।
চাভেজ ১৯৯৯ সালে ক্ষমতায় আসেন। তিনি সমাজতন্ত্রের কথা বলেন। তিনি গরিবদের জন্য জনপ্রিয় হন। কিন্তু তিনি রাষ্ট্রের ক্ষমতা ধীরে ধীরে এক হাতে কেন্দ্রীভূত করেন।
চাভেজ মারা যান ২০১৩ সালে। তারপর মাদুরো প্রেসিডেন্ট হন। এখান থেকেই সমস্যাগুলো পরিষ্কার হতে শুরু করে।
প্রথম বড় ভুল শুরু হয় ২০১৩–২০১৪ সাল থেকে। মাদুরোর অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল খুব সীমিত। তিনি সরকারি খরচ বাড়ান। কিন্তু উৎপাদন বাড়াতে পারেননি।
২০১৪ সাল থেকে তেলের দাম কমতে শুরু করে। রাষ্ট্রের আয় হঠাৎ কমে যায়। কিন্তু সরকার খরচ কমায় না। বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ছাপানো বাড়ে।
এর ফল আসে ২০১৫–২০১৬ সালে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে থাকে। টাকার মূল্য দ্রুত কমে যায়। মানুষের বেতন মূল্যহীন হয়ে পড়ে।
২০১৭ সালে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়। ভেনেজুয়েলা হাইপারইনফ্লেশনে ঢুকে পড়ে। দোকানে খাবার থাকে না। ওষুধ পাওয়া যায় না।
এই সময় মানুষ রাস্তায় নামে। ২০১৪, ২০১৭ এবং ২০১৯ সালে বড় বড় বিক্ষোভ হয়। মানুষ খাবার চায়। তারা কাজ চায়। সম্মান চায়। পারিবার বাঁচাতে চায়।
মাদুরোর দ্বিতীয় বড় ভুল এখানেই। তিনি এই বিক্ষোভকে রাজনৈতিক শত্রুতা হিসেবে দেখেন। পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী নামানো হয়। গ্রেপ্তার শুরু হয়। অনেককে মেরে ফেলা হয়।
২০১৪ সাল থেকে বহু মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। অনেক মানুষ আহত হয়। অনেকে নিহত হয়। ভয় ও আতঙ্ক সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।
তৃতীয় বড় ভুল ঘটে ২০১৫ সালে। সে বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিরোধীরা জয় পায়। এটি ছিল মাদুরোর জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা।
সংসদ তখন সরকারকে প্রশ্ন করতে শুরু করে। কিন্তু ২০১৭ সালে সরকার সংসদের ক্ষমতা কার্যত কেড়ে নেয়। আদালতের মাধ্যমে সংসদ দুর্বল করা হয়।
এরপর ২০১৭ সালেই একটি নতুন “কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি” গঠন করা হয়। এই সভা পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। নির্বাচিত সংসদ গুরুত্ব হারায়।
এখান থেকেই একনায়কতন্ত্রের অভিযোগ জোরালো হয়। কারণ আইনসভা আর স্বাধীন থাকে না।
চতুর্থ বড় ভুল হলো নির্বাচন নিয়ে বিশ্বাস নষ্ট করা। ২০১৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়। অনেক বিরোধী দল অংশ নেয়নি। অনেক দেশ ফলাফল মানেনি।
২০২৪ সালের নির্বাচনেও একই প্রশ্ন ওঠে। ফল ঘোষণার স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ থাকে। মানুষ মনে করতে শুরু করে—ভোটে কিছু বদলাতে পারে নি।
গণতন্ত্রে এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থা। কারণ তখন শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের পথ বন্ধ হয়ে যায়।
পঞ্চম বড় ভুল হলো আদালত ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ। ২০১৬–২০১৭ সালের পর আদালতের সিদ্ধান্ত প্রায়ই সরকারের পক্ষে যায়। রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ— আইনসভা, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ—একটি হাতে চলে আসে।মানে তার নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
এটাই একনায়কতন্ত্রের মূল বৈশিষ্ট্য।
ষষ্ঠ বড় ভুল হলো বাস্তবতা অস্বীকার করা। সরকার বহু বছর ধরে বলেছে, সব সংকট বিদেশি ষড়যন্ত্র। সব সমস্যা নিষেধাজ্ঞার ফল।
কিন্তু দেশের ভেতরের ভুল নীতির কথা স্বীকার করা হয়নি।
এর ফল ভয়াবহ হয়। ২০১৫ সাল থেকে লাখ লাখ মানুষ দেশ ছাড়ে। ২০২০ সালের মধ্যে কোটি মানুষ ভেনেজুয়েলা ছেড়ে পালায়। এটি লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটে পরিণত হয়।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের। শিশুরা অপুষ্টিতে ভোগে। হাসপাতালে ওষুধ থাকে না। শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
এ কারণেই আজ মাদুরোকে “একনায়কতন্ত্রের নায়ক” বলা হয়।
কারণ তিনি ২০১৩ সাল থেকে ক্ষমতায় আছেন। তিনি ক্ষমতা ছাড়াকে ভয় পান। তিনি সংসদকে দুর্বল করেছেন। নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে দিয়েছেন। ভিন্নমতকে দমন করেছেন।
এটি কোনো একদিনের ভুল নয়। ২০১৩ থেকে ২০২৪, একটির পর একটি সিদ্ধান্ত ভেনেজুয়েলাকে এই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
এই লেখার উদ্দেশ্য কাউকে ঘৃণা শেখানো নয়। উদ্দেশ্য একটাই আর তা হচ্ছে ক্ষমতা যখন জবাবদিহি হারায়,
তখন একজন নেতা কীভাবে ধীরে ধীরে একনায়কে পরিণত হয় তা বোঝাতে আমার জুম্ম আদিবাসীদের জন্য লিখা।
ধন্যবাদ আর জুজু ।