
আজ জানুয়ারী ২৪।। সব টিকটাক থাকলে ভোট হবে ১২ ফেব্রুয়ারী। কিন্তু অনেকের মত এখনো ভোটের পরিবেশ নেই। ভোট হবে কিনা বিজ্ঞ মহলে এখনো সন্দেহ রয়ে গেছে।
এই লেখাটি কোনো ব্যক্তিকে জেতানো বা হারানোর প্রচারণা নয়। এটি পাহাড়ের ভেতরে দীর্ঘদিন জমে থাকা এক অদৃশ্য দ্বন্দ্ব, বিভাজন ও নেতৃত্ব সংকট নিয়ে কথা বলার চেষ্টা। যারা ভাবছেন এটা শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক লেখা, তারা আসলে সমস্যার গভীরে তাকাচ্ছেন না।
হ্যাঁ, পাহাড়ও থেমে নেই। রাঙ্গামাটিতে বিজয়ী প্রায় নিশ্চিত হওয়া গেলেও বান্দরবানে জেরি বাবু একটু এদিক ওদিক হলে হেরে যেতে পারেন। NCP-র বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশী।
কিন্তু খাগড়াছড়ি অবস্থা চরমে। আদিবাসীদের মধ্যে ভোট কে জিতবে তা নিয়ে এই চরম উদ্বেগ নয়। বরং এখানে সমীরণ বনাম ধর্মজ্যোতি। সোজা করে বললে বলতে হ, PCJSS বনাম UPDF।
অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০০১ সালের কথা মনে আছে কি?
অক্টোবর ১, ২০০১ সালে এটি অনুষ্ঠিত হয়। UPDF নির্বাচনে যোগ দেয়। PCJSS নির্বাচন না করলেও উপেন্দ্রলালকে সমর্থন দেয়। ভোট যুদ্ধ তুমুল হয়।
অনেকের মতে, আসলে এটা শুধু ভোট যুদ্ধ ছিল না। কারণ এ ভোট যুদ্ধের সাথে সাথে অস্ত্রযুদ্ধ প্রকট হয়ে উঠে।
সেই সময় রাষ্ট্র বা প্রশাসন কার্যকর কোনো মধ্যস্থতা না করে বরং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার আগুনে ঘি ঢেলে দিয়ে ধীরে ধীরে সহিংস সংঘাতে রূপ দেয় এবং দুই বলদের লড়ায়ের মত আনন্দ উপভোগ করে। অথচ পাহাড় এই বিভেদে ভাইয়ের বুকের তাজা রক্তের মূল্য আজও পাহাড় বহন করছে।
এই অস্ত্র যুদ্ধ প্রায় তিন দশকে পা দিয়েছে।
পাহাড় আজ সেই ২০০১ সালের পুনরাবৃত্তি দেখছে। তাই এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও আসলে নির্বাচনে কে জিতবে বা কে হারবে সেটা নয়। এটা হচ্ছে কে থাকবে আর কে থাকবে না সেই উপসর্গ।
বুঝতে পেরেছেন কি বলছি নিশ্চয়।
এবার একটু সহজ করে বলি।
ধরুন, একি গ্রামে দুজন ছোট বালক একে ওপরের কাছে হার মেনে নিতে চায় না। সব সময় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে।
তখন গ্রামের মুরুব্বিরা কি করে তাদের সেই বিরোধ মীমাংসা করে?
আমি সেই সেরকম অনেক ঘটনা দেখেছি। পাহাড়ি গ্রামে এটা সমাধান করার বংশ পরস্পরায় প্রচলিত একটি সহজ উপায় আছে। তা হচ্ছে সকলের সামনে দুজনকে “বোদাবুদি”র মাধ্যমে হার জিত নির্ণয় করা। বারবার যে তিন বার জিতে সেই জয়ী। আর যে হারে তার সে হার মেনে নেয়।
হার-জিত নির্ণয়ে এটি পাহাড়ে আদিবাসীদের যুগযুগ ধরে প্রচলিত প্রথা।
কিন্তু বাস্তবে আজ পাহাড়ের রাজনীতি আর গ্রামের উঠোনে সীমাবদ্ধ নেই। এখানে অস্ত্র, সীমান্ত, রাষ্ট্রীয় কৌশল এবং আন্তর্জাতিক বাস্তবতা জড়িয়ে গেছে। তাই রায় যত দেরিতে আসবে, ক্ষতিও তত গভীর হবে।
আজ সেই দুই বালক যদি একজন PCJSS আর আরেকজন UPDF হয় আমরা কি সেই একি নিয়ম মেনে হার জিত নির্ণয় করতে পারি না ?
উন্নয়ন বাদ দিন। পাহাড়ে কি উন্নতি হয়ে তা বাদ দিন। আগে বিবাদ মীমাংসা করি। সেই ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর থেকে আজ ২৬ সালের জানুয়ারী ২৪ তারিখ হিসেব করে দেখি কে জিতেছে?
সংক্ষেপে দেখি-
১) PCJSS- এর আঞ্চলিক পরিষদ আছে (দেশে)
UPDF-এর সে রকম কিছু নেই
২) PCJSS আন্তর্জাতিকভাবে পাহাড়ের কথা UN পর্যন্ত প্রতিনিধি পাঠায়
UPDF আজ পর্যন্ত কাউকে পাঠাতে পারে নি
৩) PCJSS অন্তত একবার MP নির্বাচনে জয় লাভ করেছে
UPDF বারবারই ফেল করেছে
৪) PCJSS দুভাবে বিভক্ত হয়েছে কিন্তু কোন ভাগ UPDF এ যোগ দেয় নি
UPDF দুভাবে বিভক্ত হয়েছে কিন্তু একভাবে PCJSS যোগ দিয়েছে
৫) আগের অনেক অঞ্চল এখন PCJSS-এর দখলে
৬) ভারতের নির্ভরতা PCJSS- এর ওপর বেশী (এই পয়েন্টে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে যা এখনো হয়তো খুলে বলা যাচ্ছে না)।
এবার তাহলে জনগণ সিদ্ধান্ত দিক এখানে জয়ী কে?
UPDF হার মেনে নিতে পারবে না। কারণ তাদের মধ্যে সেই দুরদুরশিতা নেই। থাকলে তারা এতদূর এগুত না। অনেকদিন আগে হাত মিলিয়ে বসে যেত। আমি বলছি না PCJSS সব ক্ষেত্রে সঠিক।
কিন্তু সাধারণ জনগণের দৃষ্টিতে দেখলে PCJSS-এর হাতে আগের মত পার্বত্য চট্টগ্রামের সংগ্রামকে তুলে দেওয়া দরকার। কারণ ভারত এবং আন্তর্জাতিক সাহাস্য ছাড়া পাহাড়ে অধিকার ফিরবে না।
পরিশেষে এইটুকু বলে রাখি, ৩০ বছর PCJSS ছিল কিন্তু এবারের মত শক্তিশালী ছিল না। হঠাৎ করে এই দল এই শক্তি পেল কোথায় সেই ইঙ্গিত যদি UPDF কর্মীদের মাথায় না থাকে কিছু করার নেই।
হ্যাঁ, আমি PCJSS-এর কর্মী নই। UPDF -এর বিরোধী নই। অন্যদের মত তিন দশক আমিও চুপ ছিলাম। হার-জিত নিয়ে কোন টু শব্দ করি নি।
হ্যাঁ, আমিও অন্যসব মানুষের মত সাধারণ একজন মানুষ। আমিও পাহাড়ে জন্মেছি। পাহাড় নিয়ে সাধারণ মানুষের মত ভাবি। কাজেই আমি মনে করি, PCJSS ১০০% সঠিক না হলেও পাহাড়ে এই দল ছাড়া মুক্তি নেই। অস্ত্র সংগ্রামে হোক বা গণতান্ত্রিক সংগ্রামে হোক পাহাড়ের অধিকার আদায়ে এই দলের নিকট পাহাড়ের নেতৃত্ব তুলে দেওয়া দরকার।
আর যদি নাও হয়, তবে প্রাণহানি ঘটবে। দেরি হলেও UPDF-এর জয়ের সম্ভাবনা একদম নেই বললে চলে।
না, হয়তো ভাবছেন, যে যার দলের অবস্থানে থেকে অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চলবে। আপাতত তা মনে হচ্ছে না। গণতন্ত্রের দেশ থাকি কিন্তু গেরিলা দলে আপাতত গণতন্ত্র নেই। আগে সফলতা তারপর গণতন্ত্র।
জনগণ যত তাড়াতাড়ি এই গ্রামের বালকদের মত “বোদাবুদি”র রায় দিতে পারবে তত পাহাড়ের মঙ্ঘল।
তাই সমীরণ বা ধর্মজ্যোতির হার জিত নিয়ে ভোট বিষয় নয়। এই বিষয়টা পাহাড়ের নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে সেটার লড়াই। কেউ না শুনলে হয়তো অঘটনও ঘটে যেতে পারে। তাই আমি মনে করি, সাধারণ মানুষের এখানে ভোটের বিষয়ে নীরব থেকে রায় দেওয়া উচিত।
ইতিহাস সাক্ষী, পাহাড়ে বিভক্ত নেতৃত্ব কখনো আদিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। বিভাজনের সুযোগে সব সময় তৃতীয় পক্ষ শক্তিশালী হয়েছে। আজও সেই ঝুঁকি রয়ে গেছে।