দেশটা জনগণের, সেনানিবাসের নয়

দেশে এখন নতুন এক নিয়ম চলছে—মানুষ মরে, সেনা হাসে; জনগণ কাঁদে, আর “রাষ্ট্র” নাকি শান্ত থাকে! কিন্তু মনে রাখুন, শান্তি বন্দুকের নল থেকে নয়, জনগণের বুক থেকে আসে।

যখন পাহাড়ে কিংবা শহরে নিরীহ মানুষ গুলি খায়, তখন সেনানিবাসের ভেতরে হয়তো নৈশভোজ চলে; কিন্তু বাইরে রাস্তায় যে রক্ত ঝরে, সেটাই একদিন দেয়াল ভেদ করে ঢুকে পড়ে ক্ষমতার ঘরে।

আমরা বলছি না, দেশে সেনা চাই না। আমরা বলছি, অপরাধী সেনা চাই না।

যে ইউনিফর্ম মানুষ মারতে শেখে, তাকে ইউনিফর্ম নয়, ইউনিফর্মের আদালতে পাঠানো উচিত।

যে রাষ্ট্রে বাবা সন্তানের হত্যার বিচার পায় না, সেখানে জনগণই একমাত্র বিচারক। জনগণের কণ্ঠকে দমন করে কখনোই রাষ্ট্র টিকে থাকে না—ইতিহাস বারবার তা প্রমাণ করেছে।

তাই বলি, এই দেশ জনগণের, বন্দুকধারীদের নয়।
জনগণের রক্তে গড়া পতাকা এখন কলঙ্কিত ইউনিফর্মে জড়িয়ে গেছে।

অপরাধী সেনারা যদি আজও অজুহাতের আড়ালে বেঁচে থাকে, তবে কাল তাদের বিচারের মঞ্চ তৈরি করবে জনগণ নিজের হাতে।

আর সেই দিন, আদালত বসবে রাজপথে- বিচারক হবে জনতা, সাক্ষী হবে শহীদের রক্ত আর রায় লেখা হবে একটাই কথায়, “এই দেশ সেনানিবাসের নয়, এই দেশ জনগণের!”


সেনানিবাসে আলাদা কারাগার কি বৈধ?

সেনানিবাসে আলাদা কারাগার কি বৈধ?
সেনানিবাসে আলাদা কারাগার কি বৈধ?

রাষ্ট্রে দুই আইন চললে একদিন আইনই পালাবে! সেনানিবাসে আলাদা কারাগার কি বৈধ? তাহলে প্রত্যক বাবা-মা তাদের অপরাধী সন্তানদের জন্য বাড়িতে নিজস্ব কারাগার বানাবে। সেটা কি বৈধ হবে?

এক দেশে ছিল আইন—সবাই মানত, সবাই ভয়ও পেত। হঠাৎ একদিন দেখা গেল, সেই আইনকে তালা মেরে বন্দি করা হয়েছে সেনানিবাসে। এখন আইন বাইরে যেতে চাইলে পারমিশন লাগে, কারণ ওটা এখন ‘সামরিক এলাকা’। বিচার চাইলে আগে ফরম পূরণ করতে হয়, আর অনুমোদন লাগে “উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের”।

একটি স্বাধীন দেশে সেনাবাহিনী থাকে রাষ্ট্ররক্ষার জন্য, বিচার করার জন্য নয়। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেনাবাহিনীও বুঝে গেছে, যে হাতে বন্দুক আছে, তার হাতে বিচারও চলে আসে। তাই তারা ভাবছে, আদালতের দরজা বন্ধ থাকলে কষ্ট কী! দরজা আছে, তালা আছে, জেলও বানানো যায়—সবই রাষ্ট্রের ভেতরে!

দেশে এখন এক অদ্ভুত পরিস্থিতি: জনগণের জন্য এক আইন, আর সেনানিবাসের ভেতর আরেক আইন। ফলাফল কী? যে রাষ্ট্রে দুই আইন চলে, সেখানে আইন থাকে না—থাকে ভয়। তখন আইন বইয়ে থাকে, আর বিচার হয় গোপনে, চা-নাস্তা খেতে খেতেই।

সেনাবাহিনী দেশের গর্ব, সন্দেহ নেই। কিন্তু গর্ব আর গডফাদারির মধ্যে পার্থক্য আছে। যে বাহিনী সীমান্তে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ে, সে যদি ভেতরে এসে বিচারক, তদন্তকারী আর কারারক্ষী হয়ে যায়, তাহলে রাষ্ট্রের নাম পাল্টে দিতে হয়—“গণপ্রজাতন্ত্রী” বাদ দিয়ে “গণব্যারাক” রাখতে হয়।

একটা দৃশ্য ভাবুন, একজন সেনা সদস্য অপরাধ করেছে, সেনা ট্রাইব্যুনালে দোষী। কিন্তু তাকে জেলে না পাঠিয়ে সেনানিবাসেই বন্দি রাখা হলো। বাহ! দেশের ইতিহাসে এ এক নতুন আতিথ্য—যেন শাস্তির বদলে সেনানিবাসে পাঠানো হচ্ছে ‘রিফ্রেশমেন্ট কোর্সে’। কেউ কেউ বলে, এটা শাস্তি নয়, “জামাই আদর” সংস্করণের কারাবাস।

এই ব্যবস্থায় প্রশ্ন ওঠে, বিচারটা হচ্ছে রাষ্ট্রের নামে, না বাহিনীর নামে? আইন কার হাতে—জনগণের, না বন্দুকধারীর?
বিচার যদি ব্যারাকে হয়, তাহলে পুলিশ কী করবে? কোর্টরুমে এখন কি ট্যাংক পার্কিং লট হবে?

সেনা ট্রাইব্যুনাল থাকতে পারে, কিন্তু কারাগার গড়া, শাস্তি দেওয়া, হেফাজত রাখা—এসব পুলিশের কাজ। পুলিশ রাষ্ট্রের নাগরিক কাঠামোর অংশ। কিন্তু যদি সেনাবাহিনী নিজেরাই ধরে, জিজ্ঞাসাবাদ করে, কারাবন্দি রাখে—তাহলে সেই বিচার আর রাষ্ট্রের নয়, হয় “অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা অভিযান।”

আর সেই ‘অভিযান’-এর ফল কী হয় জানেন? কেউ আর জানে না কে কোথায় বন্দি, কেমন অবস্থায় আছে। পরিবারও জানে না, মানুষটা এখন ‘জেলে’ না ‘জামাইখানায়’। এইভাবেই শুরু হয় “গোপন হেফাজত” আর “গুমের” রাজনীতি।

বিচার যখন চোখের আড়ালে চলে যায়, তখন অন্যায়ও বুক ফুলিয়ে হাঁটে। কারণ তখন অপরাধী জানে, আদালতে নয়—বিচার হবে সেনানিবাসে। আর সেনানিবাসে আইন ঢোকে কেবল ‘পাস অনুমোদন’ নিয়ে।

কেউ কেউ বলে, “সেনাবাহিনীর নিজেদের আইন আছে।” হ্যাঁ, আছে। কিন্তু সেই আইন কি সংবিধানের চেয়ে বড়? সংবিধান যদি সেনা আইনের অধীন হয়, তাহলে জনগণের অধিকার যাবে কোথায়? দেশ তখন জনগণের নয়, হয়ে যাবে ব্যারাকের ফ্র্যাঞ্চাইজি।

ন্যায়বিচার মানে নিরপেক্ষতা, যেখানে পক্ষপাত বা ভয় থাকে না। সেনাবাহিনী নিজেরাই নিজেদের বিচার করলে সেটা নিরপেক্ষ নয়, সেটা আত্মপ্রেম। যেমন কেউ নিজের চাকরির মূল্যায়ন নিজেই লিখে দেয়, “আমার কাজ দারুণ, আমাকে পদোন্নতি দিন!”

আমরা সেনাবাহিনীকে সম্মান করি, কারণ তারা দেশের জন্য জীবন দেয়। কিন্তু সম্মান মানে অন্ধ আনুগত্য নয়। তারা রাষ্ট্রের অংশ, রাষ্ট্র নয়।

রাষ্ট্রের উপরে কেবল আইন, আর সেই আইন সবার জন্য সমান—সে সৈনিক হোক বা সাধারণ মানুষ। অপরাধ করলে শাস্তি হবে। কিন্তু সেই শাস্তি হতে হবে আইনের হাতে, বাহিনীর নয়।

আজ যদি দেশের মানুষ চুপ থাকে, প্রতিবাদ না করে, কাল হয়তো এই “সাময়িক কারাগার”ই স্থায়ী হবে। আজ যার ওপর প্রয়োগ হচ্ছে, কাল তার জায়গায় হয়তো আরেক সেনা অপরাধীকে জামাই আদরে রাখা হবে। তখন বলার কেউ থাকবে না, “আইন কোথায়?” কারণ আইন তখনও সেনানিবাসেই থাকবে—বন্দি হয়ে।

বিচার গোপনে হয় না, প্রকাশ্যে হয়। বন্দুক দিয়ে রাষ্ট্র রক্ষা হয়, কিন্তু ন্যায়বিচার রক্ষা হয় কলম ও আদালতের মাধ্যমে। তাই এখনই সময় বলা, সেনাবাহিনী আলাদা কারাগার বানাতে পারে না। অপরাধী সে সেনা হোক বা সাধারণ মানুষ হোক, তাকে পুলিশের হাতে দিতে হবে, আদালতের সামনে দাঁড় করাতে হবে।

কারণ একবার যদি রাষ্ট্রে দুই আইন চালু হয়, তখন তৃতীয় আইন আসতে সময় লাগে না আর সেটা হলো “যে বন্দুক যার আইন তার।” গণতান্ত্রিক দেশে তা তো হতে পারে না। যে দেশে বিচার বন্দি হয়, সেখানে মানুষ মুক্ত থাকে না—শুধু ভয়ই রাজত্ব করে।

তাহলে এবার বলুন, রাষ্ট্রে দুই আইন চললে একদিন আইনই পালাবে! সেনানিবাসে আলাদা কারাগার কি বৈধ? তাহলে প্রত্যক বাবা-মা তাদের অপরাধী সন্তানদের জন্য বাড়িতে নিজস্ব কারাগার বানাবে। সেটা কি বৈধ হবে?


বাংলাদেশে কি আবার সামরিক শাসন আসতে চলেছে?

Bd-army2025
বাংলাদেশ আর্মি

বাংলাদেশের সেনাবাহিনী এখন ভীষণ বেকায়দা অবস্থানে!  একদিকে  ঘর সামলাবে না বাহির সামলাবে!  আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে দোষী সাব্যস্ত হওয়া অন্যদিকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে যাওয়ার সুযোগ সীমিত হওয়া! 

একদিকে তাদের মি. ক্লিন ইমেজে কালিমা লিপ্ত হয়ে সাধারণ জনগণের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা হারানোর ভয়,  অন্যদিকে ইনকামের বিশাল একটা অংশ সীমিত হয়ে যাওয়া! আবার ভূ-রাজনৈতিক চক্করে পড়ে আম ছালা সবিই হারানোর শংকাও কম নয়!

অবশ্য বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর অতীত ইতিহাস খুব একটা গৌরবের তা বলা যাবে না!  বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে তাদের হাত বার বার রক্তে রঞ্জিত হয়েছে -স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিব,  জাতীয় নেতা থেকে জিয়াউর রহমান সহ রাষ্ট্রনায়কের রক্তে ,  দেশের শাসন ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে বার বার,  যার ধারাবাহিকতা এখনো চলমান- বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে! 

পার্বত্য এলাকার মাটি তাদের কারণেই বার বার রক্তে রঞ্জিত হয়েছে,  এখনো হচ্ছে!  কখনো সরাসরি,  কখনো ডিভাইড এন্ড রুলস পলিসির প্রয়োগ ঘটিয়ে, কখনো  বা তাদেরই প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পুণর্বাসিত সেটেলারদের মাধ্যমে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে যুগ যুগ ধরে এই রক্তের হোলি খেলা চালিয়ে যাচ্ছে,  পাশাপাশি সীমাহীন অর্থবিত্তের মালিক বনে যাচ্ছে!  যেহেতু বাংলাদেশের দুর্বল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে কোন নির্বাচিত সরকারই সামরিক বাহিনীর উপর কতৃত্ব করতে পারেনি বরং তাদেরকে তোয়াজ করেই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সম্ভাব্য সবকিছু করেছে! 

তারই ফলশ্রুতিতে সামরিক বাহিনী আজ আর দেশ রক্ষার বাহিনী নয়,  তারা দিনে দিনে কর্পোরেট বাহিনীতে পরিনত হয়েছে!  একদিকে কর্পোরেট ব্যবসা সম্প্রসারণে পূর্ণ মনোযোগ,  অন্যদিকে সরকারি প্রশাসনের উপর কতৃত্ব সবকিছু মিলিয়ে তাদের শৃঙ্খলা রক্ষা,  চেইন অব কমান্ড দিন দিন ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে! 

এটা আরো প্রকট হয় শেখ হাসিনার পতন আন্দোলনের সময়! শেখ হাসিনা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সামরিক বাহিনীর জন্য এমন কিছু বাকি রাখেননি, যা তারা চেয়েছে,  কিন্তু ক্রাইসিস মূহুর্তে তারা তাকে সেইফ এক্সিট ছাড়া আর কোন সহায়তা দেয়নি, শুধুমাত্র এই চেইন অব কমান্ডের দুর্বলতার কারণে!

আর এখন যখন তাদের আর একটা দুর্বলতা জনগণের কাছে উন্মোচিত হতে চলেছে,  তখন তারা দেশের বিদ্যমান আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজেদেরকে রক্ষা করার প্রয়াস চালাচ্ছে!  আইনের চোখে যারা অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছে,  গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করা হয়েছে, তাদেরকে রক্ষা করতে যাওয়া কোন সুশৃঙ্খল বাহিনীর কাজ নয়! আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে তাদের উচিত অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা!  তা না করে তাদেরকে হেফাজতে নিয়ে রাখা মানে তারা দেশের প্রতি,  দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়! 

বাস্তবতা হলো, অন্তরর্তী সরকার যেহেতু একটা নড়বড়ে সরকার, তাই তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা কোন ভাবেই সম্ভব হবে না!  সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো – তাদের স্বার্থে আঘাত লাগলে নির্বাসন বানচাল করে ক্ষমতা দখল নিবেনা তারই বা নিশ্চয়তা কি!

লেখকঅচেনা পাহাড়ি বুদ্ধিজীবী।

বিদ্রঃ পোস্টটি লিখেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামের এক বিশিষ্ট লেখক।তিনি তার নাম প্রকাশ করতে চান নি। তাই নাম রাখলাম “অচেনা পাহাড়ি বুদ্ধিজীবী।” কিন্তু ছবিটি আমি বানিয়েছি। তাই এই লেখার কৃতিত্ব এবং মতামত আমার নয় । এটা সম্পূর্ণ লেখকের কৃতিত্ব। এটি তার দ্বিতীয় আর্টিকেল।

কেউ এধরনের পোস্ট লিখতে চাইলে লিখতে পারেন। সুন্দর হলে আমি আমার ওয়েবসাইটে প্রকাশ করবো।

তোতাদের ভিড়েঃ পাহাড়ের মানুষ এখনো স্বপ্ন বুনে

তোতাপাখি
তোতাদের ভিড়েও পাহাড় স্বপ্ন বুনে

পাহাড়ের বাতাস এখন আর মুক্ত নয়। এখানে বাতাসও যেন অনুমতি নিয়ে বয়ে যায়, গাছেরা নীরব থাকে, আর পাখিরাও শেখে কখন কথা বলা যাবে, কখন যাবে না। পাহাড়ে যখন রাত নামে, তখন শুধু ঘাসে শিশির পড়ে না, মানুষের বুকেও জমে না বলা কথার হাজারো বোঝা।

কেউ চিৎকার করতে চায়, কিন্তু চারদিকের ইউনিফর্মের ছায়া গলা টিপে ধরে। ঠিক তখনই শহরের কোনো এক প্রান্তে ইউনিফর্ম পরা এক মুখ পরম তৃপ্তিতে টেলিভিশনের পর্দায় বলে ওঠে, “সব শান্তি।”

পাহাড়ের মানুষ তখন নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকে, যেন কেউ তাদের আত্মার শব্দ চুরি করে নিয়েছে। সেই মুখগুলোর মধ্যে কেউ পাহাড়ি—চোখে এখনো পূর্বপুরুষের রক্তের স্মৃতি, তবু কণ্ঠে শুধু সরকারের বুলি। তারা কথা বলে এমনভাবে, যেন এই পাহাড় তাদের নয়, যেন পাহাড় কেবল পোস্টিংয়ের জায়গা। তারা হাসে, সাজে, ক্যামেরার সামনে শেখা বাক্য বলে, “সব উন্নয়ন চলছে, পাহাড় শান্ত।”

কিন্তু পাহাড়ের মাটিতে তখনও কাদা মিশে আছে রক্তে, আর দূরের কোনো গ্রামে রাতভর জ্বলছে ঘর। এক পাহাড়ি নারীর চাঁপা কান্না মিলিয়ে যায় সৈন্যদের মার্চপাস্টের আওয়াজে।

আজকাল প্রমোশন এক ধরনের পুরস্কার নয়, বরং আত্মা বিক্রির বিনিময়ে পাওয়া ছাপোষা সান্ত্বনা। কেউ যখন বিবেকের কথা বলে, তখন তাকে বলা হয় অবাধ্য, আর যারা দালালি করে, তারা হয় “দেশপ্রেমিক।” এ এক অদ্ভুত সময় যেখানে লজ্জা পরিণত হয় পদকে, আর নীরবতা হয়ে ওঠে আনুগত্যের প্রমাণ।

পাহাড়ের আদিবাসীরা এইসব মুখ দেখে বোঝে, দাসত্বেরও আধুনিক রূপ আছে। বন্দুকধারীরা শুধু পাহাড়ে অবস্থান নেয় না; তারা এখন পাহাড়িদের মনের মধ্যেও ক্যাম্প বসিয়ে ফেলেছে। যে মুখ একসময় পাহাড়ের ভাষায় কথা বলত, এখন সেই মুখে অন্যের উচ্চারণ। তাদের চোখে ভয় নেই, কারণ বিবেক তো অনেক আগেই মরেছে।

পাহাড়ের মা যখন নিজের সন্তান হারায়, তার বুকের আর্তনাদ হয়ত টেলিভিশনে পৌঁছায় না, কিন্তু বাতাস জানে। পাহাড়ের শিশুরা যখন লুকিয়ে পড়ে কোনো ক্যাম্পের পাশে, তখন তারা ভাবে, “আমাদের অপরাধ কী?” অথচ অন্য প্রান্তে কেউ পোস্ট দেয়, “দেশে শান্তি ফিরেছে।” সেই শান্তির মানে হলো পাহাড়ের নীরবতা, আর নীরবতার মানে হলো ভয়।

তবু এই নীরবতার নিচে এখনো কেউ কেউ স্বপ্ন বুনে। তাদের স্বপ্নে পাহাড়ের আকাশ আবার নীল, সৈন্যদের ক্যাম্পের জায়গায় আবার বাচ্চাদের স্কুল, বন্দুকের শব্দের জায়গায় পাহাড়ি বাঁশির সুর। কেউ কেউ এখনো মনে মনে আঁকে, একটা সকাল, যেখানে কেউ আর ইউনিফর্ম পরে নয়, মুক্ত পায়ে হেঁটে যাবে ঝর্ণার পাশে। তারা বিশ্বাস করে, পাহাড়ের বুক থেকে মুছে যাওয়া অধিকার একদিন ফিরে আসবে।

এখন পাহাড়ের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অস্ত্র বন্দুক নয়, তোতাদের মুখ। গুলির শব্দে একবারে কেউ মারা যায়, কিন্তু এই তোতাদের মুখে প্রতিদিন মরছে পাহাড়ের স্মৃতি, ইতিহাস, আর প্রতিরোধের চেতনা। তাদের হাসি আর বক্তব্যে ঢাকা পড়ে সত্যের কবর।

তবু পাহাড় এখনো টিকে আছে, কারণ গাছেরা এখনো নত হতে শেখেনি। এই পাহাড়ের মাটিতে এমন কিছু মানুষ আছে, যারা এখনও ফিসফিস করে বলে, “আমরা ভয় পাই না।”

তারা জানে, একদিন এই পাহাড় আবার জেগে উঠবে। তখন যারা এখনো স্বপ্ন বুনে অন্ধকারে, তাদের হাত ধরেই আলো নামবে পাহাড়ে। তোতাপাখি এবং দালালেরা তখন ইতিহাসের ধুলোয় চাপা পড়বে।


পাক-আফগান যুদ্ধ: বাংলার মৌলবাদীদের নির্বাচিত মানবতা

বাংলাদেশ-মানবতা
বাংলাদেশের মানবতা

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্তে এখন তীব্র সংঘর্ষ চলছে। আকাশে যুদ্ধবিমান, মাটিতে ধোঁয়া, সীমান্তজুড়ে গোলাগুলির শব্দ। পাকিস্তান দাবি করছে তারা সন্ত্রাসী ঘাঁটি লক্ষ্য করে অভিযান চালাচ্ছে, আর আফগানিস্তান বলছে এটি তাদের সার্বভৌমত্বে আঘাত। আসল সত্য হলো, এটি কোনো হঠাৎ শুরু হওয়া যুদ্ধ নয়; এর শিকড় আছে দীর্ঘদিনের উত্তেজনায়। দ্যুরান্ড লাইন নিয়ে সীমান্ত বিরোধ, সীমান্ত পেরিয়ে আসা সশস্ত্র গোষ্ঠী, এবং একে অপরকে “শত্রু আশ্রয়দাতা” বলে দোষারোপ করা—এসব মিলেই এই নতুন সংঘাতের আগুন জ্বালিয়েছে।

পাকিস্তানের প্রথম হামলার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়, যেখানে তারা দাবি করে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের (TTP) বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। আফগানিস্তান সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানায় এবং সীমান্তের একাধিক পোস্টে পাল্টা আক্রমণ চালায়। এখন দুই দেশের মধ্যে চলছে টানা পাল্টা হামলা, যার মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ—যারা কারও শত্রু নয়, কেবল দুর্ভাগ্যজনক ভূগোলের বাসিন্দা।

এই ভয়াবহ সংঘর্ষে যে বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট, তা হলো মুসলমানের হাতে মুসলমানের রক্ত। আর সেই দৃশ্য যখন টিভির পর্দায় ভেসে ওঠে, তখন ঢাকায়, চট্টগ্রামে বা সিলেটে কোনো মিছিল বের হয় না, কোনো মাইকে স্লোগান ওঠে না, কোনো মৌলবাদী নেতা বুক চাপড়ে কাঁদে না। অথচ গাজায় যদি হামাস সন্ত্রাসীদের ওপর ইসরাইলি বোমা পড়ে, এই একই লোকেরা রাত জেগে রাস্তায় নামে, সোশ্যাল মিডিয়ায় আগুন ধরিয়ে দেয়, মসজিদের সামনে চেঁচিয়ে দেশ জুড়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে।

তখন প্রশ্নটা খুব সহজ, গাজায় মুসলমান মরলে তারা চেঁচায়, কিন্তু পাকিস্তান-আফগান সীমান্তে মুসলমান মরলে তারা চুপ কেন?

এই নীরবতা কেবল দুর্বলতা নয়, এটি একধরনের রাজনৈতিক কূট-বুদ্ধি। কারণ গাজার নাম উচ্চারণ করা নিরাপদ। ওখানে শত্রু স্পষ্ট, স্লোগান সহজ, আর জনতার আবেগ ব্যবহারযোগ্য। কিন্তু পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের যুদ্ধ জটিল। দুই পক্ষই মুসলমান, দুই পক্ষই আল্লাহর নাম নেয়, দুই পক্ষই নিজেদের ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করতে চায়। এখানে এক পক্ষকে সমর্থন মানে অন্য পক্ষকে অস্বীকার করা, আর সেই অস্বীকারের ঝুঁকি তারা নিতে চায় না।

তাই যারা ধর্মের নামে ‘উম্মাহ’র ঐক্যের কথা বলে, তারা এখন নীরবতার তাঁবুর ভেতরেই আশ্রয় নিয়েছে। তাদের ঈমান যেন সিলেক্টিভ মোডে চলে—যেখানে গাজায় মানবতা আছে, কিন্তু পাক-আফগান সীমান্তে সাধারণ মুসলিমদের জন্য নেই।

মৌলবাদীরা যেভাবে নিজের সুবিধামতো আবেগ বেছে নেয়, তাতে বোঝা যায় ধর্ম এখন তাদের কাছে বিশ্বাস নয়, এক লাভজনক ব্যবসা। গাজায় আগুন লাগলে তারা ঘুমেও চেঁচিয়ে ওঠে, কারণ সেখানে ক্যামেরা আছে, জনসমর্থন আছে, রাজনৈতিক মঞ্চ আছে। কিন্তু পাকিস্তান-আফগান সীমান্তে ক্যামেরা নেই, বক্তৃতার সুযোগ নেই, তাই সেখানে তারা নীরব থাকে। এই নীরবতাই তাদের আসল মুখ। কারণ তারা সত্যের পক্ষে নয়, তারা শত্রু বাছাই করে নেয়; আর সেই নির্বাচিত শত্রুতার মাধ্যমে নিজেদের ধার্মিকতা প্রমাণ করে।

একই দেশে বাস করা শত বছর ধরে নিপীড়িত পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী কিংবা দেশের অন্য প্রান্তে অমুসলিমদের ওপর চলা নিপীড়নের ক্ষেত্রেও এই মৌলবাদীদের মানবতা একইভাবে ঘুমিয়ে থাকে। পাহাড়ে যদি কোনো আদিবাসী নারী ধর্ষিত হয় বা কোনো গির্জা বা মন্দির পুড়ে যায়, তখন এই ধর্মব্যবসায়ীরা বলে, “ওরা তো মুসলমান নয়।” অর্থাৎ, তাদের মানবতা ধর্মীয় শর্তসাপেক্ষ। এই নির্বাচিত মানবতাই এখন রাষ্ট্রের নৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রতিচ্ছবি।

কোনো এক মাওলানা এখনো হয়তো ফেসবুকে গাজার শিশুর ছবি পোস্ট করে লিখছেন, “আমরা নীরব নই।” কিন্তু প্রশ্ন হলো, যখন মুসলমানের নিষ্পাপ বাচ্চারা পাক–আফগান সীমান্তে মরছে, তখন সেই নীরবতাই কি আসলে অপরাধ নয়? গাজার কান্না যদি পবিত্র হয়, তাহলে পাহাড়ের কান্না কি অপবিত্র?

মৌলবাদীরা এখনো বুঝতে শেখেনি, “মানবতার কোনো ধর্ম নেই।” তাদের ঈমানের ব্যাটারি কেবল তখনই চার্জ নেয়, যখন প্রতিপক্ষের নাম হয় ‘ইহুদি’। কিন্তু ‘চাকমা’, ‘হিন্দু’ কিংবা ‘আফগান’ শব্দটি শুনলেই সেই মানবতা কানে তুলো দেয়, কারণ সেখানে প্রতিবাদে কোনো রাজনৈতিক লাভ নেই, কোনো আন্তর্জাতিক তালি নেই। এখন ‘আফগান’ আর ‘পাকিস্তানি’ মুসলমান মরে যাচ্ছে, তবু বাংলাদেশের মৌলবাদী বিবেক নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে।

কারণ, এখানে উভয়েই মুসলমান, কাউকে দোষ দিলে নিজেদের নাকই কেটে যাবে। তাই তারা চুপ থাকে। এই চুপ থাকাটাই এখন বাংলাদেশের মৌলবাদীদের নতুন ফতোয়া, “যেখানে বিধর্মী নেই, সেখানে মানবতা নয়।” এই হচ্ছে বাংলাদেশের মৌলবাদীদের দ্বিমুখী নীতি। চমৎকার!

এই সময়ের সবচেয়ে বড় ব্যঙ্গ হচ্ছে, যারা নিজেদের ‘উম্মাহ’র প্রতিনিধি বলে দাবি করে, তারা এখন নিজেদের মুসলমান প্রতিবেশীর প্রতিও নির্দয়। ধর্মের নামে যাদের এত আওয়াজ, তাদের বিবেক এখন নিঃশব্দ মোডে। একসময় তারা বলত, “রক্তপাত ইসলামে হারাম।” আজ তারা বলে, “এই যুদ্ধ আমাদের নয়।” এই নির্বাচিত মানবতাই মৌলবাদীদের সর্বশেষ মুখোশ। তারা কান্নার বিষয়ও রাজনীতির ছাঁকনিতে ছেঁকে নেয়।

আমি শেষ করতে চাই না। বাংলাদেশের মৌলবাদীদের নিয়ে আরও অনেক বলার আছে। তবু শেষ করতে হবে। তাই যারা এই লম্বা পোস্ট পড়েন নি তাদের জন্য এখানে সংক্ষেপ করছি -গাজায় চেঁচানো সহজ, কারণ সেখানে ক্যামেরা আছে। কিন্তু সীমান্তে বা পাহাড়ে রক্তে কোনো ক্যামেরা নেই। তাই তারা চুপ। এই চুপ থাকা শুধু কাপুরুষতা নয়, এটাই তাদের আসল রাজনীতি—যেখানে ধর্ম এক প্রোডাক্ট, মানবতা এক স্লোগান, আর নীরবতা এক নিরাপত্তা-কৌশল। আজকের মৌলবাদী এটাই: গাজায় চিল্লানি দেয়, সীমান্তে কানে তুলো দেয়, আর পাহাড়ের কান্না শুনলে মিউট বোতাম টিপে দেয় আর সেটাই এখন বাংলাদেশের মানবতা।


হেফাজতের নামে হেফাজতবাদ শেষ হবে

sena-bangladesh
হেফাজতের নামে হেফাজতবাদ শেষ হবে

বাংলাদেশে এখন নতুন এক ধরনের দেশপ্রেম জন্ম নিয়েছে যে দেশপ্রেম আদালতকে ভয় পায়।কিন্তু বন্দুককে ভালোবাসে। সংবিধান বলে সবাই আইনের অধীন।কিন্তু সেনাবাহিনী এখন সেই আইনকেই নিজের অধীন বানিয়ে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চার্জশিট দিয়েছে। কিন্তু সেনাবাহিনী হেফাজত দিয়েছে। এই এক অদ্ভুত দেশ, যেখানে অপরাধীকে গ্রেফতার করার পরিবর্তে সম্মান দেওয়া হয় আর বিচারককে বলা হয় “অতিরিক্ত উৎসাহী”।

১১ অক্টোবর সেনানিবাসে যখন মেজর জেনারেল হাকিমুজ্জামান ঘোষণা দিলেন, “পঁচিশজনের মধ্যে পনেরজন আমাদের হেফাজতে”—তখন তাঁর মুখের গর্বই বলে দিচ্ছিল, তারা রাষ্ট্র নয়, রাষ্ট্রের ওপরে। এই “হেফাজত” যেন একধরনের নিরাপদ আশ্রয়, যেখানে আইনের কোনো অনুমতি লাগে না, কেবল পদবী লাগে। যেন আদালত নয়, সামরিক ব্যারাকই এখন নতুন বিচারালয়।

মজার বিষয়, এই হেফাজত এখন আর কারাগার নয়, এটা একধরনের ক্লাব যেখানে ন্যায়বিচারকে অতিথি করে রাখা হয়, কিন্তু কখনো ঢুকতে দেওয়া হয় না।

১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির কাগজ এখনো ধুলো জমে পড়ে আছে, কিন্তু পাহাড়ে সেনা ক্যাম্প আজও টলটলে নতুন। চুক্তি বদলায় না, কেবল রঙ বদলায় সবুজ পাহাড় এখন খাকি রঙে ঢেকে গেছে। দুই দশকের বেশি সময় কেটে গেছে, কিন্তু সেই বন্দুক এখনো শিখিয়ে দেয় কে মানুষ আর কে শত্রু। যখন পাহাড়ে একজন নারী ধর্ষিত হয়, তখন তাকে বলা হয় “দুঃখজনক ঘটনা”, কিন্তু যখন একজন অফিসারের নাম চার্জশিটে আসে, তখন বলা হয় “আমরা হেফাজতে রেখেছি।” আহা, কী সুন্দর মানবিকতা!

এই দেশের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা এখন সেনা হেফাজত। সেখানে বিচার ঢোকে না, কেবল সংবাদ সম্মেলন ঢোকে। সেই সংবাদে থাকে পরিস্কার ভাষা, “আমরা সহযোগিতা করছি।” সহযোগিতা মানে কী? সহযোগিতা মানে সময় কিনে নেওয়া, প্রমাণ মুছে ফেলা, এবং জনগণকে বিভ্রান্ত রাখার এক ধরনের শিল্প। সেনাবাহিনী এই শিল্পে সিদ্ধহস্ত। তারা জানে কীভাবে দেশপ্রেমকে ঢাল বানিয়ে সত্যকে গুলি করতে হয়।

রাষ্ট্রের তিন স্তম্ভ—বিচার, প্রশাসন, আইনসভা—সব এখন একের পর এক চেয়ারে বসে হাততালি দিচ্ছে। কারণ যে বাহিনী কখনো ক্ষমতা থেকে দূরে থাকে না, তার সামনে সবাই নতজানু। আদালত আজ দাঁড়ায় সেনা অনুমতির অপেক্ষায়, সাংবাদিক দাঁড়ায় সেনা অনুমতির ভয় নিয়ে, আর জনগণ দাঁড়ায় আদালতের বাইরে—হাতে একটা পোস্টার: “ন্যায় চাই।” কিন্তু ন্যায় এখন ব্যারাকে, চা খাচ্ছে।

দেশপ্রেমের নামে যে ভয় তৈরি হয়েছে, সেটা এখন ধর্মের মতো পবিত্র। সেনা মানে নিরাপত্তা, সেনা মানে সাহস—এই কথাগুলো বারবার বলা হয় যেন মানুষ ভুলে যায়, সেনা মানে কখনও কখনও অবিচারও। জনগণ যদি প্রশ্ন করে, তাকে বলা হয় ষড়যন্ত্রকারী। যদি প্রতিবাদ করে, তাকে বলা হয় রাষ্ট্রদ্রোহী। কিন্তু যারা হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত, তারা নাকি দেশপ্রেমিক! এ যেন এক উল্টো পৃথিবী, যেখানে সত্য লজ্জায় মুখ ঢাকে, আর ক্ষমতা বক্তৃতা দেয়।

এই দেশকে পাহারা দেওয়ার নামে সেনাবাহিনী আজ নিজেরাই দেশের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। কারণ যে বাহিনী নিজেকে আইন মানার বাইরে ভাবতে শুরু করে, সে বাহিনী কেবল সীমান্তে নয়—রাষ্ট্রের বিবেকেও দখল বসায়। তারা জনগণকে শেখায় ভয়, আর ভয় শেখায় নীরবতা। কিন্তু নীরব মানুষ কখনো নিরাপদ নয় বরং তারা কেবল মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকে।

আজ বাংলাদেশের মানুষ জানে, ন্যায়বিচার গুলির চেয়ে দুর্বল। কিন্তু ইতিহাসে গুলি নয়, বিচারই টিকে থাকে। যারা মনে করছে সেনা হেফাজত মানে নিরাপত্তা, তারা ভুলে গেছে যে আদালতের সামনে একদিন সবাইকে দাঁড়াতে হয়, ইউনিফর্মসহ। সেই দিন যতই বিলম্বিত হোক, আসবেই।

আইনের উপরে কেউ নয়, এমনকি ইউনিফর্মও নয়। কিন্তু বাংলাদেশে এখন মনে হয় ইউনিফর্মের ছায়াই সবচেয়ে ঘন, যেখানে আলো পৌঁছায় না। তবু কেউ একজন কোথাও লিখে রাখছে, “হেফাজতের নামে হেফাজতবাদ শেষ হবে।” কারণ ন্যায়বিচারের কোনো র‍্যাঙ্ক লাগে না—তার শুধু সাহস লাগে।


আমি আদিবাসী, তুমি সেটলার

আমি আদিবাসী, তুমি সেটলার
আমি আদিবাসী, তুমি সেটলার

গতকাল টোকিয়োতে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে আদিবাসী জুম্মদের একটি সমাবেশ ছিল। সেকথা সবাই আপনারা জেনে গেছেন। অনেকে ছবি, ক্লিপ এবং ছবি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেছেন।

সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের সেটলারদের জন্য আমার একটি মেসেজ ছিল। মেসেজটি আমি রেকর্ড করতে পারিনি। তাই পোস্ট করতে পারিনি। কিন্তু কী বলেছি তা সংক্ষেপে লিখছি।

“আমি আজ টোকিয়োতে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছি। আমি জাপানের রাজধানী টোকিয়োতে থাকি। আমি জাপানি নই। আমি বাংলাদেশি। আমি যদি বলি আমি জাপানি তাহলে আমি মিথ্যা বলি। কারণ আমার একটি ইতিহাস আছে। মানুষ জানে আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি।

একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে যেসমস্ত সেটলার সমতল থেকে এসেছে তারা যে ভাষায় কথা বলুক না কেন, জাপানি, চাকমা, মারমা বা ইংরেজি বা ফারসি তারা সেটলার। কারণ তারা সমতল থেকে পাহাড়ে সেটলার হিসেবে এসেছে।

তাদের যদি কেউ দাবী করে বলে, আমি পাহাড়ে জন্মগ্রহণ করেছি, তাই আমি আদিবাসী। তাহলেও সে সেটলার যদি সে সেটলারের সন্তান হয়। মানে সোজা কথায়, তোমার দাদু যদি সেটলার হয়ে পাহাড়ে আসে বা তোমার বাবা বা মা সেটলার হয়ে পাহাড়ে আসে, তুমি সেটলার। তোমার পাহাড়ে জন্ম তোমার পরিচয় বদলাতে পারে না।

তুমি যতই নিজেকে আদিবাসী বলে দাবি কর, বিশ্ব তোমাকে সেটলার বলে চিনবে। কাজেই তোমার পরিচয় হবে সেটলার। সেটলার ছাড়া অন্য নাম তোমার জন্য উপযুক্ত আর কোনো নাম নেই।

সেই সূত্রে আমরা তোমাদের শতবার, হাজারো বার এবং সারাজীবন সেটলার নামে ডাকবো। আর আমরা এখানে জন্মেছি, আমাদের বাবারা এখানে জন্মেছেন, আমাদের দাদুরা এবং পূর্বপুরুষেরা এখানে জন্মেছেন। তাছাড়াও আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা অনুসারে আমরাও পাহাড়ের আদিবাসী।

তোমরা সেটলার নাম মুছে ফেলতে চাইলে সমতলে চলে যাও এবং আদিবাসী জুম্মদের তাদের জায়গা ফিরিয়ে দাও।তখন আর তোমাদের আমরা সেটলার ডাকবো না।”


মাইকেল চাকমা কি সত্যিই জেলে?

মাইকেল কি জেলে?
মাইকেল কি জেলে?

বাংলাদেশের মিডিয়া এবং সামাজিক মাধ্যমে গতকাল হঠাৎ আলোচনায় উঠে আসে—“ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমাকে ৮ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।” অনেকে ভেবে নিয়েছে, রায় ঘোষণার সময় তিনি আদালতে ছিলেন, এবং সাথে সাথেই কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

কিন্তু আসলে সত্যিটা পুরোপুরি ভিন্ন। গতকাল সমাবেশ থেকে ফিরে আমি বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে অনুসন্ধান করেছি। সেই খোঁজ থেকেই এই লেখা—যাতে আমার পাঠকেরা সঠিক তথ্যটি জানতে পারেন। আমি আইনজীবী নই, তাই বিষয়টি একেবারেই আমার নিজের বোঝাপড়া ও বিশ্লেষণ থেকে তুলে ধরছি।

রায় হয়েছে, কিন্তু তিনি উপস্থিত ছিলেন না

প্রথম আলো ইংরেজি সংস্করণ, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, এবং ধাকাস্ট্রিমসহ একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে,
রায় ঘোষণার সময় মাইকেল চাকমা আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। তিনি বা তাঁর সহ-আসামি সুমন চাকমা কেউই রাঙ্গামাটির আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।

আদালতের ভাষায় এটি ছিল “in absentia conviction”, অর্থাৎ অনুপস্থিত অবস্থায় রায় ঘোষণা।

রাঙ্গামাটির অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ত্বহিদুল হক এই রায় দেন। ২০০৭ সালের ৩০ অক্টোবরের একটি পুরোনো চাঁদাবাজি মামলায় যেখানে অভিযোগ ছিল, মাইকেল ও তার সহযোগী নাকি এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা আদায়ের চেষ্টা করেছিলেন।

‘In Absentia’ মানে কী?

‘In absentia conviction’ মানে, আসামি আদালতে না থাকলেও বিচারক রায় ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৩৯(বি) ধারায় এর সুযোগ রয়েছে যদি আদালত মনে করে আসামি বারবার সমন উপেক্ষা করেছেন বা পলাতক।

তবে এর মানে এই নয় যে তিনি এখন জেলে আছেন। বরং, আদালতের রায় কার্যকর হবে তখনই, যখন তাকে গ্রেপ্তার করা হবে অথবা তিনি আত্মসমর্পণ করবেন।

অর্থাৎ, এখন মাইকেল চাকমার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হতে পারে। কিন্তু তিনি এই মুহূর্তে কারাগারে নেই।

কেন এই বিভ্রান্তি?

রায়ের খবরটি যেভাবে ছড়িয়েছে, তাতে অনেকেই headlines দেখে ধরে নিয়েছেন, “তিনি ধরা পড়েছেন, আদালতে ছিলেন, এবং রায় শুনেই জেলে গেছেন।” কিন্তু প্রথম আলোর অফিসিয়াল রিপোর্টে স্পষ্ট বলা আছে:

“The verdict was delivered in absence of the accused — Michael Chakma and Suman Chakma.”

অর্থাৎ, তাঁরা ছিলেনই না। এটা একটি পুরোনো মামলা, এবং সম্ভবত রাজনৈতিকভাবে পুনরায় সক্রিয় করা হয়েছে।

রায়ের পেছনে রাজনৈতিক বাস্তবতা:

মাইকেল চাকমা দীর্ঘ সময় “আয়না ঘর” নামে পরিচিত গোপন কারাগারে নিখোঁজ ছিলেন। ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তিনি মুক্তি পান। এরপর থেকে তিনি নীরব, প্রকাশ্যে কোনো তৎপরতা করেননি। কিন্তু নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার কথা শুনা গেছে।

ঠিক সেই সময়ে, যখন দেশের রাজনীতিতে আবার পাহাড় ও আদিবাসী সংখ্যালঘু প্রশ্ন আলোচনায় এসেছে। হঠাৎ তাঁর পুরোনো মামলার রায় ঘোষণা করা হলো এবং তা অনুপস্থিত অবস্থায়।

এটা কি কাকতালীয়?

না কি একটি রাজনৈতিক বার্তা, “তুমি যত নীরব থাকো, আমরা ভুলে যাইনি”? বা নির্বাচনে দর কষাকষি নিয়ে সেনাদের সাথে মিল হয় নি? নাকি সেনাদের মাঝে যে দুভাবে বিভক্তি দেখা যাচ্ছে সেই সুযোগে ওই আলোচিত তার দলের পাঁচ নেতা থেকে দুই মাইনাস করার ফরমুলা কার্যকর হচ্ছে?

তাহলে অপরজন জন কে?

শেষ করবো?

আজ যারা ভেবেছেন, “মাইকেল চাকমা জেলে গেছেন।”

উত্তর হচ্ছে “না”, তিনি এখনো জেলে নন বরং রায় ঘোষণার সময় অনুপস্থিত ছিলেন।

এই রায় মূলত একটি ‘in absentia conviction’, যার আইনি অর্থ: রাষ্ট্র একতরফাভাবে রায় ঘোষণা করেছে আর আসামি ধরা পড়লে বা আত্মসমর্পণ করলে সেই সাজা কার্যকর হবে।

অর্থাৎ, মাইকেল এখন হয়তো মুক্ত বাতাসে আছেন কিন্তু তাঁর মাথার ওপর ঝুলছে এক অদৃশ্য পরোয়ানা যেটা রাষ্ট্রের ইঙ্গিতবাহী: “তুমি পাহাড়ের মানুষ, আর আমরা আইনের পাহাড়।তুমি আজ জীবিত কিন্তু আগামীকাল জেলে কিংবা লাশঘরে যদি কথা না শুনো।”


বিচার না বার্তা? মাইকেল চাকমার রায় কি নতুন আপসের ইঙ্গিত?

মাইকেল-চাকমা
মাইকেল-চাকমা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে যাদের নাম একসময় নিষিদ্ধ উচ্চারণের মতো ছিল, আজ সেই চারজনের নাম আবার উঠে এসেছে — গোলাম আজমের ছেলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আজমী, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী, মীর কাসেম আলীর ছেলে ব্যারিস্টার আরমান (মীর আহমেদ বিন কাসেম) এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি নেতা মাইকেল চাকমা।

চারজনের চারটি গল্প আলাদা, কিন্তু তাদের এক সূত্রে বেঁধে রাখে একটি অভিজ্ঞতা—রাষ্ট্রীয় গুম, বন্দিত্ব ও অদৃশ্য ক্ষমতার ছায়া।

আজ যখন মাইকেল চাকমা আবারও একটি পুরোনো মামলায় রাঙামাটির আদালত থেকে ৮ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন, তখন প্রশ্ন জেগেছে—এই মানুষটি কি সত্যিই অপরাধী, নাকি রাজনীতির খেলায় “মাঝখানে পড়ে যাওয়া” এক বলি?

গুম থেকে আদালত পর্যন্ত এক রাজনৈতিক নাটক:

২০১৯ সালে হঠাৎ নিখোঁজ হওয়া মাইকেল চাকমা সেই সময় “ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (UPDF)”-এর অন্যতম সংগঠক ছিলেন। তার গুমের অভিযোগের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল কুখ্যাত “আয়না ঘর” কারাগারের নাম। দীর্ঘ সময় পর ২০২৪ সালের অগাস্টে গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তিনি ফিরে এসে বলেছিলেন, “আমাকে সাদা পোশাকে তুলে নিয়ে অন্ধকারে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। শুনেছি বাইরে অনেকে মরছে, কিন্তু ভিতরে আমরা তখনও জীবিত লাশ।”

এই সাক্ষ্য কেবল একজন নেতার নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের নীরব আর্কাইভ। কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেই মানুষটি আজ আবার আদালতে অভিযুক্ত—একটি ২০০৭ সালের চাঁদাবাজির মামলায়, যেখানে তিনি নাকি এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা আদায়ের চেষ্টা করেছিলেন।

প্রশ্ন হলো—১৭ বছর পর কেন এই মামলার রায়? এখন কেনই বা এই সাজা?

চারজনের সমান্তরাল ইতিহাস:

আজমী, হুম্মাম, আরমান এবং মাইকেল—এই চারজনের জীবনরেখা আলাদা হলেও রাষ্ট্রীয় আচরণের ধরন প্রায় একই।

  • আজমী ছিলেন সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার, কিন্তু গোলাম আজমের পুত্র হওয়ার অপরাধে আট বছর গুম থেকে ফিরে এলেন।
  • হুম্মাম কাদের চৌধুরী আদালত থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ, পরে ফিরে এসে বললেন—“বাবার রায় ট্রাইব্যুনালে লেখা হয়নি, লেখা হয়েছিল মন্ত্রণালয়ে।”
  • মীর আহমেদ বিন কাসেম (আরমান) তার বাবার মৃত্যুদণ্ডের পর নিখোঁজ, পরে একইভাবে ফিরে এলেন।
  • আর পাহাড়ের মাইকেল চাকমা—একজন ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ—যার অপরাধ হয়তো তার অস্তিত্বই।

এই চারজনই একসময় “মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল”কে প্রশ্ন করেছিলেন, এবং অনেকেই মনে করেন তারা শেষ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালত বা মানবাধিকার কমিশনে আইনি পদক্ষেপ নিতে চেয়েছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে তাদের গুম, মামলা ও নিগ্রহ কাকতালীয় বলে মনে হয় না।

তাহলে মাইকেল চাকমা কি সেনাবাহিনীর সঙ্গে আপস করেছেন?

প্রশ্নটি রাজনৈতিক এবং জটিল। কারণ, পাহাড়ে সেনাবাহিনী কেবল নিরাপত্তা বাহিনী নয়, বরং একটি অদৃশ্য প্রশাসন—যাদের উপস্থিতিতে শান্তিচুক্তিও আজ ভঙ্গুর।

মাইকেল চাকমা একদিকে সেই সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, আবার অন্যদিকে আদালতে হাজির হয়েছেন, নির্বাচনের সময় নীরব থেকেছেন, এমনকি কিছু সভায় অংশও নিয়েছেন—যা অনেকের চোখে “আপস”।

তবে বাস্তবতা হলো, আপস” এবং “বেঁচে থাকা”—বাংলাদেশে প্রায়ই একই জিনিস। যে দেশে গুম হওয়া মানুষ ফিরে আসে শুধুমাত্র রাজনৈতিক পালাবদলের পর, সেখানে আদালতের মুখোমুখি দাঁড়ানোই হয়তো একধরনের প্রতিরোধ।

মাঝখানে পড়া নাকি পরিকল্পিত বিচ্ছিন্নতা:

মাইকেল চাকমা হয়তো সত্যিই “মাঝখানে পড়ে” গেছেন—একদিকে রাষ্ট্র, অন্যদিকে নিজের দল। পাহাড়ের রাজনীতি এখন বিভক্ত: একাংশ ইউপিডিএফ, আরেকাংশ পার্বত্য চুক্তিপন্থী জনসংহতি সমিতি, আর মাঝখানে রয়েছেন সাধারণ পাহাড়িরা।

সেনাবাহিনী যেভাবে এসব বিভক্তিকে কাজে লাগায়, তাতে মনে হয় “মাইকেল” নামটি আসলে এক রাজনৈতিক উদাহরণ—যাকে দমনও করা যায়, আবার প্রয়োজনমতো ব্যবহারও করা যায়।কাজ শেষ হয়ে গেলে বন্দি করে রাখা যায় বা ক্রসফায়ার দেওয়া যায়।

আমার শেষ কথা:

আমার শেষ কথা হয়তো নির্মম শোনাবে। কিন্তু বাস্তব। মাইকেল বাবু আমার কেউন নন। কিন্তু তিনি আমার পাহাড়ের ভাই। অনেক কিছুর মধ্যে আমার সাথে অমিল থাকতে পারে কিন্তু হাজারো বিষয় মিল আছে।

হ্যাঁ, বাংলাদেশে রাষ্ট্র যখন “অপরাধ” ও “রাজনীতি”র সীমারেখা নিজেই মুছে ফেলে, তখন বিচার আর ন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য থাকে শুধু কাগজে। আজ মাইকেল চাকমা হয়তো বাইরে আগামীকাল হয়তো কারাগারে কিংবা পলাতক আসামী কিংবা ক্রসফায়ারে মৃত একটি লাশ, কিন্তু প্রশ্নটা পাহাড়ের বাতাসে রয়ে গেছে, তিনি কি অপরাধী, না কি রাষ্ট্রের চোখে অদৃশ্য হওয়া এক প্রতীক?

যদি তিনি সত্যিই আপস করেন, তবুও সেটা হয়তো নিজের বাঁচার জন্য; আর যদি তিনি মাঝখানে পড়েন, তবে সেই মাঝখানটাই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অন্ধকারতম অঞ্চল—যেখানে আইন, বিচার আর জাতিগত সত্য একে অপরের শত্রু হয়ে আছে।

কিন্তু পরিশেষে পাহাড়ের একটি দ্বীপ নিভে দেওয়া। তাই সরকারের পোষা কারখানায় যেন কোন পাহাড়ের দ্বীপ জন্ম না নেয়। আমাদের প্রত্যকের এই পরিণতি আগেভাবে ভাবতে হবে।


তোমরা শান্তিচুক্তি বাতিল করে দেখাও

শান্তিচুক্তি বাতিল
(টোকিয়ো পররাষ্ট্র সামনে চলছে আদিবাসীদের সমাবেশ)

টোকিওর রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই ব্যানারটি কেবল শব্দ নয় — এটি একটি দাবি, একটি ঘোর দৃষ্টি ও নিঃশব্দ প্রতিবাদ। পাহাড়ের যে মানুষগুলো তাদের জন্মভূমিতে কথা বলার অধিকার হারিয়েছে, তারাই আজ জাপানের রাজধানীর হৃদয়ে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছে, আমরা আর চুপ করে থাকবো না।

পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ দেশগুলোর একটি শহর, টোকিও — যেখানে শান্তি প্রতিদিনের অভ্যাস। আর ঠিক সেই শহরের নিস্তব্ধ রাস্তায় আজ প্রতিধ্বনিত হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের আর্তনাদ, জুম্ম জাতি মানুষের ঘোষণা, “STOP STATE-SPONSORED ATTACK ON INDIGENOUS JUMMA PEOPLES IN CHT.”

বিদেশের আলোয় যারা বাস করছে, তারা আজও পাহাড়ের আঁধার ভুলে যায়নি। টোকিওর ট্রেনের শব্দ, গাড়ির হর্ণ, আকাশছোঁয়া দালানের মাঝে তাদের চোখে এখনো জ্বলছে জ্বালিয়ে দেওয়া গ্রামগুলোর আগুন। তারা জানে, পাহাড়ের মাটি থেকে যদি কণ্ঠরোধ করা হয়, তবে সেই কণ্ঠ অন্য কোনো শহর থেকে জেগে উঠবেই। আজ সেই কণ্ঠ জেগেছে টোকিওতে, বিশ্বের অন্যতম কূটনৈতিক কেন্দ্রের সামনে।

সেখানে বলা হয়েছে স্পষ্ট ভাষায়, “তোমরা শান্তিচুক্তি বাতিল করে দেখাও, আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বাধীনতা ঘোষণা দিতে পারি কিনা।”

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা যেন এক অনন্ত নিপীড়নের ইতিহাসে বন্দি হয়ে আছে। পাকিস্তান আমলে শুরু হওয়া বৈষম্য স্বাধীন বাংলাদেশের অর্ধশতকেও শেষ হয়নি; বরং নতুন রূপে ফিরে এসেছে। ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি পাহাড়ে একটুখানি আশার আলো জ্বালিয়েছিল, কিন্তু তিন দশক পরও সেই আলো বাস্তব হয়নি। চুক্তিটি সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুলিয়ে রেখেছে—যেন শান্তির নামে আরেকটি প্রতারণা।

এটি কোনো হুমকি নয়, এটি একটি জাতির আত্মরক্ষার অধিকার। প্রায় আট দশকের নিপীড়ন আর তিন দশকের ভঙ্গ প্রতিশ্রুতির পর পাহাড়ের মানুষ আজও দাঁড়িয়ে আছে ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষায়। বাংলাদেশ সরকার, সেনাবাহিনী এবং সেটলার গোষ্ঠী মিলেই শান্তিচুক্তির প্রতিটি ধারা লঙ্ঘন করেছে। অথচ পাহাড়ের মানুষ কখনো সংঘাত চায়নি; তারা শুধু চেয়েছে ন্যায্য অধিকার, সম্মান, এবং শান্তিতে বাঁচার নিশ্চয়তা।

আমরা যারা পাহাড়ের সন্তান, আমরা বলতে চাই, আমাদের ঘর পুড়েছে, আমাদের মায়ের কান্না থামেনি, আমাদের শিশুরা ভয় শেখে ভাষার আগেই। এই ভয় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি রাষ্ট্রের তৈরি ভয়ের রাজনীতি। আর আজ টোকিও থেকে আমরা বলেছি — এই ভয় আমরা মানি না, এই নীরবতা আমরা আর মানবো না।

আজকের সমাবেশে সেই ব্যানারেই লেখা ছিল, “We demand withdrawal of military forces, removal of illegal settlers, justice for the gang-raped 12-year-old Jumma schoolgirl, indigenous youths killed by army gunfire, burning down of Jumma houses and Rangamati massacres, with implementation of the 1997 CHT Peace Accord. Urgently need global solidarity and international intervention to save CHT’s indigenous peoples!”

এই বাক্যগুলো শুধু প্রতিবাদের নয়; এগুলো মানবতার পরীক্ষা। কারণ পাহাড়ে আজও সেনার বুটের নিচে চাপা পড়ছে শিশুদের স্বপ্ন, মায়ের আহাজারি, আর তরুণদের ভবিষ্যৎ।

জাপানের রাজধানীতে এই প্রতিবাদ কেবল বাংলাদেশের সরকারের উদ্দেশ্যে নয়; এটি জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও বিশ্বের সব মানবাধিকার রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে এক সরাসরি বার্তা— চুপ থেকো না। তোমাদের নীরবতা আজ অন্যায়ের সহযোগী হয়ে উঠেছে। পাহাড়ের মানুষ ন্যায় চায়, ন্যায্যতা চায়, তাদের নিজ ভূমিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর অধিকার চায়।

যদি শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন না হয়, যদি দমননীতি অব্যাহত থাকে, তবে পাহাড়ের মানুষ বাধ্য হবে নতুন পথ বেছে নিতে — আর সেই পথের নাম হবে স্বাধীনতা।

শেষে, টোকিওর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণদের চোখে আমি দেখেছি সেই পাহাড় — যেখানে আগুন আছে, কিন্তু আলোও আছে; যেখানে রক্ত আছে, কিন্তু আশাও আছে। তারা আজ প্রমাণ করেছে, নির্বাসনেও জাতি টিকে থাকে, যদি স্মৃতি ও প্রতিরোধ বেঁচে থাকে।

আর সেই প্রতিরোধের শপথ আজ টোকিওর বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে, “তোমরা শান্তিচুক্তি বাতিল করে দেখাও, পাহাড় তার স্বাধীনতা ঘোষণা করবেই। কারণ ভয়ে নীরব থাকার সময় নেই; নীরবতা আর বাঁচানোর নিশ্চয়তা দেয় না।”