
যে বিপ্লবে নারীদের সম্পৃক্ত করা যায় না, সেই বিপ্লব কখনোই সত্যিকার অর্থে গতিশীল হয় না। পাহাড়ে এই কথাটি আজ নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। কারণ সময় বদলেছে, বাস্তবতা বদলেছে, কিন্তু আমাদের চিন্তার কাঠামো অনেক জায়গায় এখনো থমকে আছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বিপ্লবের ইতিহাস আজকের নয়। এটি প্রায় শতাব্দীজুড়ে বিস্তৃত। এই দীর্ঘ ইতিহাসে পাহাড়ি আদিবাসী নারীরা শুধু দর্শক ছিল না। তারা বিভিন্নভাবে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল—খাদ্য জোগানো, বার্তা বহন, আশ্রয় দেওয়া, এমনকি সশস্ত্র সংগ্রামের গল্পও আমরা শুনেছি। শান্তিবাহিনী গঠনের সময় নারী সশস্ত্র কর্মীর কথা লোকমুখে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে তাদের উপস্থিতি ছিল সীমিত, দৃশ্যমান ছিল না। হয়তো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে, হয়তো তৎকালীন বাস্তবতায় নারীদের সেই জায়গা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় এখন পেরিয়ে গেছে।
আজ পৃথিবী নারী ও পুরুষকে আর আলাদা করে বিচার করে না। শুধু সংখ্যায় নয়, শক্তিতে, মেধায়, সাহসে এবং অধিকারেও তারা সমান। পাহাড়ের দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হয়। অনেক জায়গায় নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়েও বেশি। তাহলে এই বিশাল শক্তিকে বাদ দিয়ে কোনো আন্দোলন কীভাবে সফল হতে পারে? বড় একটি অংশকে উপেক্ষা করে কোনো সংগ্রাম কখনোই পূর্ণতা পায় না—এটা শুধু তত্ত্ব নয়, বাস্তব সত্য।
আবেগ থেকে নয় বরং বেঁচে থাকার তাগিদ থেকে পাহাড়ি নারীরা আন্দোলনে যুক্ত হতে চায়। জমি হারানোর যন্ত্রণা, নিরাপত্তাহীনতা, পরিবার ভাঙনের ভয়—এসব তারা প্রতিদিন নিজের শরীরে বহন করে। পুরুষের চেয়ে নারীর জীবন পাহাড়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তাদের সংগ্রামে আগ্রহ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন। এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে কোনো আন্দোলন দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।
তবুও পাহাড়ের সমাজ এখনো গভীরভাবে পুরুষতান্ত্রিক। নারীদের দুর্বল ভাবা হয়। তাই তাদের আন্দোলনের কেন্দ্র থেকে দূরে রাখা হয়। অথচ বাস্তবতা হলো, নারীরাও এই সংগ্রামে যুক্ত হতে চায়। একজন পুরুষ যেমন তার জাতি, ভূমি ও অস্তিত্বকে ভালোবাসে, একজন নারীও ঠিক তেমনই ভালোবাসে। তারা আগ্রহ দেখালে তাদের “না” বলা আসলে নৈতিকভাবে সঠিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও দূরদর্শী নয়।
আজ পাহাড়ে আমরা দলের দুর্নাম শুনি—দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার। এগুলো কেবল ব্যক্তিগত চরিত্রের সমস্যা নয়, এগুলো কাঠামোগত সমস্যা। বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পুরুষদের একচেটিয়া বলয়ের ভেতরে এসব প্রবণতা সহজে জন্মায়। নারীরা পাশে থাকলে অনেক সময় এই প্রবণতা কমে আসে। কারণ নারীরা শুধু সহানুভূতির প্রতীক নয়, তারা সংযম, জবাবদিহি এবং দায়িত্ববোধের শক্তিশালী উপস্থিতি। সংগ্রামে নারী কর্মীরা অনেক সময় শুধু কাজের শক্তি নয়, বরং সান্ত্বনা ও গভীর অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।
আরেকটি কঠিন সত্য হলো, নারীদের বাদ পড়ার পেছনে শুধু সমাজ নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পুরুষ নেতৃত্বও দায় এড়াতে পারে না। অনেক নারী এগিয়ে আসতে চাইলেও তাদের সামনে রাখা হয় অবিশ্বাস, সন্দেহ আর নীরব ভয়। আন্দোলনে যুক্ত হলে নারীদের চরিত্র নিয়ে গুজব ছড়ানো হয়, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এই সামাজিক শাস্তির ভয় অনেক নারীকেই পেছনে সরিয়ে রাখে। এটা নারীদের দুর্বলতা নয় বরং এটা আন্দোলনের নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়ার ফল।
কাজ না থাকলে মানুষ বিপথে যায় আর এটা পাহাড়েও সত্য।
আজ প্রশ্ন হচ্ছে, নারীরা কী করবে? আমরা কি তাদের সমাজের কাজে, জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে যুক্ত হওয়ার কোনো বাস্তব পথ খুলে দিতে পেরেছি? যদি না পারি, তাহলে তারা যখন ভিন্ন পথ বেছে নেয়, তখন শুধু দোষারোপ করলেই কি আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়?
আমরা একই কলেজে পড়েছি, একই ডিগ্রি নিয়ে পাশ করেছি। আমি পুরুষ বলে রাজনীতি করি, দল করি, নেতা হই। কেউ টাকার জোরে বড় পদে বসি, কেউ দেশ ছেড়ে বিদেশে থাকি, কেউ ব্যবসা, গাড়ি, বাগান আর সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকি, কেউ অস্ত্র ধরে নিজেকে বড় বিপ্লবী বানাই। কিন্তু নারীরা এসবের কোনোটাই সহজে করতে পারে না। তারা ভান্তে হতে পারে না, দল করে নেতা হতে পারে না, আপনার মতো দেশ ছেড়ে পালাতে পারে না, সেনা ক্যাম্পের ছায়ায় বিপ্লবী সাজতে পারে না, বন্দুক হাতে চাঁদা তুলে জীবন চালাতে পারে না।
তাদেরও স্বপ্ন আছে। বড় হওয়ার স্বপ্ন, নেতৃত্ব দেওয়ার স্বপ্ন, একটু ভালোভাবে বাঁচার স্বপ্ন। এই স্বপ্নগুলোর জন্য আমরা যদি কোনো সম্মানজনক পথ না রাখি, তাহলে তারা যখন অন্য জাতির পুরুষের হাত ধরে চলে যায়, নামের শেষে আদিবাসীর টাইটল বাদ দিয়ে অন্য টাইটলে পরিচিত হয় তখন আমরা শুধু একজন মানুষকে হারাই না। আমরা হারাই আমাদের ভবিষ্যতের এক বড় শক্তিকে।
এই নারীরাই আমাদের জন্য ভাত রান্না করতে পারত, জঙ্গলে অসুস্থ হলে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে পারত, জাতির অস্তিত্ব রক্ষার পরিকল্পনার সমান অংশীদার হতে পারত। আমরা যা পারি, তারাও তা পারে। একজন অসুস্থ সৈনিকের পাশে একজন নারী সৈনিকের গুরুত্ব কতটা, তা সৈনিক না হলে বোঝা কঠিন।
বিশ্বে ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে অনেক সময় একজন পুরুষ সৈনিকের সঙ্গে একজন নারী সৈনিক রাখা হয় যেন মিশন যেন সফল হয়। একজন পুরুষ সহজে একজন নারী সহযোদ্ধাকে ফেলে যায় না, যেমন একজন নারীও সহজে একজন পুরুষ সহযোদ্ধাকে ছেড়ে যায় না। এই বাস্তবতার কারণেই অনেক দেশ, বিশেষ করে ইসরায়েল, এই নীতিকে গুরুত্ব দেয়। এটি কোনো আবেগী ধারণা নয়, এটি পরীক্ষিত কৌশল।
আজ পাহাড়ি কিশোরী মেয়েরা এই আন্দোলনের দিকে তাকিয়ে কী শিখছে, সেটাও আমাদের ভাবা দরকার। তারা কি শিখছে যে এই সংগ্রাম শুধু পুরুষদের জন্য? তারা কি ভাবছে, এখানে আমার কোনো জায়গা নেই? যদি আজ আমরা এই বার্তাই দিই, তাহলে দশ বছর পরে পাহাড়ের আন্দোলন আরও সংকীর্ণ, আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। তখন শুধু নারীরা নয়, পুরো একটি প্রজন্ম আমাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।
পাহাড়ে বিষয়টি এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার নয়।
নারীদের দূরে ঠেলে নয়, কাছে টেনে নিতে হবে। তাদের শুধু সহযোগী হিসেবে নয়, সিদ্ধান্তের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। বিপ্লবকে যদি সত্যিকার অর্থে জীবিত, বিশ্বাসযোগ্য ও টেকসই করতে চাই, তাহলে আজই এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। বিপ্লব সফল করতে হলে নারীদের জায়গা আজই তৈরি করতে হবে—আগামীকালের জন্য নয়, এখনই।








