খাগড়াছড়িতে হঠাৎ করে “ওয়াদুদ হঠাও” শ্লোগান উঠেছে। আসলে এটা কোনো হঠাৎ আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়।
এটা দীর্ঘদিন জমে থাকা প্রশ্ন আর হতাশার প্রকাশ। মানুষ এখন আর শুধু দল দেখে ভোট দিতে চায় না। তারা প্রার্থীর রেকর্ড আর ভূমিকা দেখতে চায়।
ওয়াদুদ ভূঁইয়া দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে আছেন। কিন্তু তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মামলার ইতিহাস, দুর্নীতির অভিযোগ—এসব বিষয় সাধারণ মানুষের মন থেকে কখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি।
আদালতে খালাস পাওয়া এক বিষয়। কিন্তু রাজনীতিতে মানুষের বিশ্বাস ও গ্রহণযোগ্যতা আরেক বিষয়।
এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে আরেকটি গুরুতর অভিযোগও ঘুরে ফিরে আসছে। পাহাড়ি জমি দখল করে তাঁর নামে ‘ওয়াদুদ পল্লী’ বানানো হয়েছে—এমন অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ সত্য কি না সেটাই একমাত্র প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, মানুষের জমির ওপর গ্রামের নাম একজন রাজনীতিকের নামে কেন হবে? এই প্রশ্নের স্পষ্ট কোনো জবাব আজও মানুষ পায়নি।
আরেকটি প্রশ্ন আরও গভীর। যদি একজন মানুষ বারবার পদ আঁকড়ে ধরে থাকেন, তাহলে নতুন ও যোগ্য নেতৃত্ব উঠে আসবে কীভাবে?
গত প্রায় ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে একই নাম ক্ষমতার আশেপাশে ঘুরছে। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে খাগড়াছড়ির সাধারণ মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে—এই প্রশ্নও উঠছে।
এই প্রশ্নগুলো সবচেয়ে বেশি তুলছে তরুণরা। যারা প্রথম বা দ্বিতীয়বার ভোট দিতে যাচ্ছে, তারা চায় নতুন নেতৃত্ব, কম বিতর্ক, কম অহংকার। তাদের চোখে রাজনীতি মানে আর উত্তরাধিকার নয়, জবাবদিহি।
এই পরিস্থিতিতেই এবার ভিন্ন একটি বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। খাগড়াছড়ি জেলার মারমা জনগোষ্ঠীর একজন পাহাড়ি–বাঙালি সমন্বয়পন্থী নেতা ছিলেন, যিনি সুযোগ পেলে বিএনপিকে সহজেই জয়ের পথে নিতে পারতেন—এমন বিশ্বাস অনেকের ছিল।
কিন্তু দলীয় কাঠামোয় সেই সুযোগ তৈরি হয়নি। ফলে সমীরণ দেওয়ান বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এর প্রভাব ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপি এখন কয়েকভাগে বিভক্ত। যদি মারমা জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ সমীরণের পক্ষে দাঁড়ায়, তাহলে ওয়াদুদ ভূঁইয়ার পরাজয় নিশ্চিত—এমন বিশ্লেষণও শোনা যাচ্ছে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। বিদ্রোহী প্রার্থীকে ভোট দেওয়া মানেই দলবিরোধিতা নয়। অনেক সময় এটি দলকে শোধরানোর একটি রাজনৈতিক বার্তা। নির্বাচনের ইতিহাসে এমন হাজারো নজির আছে।
আজ খাগড়াছড়ির মানুষ ভয় দেখাতে চায় না, তারা ভোটের মাধ্যমে কথা বলতে চায়। তারা বলতে চায়—ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। একই মানুষ বারবার সুযোগ নিলে যোগ্য নেতৃত্ব বারবার বঞ্চিত হয়।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি না আসে, তাহলে “ওয়াদুদ হঠাও” শুধু শ্লোগান থাকবে না—এটা রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হবে।