ধর্ম বানিজ্যের নির্বান এখন জাতীয়কৃত: পাহাড়ের মানুষ জাগবে কি?

চীবর দান নিয়ে কত পোস্ট চোখে পড়ে গেল। বন্ধুদের কত পোস্ট পড়ে দেখলাম। সবচেয়ে অবাক হলাম জাতীয় চীবরদানের কথা শুনে। মনে হলো এটা একটা পাহাড়ে দালালদের নতুন ধর্ম বানিজ্য সংস্করণ যা সরকারিকরণ হতে চলেছে। আগে বনরা নির্বানের টিকিট দিত, এখন সেটি এক ধাপ এগিয়ে সরকারিকরণ হচ্ছে। এবার নির্বান যেতেও সরকারের অনুমতি লাগবে।

সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, বৌদ্ধ সংগীতের পরিবর্তে নাকি এ অনুষ্ঠান দেশের জাতীয় সঙ্গীত দিয়ে শুরু হয়।

চীবর দানের মৌসুম এলেই মনে হয় পাহাড়ের বাতাসেও যেন একধরনের হিসাব-নিকাশের গন্ধ লাগে। সবাই হঠাৎ করেই ধর্মপ্রাণ হয়ে ওঠে, বিহারগুলো নোটিশ পাঠায়, পাড়ায় পাড়ায় খবর ছড়ায়, এই বছর একটু জমজমাট হবে।

বাজেট কতো?

লাখ লাখ! অনেক সময় কোটি। থাকে গাড়ির বাজেট।

তারপর সবাই মিলে ভাগ করে নেয়, কে কত দেবে। যার হাতে টাকা নাই, সেও ভাবে, না দিলে সমাজ কী বলবে! স্বর্গে জায়গা না মিললে বৌদ্ধ স্বর্গও তো দূরে চলে যাবে। তাই ধার করলেও দিতে হয়, মুখ বাঁচানো ধর্মের বড় নিয়ম।

যাদের পকেট ভারী, তারা এই সময়টায় আরও ভারী হয়ে ওঠে। বাজেট কেমন হবে, কে কত দেবে—সব ঠিক হয় তাদের বৈঠকে। গরিব লোকের কাজ শুধু মাথা নাড়ানো আর টাকা দেওয়া। যেন ধর্ম নয়, এটা একধরনের ট্যাক্স।

পার্থক্য শুধু এই, সরকার ট্যাক্স না দিলে জেল দেয়, বিহার ট্যাক্স না দিলে সমাজে একঘরে করে। তবু সবাই দেয়, কারণ ধর্মের নামে ভয় দেখানো এক অদ্ভুত শক্তি যে ভয় কাউকে বুদ্ধ বানায় না, বরং কাঁপিয়ে রাখে।

যারা সারাবছর মানুষের ঘাড়ে চড়ে চলেছে, তারা হঠাৎ এই মৌসুমে ‘দানবীর’ হয়ে যায়। নামটা দেয় বুদ্ধের, কাজটা করে লেনদেনের। কেউ দুই হাজার দিলেই মনে করে স্বর্গের টিকিট বুক হয়ে গেছে।

আর যে লোকটা সকালে হাটে ধান বেচে বিকেলে চাঁদা দেয়, সে ভাবে, “হয়তো বুদ্ধ দেখছেন।” কিন্তু বুদ্ধও হয়তো ভাবছেন, “এই দৃশ্য আমি তো চাইনি!”

ধর্ম এখন একরকমের প্রদর্শনী হয়ে গেছে। কে কয়বার বিহারে গেল, কে ভান্তের পাশে বসে ছবি তুলল, কে কত দান করল—এইসব হিসাবই এখন ‘আধ্যাত্মিকতা’র মাপ।

কিন্তু যে ধর্ম মানুষকে বিনয় শেখায়, সে ধর্মের চেহারা আজ কোথায়? পাহাড়ে এখন ধর্ম নয়, ধর্মের ব্যবসা চলছে। আর এই ব্যবসায় লাভ করে সেই কয়েকজন, যারা আগে থেকেই পেটভরা ও সময়ভরা।

বাকিরা শুধু দৌড়াচ্ছে, ধার করছে, হাসছে, আর ভিতরে ভিতরে বুঝছে—এই হাসিটাও একধরনের বাঁচার কৌশল।

ধর্ম যদি সত্যি হতো আত্মশুদ্ধির পথ, তাহলে এত চাঁদা, এত আয়োজন, এত প্রদর্শন লাগত না। বুদ্ধ বলেছিলেন সংযমে শান্তি, আর আমরা বুঝে ফেলেছি—সংযম মানে কম দান নয়, বরং বেশি প্রদর্শন।

তাই পাহাড়ে এখন ধর্ম মানে বিহারের লাউডস্পিকার, আর মানুষ মানে হিসাবের খাতা। এটাই ধর্ম বানিজ্যের নির্বান জাতীয়করণের ফল।পাহাড়ের মানুষ জাগবে কি?


Leave a Reply