পাক-আফগান যুদ্ধ: বাংলার মৌলবাদীদের নির্বাচিত মানবতা

বাংলাদেশ-মানবতা
বাংলাদেশের মানবতা

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্তে এখন তীব্র সংঘর্ষ চলছে। আকাশে যুদ্ধবিমান, মাটিতে ধোঁয়া, সীমান্তজুড়ে গোলাগুলির শব্দ। পাকিস্তান দাবি করছে তারা সন্ত্রাসী ঘাঁটি লক্ষ্য করে অভিযান চালাচ্ছে, আর আফগানিস্তান বলছে এটি তাদের সার্বভৌমত্বে আঘাত। আসল সত্য হলো, এটি কোনো হঠাৎ শুরু হওয়া যুদ্ধ নয়; এর শিকড় আছে দীর্ঘদিনের উত্তেজনায়। দ্যুরান্ড লাইন নিয়ে সীমান্ত বিরোধ, সীমান্ত পেরিয়ে আসা সশস্ত্র গোষ্ঠী, এবং একে অপরকে “শত্রু আশ্রয়দাতা” বলে দোষারোপ করা—এসব মিলেই এই নতুন সংঘাতের আগুন জ্বালিয়েছে।

পাকিস্তানের প্রথম হামলার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়, যেখানে তারা দাবি করে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের (TTP) বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। আফগানিস্তান সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানায় এবং সীমান্তের একাধিক পোস্টে পাল্টা আক্রমণ চালায়। এখন দুই দেশের মধ্যে চলছে টানা পাল্টা হামলা, যার মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ—যারা কারও শত্রু নয়, কেবল দুর্ভাগ্যজনক ভূগোলের বাসিন্দা।

এই ভয়াবহ সংঘর্ষে যে বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট, তা হলো মুসলমানের হাতে মুসলমানের রক্ত। আর সেই দৃশ্য যখন টিভির পর্দায় ভেসে ওঠে, তখন ঢাকায়, চট্টগ্রামে বা সিলেটে কোনো মিছিল বের হয় না, কোনো মাইকে স্লোগান ওঠে না, কোনো মৌলবাদী নেতা বুক চাপড়ে কাঁদে না। অথচ গাজায় যদি হামাস সন্ত্রাসীদের ওপর ইসরাইলি বোমা পড়ে, এই একই লোকেরা রাত জেগে রাস্তায় নামে, সোশ্যাল মিডিয়ায় আগুন ধরিয়ে দেয়, মসজিদের সামনে চেঁচিয়ে দেশ জুড়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে।

তখন প্রশ্নটা খুব সহজ, গাজায় মুসলমান মরলে তারা চেঁচায়, কিন্তু পাকিস্তান-আফগান সীমান্তে মুসলমান মরলে তারা চুপ কেন?

এই নীরবতা কেবল দুর্বলতা নয়, এটি একধরনের রাজনৈতিক কূট-বুদ্ধি। কারণ গাজার নাম উচ্চারণ করা নিরাপদ। ওখানে শত্রু স্পষ্ট, স্লোগান সহজ, আর জনতার আবেগ ব্যবহারযোগ্য। কিন্তু পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের যুদ্ধ জটিল। দুই পক্ষই মুসলমান, দুই পক্ষই আল্লাহর নাম নেয়, দুই পক্ষই নিজেদের ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করতে চায়। এখানে এক পক্ষকে সমর্থন মানে অন্য পক্ষকে অস্বীকার করা, আর সেই অস্বীকারের ঝুঁকি তারা নিতে চায় না।

তাই যারা ধর্মের নামে ‘উম্মাহ’র ঐক্যের কথা বলে, তারা এখন নীরবতার তাঁবুর ভেতরেই আশ্রয় নিয়েছে। তাদের ঈমান যেন সিলেক্টিভ মোডে চলে—যেখানে গাজায় মানবতা আছে, কিন্তু পাক-আফগান সীমান্তে সাধারণ মুসলিমদের জন্য নেই।

মৌলবাদীরা যেভাবে নিজের সুবিধামতো আবেগ বেছে নেয়, তাতে বোঝা যায় ধর্ম এখন তাদের কাছে বিশ্বাস নয়, এক লাভজনক ব্যবসা। গাজায় আগুন লাগলে তারা ঘুমেও চেঁচিয়ে ওঠে, কারণ সেখানে ক্যামেরা আছে, জনসমর্থন আছে, রাজনৈতিক মঞ্চ আছে। কিন্তু পাকিস্তান-আফগান সীমান্তে ক্যামেরা নেই, বক্তৃতার সুযোগ নেই, তাই সেখানে তারা নীরব থাকে। এই নীরবতাই তাদের আসল মুখ। কারণ তারা সত্যের পক্ষে নয়, তারা শত্রু বাছাই করে নেয়; আর সেই নির্বাচিত শত্রুতার মাধ্যমে নিজেদের ধার্মিকতা প্রমাণ করে।

একই দেশে বাস করা শত বছর ধরে নিপীড়িত পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী কিংবা দেশের অন্য প্রান্তে অমুসলিমদের ওপর চলা নিপীড়নের ক্ষেত্রেও এই মৌলবাদীদের মানবতা একইভাবে ঘুমিয়ে থাকে। পাহাড়ে যদি কোনো আদিবাসী নারী ধর্ষিত হয় বা কোনো গির্জা বা মন্দির পুড়ে যায়, তখন এই ধর্মব্যবসায়ীরা বলে, “ওরা তো মুসলমান নয়।” অর্থাৎ, তাদের মানবতা ধর্মীয় শর্তসাপেক্ষ। এই নির্বাচিত মানবতাই এখন রাষ্ট্রের নৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রতিচ্ছবি।

কোনো এক মাওলানা এখনো হয়তো ফেসবুকে গাজার শিশুর ছবি পোস্ট করে লিখছেন, “আমরা নীরব নই।” কিন্তু প্রশ্ন হলো, যখন মুসলমানের নিষ্পাপ বাচ্চারা পাক–আফগান সীমান্তে মরছে, তখন সেই নীরবতাই কি আসলে অপরাধ নয়? গাজার কান্না যদি পবিত্র হয়, তাহলে পাহাড়ের কান্না কি অপবিত্র?

মৌলবাদীরা এখনো বুঝতে শেখেনি, “মানবতার কোনো ধর্ম নেই।” তাদের ঈমানের ব্যাটারি কেবল তখনই চার্জ নেয়, যখন প্রতিপক্ষের নাম হয় ‘ইহুদি’। কিন্তু ‘চাকমা’, ‘হিন্দু’ কিংবা ‘আফগান’ শব্দটি শুনলেই সেই মানবতা কানে তুলো দেয়, কারণ সেখানে প্রতিবাদে কোনো রাজনৈতিক লাভ নেই, কোনো আন্তর্জাতিক তালি নেই। এখন ‘আফগান’ আর ‘পাকিস্তানি’ মুসলমান মরে যাচ্ছে, তবু বাংলাদেশের মৌলবাদী বিবেক নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে।

কারণ, এখানে উভয়েই মুসলমান, কাউকে দোষ দিলে নিজেদের নাকই কেটে যাবে। তাই তারা চুপ থাকে। এই চুপ থাকাটাই এখন বাংলাদেশের মৌলবাদীদের নতুন ফতোয়া, “যেখানে বিধর্মী নেই, সেখানে মানবতা নয়।” এই হচ্ছে বাংলাদেশের মৌলবাদীদের দ্বিমুখী নীতি। চমৎকার!

এই সময়ের সবচেয়ে বড় ব্যঙ্গ হচ্ছে, যারা নিজেদের ‘উম্মাহ’র প্রতিনিধি বলে দাবি করে, তারা এখন নিজেদের মুসলমান প্রতিবেশীর প্রতিও নির্দয়। ধর্মের নামে যাদের এত আওয়াজ, তাদের বিবেক এখন নিঃশব্দ মোডে। একসময় তারা বলত, “রক্তপাত ইসলামে হারাম।” আজ তারা বলে, “এই যুদ্ধ আমাদের নয়।” এই নির্বাচিত মানবতাই মৌলবাদীদের সর্বশেষ মুখোশ। তারা কান্নার বিষয়ও রাজনীতির ছাঁকনিতে ছেঁকে নেয়।

আমি শেষ করতে চাই না। বাংলাদেশের মৌলবাদীদের নিয়ে আরও অনেক বলার আছে। তবু শেষ করতে হবে। তাই যারা এই লম্বা পোস্ট পড়েন নি তাদের জন্য এখানে সংক্ষেপ করছি -গাজায় চেঁচানো সহজ, কারণ সেখানে ক্যামেরা আছে। কিন্তু সীমান্তে বা পাহাড়ে রক্তে কোনো ক্যামেরা নেই। তাই তারা চুপ। এই চুপ থাকা শুধু কাপুরুষতা নয়, এটাই তাদের আসল রাজনীতি—যেখানে ধর্ম এক প্রোডাক্ট, মানবতা এক স্লোগান, আর নীরবতা এক নিরাপত্তা-কৌশল। আজকের মৌলবাদী এটাই: গাজায় চিল্লানি দেয়, সীমান্তে কানে তুলো দেয়, আর পাহাড়ের কান্না শুনলে মিউট বোতাম টিপে দেয় আর সেটাই এখন বাংলাদেশের মানবতা।


Leave a Reply