গ্রীনল্যান্ড নিয়ে বিরাট হৈচৈ। কিন্তু ভেনেজুয়েলা, ইউক্রেন আর ইরান নিয়ে এখন বেশী বিশ্ব উত্তপ্ত থাকায় গ্রীনল্যান্ড বিষয়টি চাপা পড়েছে। কিন্তু ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির মত যেকোন সময় বিষয়টি ফুঁসে উঠতে পারে।
চলুন সহজ করে এবিষয় দেখি।
গ্রীনল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ, কিন্তু এটি কোনো স্বাধীন দেশ নয়। এটি ডেনমার্কের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। ভৌগোলিকভাবে গ্রীনল্যান্ড উত্তর আমেরিকার কাছাকাছি, কানাডার উত্তর-পূর্বে এবং উত্তর মেরুর খুব কাছে অবস্থিত।
জনসংখ্যা খুবই কম—প্রায় ৫৬ হাজার—এবং বেশিরভাগ মানুষ ইনুইট আদিবাসী। দ্বীপের প্রায় পুরোটা বরফে ঢাকা। বাইরে থেকে নির্জন ও দূরবর্তী মনে হলেও, বাস্তবে গ্রীনল্যান্ড আজ বিশ্বরাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
এই দ্বীপটির গুরুত্ব প্রথমে বোঝা যায় এর অবস্থান দেখে। গ্রীনল্যান্ড আর্কটিক অঞ্চলের মাঝামাঝি এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখান থেকে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ এবং রাশিয়ার দিকে একসাথে নজর রাখা যায়।
আধুনিক যুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার এবং আকাশ নজরদারির ক্ষেত্রে এই ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শীতল যুদ্ধের সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্র এখানে সামরিক সুবিধা গড়ে তুলেছে।
এই কারণেই Donald Trump গ্রীনল্যান্ড কেনার কথা প্রকাশ্যে বলেছিলেন। অনেকেই তখন এটিকে অদ্ভুত বা হাস্যকর মনে করলেও, বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ কৌশলগত। যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে গ্রীনল্যান্ডকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।
এখানে যুক্তরাষ্ট্রের থুলে এয়ার বেস রয়েছে, যা রাশিয়া দিক থেকে আসতে পারে এমন ক্ষেপণাস্ত্র আগাম শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়। পুরো গ্রীনল্যান্ডের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকলে যুক্তরাষ্ট্র আর্কটিক অঞ্চলে আরও শক্ত অবস্থান নিতে পারত।
আরেকটি বড় কারণ হলো প্রাকৃতিক সম্পদ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গ্রীনল্যান্ডের বরফ ধীরে ধীরে গলছে। এতে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর কাছে এটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। বরফের নিচে রয়েছে রেয়ার আর্থ খনিজ, ইউরেনিয়াম, তেল ও গ্যাস।
আধুনিক প্রযুক্তি, সামরিক সরঞ্জাম এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য এই খনিজগুলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। যুক্তরাষ্ট্র চায় না এসব সম্পদের ওপর অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র একক প্রভাব তৈরি করুক।
এখানেই আসে China–এর প্রসঙ্গ। চীন আর্কটিক অঞ্চলকে ভবিষ্যতের বাণিজ্য ও শক্তির নতুন ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে। তারা গ্রীনল্যান্ডে অবকাঠামো ও খনিজ খাতে আগ্রহ দেখিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং সরাসরি নিরাপত্তার প্রশ্ন।
কারণ যেখানে চীনের অর্থনৈতিক উপস্থিতি বাড়ে, সেখানে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাবও বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
একইভাবে Russia আর্কটিক অঞ্চলে দ্রুত সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে। নতুন ঘাঁটি, যুদ্ধজাহাজ এবং নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলছে তারা। গ্রীনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকলে রাশিয়ার এই তৎপরতা পর্যবেক্ষণ ও মোকাবিলা করা অনেক সহজ হতো।
তবে গ্রীনল্যান্ড যেহেতু ডেনমার্কের অধীন, তাই Denmark ট্রাম্পের প্রস্তাব স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করে। ডেনমার্ক এবং গ্রীনল্যান্ডের স্থানীয় সরকার দু’পক্ষই জানিয়ে দেয়—গ্রীনল্যান্ড কোনো বিক্রির বস্তু নয়, এবং এর ভবিষ্যৎ এখানকার মানুষই নির্ধারণ করবে।
সব মিলিয়ে গ্রীনল্যান্ড কোনো বরফে ঢাকা নির্জন দ্বীপ নয়। এটি সামরিক নিরাপত্তা, প্রাকৃতিক সম্পদ, নতুন বাণিজ্যিক নৌপথ এবং চীন–রাশিয়ার প্রভাব ঠেকানোর প্রশ্নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্পের আগ্রহ আসলে এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। গ্রীনল্যান্ডকে ঘিরে যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তা ভবিষ্যতের বিশ্বরাজনীতিতে আর্কটিক অঞ্চলের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে দেয়।