পাহাড়ের কণ্ঠকে বিশ্বের সামনে তোলার সময় এসেছে

পাহাড়ে নিজস্ব মিডিয়ার বিকল্প নেই
পাহাড়ে নিজস্ব মিডিয়ার বিকল্প নেই

পাহাড়ের সংবাদ আজ আর শুধু পাহাড়ে সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তি ও সামাজিক মাধ্যমের যুগে, পাহাড়ের কথা, বেদনা, সংস্কৃতি, কিংবা অর্জন—সবকিছুই এখন কয়েক সেকেন্ডে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে পৌঁছে যেতে পারে।

কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, এই তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য?

সামাজিক মাধ্যমের খবরে যেমন আবেগ আছে, তেমনি গুজবের আশঙ্কাও প্রবল। সরকারী বা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে কোনো তথ্য উপস্থাপন করতে গেলে শুধুমাত্র সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট যথেষ্ট নয়। তাই প্রয়োজন এমন একটি বিশ্বাসযোগ্য সংবাদমাধ্যম, যা হবে সত্যনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন।

কেন The Hill Voice একা যথেষ্ট নয়?

আজ পর্যন্ত “The Hill Voice” পাহাড়ের একমাত্র শক্তিশালী আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। এর অবদান অপরিসীম—যদি এই মাধ্যমটি না থাকত, পার্বত্য চট্টগ্রামের বহু বাস্তবতা আমরা হয়তো জানতেই পারতাম না। তবে হাজারো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সমুদ্রে “The Hill Voice” এখনো একটি ছোট নৌকার মতো, যা বিশাল ঢেউয়ের মধ্যে সাহস ও আদর্শের জোরে টিকে আছে।

পাহাড়ের কণ্ঠকে দমিয়ে রাখতে এর বিপরীতে ব্যঙ্গাত্মক বা বিকৃত সংবাদ পরিবেশনকারী অসংখ্য তথাকথিত পত্রিকা জন্ম নিয়েছে। ফলে “The Hill Voice” যেমন এককভাবে লড়ছে, তেমনি নতুন শক্তিশালী সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজন দিন দিন বেড়ে চলেছে।

আমাদের কী করতে হবে?

পাহাড়ের সত্যিকারের চিত্র, উন্নয়ন ও সংকট আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে আমাদেরও নিজস্ব ডিজিটাল নিউজ মিডিয়া গড়ে তুলতে হবে।

এই নতুন প্রজন্মের সংবাদমাধ্যম শুধু প্রতিবেদন নয়, বরং পাহাড়ের ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিক্ষা, অর্থনীতি, ও পরিবেশ—সবকিছুই একত্রে তুলে ধরবে।

যেমন ‘The Times of Israel’ বা ‘The Times of India’ কেবল রাজনৈতিক খবর নয়, বরং সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, ধর্ম, মতামত, ভ্রমণ, এমনকি প্রযুক্তি নিয়েও আলোচনা করে তেমনি পাহাড়কেন্দ্রিক একটি পূর্ণাঙ্গ Hillnews Network গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

মানবিক ভূমিকা:

এই ধরনের ডিজিটাল নিউজ প্ল্যাটফর্ম শুধু তথ্যের উৎস নয়, বরং সংহতির কেন্দ্র হতে পারে।

তাছাড়া যখন পাহাড়ে কোনো বিপর্যয়, অগ্নিকাণ্ড, বা মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটে, তখন এই নিউজ প্ল্যাটফর্মগুলো আন্তর্জাতিক সচেতনতা ও donation drive সংগঠনের মাধ্যমে ত্রাণ, সহায়তা, ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সম্ভাবনা ও সম্পদঃ

ফ্রান্স, জাপান, কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশে থাকা প্রবাসী পাহাড়িরা এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাদের লেখনী, গবেষণা, ফটোগ্রাফি ও বিশ্লেষণ এই মিডিয়াকে আন্তর্জাতিক রূপ দিতে পারে।

শুধু দরকার একটি স্বচ্ছ সম্পাদকীয় বোর্ড, পেশাদার সাংবাদিকতা নীতিমালা, এবং আধুনিক ডিজিটাল অবকাঠামো।

লাভজনকতা ও মিশন একসাথেঃ

ভবিষ্যৎ পাহাড়ি নিউজ প্ল্যাটফর্মগুলো হবে “mission-driven profitable media startups।”

এদের লক্ষ্য থাকবে দুই দিকেই, একদিকে পাহাড়ের সত্য প্রচার ও মানবিক ঐক্য গঠন, অন্যদিকে অর্থনৈতিক টেকসইতা ও তরুণদের কর্মসংস্থান তৈরি।

এই নিউজ মাধ্যমগুলো হবে:

  • পাহাড়ি সাংবাদিক, লেখক ও তরুণদের জন্য আন্তর্জাতিক সুযোগের প্ল্যাটফর্ম।
  • বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ, সাবস্ক্রিপশন, YouTube ও অ্যাফিলিয়েট ইনকাম থেকে আয়যোগ্য ব্যবসা।
  • পাহাড়ি ভাষা, সংস্কৃতি ও সংবাদকে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যম।

সঠিক পরিকল্পনা, দলবদ্ধতা ও সাহস থাকলে—৬ মাস থেকে ১ বছরের মধ্যেই এটি নিজস্ব আয় সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে এবং বিশ্বের মানচিত্রে পাহাড়ের কণ্ঠকে নতুন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করবে।

আমি নিচে একটি সম্ভাব্য বাজেট দিলাম যা দেখে কিছুটা আঁচ করা যেতে পারে –

প্রাথমিক বাজেট পরিকল্পনাঃ

ব্যয়ের ধরনআনুমানিক খরচ (USD)সময়কাল / মন্তব্য
ডোমেইন ও হোস্টিং (WordPress Business Plan)$300১ বছর
লোগো, ব্র্যান্ডিং ও ওয়েব ডিজাইন (Elementor Pro, থিম, কাস্টম UI)$250এককালীন
নিউজ কন্টেন্ট, লেখক ও অনুবাদক (৩ জন পার্টটাইম)$600/মাস × ৬ মাস = $3,600প্রথম ৬ মাস
SEO ও সোশ্যাল মিডিয়া প্রমোশন (Facebook, X, Pinterest, YouTube)$200/মাস × ৬ মাস = $1,200অর্গানিক ও পেইড গ্রোথ
সাইট সিকিউরিটি, ব্যাকআপ ও CDN (Cloudflare, Jetpack Security)$150বার্ষিক
ভিডিও প্রোডাকশন ও YouTube চ্যানেল সেটআপ$500এককালীন
প্রাথমিক ফটো/ভিডিও রাইটস, Canva Pro, স্টক লাইসেন্স$150বার্ষিক

➡️ মোট আনুমানিক ব্যয় (৬ মাস): ≈ $6,000 USD


আয় সম্ভাবনা (৬ মাস পর থেকে শুরু):

উৎসসম্ভাব্য আয় (USD/মাস)মন্তব্য
Google AdSense ও স্পনসর বিজ্ঞাপন$200–400অর্গানিক ট্রাফিক বৃদ্ধি পেলে
Affiliate Marketing (Booking, Agoda, etc.)$100–200ট্রাভেল নিউজ সেকশন থেকে
YouTube মনিটাইজেশন ও শর্টস$150–250নিয়মিত ভিডিও থাকলে
Paid Submissions / Guest Blogs$100–150বিদেশি লেখক/সংগঠন থেকে

➡️ মোট আনুমানিক আয় (৬ মাস পর): ≈ $600–1,000/মাস

👉 অর্থাৎ প্রথম বছরের শেষে নিউজটি তার নিজস্ব খরচ মেটাতে এবং সামান্য লাভ করতে সক্ষম হবে।
দ্বিতীয় বছর থেকে এটি পূর্ণাঙ্গ লাভজনক আন্তর্জাতিক ডিজিটাল নিউজ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারবে।


বিদ্র: আমি নিজেই এই কাজে দীর্ঘ সময় ধরে জড়িত এবং research করে যাচ্ছি কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার আলোকে লিখছি। যারা এবিষয়ে অভিজ্ঞ তারা আনুমানিক হিসেব দেখে বুঝতে পারবেন এটা আমি একটু বেশী করে ধরেছি। এর থেকে কম খরচেও ডিজিটাল নিউজ প্রকাশ করা যাবে।


La Voix des Jummas: পাহাড়ের কণ্ঠকে সমর্থন করার আহবান

La Voix des Jummas, an  organization in France that works for for the Indigenous people of the Chittagong Hill Tracts Bangladesh.
ফ্রান্সে পাহাড়ে আদিবাসী অত্যাচারের প্রতিবাদ(ছবিঃ La Voix des Jummas)

আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদে জন্ম নেওয়া জুম্ম জনগোষ্ঠীর ইতিহাস যেন দীর্ঘ নিঃশব্দতার ইতিহাস। আমাদের ভূমি, সংস্কৃতি, ভাষা, এমনকি অস্তিত্বও অসংখ্যবার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অবহেলার শিকার হয়েছে। তবুও আমরা পাহাড়ি মানুষরা এখনো লড়ে যাচ্ছি অস্তিত্বের, মর্যাদার, শান্তির লড়াই। এই লড়াইয়ে একটি অনন্য আন্তর্জাতিক কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে লা ভোয় দে জুম্মাস (La Voix des Jummas), যার অর্থ “জুম্মদের কণ্ঠস্বর।”

ফ্রান্সে নিবন্ধিত এই সংগঠনটি জুম্ম জনগোষ্ঠীর পক্ষে একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের রূপ দিয়েছে। তাদের কাজ শুধু মানবাধিকার রক্ষা নয়; বরং একটি জাতিসত্তার পুনর্জাগরণ। তারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জুম্মাদের অধিকার নিয়ে কাজ করেন, জাতিসংঘে রিপোর্ট জমা দেন, বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং জুম্মাদের সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেন।

La Voix des Jummas বিশ্বাস করে যতক্ষণ পর্যন্ত জুম্মাদের কণ্ঠস্বর শোনা না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত পাহাড়ে প্রকৃত শান্তি আসবে না।তাই এই সংগঠন নিরলসভাবে কাজ কর যাচ্ছে।

এই সংগঠনের ফেসবুক পেজ এখন যেন একটি জীবন্ত ইতিহাস। সেখানে প্রকাশিত হয় জুম্মাদের জীবন, তাদের প্রতিবাদ, গান, উৎসব, আঘাত আর আশার গল্প। আপনি যদি এই পেজটি অনুসরণ করেন, তাহলে আপনি শুধু একটি পেজ নয়—একটি জাতির আশা অনুসরণ করছেন। আপনার এক ‘Follow’, এক ‘Share’, এক মন্তব্য মানে, পৃথিবীর আরেক প্রান্তে একজন নিঃশব্দ পাহাড়ি মানুষ বুঝতে পারে, “আমার কণ্ঠ কেউ শুনছে।”

আমরা জানি, আমাদের কোন বড় মিডিয়া নেই। আমরা সেই শক্তি গড়ে তুলতে পারি নি। তাই পাহাড়ের ভেতরে ঘটে যাওয়া নির্যাতন, ভূমি দখল, নারী নিপীড়ন বা সংস্কৃতি ধ্বংসের খবর প্রায়ই মিডিয়ার বাইরে থেকে যায়। কিন্তু La Voix des Jummas সেই হারিয়ে যাওয়া খবরগুলোকে বিশ্বের সামনে নিয়ে আসে। আপনার একটি লাইক, একটি শেয়ার, একটি ফলো এই সত্যগুলোকে আন্তর্জাতিকভাবে দৃশ্যমান করে।

আন্তর্জাতিক সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী কিংবা জাতিসংঘের নীতিনির্ধারকরা যখন এসব পোস্ট দেখেন, তখন চাপ তৈরি হয় যা বাস্তবে পাহাড়ের মানুষের পক্ষে কাজ করে। তাই আপনার একটি লাইক মানে কেবল সমর্থন নয়, এটি এক ধরনের প্রতিরোধ।

একটি পেজ অনুসরণ করা হয়তো ক্ষুদ্র কাজ মনে হতে পারে, কিন্তু তার প্রভাব অনেক গভীর। এটি পাহাড়ের মানুষকে আত্মবিশ্বাস দেয় যে তারা একা নয়। এটি শহরে বসবাসকারী তরুণদের চোখে খুলে দেয় এক অনুচ্চারিত বাস্তবতার জানালা। আপনার একটি শেয়ার পৃথিবীর অন্য প্রান্তে বসা কোনো মানুষকে সত্য জানতে শেখায়, অনুপ্রাণিত করে, জাগিয়ে তোলে।

আপনার একটি Follow হতে পারে একজন কর্মীর সাহস, একজন মায়ের আশার আলো, একজন শিক্ষার্থীর অনুপ্রেরণা। আপনি যেখানে থাকেন না, কিন্তু আপনার মোবাইলের স্ক্রিন থেকেই পাহাড়ের পক্ষে দাঁড়াতে পারেন।

La Voix des Jummas তাই শুধু একটি সংগঠন নয়; এটি এক ধরণের আত্মপ্রকাশ, এক ন্যায়ের আর্তি। এই পেজটি অনুসরণ করে আপনি সেই আর্তিতে নিজের কণ্ঠ যোগ করতে পারেন। আপনার প্রতিটি ক্লিক, প্রতিটি শেয়ার, প্রতিটি মন্তব্য এক এক করে গড়ে তোলে সেই দিন, যখন পাহাড়ের মানুষও সমানভাবে শান্তি, মর্যাদা ও অধিকার ভোগ করতে পারবে।

এখন সময় এসেছে পাহাড়ের কণ্ঠকে উচ্চারণ করার—আপনার নিজের কণ্ঠের মধ্য দিয়েই।

আজই অনুসরণ করুন La Voix des Jummas-এর ফেসবুক পেজ, কারণ পাহাড়ে সত্যিকার পরিবর্তন শুরু হয় সচেতনতার মাধ্যমেই।
👉 আপনার লাইক হতে পারে একটি কণ্ঠের শক্তি,
👉 আপনার শেয়ার হতে পারে একটি আন্দোলনের গতি,
👉 আর আপনার ফলো হতে পারে একটি ইতিহাসের মোড়।

পাহাড়কে শক্তি দিন। কণ্ঠস্বরকে পৌঁছে দিন। Follow করুন La Voix des Jummas।

লিঙ্কঃ

FACEBOOK Page: La Voix des Jummas

WEBSITE: La Voix des Jummas


বনবিহারে হানা: পাহাড়ের নীরবতার আরেক অধ্যায়

বর্মাছড়ি- বন-বিহার_SB Chakma সেনাবাহিনীর হানা এবং জায়গা বেদখল
বর্মাছড়ি বনবিহার সেনাদের বেদল(ছবিঃ S B Khisa প্রোফাইল থেকে)

বর্মাছড়ির বনবিহারে গতকাল সেনারা হানা দিয়েছে। ঘটনাটি কোনো আকস্মিক বিষয় নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত সূচনা। সরকার জানে কখন কোথায় আঘাত হানতে হবে, আর সেই হিসাবেই একের পর এক বিহার আজ টার্গেটে পরিণত হয়। আজ বর্মাছড়ি, কাল অন্য কোথাও। এই আঘাত শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনার নয়, এটি পাহাড়ের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের ওপর সরাসরি আঘাত।

জনগণ রাস্তায় নামবে, প্রতিবাদ করবে—এটি অনুমেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাতে কি কোনো পরিবর্তন আসবে?

আমার তো মনে হয় না।

অতীতের ইতিহাস বলে, পাহাড়ের প্রতিবাদ বারবার দমন করা হয়েছে। কারণ পাহাড়ে এখনো সেই জাতিগত ঐক্য নেই, যা প্রতিবাদকে শক্তিতে রূপ দিতে পারে। যদি ভিক্ষু সংঘ একত্রে দাঁড়ায়, দেশ-বিদেশে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, আন্তর্জাতিক মহলও বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নেয়। কিন্তু বনভিক্ষুরা কি কখনো সেই পথে হেঁটেছেন?

না। পাহাড়ে তা নজির নেই।

অতীতে বহু বিহার ভাঙচুর হয়েছে, আগুনে পুড়েছে, তবু বনভিক্ষুরা থেকেছেন নীরব। প্রতিবাদ, জাতি রক্ষা, শিক্ষা, অস্তিত্ব—এসব শব্দ যেন তাঁদের অভিধানে নেই। এই নীরবতা কাদের জন্য, কার স্বার্থে—এ প্রশ্ন আজ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এখন বনবিহারের পালা এসেছে। এবারও যদি তাঁরা নীরব থাকেন, তাহলে পাহাড়ের মানুষ তাঁদের পাশে দাঁড়াবে কেন?

আপনার কাছে এই প্রশ্ন উঠেছে কিনা আমি জানি না।

আমার মনে আজ অনেক প্রশ্ন। অনেকে হয়তো বলবে, এই বিষয়টি নিয়ে আমার ভাবার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমি জানি, আমার মতো অসংখ্য সাধারণ মানুষ পাহাড়ে আছে, যারা নীরবে ভাবে, চিন্তা করে, আর সত্যকে উপলব্ধি করে। তারা হয়তো রাজনীতি বোঝে না, কিন্তু অবিচারের গন্ধ চিনতে পারে।

বনবিহারের এই নীরব নীতি নতুন নয়; এর শিকড় বনভান্তের সময় থেকেই। পাহাড়ে সেটলার প্রকল্পের উত্থান, সামরিক ছাউনির বিস্তার, আর একই সঙ্গে বনবিহারের প্রসার—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে ঘটেছিল। এটি কোনো কাকতাল নয়। তা স্বীকার করবেন কিনা জানি না।

সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো, বনভান্তে কখনো সেটলার বা সামরিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলেননি; বরং পাহাড়ের তৎকালীন একমাত্র মুক্তিকামী শক্তি, শান্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি তাঁদের গালাগাল করেছেন এমন সময়ে, যখন শান্তিবাহিনী ছিল পাহাড়ের অস্তিত্ব ও আত্মসম্মানের একমাত্র প্রতীক। তার আগে পাহাড়ের কোন অপশক্তি শান্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায় নি।

আমি আজ পর্যন্ত এই তাৎপর্যের ব্যাখ্যা খুঁজে চলেছি- কেন ভান্তে অত্যাচারীদের বিষয়ে নীরব ছিলেন কিন্তু স্বজাতীয় মুক্তিকামীদের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন।

বলা যায়, বনভান্তের এই নীরবতা এবং পরবর্তীকালে বনবিহারের বিস্তার ছিল কোনো আধ্যাত্মিক আন্দোলন নয়, বরং এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত ধর্মীয় প্রভাব প্রতিষ্ঠার প্রকল্প।

আজ যুক্তির খাতিরে স্বীকার করতে হয়, বনবিহারের এই বিস্তারও এক রাজনৈতিক কর্মসূচিরই অংশ। নাম ধর্ম, ভিতরে রাজনীতি। লক্ষ্য একটাই—পাহাড়ি সমাজের ঐক্য, সংস্কৃতি ও স্বাধীন চিন্তার শিকড় কেটে ফেলা। আজ বনবিহারকে ঘিরে যে সংঘাত শুরু হয়েছে, তা ধর্মীয় নয়, এটি এক গভীর সাংস্কৃতিক যুদ্ধের সূচনা।

এই ধারা যদি চলতে থাকে, তাহলে শুধু বিহার নয়, হারিয়ে যাবে পাহাড়ের আত্মা, তার সংস্কৃতি, তার মানুষ হওয়ার অধিকার। আমি বনবিহারের নীতির বিরুদ্ধে লিখি, ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়।

আমি জানি, অনেক বনভিক্ষু আছেন যাদের প্রতি আমার ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা আছে। তাঁরা প্রজ্ঞাবান, জাতি ও ধর্ম সম্পর্কে সচেতন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের কঠোর নীতির বাইরে তাঁরা যেতে পারেন না। সেই কারণেই তাঁরা কালা, বোবা, এবং অনেক সময় নিজের বিবেককেও স্তব্ধ করে রাখেন।

আমি বারবার বলে যাচ্ছি, যদি কিছু নীতি শিথিল করা যায়, তাহলে জাতি ও ধর্ম—দুটিই টিকে যাবে। কিন্তু যদি তা না হয়, তবে মনে রাখতে হবে—এটি কেবল শুরু।

আজ বনবিহারের বর্মাছড়ির জমি, কাল অন্য কোনো কুতুকছড়ি বিহার, পরশু হয়তো পাহাড়ের আত্মপরিচয়ই মুছে যাবে। যদি বনবিহার অন্যের বিপদের সময় চুপ থাকে, তবে অন্যরাও তাদের বিপদে চুপ থাকবে।এটা একদম সরল সমীকরণ। এই নীরবতা একদিন সমষ্টিগত আত্মবিনাশে রূপ নেবে। তাই এখন সময় এসেছে, বনদের নীরবতা ভাঙার।

আমি জানি না যা বলছি কতজন বুঝবেন। কিন্তু যারা ২০৩০ সালের এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে নীরবে পর্যবেক্ষণ করছেন, তারা জানেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে কী ঘটতে যাচ্ছে, তার ইঙ্গিত আজই স্পষ্ট। এই আগুন আজ বর্মাছড়ি বনবিহারের দরজায়, কাল সেটা ছড়িয়ে পড়বে পুরো পাহাড়ের বনবিহার জুড়ে, পুরো পাহাড় জুড়ে। বনরা পাহাড়ের এক নীরব শক্তি। আজ তারা নীরবতা যদি না ভাঙে, এই নীরবতাই হবে পাহাড়ের শেষ নির্বাণ টিকেট।

ভাল থাকবেন।


রাণী কালিন্দী: বুদ্ধিমতী কিন্তু বিভ্রান্ত শাসক

Kalindi-rani-chakma-ruler
রাণী কালিন্দী( প্রতীক ছবি)

চাকমা রাণী কালিন্দী ছিলেন এক অনন্য নারী, যিনি পাহাড়ের ইতিহাসে সাহস, প্রজ্ঞা ও ভুলের মিলন ঘটিয়েছিলেন একই শরীরে। তিনি ছিলেন এমন এক সময়ের শাসক, যখন ব্রিটিশরা চট্টগ্রাম দখল করে পাহাড়ের দিকে ক্রমশ অগ্রসর হচ্ছে, আর পাহাড়ি সমাজ তখনও আত্মীয়তার বন্ধনে গাঁথা, জুমচাষের অর্থনীতিতে নির্ভরশীল, আর সংস্কৃতিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সেই পাহাড়ি স্বাতন্ত্র্যকে প্রথমবার কাগজে বন্দী করার নামই ছিল ব্রিটিশ সভ্যতা, আর তার সঙ্গে রাজনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে তাল মিলিয়েছিলেন রাণী কালিন্দী যদিও শেষ পর্যন্ত সেই কৌশলই পরিণত হয় পাহাড়ের পরাধীনতার সূচনায়।

তিনি রাজা ধরম বক্স খাঁ’র পত্নী ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর ১৮৩২ সালে তিনি রাজ্যভার গ্রহণ করেন, যদিও ব্রিটিশ প্রশাসন তাঁর এই অধিকার স্বীকার করেনি। রাণী দ্বিধা করেননি; আদালতের আশ্রয় নিয়েছিলেন। বারো বছরের মামলা শেষে ১৮৪৪ সালে তিনি জয়লাভ করেন, এবং এই রায় তাঁকে কেবল রাজ্যাধিকারই দেয়নি, দিয়েছে নারীর রাজনৈতিক মর্যাদার স্বীকৃতি। কিন্তু জয় মানেই সবসময় সঠিক দিক নয়। সেই সময় থেকেই তাঁর চারপাশে বেড়ে ওঠে নতুন এক শ্রেণি—বাঙালি আইনজ্ঞ, জমিদার ও দোভাষী—যারা রাণীর প্রশাসনিক সহযোগী হয়ে ওঠে, কিন্তু একই সঙ্গে রাজ্যের আত্মাকে ধীরে ধীরে দূষিত করে ফেলে।

রাণী কালিন্দী ছিলেন বুদ্ধিমতী, কিন্তু তাঁর প্রজ্ঞা ছিল শিক্ষিত বাঙালি ও ইংরেজ আইনজ্ঞদের উপর অতি বিশ্বাসে গড়া। তিনি মনে করতেন, ব্রিটিশ প্রশাসনের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হলে ইংরেজি ও বাংলা জানা লোক দরকার। পাহাড়ি সমাজে তখন এমন কেউ ছিল না, ফলে তিনি আশ্রয় নিলেন পাশের চট্টগ্রামের শিক্ষিত বাঙালিদের। তারা তাঁর রাজসভায় কাজ শুরু করল—রাজস্ব হিসাব, নথি প্রস্তুতি, আইনজীবীর ভূমিকা।

প্রথমে এই পদক্ষেপে উপকারই হয়েছিল, কিন্তু খুব ধীরে ধীরে তারা হয়ে উঠল রাজ্যের চালিকা শক্তি। পাহাড়ি প্রথা, ভাষা, এমনকি রাজার ন্যায়বিচার পদ্ধতিও ঢলে পড়তে লাগল বাংলা প্রশাসনিক ধাঁচের দিকে। রাজসভায় পালি ও চাকমা ধ্বনিলিপির জায়গা নিল বাংলা লিপি; রাজদরবারের কণ্ঠস্বর বদলে গেল, আর পাহাড়ের সংস্কৃতি হারাতে শুরু করল তার প্রশাসনিক মর্যাদা।

রাণী কালিন্দী ভেবেছিলেন, এই পরিবর্তন রাজ্যকে আধুনিক করবে। কিন্তু এই আধুনিকতার ভেতরে লুকিয়ে ছিল পরাধীনতার নকশা। ব্রিটিশরা এই ভাষাগত পরিবর্তনের মধ্যেই দেখেছিল সুযোগ। কারণ এখন তারা সহজেই বাঙালি মধ্যস্বত্বভোগীদের ব্যবহার করতে পারবে প্রশাসনিক দোভাষী হিসেবে। রাণী তাঁর রাজ্যের নিরাপত্তা খুঁজেছিলেন জ্ঞানের আলোয়; কিন্তু জ্ঞানের সেই আলোই ছিল কৌশলগত ফাঁদ, যা পাহাড়ের অরণ্যে এনে ফেলেছিল কাগজের শাসন।

এই সময়েই শুরু হয় জমি ও রাজস্ব সংস্কার। রাজভাণ্ডার পরিচালনার জন্য তিনি কিছু বাঙালি মোহরার নিয়োগ করেন, যারা কর সংগ্রহের পাশাপাশি রাজস্ব জমি ইজারা নিতে শুরু করে। পাহাড়ের সাধারণ মানুষ তখনও জমি বা করের কোনো লিখিত আইন জানত না। ফলে, এই মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি ধীরে ধীরে রাজ্যের কৃষিজমি ও শ্রমের ওপর দখল প্রতিষ্ঠা করে। পাহাড়ি জনগণ তাদের জুম জমি হারায়, এবং অর্থনীতি পরিণত হয় দালাল শ্রেণির দাসত্বে। রাণীর এই পদক্ষেপ, যা তিনি নিয়েছিলেন প্রশাসনিক সুবিধার জন্য, হয়ে দাঁড়ায় পাহাড়ের ভূমি-বিপর্যয়ের প্রথম ধাপ।

তবে রাণী ছিলেন ধর্মে উদার। তিনি মহামুনি বৌদ্ধ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন, আবার হিন্দু ও মুসলমান প্রজাদের জন্য মন্দির ও মসজিদ নির্মাণের অনুমোদন দেন। তাঁর রাজ্যে ধর্ম ছিল মিলনের প্রতীক। কিন্তু এই সহিষ্ণুতা রাজনীতিতে দুর্বলতার প্রতীক হয়ে ওঠে। তাঁর বাঙালি উপদেষ্টারা তাঁর উদার নীতিকে ব্যবহার করে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে থাকে, কারণ তাঁরা জানত ধর্মীয় সহাবস্থান প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম। রাণী যেখানে দেখেছিলেন মানবতা, তাঁরা দেখেছিলেন প্রভাব বিস্তারের সুযোগ।

১৮৬৬ সালে ব্রিটিশ সরকার ক্যাপ্টেন টি. এইচ. লুইনকে পার্বত্য চট্টগ্রামের সুপারিন্টেন্ডেন্ট হিসেবে পাঠায়। লুইন ছিলেন কূটনৈতিক বুদ্ধি ও মানবিক মমতায় ভরপুর এক ব্রিটিশ কর্মকর্তা—যিনি পাহাড়কে দখলের ভূখণ্ড নয়, বরং এক জীবন্ত সমাজ হিসেবে দেখেছিলেন। তিনি স্থানীয় জনগণের জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও সরলতা দেখে মুগ্ধ হন, এবং তাদের আস্থা অর্জন করেন খুব দ্রুতই।

কিন্তু যতদিন তিনি চাকমা রাজ্যের ভেতরের প্রশাসন দেখেছেন, ততদিনই তাঁর মনে এক অস্বস্তি জন্মেছে। রাণী কালিন্দীর রাজশাসনে প্রজাদের উপর প্রশাসনিক চাপ, রাজস্ব সংগ্রহে অনিয়ম, এবং কিছু প্রভাবশালী শ্রেণির স্বার্থপরতা তাঁকে হতাশ করেছিল। তিনি মনে করেছিলেন—রাণীর উপদেষ্টারা, বিশেষত কিছু বাঙালি দালাল ও রাজকর্মচারী, জনগণকে শাসনের বদলে শোষণের পথে ঠেলে দিচ্ছে।

ফলে, লুইন ধীরে ধীরে প্রজাদের পাশে দাঁড়ান। তাঁর সহানুভূতি ছিল পাহাড়ের সাধারণ মানুষের প্রতি, আর এখানেই শুরু হয় রাণী কালিন্দী ও লুইনের তীব্র মতবিরোধ। রাণী মনে করলেন, লুইন তাঁর রাজকীয় কর্তৃত্বে হস্তক্ষেপ করছেন। আর লুইন বিশ্বাস করলেন, রাণীর রাজনীতি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

এই দ্বন্দ্ব শুধু দুজন ব্যক্তির মধ্যে নয়—এটি ছিল দুই দৃষ্টিভঙ্গির সংঘর্ষ: একদিকে স্বদেশি রাজতন্ত্রের গৌরব, অন্যদিকে ঔপনিবেশিক আধুনিকতার দাবি। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, এখান থেকেই সূচনা হয়েছিল পাহাড়ের রাজকীয় ক্ষমতা ও ব্রিটিশ প্রশাসনের মধ্যকার দীর্ঘ সংঘাতের।

কিন্তু লুইন জানতেন, রাণী কালিন্দী সরাসরি সংঘাতে যাবেন না। তাই তিনি একের পর এক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেন, যা রাণীর ক্ষমতা খর্ব করে। যখন তিনি রাণীর সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেন, রাণীর বাঙালি উপদেষ্টারা বলেন, “ইংরেজের সঙ্গে সাক্ষাৎ মানেই পরাধীনতা।”

রাণী এই পরামর্শ মেনে আলোচনায় অস্বীকৃতি জানান। এর ফল হয় ভয়াবহ। লুইন এই প্রত্যাখ্যানকে ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে নেন এবং চাকমা রাজ্য ভেঙে দেওয়ার প্রস্তাব প্রস্তুত করেন। ১৮৬৭ সালে তিনি রাণীর অনুমতি ছাড়াই তাঁর এক মারমা প্রজাকে কর আদায়কর্তা হিসেবে নিয়োগ করেন। রাণী এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মামলা করেন, কিন্তু ১৮৭০ সালে তাঁর আবেদন খারিজ হয়। প্রশাসন ঘোষণা করে—উত্তরাঞ্চল রাণীর অধীনে থাকলেও তিনি কার্যকর শাসন দিতে পারছেন না। এই যুক্তির আড়ালেই ব্রিটিশরা শুরু করে চাকমা রাজ্যের বিভাজন পরিকল্পনা।

১৮৭৩ সালে রাণী মারা যান, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর দশ বছরের মাথায় ১৮৮১ সালে কার্যকর হয় সেই পরিকল্পনা—তিনটি পৃথক সার্কেল গঠিত হয়: চাকমা, বোমাং ও মং। এক ঐক্যবদ্ধ রাজ্য পরিণত হয় তিন ভাগে, আর পাহাড়ি ঐক্য হারিয়ে যায় কাগজে-কলমে।

রাণী কালিন্দীর ভুল এখানে শুধু রাজনৈতিক নয়, তা ছিল সামাজিকও। তাঁর সময় পাহাড়ি সমাজে শিক্ষিত নেতৃত্ব ছিল না। আইনি ভাষা, রাজস্ব ব্যবস্থা বা প্রশাসনিক কৌশল সম্পর্কে পাহাড়ি কেউ জানত না। তাই তিনি বাধ্য হয়েছিলেন বাইরের শিক্ষিত শ্রেণির সাহায্য নিতে। কিন্তু এই সহযোগীরা পাহাড়ের নয়, সমভূমির সন্তান। তাঁদের চোখে পাহাড় ছিল সুযোগের ক্ষেত্র, রাণী ছিলেন সোপান। রাণী তাঁকে ঘিরে থাকা মানুষদের উদ্দেশ্য বুঝতে পারেননি, কারণ তাঁর নিজের ভিত ছিল সৎ বিশ্বাসে গড়া। ইতিহাসে সেই বিশ্বাসই আজ ‘ভুল’ নামে পরিচিত।

তবুও তাঁকে একপাক্ষিকভাবে দোষারোপ করা অন্যায় হবে। কারণ এই নারী একাই দাঁড়িয়েছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মুখোমুখি হয়ে, আদালতে লড়েছিলেন বারো বছর ধরে, প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মহামুনি মন্দির, এবং ধর্মীয় সহিষ্ণুতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তিনি পাহাড়ে নারী নেতৃত্বের পথ খুলে দিয়েছিলেন, যে পথ দিয়ে আজও পাহাড়ি নারীরা রাজনীতি ও সমাজে নিজেদের অবস্থান খুঁজে পায়।

তাঁর ভুলের মূলে ছিল তাঁর মানবিক সরলতা। তিনি ভেবেছিলেন, সহযোগিতা মানেই সমাধান। তিনি বুঝতে পারেননি, সভ্যতার ভাষা যখন অন্যের হাতে বন্দী হয়, তখন সহযোগিতার আড়ালে শুরু হয় অধীনতার ইতিহাস। তিনি পাহাড় হারিয়েছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, সভার টেবিলে; হারিয়েছিলেন বন্দুকের গুলিতে নয়, উপদেষ্টার পরামর্শে। তাঁর কলমের স্বাক্ষরই ছিল পাহাড়ি মানচিত্রের পরিণতি।

রাণী কালিন্দী আজ ইতিহাসে একটি জটিল প্রতীক—তিনি সাহসেরও প্রতিমা, আবার সতর্কতারও প্রতিচ্ছবি। তাঁর জীবন শেখায়, বিশ্বাস যদি নিজের সংস্কৃতি ও বাস্তবতার চেয়ে বড় হয়ে যায়, তবে সেটিই হয়ে ওঠে পতনের কারণ। তিনি যে বিশ্বাস করেছিলেন বাঙালি পরামর্শদাতাদের, সেই বিশ্বাসই আজ পাহাড়ের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ক্ষতচিহ্ন। কারণ তাঁর যুগেই পাহাড়ের মধ্যে বাঙালি প্রশাসনিক প্রভাবের সূচনা হয়, যা আজও অব্যাহত।

চাকমা রাণী কালিন্দী তাই ইতিহাসে এক অমোঘ সত্যের প্রতিনিধিত্ব করেন, যে জাতি নিজের ভাষা, নেতৃত্ব ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে পারে না, তার পরামর্শদাতারা একদিন হয়ে যায় শাসক, আর রাজ্য পরিণত হয় প্রদেশে। তিনি ছিলেন শেষ রাণী, যিনি ভাবতেন সভ্যতা পাহাড়কে বাঁচাবে। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, সভ্যতা কেবল পাহাড়ের রঙ মুছে দেয়, আর রেখে যায় এক দীর্ঘশ্বাসময় স্মৃতি—রাণী কালিন্দী নামে।


🔸 লোকমুখে লুইন ও রাণী কালিন্দী সম্পর্কে প্রচলিত কাহিনি:

১) তার শাসনে লোগাং-পুজগাং-এর কাহিনী শুনা যায়

২ ) চাকমা রাজারা এবং চাকমা প্রজাদের তান্ত্রিক ক্ষমতা কমাতে মিয়ানমার থেকে ভিক্ষু এনে চাকমাদের ঐতিহ্য ধ্বংস করার অভিযোগ লোকমুখে শুনা যায় এবং চাকমাদের পালিত মহাযান লুরি ধর্ম বিনষ্ট হয়। ফলে চাকমাজাতি ইতিহাস বিস্মৃত হয়।

৩) লুইনকে বানরের সাথে তুলনার কথাও লোককাহিনী রয়েছে।

৪) চাকমারা আসলে রানীর চেয়ে লুইনকে বেশী সমাদর করত। রাজ কাজে নিয়োজিত বাঙালীদের চেয়ে লুইন প্রজাদের বেশী ভাল চোখে দেখেছিলেন।

আপনার জানা থাকলে কিছু যোগ করুন। কমেন্ট খোলা আছে-

যন্ত্র নয়, হৃদয়ই তো আসল সুর

asim-chakma
গাধা কখনো ঘোড়া হতে পারে না

আজকের পৃথিবী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) যুগে প্রবেশ করেছে। শব্দ, ছবি, সঙ্গীত—সবই এখন যন্ত্রের মাধ্যমে তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু এক অদ্ভুত প্রশ্ন দিন দিন আরও জোরালো হয়ে উঠছে, “যন্ত্র কি সত্যিই হৃদয়ের সুর বুঝতে পারে?”

একজন শিল্পী যখন কোনো সুর তৈরি করেন, সেখানে তার জীবনের অভিজ্ঞতা, হারানো সময়ের বেদনা, আর অজানা ভালোবাসার স্পর্শ লুকিয়ে থাকে। সেই অনুভব কোনো অ্যালগরিদমে লেখা যায় না। তাই, যদিও সবাই এখন AI ব্যবহার করে, সবাই সৃষ্টিকর্তা হয়ে উঠতে পারে না।

অনেকে বলে, “আমি বহুদিন ধরে AI ব্যবহার করছি!” কিন্তু সময়ের পরিমাণ কখনো প্রতিভার পরিমাপ নয়। যন্ত্র শিখতে পারে, কিন্তু অনুভব করতে পারে না। একজন শিল্পীর আসল শক্তি তার প্রযুক্তি নয়, তার হৃদয়ের গভীরতা, তার কল্পনার প্রাণ।

একই ক্লাসে সবাই একই বই পড়ে, একই শিক্ষক থেকে শোনে। তবুও কেউ জীবনের কষ্টে রিকশা চালায়, কেউ আকাশে উড়ে পাইলট হয়। কারণ বই সবার কাছে সমান, কিন্তু বুদ্ধি, শ্রম আর আগ্রহ সবার সমান নয়।

ফেসবুকও তো সবাই ব্যবহার করে। কিন্তু সবাই কি লক্ষ মানুষের অনুপ্রেরণা হয়? কেউ শুধু ছবি দেয়, কেউ আবার সেই প্ল্যাটফর্মে মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালায়।

AI-ও ঠিক তেমন। সবাই ব্যবহার করছে, কিন্তু সবাই অসীম চাকমা হতে পারছে না।

অসীম চাকমা আপাত একজনই। তার প্রতিভাকে আমাদের শ্রদ্ধা করা উচিত ।

তিনি শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করেননি, তিনি তার অনুভব, তার আত্মা, আর তার শিল্পবোধ ঢেলে দিয়েছেন প্রতিটি সুরে। তাই তার সৃষ্টি হৃদয় ছুঁয়ে যায়, আর অনেকের তৈরি সুর শুধু মস্তিষ্কে ধাক্কা খায়।

এখানেই পার্থক্য—AI শুধু হাতিয়ার, কিন্তু শিল্পীই সেই হাতিয়ারকে আত্মা দেয়।

যন্ত্র যত নিখুঁত হোক, মানুষের হৃদয়ের অপূর্ণতাই তাকে সুন্দর করে তোলে।
একজন প্রতিভাবান শিল্পী AI ব্যবহার করলে তা হয়ে ওঠে জাদু। আর যে শুধু যন্ত্রে বিশ্বাস রাখে, তার সৃষ্টি নিঃশব্দে থেমে যায়।

তাই, আমাদের শেখা উচিত প্রতিভাকে মূল্য দিতে।
কারণ পৃথিবী চলে যন্ত্রে নয়—চলে মানুষের হৃদয়ে, শ্রমে, আর ভালোবাসায়।

AI সুর তৈরি করতে পারে, কিন্তু হৃদয় ছাড়া সুর বাজে না।
AI ছবি আঁকতে পারে, কিন্তু অনুভূতি দিতে পারে না।
AI শব্দ লিখতে পারে, কিন্তু গল্প বলতে পারে না।

অসীম চাকমা সেই গল্পের কথক যার হাতে যন্ত্র নয়, হৃদয় গান গায়।

অসীম চাকমাঃ পাহাড়ের বুকে না জানা এক উদীয়মান আদিবাসী তরুণ তারকা

অসীম চাকমা
(ছবিঃ অসীম চাকমা ফেইসবুক থেকে নেওয়া)

শিরোনামটি শুনে হয়তো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—কে এই অসীম চাকমা? কেন তিনি ‘তরুণ তারকা’? নামটি হয়তো অনেকের অজানা, চেহারাটিও হয়তো কারও মনে পড়ে না। কিন্তু যদি আমি বলি, “Di Chogot Hodok Sobon Mor”—এই হৃদয় ছোঁয়া চাকমা গানটি শুনেছেন? তাহলে হয়তো মনে পড়বে, সেই সুরের মধ্যে এক অনন্য আবেগ ছিল, যা পাহাড়ের কণ্ঠস্বরের মতো আঘাত করেছিল অন্তরে।

হ্যাঁ, সেই গানটির স্রষ্টা এই অসীম চাকমা। সে হয়তো এখনো শতভাগ পরিপূর্ণ শিল্পী নয়, কিন্তু সে যা সৃষ্টি করেছে, তা হাজারো হৃদয়কে নাড়িয়ে দিয়েছে। আজ সেই তরুণ তারকার কথা বলব।

রাঙামাটির বরকল উপজেলার সুবলং ইউনিয়নের ছোট্ট এক পাহাড়ি গ্রাম শুকরছড়ি—সেখানেই এই তরুণ শিল্পীর জন্ম। বাবা সুমন চাকমা, মা শোভারাণী চাকমা। সংসারে অর্থের প্রাচুর্য ছিল না, কিন্তু ভালোবাসার প্রাচুর্য ছিল অগাধ। আর ছিল এক ছেলের মনে জন্ম নেওয়া এক অনির্বাণ স্বপ্ন—নিজের জাতিকে একদিন বিশ্বের কাছে তুলে ধরার, নিজের ভাষাকে গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ করার।

অসীমের ছোটবেলা ছিল অন্যরকম। অন্যরা খেলাধুলা বা বিনোদনে সময় কাটাত, সে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত পর্দার দিকে। ভিডিও, দৃশ্য, সঙ্গীত—এই তিনটি শব্দের মধ্যেই সে খুঁজে পেয়েছিল নিজের আনন্দের জগৎ। হাতে কোনো দামি যন্ত্র ছিল না, ছিল কেবল একটি সাধারণ মোবাইল ফোন। কিন্তু সেই ফোনই একদিন তার জন্য খুলে দেয় আরেক পৃথিবীর দরজা।

২০১৬ সালের ১৫ নভেম্বর, সে তৈরি করে নিজের ইউটিউব চ্যানেল। তখন হয়তো সে নিজেও বুঝতে পারেনি, এই ছোট্ট উদ্যোগ একদিন তার জীবনের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ হয়ে উঠবে। গ্রামের কোনো বৌদ্ধ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গেলে সে ফোনে দৃশ্য ধারণ করত, ফিরে এসে মোবাইলেই সেগুলো সম্পাদনা করত, তারপর ইউটিউবে আপলোড করত। মানুষ তখন খুব একটা দেখত না, প্রশংসাও করত না। কিন্তু অসীম জানত—একদিন এই নিঃশব্দ পরিশ্রমই তার পরিচয়ের পথ তৈরি করবে।

সময়ের সঙ্গে পৃথিবী বদলাতে শুরু করল। প্রযুক্তির বিস্ময়কর এক অধ্যায় খুলল—এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। অসীমও এর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠল। সে বুঝল, প্রযুক্তি কেবল যন্ত্র নয়, এটি মানুষের কল্পনার বিস্তার। ধীরে ধীরে শিখল কিভাবে এআই ব্যবহার করে গান তৈরি করা যায়, কণ্ঠকে নতুনভাবে জাগিয়ে তোলা যায়। কিন্তু তার মন এক প্রশ্নে আটকে গেল—আমাদের চাকমা সমাজে কি কেউ এভাবে গান তৈরি করছে? উত্তর এল—না। আর সেই ‘না’-ই হয়ে উঠল তার যাত্রার সূচনা।

অসীম ঠিক করল, সে তার মাতৃভাষার গানগুলোকে নতুনভাবে উপস্থাপন করবে। অন্যেরা এআই দিয়ে হেসে-খেলে অনর্থক সময় ব্যয় করছে বা সামাজিক মাধ্যমে fun করছে, সে বেছে নিল চাকমা তার সৃষ্টিকে। চাকমা ভাষায় গান তৈরিতে মন দিল। কারণ তার কাছে চাকমা ভাষা মানে পরিচয়, সঙ্গীত মানে আত্মা। তার কাছে প্রযুক্তি কোনো যান্ত্রিক খেলা নয়, বরং সংস্কৃতির নবজন্ম।

তার প্রথম গান ছিল “Di Chogot Hodok Sobon Mor।” ইউটিউবে গানটি প্রকাশের পর যেন পাহাড়ের নীরবতা ভেঙে গেল। তরুণরা বলল, “এমন চাকমা গান আগে শুনিনি।” সেই সুরে ছিল এক নতুন ছোঁয়া, যেন পাহাড়ের বাতাসে এক অচেনা মাধুর্য। গানটি মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ল—গ্রাম থেকে শহর, শহর থেকে মানুষের হৃদয়ে।

এরপর এলো “Hakkonne Jonom।” সেই গানটি শুনে অনেকে মুগ্ধ, অনেকে নিঃশব্দ। কেউ হয়তো চোখের কোণে অশ্রু চেপে রেখেছিল। কারণ এই সুরে তারা খুঁজে পেয়েছিল নিজের সংস্কৃতি, নিজের ভাষা, নিজের অদেখা গর্ব। এই গানগুলো প্রমাণ করল, চাকমা ভাষাও সৃষ্টিশীলতার জগতে বিশ্বমানের সৌন্দর্য ছড়াতে পারে।

অসীম জানে, ইউটিউবে সফলতা পেতে বড় প্রযোজনা, ভালো ক্যামেরা, কিংবা প্রচারণা লাগে। তার কাছে এগুলোর কিছুই নেই। কিন্তু যা আছে, তা আরও মূল্যবান—একটা অবিচল মন, একান্ত বিশ্বাস, আর নিজের শিকড়ে অগাধ ভালোবাসা। সে বিশ্বাস করে, সাফল্যের আসল শক্তি যন্ত্রে নয়, হৃদয়ে।

অসীম বলে, “আমি শুধু গান বানাই না। আমি চাই, বিশ্বের মানুষ জানুক, আমাদের ভাষাও গান গাইতে পারে, অনুভব করতে পারে, ভালোবাসতে পারে।” সত্যিই, তার প্রতিটি সৃষ্টিতে সেই গর্ব স্পষ্ট।

আজ অসীম চাকমা শুধু একজন তরুণ নয়; সে এক প্রতীক—এক প্রজন্মের প্রতীক, যারা প্রযুক্তি আর সংস্কৃতিকে মিলিয়ে নতুন পরিচয় গড়ছে। সে প্রমাণ করেছে, বড় শহর বা বড় প্রতিষ্ঠান নয়, বড় মনই সৃষ্টির মাপকাঠি।

তার গান এখন পাহাড় থেকে শহরে, শহর থেকে বিদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। তরুণ প্রজন্ম তার সঙ্গীত শুনে গর্ব বোধ করছে। অনেকেই বলছে, “এই ছেলেটি পাহাড়ের ইতিহাস বদলে দিচ্ছে।”

অসীম চাকমা কেবল একজন ইউটিউবার নয়, সে একজন সাংস্কৃতিক দূত যে প্রযুক্তির কণ্ঠে গাইছে নিজের জাতির গান। সে প্রমাণ করেছে, সীমিত উপকরণ দিয়েও অসীম স্বপ্ন গড়া যায়। তার গান শুধু সুর নয়, এক জাতির ইতিহাস, এক ভাষার পুনর্জন্ম, মানুষের হৃদয় স্পর্শ করা এক আবেগ।

অসীম গান গেয়ে জানান দেয়, পাহাড়ের সন্তানরাও ভাবতে, সৃষ্টি করতে, ভালোবাসতে পারে। তার নামের মতোই সে অসীম—স্বপ্নে, সাহসে, সম্ভাবনায়।

কিন্তু প্রতিভা একা বিকশিত হয় না। তাকে আলো দিতে হয়, সুযোগ দিতে হয়, পাশে দাঁড়াতে হয়। অসীমের মতো তরুণ যখন নিজের ভাষা, সংস্কৃতি আর প্রযুক্তিকে একসঙ্গে মিশিয়ে কাজ করছে, তখন তার প্রয়োজন শুধু করতালি নয়—প্রয়োজন বাস্তব সহযোগিতা, প্রয়োজন আমাদের বিশ্বাস। আজ যদি কেউ তার পাশে দাঁড়ায়—একটি ভালো যন্ত্র দেয়, একটি মানসম্মত স্টুডিও দেয়, অথবা শুধু তার কাজটিকে মানুষের সামনে তুলে ধরার সহায়তা করে—তাহলেই হয়তো এই গানগুলো পাহাড়ের সীমা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছে যাবে।

কারণ, অসীমের গান কেবল তার নিজের নয়, এটি এক জাতির সম্মিলিত গর্ব, এক পাহাড়ি আত্মপরিচয়ের প্রতিধ্বনি। আমরা হয়তো বড় শিল্পীদের পেছনে তালি দিই, কিন্তু যারা নীরবে পথ তৈরি করছে, তাদের পাশে দাঁড়ানোই আসল মানবিকতা। চাকমা সমাজের তরুণরা যদি তার কাছ থেকে শেখে—কিভাবে সীমিত যন্ত্র দিয়েও অসীম স্বপ্ন দেখা যায়—তবে সেটিই হবে তার সবচেয়ে বড় সাফল্য।

যে তরুণ পাহাড়ের কোলে বসে প্রযুক্তির ভাষায় নিজের জাতির গান গাইছে, তাকে এগিয়ে নেওয়া মানে কেবল একজন মানুষকে সাহায্য করা নয়—এটি এক সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা, এক ভাষাকে টিকিয়ে রাখা, এক আত্মাকে জাগিয়ে রাখা। অসীম চাকমা আমাদের সময়ের এক প্রতীক যে দেখিয়েছে পাহাড়ের নীরবতার ভেতরেও সুর আছে, শব্দ আছে, স্বপ্ন আছে। এখন শুধু প্রয়োজন হাত বাড়িয়ে দেওয়া যাতে এই সুর হারিয়ে না যায়, বরং আরও দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

আপনি তাকে এগিয়ে দিতে আপনার হাত বাড়াবেন তো?

তার ফেইসবুক এবং ইউটিউব লিঙ্ক নিচেঃ

ফেইসবুকঃ https://www.facebook.com/ashim.chakma.1694

ইউটিউবঃ https://www.youtube.com/@Bangori.Studio

Please read about him in English HERE.


আমি কেন The Times of Israel-এ লিখি

Purnalal-Chakma
আমার সকাল

প্রতিদিন সকালে টোকিও জেগে ওঠে তার স্বভাবসিদ্ধ শৃঙ্খলায়। ট্রেন চলে সঠিক সময়ে, মানুষ কাজে ছুটে যায়, শহর নিঃশব্দে এগিয়ে চলে নিজের নিয়মে। আমি এক কাপ কফি হাতে ডেস্কে বসি। জানালার বাইরে সূর্য উঠছে সুমিদা নদীর ওপারে, আর জানালার ভেতর আলো জ্বলে ওঠে আমার কিবোর্ডে।

অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি তো নিজের ওয়েবসাইট চালাও, তাহলে The Times of Israel-এ লেখ কেন? এত ব্যস্ততার মাঝেও সময় পাও কীভাবে?”

প্রশ্নের অভাব নেই, উত্তরও সবসময় দিই না। কারণ, সবাই যে জানতে চায়, তা নয়—অনেকে কেবল “হ্যালো” লিখে চলে যায়।

যাই হোক, আমি কেন লিখি, এই প্রশ্নের উত্তর খুব সরল। কারণ আমার কাছে লেখা মানে কোনো প্ল্যাটফর্মের মালিকানা নয়, বরং এমন এক কণ্ঠ খুঁজে পাওয়া যা সীমান্ত পেরিয়ে পৌঁছাতে পারে মানুষের হৃদয়ে।

আমি এমন এক দেশে জন্মেছি যেখানে সত্য বলা বিপজ্জনক আর নীরবতা নিরাপদ। পাহাড়ের সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে শত বছরের বঞ্চনা, নিপীড়ন, আর রাষ্ট্রের নীরব সহিংসতা। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের গল্প কেউ শোনে না—না বাংলাদেশে, না জাতিসংঘে, না বিশ্বের কোনো সভায়।

কিন্তু The Times of Israel-এর ব্লগ বিভাগে আমি প্রথম দেখেছিলাম এক খোলা দরজা যেখানে স্বাধীনভাবে বলা যায়, যেখানে নিপীড়িতের কণ্ঠ বিশ্বজুড়ে প্রতিধ্বনিত হতে পারে।

আমি ইসরায়েলের ইতিহাস দেখি যেখানে এক জাতি যারা বারবার ভেঙে পড়েও আবার দাঁড়িয়েছে এবং তাদের মাঝে আমি পাহাড়ের অস্তিত্বের প্রতিধ্বনি শুনি। তেমনি পাহাড়েই বিলীন প্রায় অস্তিত্বে ইসরায়েলের রব শুনি।

আর দেখি আমার নিজের পাহাড়ের লোকদের যারা এখনো নীরবতার দেয়ালে বন্দি। সেই দুই বাস্তবতার মধ্যে আমি লিখি এক সেতুর গল্প, যেখানে বিশ্বাস, মানবতা, আর ন্যায়বোধ একত্রে দাঁড়িয়ে আছে।

আমার টোকিওর জীবন নিঃসন্দেহে সাধারণ—কাজ, লেখা, ফটোগ্রাফি, ওয়েবসাইট পরিচালনা—সব মিলিয়ে ব্যস্ত এক দিনযাপন। কিন্তু রাত নামলে, যখন শহরের আলো জানালায় প্রতিফলিত হয়, আমি ফিরে যাই আমার পাহাড়ে সেই গ্রামে, যেখানে সেটলারদের আগুনে ঘর জ্বলে, সকালে শুধু ছাই পড়ে থাকে; যেখানে মানুষের চিৎকার নীরবতায় হারিয়ে যায়, আর কান্না নীরবে চোখ বেয়ে পানি হয়ে বেরিয়ে আসে।

আমার সকাল শুরু হয় কাক ডাকার আরও অনেক আগে। সারা জীবন আমি খুব কম ঘুমিয়েছি।ছাত্রজীবনে ঘুম বাদ দিয়ে পড়তাম, পরে কাজ করতাম, এখন লিখি। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিন-চার ঘণ্টা ঘুমাই, বাকিটা সময় শব্দে কাটে কাজে আর লেখায়।

আমি লিখি The Times of Israel-এর জন্য, লিখি নিজের ওয়েবসাইটের জন্য, লিখি কারণ লেখার কোনো শেষ নেই। আমি লিখি কারণ সত্যের কোনো ভূগোল নেই।

আমি লিখি কারণ জেরুজালেমের পাথরে খোদাই করা বিশ্বাসের প্রতিধ্বনি শুনি রাঙামাটির, খাগড়াছড়ির, বান্দরবানের পাহাড়ে। সমস্যা আলাদা নয়—মূল শব্দ একটাই: অস্তিত্ব। অস্তিত্বের জন্য দরকার সাহস, দরকার অনুপ্রেরণা, দরকার পাহাড়ের কণ্ঠ।

আমি পাহাড়ের মানুষদের প্রতি একটি আন্তরিক আহ্বান জানাতে চাই। সম্ভব হলে অনুগ্রহ করে আপনারা নিজেদের গল্প লিখুন।নিজেদের চোখে দেখা সেই বাস্তবতা তুলে ধরুন।

যতদিন পাহাড়ের মানুষ নিজের ইতিহাস নিজের হাতে লিখবেন, ততদিন কেউ সেই ইতিহাস মুছে দিতে পারবে না।

আমরা যদি নিজেদের কথা না বলি, অন্যেরা আমাদের গল্প বলবে আর সেখানে আমরা থাকব শুধু চরিত্র হিসেবে, মানুষ হিসেবে নয়।

তাই দয়া করে লিখুন, বলুন, রেকর্ড করুন—যাতে আগামী প্রজন্ম জানে, পাহাড় একসময় নিঃশব্দ ছিল না, সেখানে মানুষ বেঁচে ছিল মর্যাদা ও সাহস নিয়ে।

আমি লিখি কারণ এই পৃথিবীতে কেউ যদি না বলে, তাহলে পাহাড়ের নীরবতাই একদিন স্থায়ী হয়ে যাবে। তাই আমাদের লিখতে হবে। সম্ভব হলে লিখতে হবে। কারণ নীরব থাকলে পৃথিবী হয়তো পাহাড়কে ভুলে যাবে।


বাংলাদেশ এখন এক কঠিন প্রশ্নের মুখে— কার পাশে দাঁড়াচ্ছে?

ভারতের সামারিক গোয়েন্দা দল বাংলাদেশে ১৪-১৬ অক্টোবর ২০২৫
ভারতের সামারিক গোয়েন্দা দল বাংলাদেশে ১৪-১৬ অক্টোবর ২০২৫

ঢাকায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রতিনিধি দল এসেছে।দিনক্ষণ হচ্ছে ১৪ থেকে ১৬ অক্টোবর। ঘোষণায় বলা হয়েছিল চার সদস্য, কিন্তু বাস্তবে উপস্থিত ছিলেন অন্তত আঠারো জন। দলের নেতৃত্বে আছেন মেজর জেনারেল কুন্দন কুমার সিংহ। তারা ঢাকায় এসে একাধিক বৈঠকে অংশ নিয়েছেন, যার অধিকাংশই হয়েছে বন্ধ দরজার আড়ালে।

তারা শুধু ঢাকায় বৈঠকেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; কক্সবাজারেও গিয়েছেন। সেখানে একটি বিশেষ সামরিক স্থাপনা ও উপকূলীয় নিরাপত্তা ঘাঁটি পরিদর্শন করেছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। যদিও সরকারিভাবে কক্সবাজার সফরের কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, তবে স্থানীয় পর্যায়ে ভারতীয় প্রতিনিধিদের উপস্থিতি নিয়ে নীরব আলোচনার ঝড় উঠেছে।

সরকারিভাবে শুধু বলা হয়েছে, এটি একটি সৌজন্যমূলক সামরিক সফর। কিন্তু সময়, প্রেক্ষাপট এবং উপস্থিতির মাত্রা—সবকিছু মিলিয়ে এটি নিছক সৌজন্য নয়, বরং কৌশলগত একটি উদ্যোগ বলেই মনে হচ্ছে। মজার বিষয় হচ্ছে সামারিক ওয়েবসাইট ছাড়া কোন খবরের কাগজ বিষয়টি নিয়ে লেখার অনুমতি পায় নি।

আর এই সফর ঘটছে এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ দিনের বন্ধুত্ব এখন অবিশ্বাসে জর্জরিত। অনেকের ধারণা, এই সফরের উদ্দেশ্য বাংলাদেশের সামরিক যোগাযোগের পুরোনো প্রভাব পুনরুদ্ধার করা।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভেতরেও দেখা দিয়েছে স্পষ্ট মতপার্থক্য। এক অংশ মনে করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কই মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার রক্ষার একমাত্র পথ; অন্য অংশ বিশ্বাস করে পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন সামরিক ও ধর্মীয় ঘনিষ্ঠতাই ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। সেই ঘনিষ্ঠতা থেকে আবার মাথা তুলছে ইসলামি রাষ্ট্র গঠনের ধারণা। এই দুই মতাদর্শের সংঘাত এখন নীরবে কিন্তু গভীরভাবে সেনাবাহিনীর কাঠামো ও নেতৃত্বে প্রভাব ফেলছে।

একদিকে ভারতপন্থী গোষ্ঠী মনে করছে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দিল্লির সমর্থন অপরিহার্য, অন্যদিকে পাকিস্তানপন্থীরা ভাবছে দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ ইসলামি জোটের মধ্যেই নিহিত। এই জোটের লক্ষ্য কেবল বাংলাদেশ নয়—এর প্রভাব বিস্তার হতে পারে পার্বত্য চট্টগ্রাম, আরাকান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত। এমন প্রেক্ষাপটে ভারতীয় গোয়েন্দা দলের সফর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

এরই মধ্যে সেনাপ্রধান ঠাকুরগাঁওয়ের পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটি পরিদর্শন করেছেন এবং পাশের ক্যাম্পে বৈঠক করেছেন। কেন গেছেন, কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে—তা নিয়ে সরকারি কোনো ব্যাখ্যা মেলেনি। অনেকেই মনে করছেন, ওই বিমানঘাঁটি সম্ভবত জরুরি সামরিক ব্যবহারের জন্য পুনরায় সক্রিয় করা হচ্ছে। যদি তা সত্য হয়, তবে বাংলাদেশ নীরবে এক নতুন নিরাপত্তা কৌশল তৈরি করছে—যেখানে ভবিষ্যতের আঞ্চলিক সংঘাতের সম্ভাবনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এই ঘটনাগুলো আলাদা নয়; সবকিছু যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। এর আগে পাকিস্তান থেকেও গোয়েন্দা ও মন্ত্রীপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসেছিল। তখন সেনাপ্রধান ছিলেন চীন সফরে। এবার এসেছে ভারত। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত দায়িত্ব নিয়েছেন, এবং সেই পর থেকেই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি নতুন মোড় নিচ্ছে। ওয়াশিংটন আবার ভারতকেন্দ্রিক কৌশলে ফিরছে, আর সেই স্রোতে বাংলাদেশকেও টানার চেষ্টা চলছে।

বিশ্বপরিসরে ট্রাম্পের ইসরায়েল সফর, হামাসের অস্ত্রসমর্পণ ও বন্দি বিনিময়ের ঘটনাগুলো, এবং নেতানিয়াহুর প্রভাবে তার হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন—এসব ঘটনাও এই অঞ্চলের রাজনৈতিক স্রোতের সঙ্গে যুক্ত। ট্রাম্প ইসরায়েলে অবতরণের পর মুহূর্তের মধ্যে ভারত–পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে নিজের অবস্থান পাল্টে দেন।

বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু তাঁকে খুব স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সহযোগী। এর প্রতিফলনই এখন দেখা যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার নতুন কূটনৈতিক অক্ষ গঠনে।

অন্যদিকে মিয়ানমার সীমান্তে পরিস্থিতি ক্রমেই অস্থির হচ্ছে। রোহিঙ্গারা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন ভিডিও ও ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। অভিযোগ উঠেছে, তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর একাংশ।

একই সময় চীন তিন দিকেই খেলছে—জান্তা সরকার, আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা বিদ্রোহী—সব পক্ষকেই অস্ত্র ও সহায়তা দিচ্ছে এবং বলছে, “যুদ্ধ করো।” এই বহুমুখী খেলায় পাকিস্তানও যুক্ত হয়েছে; তারা রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের সরাসরি সমর্থন দিচ্ছে। ফলে পুরো অঞ্চল এখন সম্ভাব্য এক নতুন প্রক্সি যুদ্ধের মঞ্চে পরিণত হচ্ছে।

এই জটিল প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত সূক্ষ্ম। একদিকে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাপ, অন্যদিকে চীন ও পাকিস্তানের প্রভাব। এর মাঝখানে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ও পররাষ্ট্রনীতি আজ বিভক্ত ও দ্বিধাগ্রস্ত। প্রশ্ন এখন একটাই—বাংলাদেশ কার পাশে দাঁড়াবে? পুরোনো মিত্রতার ধারাবাহিকতায়, নাকি নতুন ইসলামি অক্ষের সঙ্গে?

এই অজানা সমীকরণের মাঝে উঠে আসছে সেনাপ্রধানের ভূমিকাও। সময় যত এগোচ্ছে, তাঁর নীতির দ্বিমুখী চরিত্র তত স্পষ্ট হচ্ছে। তিনি একদিকে হাসিনা সরকারের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখে লীগ নেতাদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন, আবার অন্যদিকে পাকিস্তানপন্থীদের প্রতি নীরব সমর্থন দিয়ে ২০২৪ সালের আন্দোলন সফল করেছেন। অনেকেই মনে করেন, এখানে মুখ্য চরিত্র নোবেল বিজয়ী ড. ইউনুস নন—মূল খেলোয়াড় সেনাপ্রধান নিজেই।

এখন তিনি এক প্রকার বুমেরাং অবস্থায়—মানবতাবিরোধী অভিযুক্ত সেনাকর্তাদের রক্ষা করলে যেমন বিপদ, না রক্ষা করলেও বিপদ। আইনের হাতে ছেড়ে দিলে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসবে, আর সেই সাপ হয়তো তিনিই। তাই অনেকের ধারণা, তিনি ভারতের সঙ্গে আপস করে নিজের নিরাপদ প্রস্থান বা safe exit তৈরি করতে চাইছেন।

সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়া আবারও ভাগ হয়ে যাচ্ছে—একদিকে ভারত–আমেরিকা–ইসরায়েল অক্ষ। অন্যদিকে পাকিস্তান–চীন–ইসলামি অক্ষ। বাংলাদেশ তাদের মাঝখানে এক নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। ঠাকুরগাঁওয়ের আকাশ থেকে চট্টগ্রামের পাহাড় পর্যন্ত এই নীরবতা এখন আর শুধু ভৌগোলিক নয়—এটি এক রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রতিধ্বনি।

আগামী দিনগুলোতে এই অক্ষগুলোর টানাপোড়েন আরও বাড়বে, এবং সেই টান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে আরও উন্মোচিত করবে। পাহাড় ও সীমান্তের নীরব সংঘর্ষ হয়তো একদিন রাষ্ট্রীয় কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসবে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া—অন্য কারও ছায়ায় নয়, নিজের সার্বভৌম অবস্থানে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং দেশের অন্যন্যা সংখ্যালঘুদের পুড়িয়ে তো তার সমাধান আসবে না। চাই রাজনৈতিক সমাধান।

প্রশ্ন এখন একটাই, বাংলাদেশ কি সেই সাহস দেখাতে পারবে?

পারবে না। কারণ যে দেশে ৯৯% ভাগ মানুষ অমুসলিম-বিরোধী, সে দেশে অমুসলিমদের অধিকার দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।

হ্যাঁ, সঙ্কেত দিয়ে রাখি, ভারত আপাতত হাসিনা দিদিকে দেশে ফিরিয়ে দিতে চায়। যদি সফল হয়, তাহলে বন্দর বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার ‘বাম হাতের টাকা’ সরকারের সেই প্রভাবশালী মানুষের পকেটে যাবে না। এমনও হতে পারে, বন্দর দেশের মানুষের হাতেই থাকতে পারে। কিন্তু পাহাড়ের মানুষের ভাগ্য একই থেকে যাবে।

আর সেই চাল যদি পাকিস্তান রোধ করতে পারে, তবে নতুন চালটা কী হবে তা আমরা সবাই জানি। এই সরকারকে টিকিয়ে রাখতে একটা উছিলা দরকার আর তা হতে পারে সীমান্তঘেঁষা ছোটখাটো যুদ্ধ। নির্বাচন আপাতত হচ্ছে না। তবে সবচেয়ে দুঃস্বপ্ন হচ্ছে পাহাড়ি দালালদের জন্য। তাদের জন্য আমার সত্যিই মায়া হচ্ছে।

এবার বলুন তো দেখি, কার সঙ্গে যাচ্ছে বাংলাদেশ?

আমি কিন্তু জানি না। আপনি জানলে একটু বলুন।


পাহাড়ে ক্যাম্প, বাজারে ব্র্যান্ড

পাহাড়ে ক্যাম্প, বাজারে ব্র্যান্ড
পাহাড়ে ক্যাম্প, বাজারে ব্র্যান্ড

বাংলাদেশে এখন এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে—যেখানে সেনাবাহিনী শুধু পাহাড় পাহারা দেয় না, পাহাড়ের ব্যবসাও চালায়। একসময় তাদের হাতে ছিল বন্দুক, এখন হাতে ফাইল, ব্র্যান্ডিং গাইডলাইন আর বাজেট রিপোর্ট।

পাহাড়ের নিরবতা এখন শুধু প্রকৃতির নয়, সেটাও একটি লাইসেন্সকৃত সম্পদ। কে কোথায় দোকান বসাবে, কে পর্যটন চালাবে, কে নদীর ধারে চা বিক্রি করবে—সবকিছুর অনুমোদন আসে ইউনিফর্মের টেবিল থেকে।

কক্সবাজারে তারা একদিকে মানবিকতার মুখোশ পরে রোহিঙ্গাদের পাহারা দেয়, আর অন্যদিকে মাদক আর রাজনীতির সুতো টানে। পাহাড়ে সন্ত্রাস দমনের নামে যারা গিয়েছিল, তারাই এখন পর্যটন আর বাণিজ্যের নতুন মুখপাত্র।

একেকজন অফিসার যেন একেকজন সিইও—তাদের প্রকল্পের নাম শুধু পাল্টেছে, মনোভাব নয়।

সম্প্রতি বানিজ্য উপদেষ্টা গিয়েছিলেন সেনাবাহিনীর এক ফার্নিচার কারখানায়। ঝকঝকে টেবিল, চেয়ার, আলমারি দেখে তিনি মুগ্ধ।
বললেন, “চমৎকার! কিন্তু ট্যাঙ্ক বানান না?”
একজন অফিসার গর্বভরে জবাব দিলেন, “সেগুলোও বানাচ্ছি, স্যার।”
উপদেষ্টা ঠোঁট উল্টে বললেন, “দেখি না তো! নাকি সোফার নিচে লুকানো?”

এই দৃশ্য হয়তো মজার মনে হয়। কিন্তু এর পেছনে আছে এক ভয়ংকর সত্য হচ্ছে, একটা সেনাবাহিনী যখন যুদ্ধক্ষেত্রের বদলে শোরুমে সাফল্য খোঁজে, তখন দেশপ্রেমও পণ্যে পরিণত হয়। পাহাড়ের মানুষ তখন বুঝতে পারে, তাদের ওপর দাঁড়ানো ক্যাম্পটা শুধু সামরিক না, অর্থনৈতিকও।

সবচেয়ে যন্ত্রণার হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ আজ নিজের জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তারা কী খাবে, কোথায় যাবে, এমনকি কোন রাস্তায় হাঁটবে—তাও যেন কেউ আগে থেকে ঠিক করে দেয় সেনা।

পাহাড়ের মানুষ আজ নিজের মাটিতেই বন্দি, নিজের ভাষায় নির্বাক। সেনাবাহিনী এখন শুধু দেশের সংখ্যালঘু ও পাহাড়ের আদিবাসীদের ওপর অত্যাচারের যন্ত্র নয়, বরং রাষ্ট্রীয় টাকা বানানোর মেশিনে রূপ নিয়েছে।

একটা বাহিনী যখন পেশাদারিত্ব হারিয়ে ব্যবসার হিসাব করে, তখন রাষ্ট্রও ধীরে ধীরে বাজারে পরিণত হয়। “নিরাপত্তা” তখন আর প্রতিরক্ষা নয়, বরং বিনিয়োগ কৌশল। ফার্নিচার, সিমেন্ট, তেল, দুধ—এসব বানানোর জন্য কি সেনাবাহিনীর জন্ম হয়েছিল? নাকি এখন নতুন নীতি হলো, “Defence Through Domestic Product”?

যদি এভাবে চলতে থাকে, তাহলে শিগগিরই দেখা যাবে, “বাংলাদেশ আর্মি প্রেজেন্টস: কৌশলগত দুধ ও সামরিক পালং শাক—দেশপ্রেমের গ্যারান্টি সহ!” দেশ কি সব সেনা দখল নিল?


যার বিয়ে তার খবর নাই

শ্রীলঙ্কার রাস্তায় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা স্লোগান দিচ্ছে, “Protect Buddhists & Hindus in Chittagong Bangladesh!”

আর ঢাকায় আমাদের ভিক্ষুরা এই সময় নতুন গাড়ির শোরুমে টেস্ট ড্রাইভ নিচ্ছে। মনে হচ্ছে, যার বিয়ে তার খবর নাই, পাড়ার লোক রাত জেগে নাচছে।

পাহাড়ে মানুষ পুড়ছে, নারী লাঞ্ছিত হচ্ছে, গ্রাম উজাড় হচ্ছে। কিন্তু আমাদের ভিক্ষুরা এখন ব্যস্ত কে কার কাছ থেকে কত কোটি চীবর দান পাবে তা গণনা করে।

তাদের ধ্যান এখন ভিক্ষার চেয়ে বেশি ‘প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট’-এর মতো—স্প্রেডশিটে করুণা, আর ফাইলে ধর্ম।

আজ পাহাড় পাহারা দেয় বন্দুকধারী, আর ধর্ম পাহারা দেয় কাষায়ধারী। দু’জনেরই লক্ষ্য এক, ‘শান্তি রক্ষা’।
একজন বন্দুক দিয়ে, আরেকজন নীরবতা দিয়ে।

টেলিভিশনে তারা শান্তির গান গায়, পত্রিকায় হাসিমুখে চীবর দান দেয়, যেন আগুনের দেশে এখনো বসন্ত চলছে।

মিডিয়াও তেমনই নির্বিকার—পাহাড় পুড়লে ক্যামেরা ঘোরে না। কিন্তু জাতীয় কঠিন চীবরদানে টিভি পর্দা যেন থামে না। পত্রিকার খবর শেষ হয় না। ঊৎসব আর উপভোগ।

দেশে আগুন লাগিয়ে কেউ বিদেশে গিয়ে শান্তিরক্ষী হয়,
মন্দিরে নীরব থেকে কেউ হয়ে যায় ‘ধর্মরক্ষী’। দু’জনের কাজই এক, “শান্তি বিক্রি করে বাঁচা।”

বুদ্ধ করুণা শিখিয়েছিলেন, কিন্তু তারা করুণা বিক্রি করছে। বুদ্ধ অন্যায়ের সামনে নীরব থাকেননি।কিন্তু তারা নীরবতাকেই সাধনা বানিয়েছে। যেন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কই এখন নির্বাণের রাস্তা।

তবু দেখুন, দূরে শ্রীলঙ্কার ভিক্ষুরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমাদের জন্য চিৎকার করছে যেন লজ্জার আয়না হাতে ধরে বলছে, “হে বাংলাদেশের ভিক্ষুগণ, তোমরা কোথায়?”

ধর্মের নাম যদি দামি গাড়ি, আইফোন, আর সরকারি বাজেটের প্রতিযোগিতায় চুপ থাকা হয়, তবে ওটা আর ধর্ম নয়—ওটা বেইমানির নীরব সংস্করণ।

যে ধর্ম নিজের সন্তানদের কান্না শুনতে পায় না, শুনলে পাপ হয় সে ধর্মের পতাকা যতই উঁচুতে ওড়ে, ভেতরে ততই শূন্যতা জমে।

একদিন সেই শূন্যতা থেকেই একটি প্রশ্ন তীব্র হয়ে উঠছে, “পাহাড় পুড়ছে, আর তোমরা ধ্যান করছো —কিসের জন্য?”

(নোটঃ পোস্টটি বন ও দালালদের উৎসর্গ করলাম।)