বনভান্তে: যে প্রশ্নগুলো ভক্তির আড়ালে এতদিন চাপা ছিল

বনভান্তেকে নিয়ে আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত ভয় কাজ করে। তাঁর ধর্মীয় অবদান নিয়ে প্রশংসা করা যায়, কিন্তু তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেই অনেকে সেটিকে ধর্মবিরোধিতা মনে করেন। অথচ একজন ধর্মগুরুকে শ্রদ্ধা করা আর তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্তকে ইতিহাসের প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা এক কথা নয়।

আমি বনভান্তেকে ছোট করতে লিখছি না। রাজগুরু অগ্রবংশ মহাস্থবিরকেও বনভান্তের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে বড় করতে চাই না। আমি জানতে চাই, ১৯৭০-এর দশক থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে সংকটময় সময়ে আমাদের ধর্মীয় নেতৃত্ব সমাজকে কোন পথে নিয়েছিল এবং তার দীর্ঘমেয়াদি ফল কী হয়েছে।

ইতিহাসের শুরুটা গুরুত্বপূর্ণ। রাজগুরু অগ্রবংশ মহাস্থবির ছিলেন তঞ্চঙ্গ্যা। ১৯৫৮ সালে তিনি চাকমা রাজগুরু হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং পার্বত্য ভিক্ষুসংঘ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষা, প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ও সমাজসেবাকে তাঁর ধারার ভিক্ষুরা গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

বনভান্তেও শুরু থেকেই তাঁর বিরোধী ছিলেন না। রাজবন বিহারের নিজস্ব তথ্যপঞ্জিতে বলা হয়েছে, ১৯৬১ সালে রাজগুরু অগ্রবংশ ও জ্ঞানশ্রী মহাস্থবিরের অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতায় বনভান্তে উপসম্পদা লাভ করেন। অর্থাৎ তাঁদের সম্পর্কের শুরু ছিল সহযোগিতার মধ্য দিয়ে, বিরোধের মধ্য দিয়ে নয়।

কিন্তু পরে সম্পর্ক বদলে যায়। পার্বত্য ভিক্ষুসংঘঘনিষ্ঠ পুরনো লেখাগুলোতে অভিযোগ করা হয়েছে, বনভান্তে পার্বত্য ভিক্ষুসংঘের ভিক্ষুদের কঠোর ভাষায় সমালোচনা করতেন এবং পরে “বন সংঘ সুশীল, পার্বত্য ভিক্ষু সংঘ দুঃশীল”—এমন ধারণা সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। রাজগুরু অগ্রবংশও সেই সমালোচনার বাইরে ছিলেন না বলে লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়।

সময়রেখাটিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি ধারার লেখায় বলা হয়েছে, রাজগুরু অগ্রবংশ ১৯৭৬ সালের শেষদিকে রাঙ্গামাটির রাজবিহার ছেড়ে যান। অন্যদিকে রাজবন বিহারের তথ্য অনুযায়ী, বনভান্তে ১৯৭৬ সালে প্রথম রাজবন বিহারে বর্ষাবাস করেন এবং ১৯৭৭ সালে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। অর্থাৎ সত্তরের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে রাঙ্গামাটির বৌদ্ধ নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছিল।

এই পরিবর্তন কি শুধু ধর্মীয় মতপার্থক্যের ফল ছিল, নাকি এর সঙ্গে জাতিগত পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা এবং গোষ্ঠীগত স্বার্থও জড়িয়ে ছিল—এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রাজগুরু অগ্রবংশ ছিলেন তঞ্চঙ্গ্যা। প্রবীণদের মুখে আজও শোনা যায়, চাকমা সমাজের একটি অংশ তখন বলতে শুরু করেছিল, “আমাদের চাকমাদের কি একজনও বড় ভান্তে নেই?”

এই মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে চাকমা সমাজের কিছু প্রভাবশালী ও তথাকথিত উচ্চশ্রেণির মানুষ বনভান্তেকে সামনে নিয়ে আসেন—এমন বয়ানও বহুদিন ধরে প্রচলিত। পরে “আমা ভান্তে”—অর্থাৎ “আমাদের চাকমা ভান্তে”—ধারণাটি চাকমা সমাজে এত শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে বনভান্তের বক্তব্য, সিদ্ধান্ত বা অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলা অনেকের কাছে যেন নিজের জাতির বিরুদ্ধে কথা বলার সমান হয়ে দাঁড়ায়।

সমস্যা এখানেই। কোনো ধর্মগুরুর প্রতি শ্রদ্ধা যখন সমালোচনাহীন আনুগত্যে পরিণত হয়, তখন যুক্তি ও আত্মসমালোচনা দুর্বল হয়ে যায়। বনভান্তে যা বলতেন, তার সবকিছুই অনেকে মাথা পেতে নিতেন—পাছে তাঁকে প্রশ্ন করলে চাকমা সমাজেরই বদনাম হয়। এই মানসিকতার ফলে ব্যক্তির ধর্মীয় মর্যাদা আর জাতিগত অহংকার একসঙ্গে মিশে যায়।

আজও বনভান্তের কিছু শিষ্য ও অনুসারীকে ঘিরে চাকমা সমাজে একই প্রবণতা দেখা যায়। তাঁদের বক্তব্য বা আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই অনেক সময় যুক্তির বদলে “আমাদের ভান্তে”, “আমাদের সংঘ”, “আমাদের মর্যাদা”—এই আবেগ সামনে চলে আসে। তখন সত্যের চেয়ে গোষ্ঠীগত সম্মান রক্ষা বড় হয়ে ওঠে।

এ কারণেই “আমা ভান্তে” শুধু একটি স্নেহের সম্বোধন ছিল কি না, নাকি এটি ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী চাকমাকেন্দ্রিক ধর্মীয় পরিচয় তৈরি করেছিল—এই প্রশ্নও ইতিহাসের আলোচনায় আসা দরকার।

তাহলে প্রশ্ন আসে, এই “আমা ভান্তে” ধারণার মধ্যে শুধু ধর্মীয় শ্রদ্ধা ছিল, নাকি চাকমাকেন্দ্রিক জাতিগত আবেগও কাজ করেছিল? বনভান্তের প্রধান শিষ্যদের মধ্যে কতজন মারমা ছিলেন, কতজন তঞ্চঙ্গ্যা, কতজন অন্য জুম্ম জনগোষ্ঠীর? তাঁর ধর্মীয় আন্দোলন বৃহত্তর জুম্ম বৌদ্ধ সমাজে সমানভাবে বিস্তৃত হয়েছিল, নাকি মূলত চাকমা সমাজকেন্দ্রিক শক্তিশালী ধর্মীয় পুনর্জাগরণে পরিণত হয়েছিল?

এই প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে নয়, তথ্য দিয়ে দেওয়া সম্ভব। তাঁর প্রধান শিষ্যদের তালিকা সামনে আসুক।

শিক্ষার প্রশ্নে বনভান্তেকে নিয়ে আরও বড় বিতর্ক আছে। তাঁর বহু পুরনো দেশনা আজও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়ায়। বিভিন্ন লেখায় তাঁর নামে এমন বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে, যেখানে ভিক্ষুদের আধুনিক পড়াশোনা, স্কুল বা অনাথ আশ্রম পরিচালনা, চাকরি, বিদেশে পড়াশোনা কিংবা আধুনিক জীবনযাপনের কিছু অংশকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

এখানে কথাটি ঘুরিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। যদি এসব বক্তব্য সত্য এবং পূর্ণ প্রেক্ষাপটেও একই অর্থ বহন করে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—একটি শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা, রাজনৈতিকভাবে দুর্বল এবং অস্তিত্বের সংকটে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য এমন শিক্ষা কতটা উপকারী ছিল?

ধর্মীয় শিক্ষা প্রয়োজন, শীল প্রয়োজন, ধ্যান প্রয়োজন। কিন্তু একটি জাতিকে টিকিয়ে রাখতে ডাক্তার লাগে, আইনজীবী লাগে, শিক্ষক লাগে, গবেষক লাগে, সাংবাদিক লাগে, প্রশাসন বোঝা মানুষ লাগে, আন্তর্জাতিক ভাষা জানা তরুণ লাগে এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন সমাজ লাগে। শুধু পুণ্য দিয়ে ভূমি রক্ষা হয় না, শুধু ধ্যান দিয়ে রাজনৈতিক অধিকার পাওয়া যায় না, আর শুধু বিহার নির্মাণ করে একটি জাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা যায় না।

তবে বনভান্তের ইতিবাচক অবদানও অস্বীকার করা যাবে না। তিনি বহু মানুষকে শীল, ধ্যান, সংযম ও ধর্মচর্চার দিকে নিয়ে গেছেন। কুসংস্কার, তন্ত্র-মন্ত্র ও নানা অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে তাঁর ভূমিকা ছিল। তাঁর কারণে চাকমা সমাজে বৌদ্ধ ধর্মীয় চেতনা গভীর হয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় অবদান স্বীকার করলেই তাঁর সামাজিক দর্শনের সমালোচনা বন্ধ হয়ে যায় না।

এরপর আসে শান্তিবাহিনীর প্রশ্ন। পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত একটি কথা হলো, বনভান্তে শান্তিবাহিনীর প্রতি বিরূপ ছিলেন এবং তাঁর কিছু দেশনায় সেই মনোভাব পাওয়া যায়। আজও সেই ধরনের দেশনার অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়ায়।

এখানে পূর্ণ সত্য সামনে আসা দরকার। তিনি কি শুধু হত্যা ও সশস্ত্র যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন, নাকি শান্তিবাহিনী যে রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতর থেকে জন্মেছিল—ভূমি, পরিচয়, স্বায়ত্তশাসন ও জুম্মদের রাজনৈতিক অধিকার—সেই আন্দোলনের প্রতিও তাঁর বিরোধিতা ছিল? এই দুই অবস্থান এক নয়।

তাই তাঁর পুরনো অডিও দেশনা সামনে আনা হোক। কোন সালে, কোন পরিস্থিতিতে, কোন বক্তব্য তিনি দিয়েছিলেন—সব প্রকাশ হোক। বনভান্তের নামে কেউ নতুন কথা যোগ করবে না, আবার ভক্তির কারণে তাঁর কঠিন রাজনৈতিক বক্তব্যও লুকিয়ে রাখা হবে না।

এরপর আসে সবচেয়ে অস্বস্তিকর অধ্যায়—সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক। এখানে অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আর শুধু শোনা কথা নয়। রাজবন বিহারের নিজস্ব তথ্যপঞ্জিতে লেখা আছে, ১৯৯১ সালে বনভান্তে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে যমচুগ, রূপকারী এবং খাগড়াছড়ির মহাজনপাড়ায় ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেন। একই বছর রাঙ্গামাটির রিজিয়ন কমান্ডার আহসান নাজমুল আমীন সস্ত্রীক রাজবন বিহারের কঠিন চীবরদানের বেইন বুনা দেখতে আসেন।

এই তথ্য ছোট নয়। সেই সময়ের পাহাড়ে একজন ধর্মগুরুর ধর্মীয় সফরের জন্য সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার কেন প্রয়োজন হলো? সেনা সাহায্য ছাড়া কি ধর্ম প্রচার সম্ভব ছিল না?

আরও একটি গুরুতর অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় আছে। বলা হয়, রাঙ্গামাটিতে দায়িত্ব পালনকালে লে. কর্নেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম বনভান্তের বিপুল ধর্মীয় প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে পাহাড়িদের কাছে সেনাবাহিনীর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। বিভিন্ন বর্ণনায় রাজবন বিহারের অনুষ্ঠানে সেনা সহযোগিতা, ফেরিঘাটে সুবিধা, আর্থিক অনুদান, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সেনা কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ এবং বনভান্তেকে হেলিকপ্টারে নিয়ে যাওয়ার কথাও এসেছে।

এই অভিযোগের প্রতিটি অংশ স্বাধীনভাবে যাচাই করা দরকার। কিন্তু রাজবন বিহারের নিজের তথ্যপঞ্জিতেই সেনা হেলিকপ্টার ব্যবহারের ঘটনা নথিভুক্ত থাকায় সামরিক কর্তৃপক্ষ ও বনভান্তের প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠতার প্রশ্নটি আর নিছক গুজব বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

২০১৩ সালের “পার্বত্য এলাকার বৌদ্ধ ধর্মের অতীত ও বর্তমান প্রেক্ষাপট” লেখায় আরও সরাসরি বলা হয়েছে, তৎকালীন সময়ে বনভান্তেকে “সামরিক অফিসারেরা ব্যবহার করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি।” এটি কোনো সরকারি তদন্তের সিদ্ধান্ত নয়; লেখকের মূল্যায়ন। কিন্তু অভিযোগটি লিখিতভাবে আছে এবং সেই সময়কার সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা দরকার।

কারণ প্রবীণ জুম্মদের স্মৃতিতে একটি বিষয় বারবার উঠে আসে—সেই সময় সাধারণ পাহাড়িরা সেনাবাহিনীর সাহায্য গ্রহণকে স্বাভাবিকভাবে দেখত না। সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল সংঘাত, অভিযান, ভয়, সন্দেহ ও নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত।

তখন সেনাদের সাহায্য নেওয়াকে অনেকেই নিছক সাহায্য মনে করত না। বিষয়টি ছিল অনেকটা “দেওয়া-নেওয়া”—give and take। সেনাবাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলে বিনিময়ে তথ্য দিতে হবে কি না, সহযোগিতা করতে হবে কি না, কিংবা সেই ব্যক্তি সেনাদের হয়ে কাজ করছে কি না—এসব সন্দেহ তৈরি হতো।

এ কারণেই যারা সেনাদের তথ্য দিত বা নিয়মিত সুবিধা নিত, তাদের অনেককে সাধারণ জুম্মরা নিজেদের স্বার্থের বিপরীত পক্ষ হিসেবে দেখত। এমন বাস্তবতায় বনভান্তের মতো অত্যন্ত জনপ্রিয় ধর্মগুরু প্রকাশ্যে সেনা হেলিকপ্টার ব্যবহার করলে এবং সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলে তার সামাজিক প্রভাব অবশ্যই বড় ছিল।

আমার মূল্যায়ন স্পষ্ট—বনভান্তে সেনাবাহিনীর সাহায্যকে বৈধতা দিয়েছিলেন। আগে যে সেনা সাহায্য সাধারণ জুম্ম সমাজে সন্দেহ, ভয় ও বিরাগের বিষয় ছিল, বনভান্তের মতো সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় ধর্মগুরুর প্রকাশ্য সেনা সহায়তা গ্রহণ সেই সামাজিক বাধা ভাঙতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

আজ পাহাড়ে আমরা সেনাবাহিনীকে বিহারে অনুদান দিতে, স্কুলে সামগ্রী দিতে, ক্লাবকে সহায়তা করতে, ব্যক্তিকে টাকা দিতে এবং নানা সামাজিক কর্মসূচি পরিচালনা করতে দেখি। এখন এসব অনেকের কাছেই স্বাভাবিক। কিন্তু এটি সবসময় স্বাভাবিক ছিল না।

এই পরিবর্তন হঠাৎ হয়নি। সমাজের সবচেয়ে প্রভাবশালী ধর্মগুরু যদি সেনা সাহায্য গ্রহণ করেন, সেনা হেলিকপ্টারে ধর্মীয় সফর করেন এবং সামরিক কর্মকর্তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক অতিথিতে পরিণত করেন, তাহলে সাধারণ মানুষের কাছেও সেনা সাহায্য নেওয়ার মানসিক বাধা দুর্বল হওয়াই স্বাভাবিক।

এই কারণেই বনভান্তের সময়কে পাহাড়ে সেনা সাহায্য গ্রহণের সামাজিক বৈধতা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা দরকার।

আরও বড় প্রশ্ন হলো, সরকারি সাহায্য সেনাবাহিনীর হাত দিয়ে জনগণের কাছে যাবে কেন? জনসেবা করার জন্য মেম্বার আছে, চেয়ারম্যান আছে, উপজেলা প্রশাসন আছে, পার্বত্য জেলা পরিষদ আছে, উন্নয়ন বোর্ড আছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তর আছে। জনগণের জন্য বরাদ্দ সরকারি অর্থ এসব বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই জনগণের কাছে পৌঁছাতে পারে।

রাজবন বিহারের নিজের ইতিহাসই এর উদাহরণ। তাদের তথ্যপঞ্জিতে উল্লেখ আছে, ২০০০ সালে রাজবন বিহারের অতিথিশালা এবং ১০ শয্যার হাসপাতাল সরকারি অনুদানে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে নির্মিত হয়েছিল। অর্থাৎ সরকার চাইলে বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে সাহায্য দিতে পারে।

তাহলে ধর্মীয় সফর, বিহার, স্কুল, ক্লাব কিংবা সাধারণ মানুষের সামাজিক সাহায্যে সেনাবাহিনীকে মধ্যস্থতাকারী হতে হবে কেন? রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা আর স্থানীয় জনসেবা এক কাজ নয়। সামরিক প্রতিষ্ঠান যখন নিয়মিত বেসামরিক উন্নয়ন ও সামাজিক সাহায্যের দায়িত্ব নেয়, তখন শুধু সাহায্যই দেওয়া হয় না; সেই প্রতিষ্ঠানের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও তৈরি হয়।

এই কারণেই প্রশ্নটি আরও সরাসরি হওয়া উচিত—সেনা সাহায্য ছাড়া কি ধর্ম প্রচার হয় না? সাধারণ মানুষের দান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বেসামরিক প্রশাসন এবং সমাজের নিজস্ব শক্তি দিয়ে কি বিহার ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান চালানো সম্ভব নয়?

এর বিপরীতে রাজগুরু অগ্রবংশের নেতৃত্বের ধরনও দেখা দরকার। তাঁকে বনভান্তের বিপরীতে বড় করার জন্য নয়, বরং একজন ধর্মগুরু একই পরিস্থিতিতে আর কী ভূমিকা নিতে পারেন তা বোঝার জন্য।

অগ্রবংশ শুধু ধর্মদেশনায় সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তাঁর জীবনীতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের দুর্দশা তুলে ধরার কথা পাওয়া যায়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত পার্বত্য ভিক্ষুসংঘের পরবর্তী ইতিহাসেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য প্রতিবাদের নজির আছে।

২০০৩ সালের মহালছড়ি হামলার পর পার্বত্য ভিক্ষুসংঘ খাগড়াছড়ি সদরে মৌনমিছিল করে। তারা বিচার, মানুষের নিরাপত্তা, ধ্বংস হওয়া বৌদ্ধ বিহার পুনর্নির্মাণ, অপরাধীদের শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দাবি করে প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দেয়।

এখানে পরিষ্কার করে বলা দরকার, ২০০৩ সালের সেই মিছিলে বৃদ্ধ রাজগুরু অগ্রবংশ নিজে হেঁটেছিলেন—এমন প্রমাণ আমার হাতে নেই। কিন্তু তিনি যে ভিক্ষুসংঘ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই ধারাটি দেখিয়েছে যে ধর্মচর্চার পাশাপাশি মানুষের ওপর অন্যায় হলে ভিক্ষুরাও প্রতিবাদে দাঁড়াতে পারেন।

এটাই আসল প্রশ্ন। একজন ধর্মগুরু কি শুধু পুণ্য, ধ্যান ও নির্বাণের কথা বলবেন, নাকি তাঁর সামনে একটি জাতির ওপর অন্যায় হলে সেই জাতির পাশে দাঁড়াবেন? ধর্মচর্চা, শিক্ষা, সমাজসেবা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ—এসব একসঙ্গে করা কি অসম্ভব?

বনভান্তের অবদান আছে এবং তাঁর ধর্মীয় প্রভাব অসাধারণ ছিল। কিন্তু সেই প্রভাবের সামাজিক মূল্যও বিচার করতে হবে। তিনি যদি আধুনিক শিক্ষাকে নিরুৎসাহিত করে থাকেন, সেটি আলোচনায় আসবে। তিনি যদি শান্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য দিয়ে থাকেন, পুরো বক্তব্য সামনে আসবে। তিনি যদি সেনাবাহিনীর সহায়তা গ্রহণ করে পাহাড়ে সেনা সাহায্যকে বৈধতা দিয়ে থাকেন, সেটিও ইতিহাসের আলোচনায় আসবে। তাঁর ধর্মীয় আন্দোলন যদি মূলত চাকমাকেন্দ্রিক হয়ে থাকে, তাঁর শিষ্যদের জাতিগত পরিচয়ের তথ্য দিয়ে সেটিও যাচাই করা হবে।

এসব প্রশ্ন ধর্ম অবমাননা নয়। এগুলো ইতিহাসের প্রশ্ন। আর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শত্রু অন্ধ ভক্তি।

তাই কয়েকটি প্রশ্ন সামনে থাকুক। “আমা ভান্তে” কথাটি কখন থেকে জনপ্রিয় হলো? বনভান্তের প্রধান মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা ও অন্য জুম্ম শিষ্য কারা ছিলেন? তিনি শান্তিবাহিনী সম্পর্কে ঠিক কী বলেছিলেন? আধুনিক শিক্ষা সম্পর্কে তাঁর সম্পূর্ণ বক্তব্য কী ছিল? সেনাবাহিনীর সঙ্গে রাজবন বিহারের সম্পর্ক কখন শুরু হয়েছিল? কী কী সহায়তা নেওয়া হয়েছিল? আর সেনা সহায়তা গ্রহণকে পাহাড়ি সমাজে স্বাভাবিক করে তোলার ইতিহাস কোথা থেকে শুরু?

যাঁরা জানেন, তাঁরা লিখুন। যাঁদের কাছে পুরনো অডিও, ছবি, চিঠি, দলিল বা প্রত্যক্ষ স্মৃতি আছে, তাঁরা সামনে আনুন। কেউ যদি বলেন এসব অভিযোগ মিথ্যা, দলিল দিন; কেউ যদি বলেন সত্য, তাহলেও দলিল দিন।

১৯৮০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত যখন পাহাড়ের মানুষের ভূমি, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক অধিকার ও অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে ছিল, তখন আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল কী—আরও বেশি ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও পুণ্য, নাকি আরও বেশি স্কুল, উচ্চশিক্ষিত তরুণ, সামাজিক সংগঠন, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস?

আর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি রয়ে যায়—যে জুম্ম সমাজ একসময় সেনাবাহিনীর সাহায্য নেওয়াকে ঘৃণা ও সন্দেহের চোখে দেখত, সেই সমাজে আজ সেনা সাহায্য এত স্বাভাবিক হয়ে গেল কীভাবে? সেই পরিবর্তনের ইতিহাসে বনভান্তের ভূমিকা কতটা?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হবে। কারণ পাহাড়ের ইতিহাস শুধু কে কত বড় ধর্মগুরু ছিলেন তার ইতিহাস নয়; পাহাড়ের ইতিহাস এটাও—কার নেতৃত্ব সমাজকে শিক্ষিত, সংগঠিত, সচেতন ও নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে, আর কোন সামাজিক পরিবর্তন বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের বদলে সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরতার সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক করেছে।

বনভান্তে কত বড় সাধক ছিলেন, সেটি ধর্মীয় ইতিহাস বিচার করবে। কিন্তু তাঁর সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবও ইতিহাস বিচার করবে। একজন ধর্মগুরুকে শ্রদ্ধা করা মানে তাঁর প্রভাবের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন করা নিষিদ্ধ নয়। ভক্তি ধর্মের বিষয়; ইতিহাস প্রমাণের বিষয়। দুটিকে এক করে ফেললে সত্য হারিয়ে যায়।

পড়ার জন্য সূত্র: রাজবন বিহার—বনভান্তের তথ্যপঞ্জি · পার্বত্য এলাকার বৌদ্ধ ধর্মের অতীত ও বর্তমান প্রেক্ষাপট · পার্বত্য ভিক্ষুসংঘ—রাজগুরু অগ্রবংশ মহাস্থবির · মহালছড়ি হামলার পর পার্বত্য ভিক্ষুসংঘের প্রতিবাদ.

Do you want to know more?

Please check here


নারীকে বাইরে রেখে পাহাড়ের আন্দোলন কতদূর যাবে?

নারীকে বাইরে রেখে পাহাড়ের আন্দোলন কতদূর যাবে?

যে বিপ্লবে নারীদের সম্পৃক্ত করা যায় না, সেই বিপ্লব কখনোই সত্যিকার অর্থে গতিশীল হয় না। পাহাড়ে এই কথাটি আজ নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। কারণ সময় বদলেছে, বাস্তবতা বদলেছে, কিন্তু আমাদের চিন্তার কাঠামো অনেক জায়গায় এখনো থমকে আছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিপ্লবের ইতিহাস আজকের নয়। এটি প্রায় শতাব্দীজুড়ে বিস্তৃত। এই দীর্ঘ ইতিহাসে পাহাড়ি আদিবাসী নারীরা শুধু দর্শক ছিল না। তারা বিভিন্নভাবে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল—খাদ্য জোগানো, বার্তা বহন, আশ্রয় দেওয়া, এমনকি সশস্ত্র সংগ্রামের গল্পও আমরা শুনেছি। শান্তিবাহিনী গঠনের সময় নারী সশস্ত্র কর্মীর কথা লোকমুখে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে তাদের উপস্থিতি ছিল সীমিত, দৃশ্যমান ছিল না। হয়তো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে, হয়তো তৎকালীন বাস্তবতায় নারীদের সেই জায়গা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় এখন পেরিয়ে গেছে।

আজ পৃথিবী নারী ও পুরুষকে আর আলাদা করে বিচার করে না। শুধু সংখ্যায় নয়, শক্তিতে, মেধায়, সাহসে এবং অধিকারেও তারা সমান। পাহাড়ের দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হয়। অনেক জায়গায় নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়েও বেশি। তাহলে এই বিশাল শক্তিকে বাদ দিয়ে কোনো আন্দোলন কীভাবে সফল হতে পারে? বড় একটি অংশকে উপেক্ষা করে কোনো সংগ্রাম কখনোই পূর্ণতা পায় না—এটা শুধু তত্ত্ব নয়, বাস্তব সত্য।

আবেগ থেকে নয় বরং বেঁচে থাকার তাগিদ থেকে পাহাড়ি নারীরা আন্দোলনে যুক্ত হতে চায়। জমি হারানোর যন্ত্রণা, নিরাপত্তাহীনতা, পরিবার ভাঙনের ভয়—এসব তারা প্রতিদিন নিজের শরীরে বহন করে। পুরুষের চেয়ে নারীর জীবন পাহাড়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তাদের সংগ্রামে আগ্রহ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন। এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে কোনো আন্দোলন দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।

তবুও পাহাড়ের সমাজ এখনো গভীরভাবে পুরুষতান্ত্রিক। নারীদের দুর্বল ভাবা হয়। তাই তাদের আন্দোলনের কেন্দ্র থেকে দূরে রাখা হয়। অথচ বাস্তবতা হলো, নারীরাও এই সংগ্রামে যুক্ত হতে চায়। একজন পুরুষ যেমন তার জাতি, ভূমি ও অস্তিত্বকে ভালোবাসে, একজন নারীও ঠিক তেমনই ভালোবাসে। তারা আগ্রহ দেখালে তাদের “না” বলা আসলে নৈতিকভাবে সঠিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও দূরদর্শী নয়।

আজ পাহাড়ে আমরা দলের দুর্নাম শুনি—দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার। এগুলো কেবল ব্যক্তিগত চরিত্রের সমস্যা নয়, এগুলো কাঠামোগত সমস্যা। বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পুরুষদের একচেটিয়া বলয়ের ভেতরে এসব প্রবণতা সহজে জন্মায়। নারীরা পাশে থাকলে অনেক সময় এই প্রবণতা কমে আসে। কারণ নারীরা শুধু সহানুভূতির প্রতীক নয়, তারা সংযম, জবাবদিহি এবং দায়িত্ববোধের শক্তিশালী উপস্থিতি। সংগ্রামে নারী কর্মীরা অনেক সময় শুধু কাজের শক্তি নয়, বরং সান্ত্বনা ও গভীর অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।

আরেকটি কঠিন সত্য হলো, নারীদের বাদ পড়ার পেছনে শুধু সমাজ নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পুরুষ নেতৃত্বও দায় এড়াতে পারে না। অনেক নারী এগিয়ে আসতে চাইলেও তাদের সামনে রাখা হয় অবিশ্বাস, সন্দেহ আর নীরব ভয়। আন্দোলনে যুক্ত হলে নারীদের চরিত্র নিয়ে গুজব ছড়ানো হয়, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এই সামাজিক শাস্তির ভয় অনেক নারীকেই পেছনে সরিয়ে রাখে। এটা নারীদের দুর্বলতা নয় বরং এটা আন্দোলনের নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়ার ফল।

কাজ না থাকলে মানুষ বিপথে যায় আর এটা পাহাড়েও সত্য।

আজ প্রশ্ন হচ্ছে, নারীরা কী করবে? আমরা কি তাদের সমাজের কাজে, জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে যুক্ত হওয়ার কোনো বাস্তব পথ খুলে দিতে পেরেছি? যদি না পারি, তাহলে তারা যখন ভিন্ন পথ বেছে নেয়, তখন শুধু দোষারোপ করলেই কি আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়?

আমরা একই কলেজে পড়েছি, একই ডিগ্রি নিয়ে পাশ করেছি। আমি পুরুষ বলে রাজনীতি করি, দল করি, নেতা হই। কেউ টাকার জোরে বড় পদে বসি, কেউ দেশ ছেড়ে বিদেশে থাকি, কেউ ব্যবসা, গাড়ি, বাগান আর সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকি, কেউ অস্ত্র ধরে নিজেকে বড় বিপ্লবী বানাই। কিন্তু নারীরা এসবের কোনোটাই সহজে করতে পারে না। তারা ভান্তে হতে পারে না, দল করে নেতা হতে পারে না, আপনার মতো দেশ ছেড়ে পালাতে পারে না, সেনা ক্যাম্পের ছায়ায় বিপ্লবী সাজতে পারে না, বন্দুক হাতে চাঁদা তুলে জীবন চালাতে পারে না।

তাদেরও স্বপ্ন আছে। বড় হওয়ার স্বপ্ন, নেতৃত্ব দেওয়ার স্বপ্ন, একটু ভালোভাবে বাঁচার স্বপ্ন। এই স্বপ্নগুলোর জন্য আমরা যদি কোনো সম্মানজনক পথ না রাখি, তাহলে তারা যখন অন্য জাতির পুরুষের হাত ধরে চলে যায়, নামের শেষে আদিবাসীর টাইটল বাদ দিয়ে অন্য টাইটলে পরিচিত হয় তখন আমরা শুধু একজন মানুষকে হারাই না। আমরা হারাই আমাদের ভবিষ্যতের এক বড় শক্তিকে।

এই নারীরাই আমাদের জন্য ভাত রান্না করতে পারত, জঙ্গলে অসুস্থ হলে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে পারত, জাতির অস্তিত্ব রক্ষার পরিকল্পনার সমান অংশীদার হতে পারত। আমরা যা পারি, তারাও তা পারে। একজন অসুস্থ সৈনিকের পাশে একজন নারী সৈনিকের গুরুত্ব কতটা, তা সৈনিক না হলে বোঝা কঠিন।

বিশ্বে ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে অনেক সময় একজন পুরুষ সৈনিকের সঙ্গে একজন নারী সৈনিক রাখা হয় যেন মিশন যেন সফল হয়। একজন পুরুষ সহজে একজন নারী সহযোদ্ধাকে ফেলে যায় না, যেমন একজন নারীও সহজে একজন পুরুষ সহযোদ্ধাকে ছেড়ে যায় না। এই বাস্তবতার কারণেই অনেক দেশ, বিশেষ করে ইসরায়েল, এই নীতিকে গুরুত্ব দেয়। এটি কোনো আবেগী ধারণা নয়, এটি পরীক্ষিত কৌশল।

আজ পাহাড়ি কিশোরী মেয়েরা এই আন্দোলনের দিকে তাকিয়ে কী শিখছে, সেটাও আমাদের ভাবা দরকার। তারা কি শিখছে যে এই সংগ্রাম শুধু পুরুষদের জন্য? তারা কি ভাবছে, এখানে আমার কোনো জায়গা নেই? যদি আজ আমরা এই বার্তাই দিই, তাহলে দশ বছর পরে পাহাড়ের আন্দোলন আরও সংকীর্ণ, আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। তখন শুধু নারীরা নয়, পুরো একটি প্রজন্ম আমাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।

পাহাড়ে বিষয়টি এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার নয়।

নারীদের দূরে ঠেলে নয়, কাছে টেনে নিতে হবে। তাদের শুধু সহযোগী হিসেবে নয়, সিদ্ধান্তের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। বিপ্লবকে যদি সত্যিকার অর্থে জীবিত, বিশ্বাসযোগ্য ও টেকসই করতে চাই, তাহলে আজই এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। বিপ্লব সফল করতে হলে নারীদের জায়গা আজই তৈরি করতে হবে—আগামীকালের জন্য নয়, এখনই।

ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী রাশিয়ার হাতে কতটা ইউক্রেনের ভূখণ্ড যাবে?

ট্রাম্প-শান্তি-আলোচনা

ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে যে ২৮ দফা খসড়া শান্তি পরিকল্পনা তৈরি করেছেন। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই চুক্তি হলে ইউক্রেনের কতটা জমি রাশিয়ার হাতে স্থায়ীভাবে থেকে যাবে। এই খসড়া প্রথমে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP) এবং পরে স্কাই নিউজসহ বড় বড় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম হাতে পায় ও বিস্তারিত প্রকাশ করে।

এই পরিকল্পনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ক্রিমিয়া, লুহানস্ক এবং দোনেৎস্ক—এই তিন অঞ্চলকে “ডি ফ্যাক্টো” অর্থাৎ বাস্তবে রাশিয়ার অংশ হিসেবে ধরে নিতে হবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও এই অবস্থান মেনে নেবে। এখন দোনেৎস্কের প্রায় ১৪% এলাকা ইউক্রেনের হাতে রয়েছে। খসড়ার প্রস্তাব অনুযায়ী সেই অংশ থেকেও ইউক্রেনকে সেনা সরিয়ে নিতে হবে এবং পুরো অঞ্চলটিকে একটি নিরস্ত্রীকৃত বাফার জোনে পরিণত করা হবে এবং এই অঞ্চলকে পরে আন্তর্জাতিকভাবে রাশিয়ার ভূখণ্ড হিসেবেই গণ্য করা হবে।

দক্ষিণের খেরসন ও জাপোরিঝিয়া অঞ্চলের ক্ষেত্রে নিয়ম হবে সোজা। বর্তমান যে “লাইন অব কন্ট্যাক্ট” বা ফ্রন্টলাইন আছে, সেটাকেই স্থায়ী সীমান্ত হিসেবে ধরে নেওয়া। অর্থাৎ যেসব জায়গা এখন রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে আছে, সেগুলোই ভবিষ্যতেও রাশিয়ার কাছে থাকবে। ইউক্রেনের হাতে থাকা অংশে তারা থাকবে ঠিকই, কিন্তু সীমান্ত পরিবর্তন হবে না—সীমান্ত দাঁড়িয়ে যাবে বর্তমান অবস্থানে।

তাহলে মোট কতটা ভূখণ্ড রাশিয়ার হাতে থাকবে?

রয়টার্স বিভিন্ন সামরিক মানচিত্র, স্যাটেলাইট ডেটা ও ওপেন-সোর্স বিশ্লেষণ দেখে হিসাব করেছে যে রাশিয়া এখন ইউক্রেনের প্রায় ১১৪,৫০০ বর্গকিলোমিটার, অর্থাৎ রাশিয়া ইউক্রেনের মোট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এলাকার প্রায় ১৯% নিয়ন্ত্রণ করছে।

এই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে—

  • ক্রিমিয়া: প্রায় ২৭,০০০ বর্গকিমি
  • দোনেৎস্ক + লুহানস্ক (ডনবাস): প্রায় ৪৬,৫৭০ বর্গকিমি
  • জাপোরিঝিয়া + খেরসন (দখলকৃত অংশ): প্রায় ৪১,১৭৬ বর্গকিমি

এই তিনটি অঞ্চলের মোট আকার দাঁড়ায় প্রায় ১১৫,০০০ বর্গকিলোমিটার অর্থাৎ পুরো ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ, বা ২০%–এর কাছাকাছি। বিশ্বের অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠানও প্রায় একই সংখ্যা দিয়েছে।

শুধু ভূখণ্ডই নয়। খসড়ায় আরও কিছু কঠোর রাজনৈতিক ও সামরিক শর্ত আছে। যেমন—

  • ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিতে পারবে না।
  • ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর সংখ্যা ৮৮০,০০০ থেকে কমিয়ে ৬০০,০০০ করতে হবে।
  • রাশিয়ার ওপর দেওয়া অনেক নিষেধাজ্ঞা ধীরে ধীরে তুলে নিতে হবে।
  • পশ্চিমে হিমায়িত রুশ সম্পদের কিছু অংশ ইউক্রেন পুনর্গঠনে ব্যবহার করতে হবে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও কিয়েভের শীর্ষ কর্মকর্তারা এসব শর্তকে একেবারে অগ্রহণযোগ্য বলেছেন।তারা পরিষ্কার করে বলেছেন, ১৯৯১ সালের সীমান্তই ইউক্রেনের বৈধ সীমান্ত, এর কম কিছু মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।

ইউরোপের অনেক দেশও পরিকল্পনাটিকে “আগ্রাসনকে পুরস্কৃত করা” বলে সমালোচনা করেছে।

অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এটিকে আলোচনা শুরু করার ভিত্তি হিসেবে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে রাশিয়া নিজে কোনো এলাকা ছাড়তে রাজি এমন কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সব মিলিয়ে বর্তমান অবস্থা হলো, এই পুরো পরিকল্পনাটি এখনো শুধু একটি খসড়া। কোনো দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে এতে স্বাক্ষর করেনি।

তবে যদি এই কাঠামোই ভবিষ্যতের শান্তি চুক্তির ভিত্তি হয়, তাহলে ইউক্রেনকে যুদ্ধ থামানোর বিনিময়ে তাদের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দিতে হতে পারে—এটাই এই মুহূর্তে পাওয়া তথ্যের সবচেয়ে পরিষ্কার ও সহজ ব্যাখ্যা।

তবে জেলেনস্কি রাজি বলে শোনা যাচ্ছে।


রোহিঙ্গা, সেটলার, সীমান্ত ও ভূরাজনীতি: বাংলাদেশের নতুন সঙ্কটক্ষেত্র পাহাড়

রোহিঙ্গা, সেটলার, সীমান্ত ও ভূরাজনীতি: বাংলাদেশের নতুন সঙ্কটক্ষেত্র পাহাড়
রোহিঙ্গা, সেটলার, সীমান্ত ও ভূরাজনীতি: বাংলাদেশের নতুন সঙ্কটক্ষেত্র পাহাড়

পাহাড়, সীমান্ত, উত্তর-পূর্ব এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে একটি বিচার—শেখ হাসিনার বিচার—আর কেবল আদালতের পরিধিতে সীমাবদ্ধ নেই; তা এখন পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিকে নাড়া দিচ্ছে।

ঢাকায় ব্রিটিশ আইনজীবীদের আগমন দেখেই বোঝা যায়, এই বিচারকে ঘিরে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন উত্তেজনায় প্রবেশ করেছে, আর পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের নীরব যোগাযোগও অস্বাভাবিকভাবে তীব্র হয়ে উঠছে।

ভারত যেদিন দিল্লিতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টার হাতে জঙ্গি মুক্তি, সীমান্তে মৌলবাদী আশ্রয় এবং উত্তরাঞ্চলে চরমপন্থীদের উপস্থিতির তালিকা তুলে দিল, ঠিক সেই দিনই ঢাকায় পাকিস্তানের সামরিক প্রতিনিধিদল ছিল। একদিকে ভারতের উদ্বেগ বাড়ছে, অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রতি বাংলাদেশের সামরিক নৈকট্যও ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হচ্ছে—এমন দ্বিমুখী পরিস্থিতি এর আগে এত স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি।

ইসরায়েল–ভারত অক্ষ দক্ষিণ এশিয়াকে একটি নতুন নিরাপত্তা বলয়ে টানছে, যেখানে জেরুজালেম, দিল্লি ও ভারতের উত্তর-পূর্বের ভবিষ্যৎ একই সুতায় বাঁধা। এর বিপরীতে ঢাকা–ইসলামাবাদের হঠাৎ উষ্ণতা দেখা যাচ্ছে এমন সময়ে, যখন বাংলাদেশে মৌলবাদী উত্থান, কারামুক্ত চরমপন্থী এবং সীমান্ত–নিরাপত্তার দুর্বলতা নিয়ে ভারত প্রকাশ্য উদ্বেগ জানাচ্ছে।

ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন সরাসরি আঞ্চলিক রাজনীতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভারত–ইসরায়েল সম্পর্ক সুদৃঢ় হওয়ার পেছনে এমন কিছু বাস্তবতা আছে যা সাধারণ মানুষের নজরে এখনো পড়ছে না। শোনা যাচ্ছে, কাশ্মীরে হাসপাতালের নিচে গাজা-স্টাইলে হামাসের অস্ত্রভাণ্ডার পাওয়া যাচ্ছে। ইসরায়েল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—হামাস যেখানে থাকুক, ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে। সেই কারণে ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও দৃঢ় হচ্ছে।

পাকিস্তানের অতীত ইতিহাসও এ অঞ্চলে অশান্তির বড় উৎস। আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেন থেকে শুরু করে লস্কর-ই-তৈবা পর্যন্ত বহু সন্ত্রাসী সংগঠন পাকিস্তানের ছত্রচ্ছায়ায় বেড়ে উঠেছে। সন্ত্রাস দমনে ভারত–ইসরায়েল এক পথের পথিক; তাই তাদের ঘনিষ্ঠতা স্বাভাবিক।

কিছু দৈনিক সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, রোহিঙ্গা শিবিরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কিছু ইউনিট প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালাচ্ছে এবং সেখানে মৌলবাদী গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে যে অন্তত পাঁচ লক্ষ রোহিঙ্গা যুবককে জিহাদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। যদি এ অভিযোগ সত্যি হয়, তবে এটি শুধু মিয়ানমারের নয়, ভারতের জন্যও বড় নিরাপত্তা হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

দিল্লির সাম্প্রতিক বিস্ফোরণ ভারতকে নতুন করে স্মরণ করে দিচ্ছে যে মৌলবাদী নেটওয়ার্ক এখন আর সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করছে না; তারা ভারতের ভেতরেও শেকড় ছড়াতে শুরু করেছে। এই অস্বস্তিকর বাস্তবতাই দিল্লিকে কঠোর নিরাপত্তা নীতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন নেতা–আমলা শিলিগুড়ি করিডোর ও কলকাতা নিয়ে ভারতের প্রতি যেসব হুমকিসূচক মন্তব্য করেছেন, তাও দিল্লির উদ্বেগ বাড়ানোর অন্যতম কারণ।

এই সমগ্র অক্ষ-সংঘাতের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে পাহাড়ে। দখল, ধর্মান্তর, জনসংখ্যাগত প্রকৌশল, আর রাতারাতি মসজিদ–মাদ্রাসা নির্মাণ—এসব ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। বরং পাহাড়কে “নীরব অঞ্চল” হিসেবে দেখে বৃহত্তর নিরাপত্তা-রাজনীতির চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। যে পাহাড়ে একটি স্কুল তুলতে বছর লাগে, সেখানে ধর্মীয় কাঠামো রাতারাতি দাঁড়িয়ে যাওয়া সেই চাপেরই ইঙ্গিত বহন করে।

পাহাড়ের রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই ভাঙাগড়ার চক্রে আটকে আছে। চাকমা সমাজের ভেতরের বনবিহার-সংক্রান্ত ধর্মীয় বিতর্ক এমনভাবে তীব্র হয়েছে যে জাতিগত ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট দেখলেও অনেকে তা উপলব্ধি করতে পারছে না। এই ভাঙনই মৌলবাদী শক্তিকে জায়গা দিচ্ছে—কেননা বিভক্ত সমাজে প্রতিরোধ সবসময়ই দুর্বল হয়।

বান্দরবান আজ দ্রুত মৌলবাদী প্রভাবের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। সেখানে আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তির কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব নেই বললেই চলে। নির্বাচন ঘিরে পাহাড়ি সমাজের একাংশের বিএনপি ও অন্যান্য জাতীয় দলে হঠাৎ ঝোঁক প্রমাণ করছে—পাহাড়ের রাজনৈতিক দিশাহীনতা কতটা গভীর হয়েছে। স্বাধীনতার পর এত স্পষ্টভাবে এ চিত্র আর দেখা যায়নি।

চাকমা সমাজ পাহাড়ের রাজনৈতিক চালিকা শক্তি। তারা যখন বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, তখন মারমা, ত্রিপুরা এবং অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীও স্বাভাবিকভাবেই দিশাহীন হয়। পরিবারের বড় ভাই যখন পথ হারায়, তখন ছোট ভাইয়েরা বিচলিত না হয়ে পারে না—পাহাড় এখন সেই অবস্থার মধ্যেই আছে।

এই পরিস্থিতিতে ধর্মীয় সংকটের দ্রুত সমাধান অত্যন্ত জরুরি। তা চাকমা রাজার মধ্যস্থতায় হোক, দায়ক–দায়িকার নির্দেশনায় হোক, কিংবা গণভোটের মাধ্যমেই হোক—পাহাড়কে প্রথমে ধর্মীয় বিভাজন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ এই সমস্যার সমাধানেই ‘রাজনৈতিক ঐক্যের সূত্র’ দেখাতে পারে; সেই ‘রাজনৈতিক ঐক্যের সূত্র’ ছাড়া পাহাড় কোনো বৃহত্তর সংকট মোকাবিলা করতে পারবে না।

হাসিনার বিচার, ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং পাকিস্তানের সামরিক ছায়া—এই তিনটি রেখা এসে আজ পাহাড়ের ওপরই মিলিত হয়েছে। ভূরাজনীতি যখন রূপ বদলায়, আঘাত লাগে আগে সীমান্তে; আর বাংলাদেশের সবচেয়ে সংবেদনশীল সীমান্তই হলো পাহাড়। এই মুহূর্তে নীরব থাকা মানে আত্মসমর্পণ।

এখন প্রশ্ন একটাই, পাহাড় কি দখল, ধর্মান্তর ও মৌলবাদী কাঠামোর সামনে চুপ করে থাকবে, নাকি নিজের ভবিষ্যতের রক্ষক হিসেবে জেগে উঠবে? মানচিত্র বদলে গেলে জাতিও বদলে যায়। ১৯৪৭-এর এক নেহেরুর “নীরবতা”য় ৭৮ বছরে দীর্ঘ পরিক্রমায় পাহাড়ের আদিবাসী জাতিসত্তা প্রায় বিলুপ্ত। তাই এখনই সিদ্ধান্তের সময়, এখনই মাঠে নামার মুহূর্ত, এখন নয়তো আর কখনোই নয়।

পাহাড় একসময়ই ১৩ লক্ষ সেটলার আর ১ লক্ষ ২০ হাজার সেনার অত্যাচারে ক্ষতবিক্ষত ছিল; সেই পাহাড়েই যদি আজ ১৩ লক্ষ রোহিঙ্গা আর তাদের গঠিত পাঁচ লক্ষ জিহাদি যুক্ত হয়, তাহলে আগামী দশ বছরে পাহাড়ের অবস্থা কেমন হবে—তা ভাবলেও শিরদাঁড়া ঠান্ডা হয়ে আসে।


হিন্দু ও সংখ্যালঘুদের বিচার এত কম দামে কেন?

হিন্দু-ধর্ম- নিন্দা
গতকালের ঢাকায় প্রতিবাদের ছবি

বাংলাদেশে হিন্দু ও সংখ্যালঘুদের জন্য বিচার এখনো সমান নয়—এই কথাটি শুধু অনুভূতি নয়, এটি প্রতিদিনের বাস্তবতা। গতকাল হিন্দু ও সংখ্যালঘুরা একজন মুসলিম সংসদ সদস্যের হিন্দু ধর্ম অবমাননার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে। তারা ব্যানার তুলেছে, প্ল্যাকার্ড ধরেছে, এবং প্রকাশ্যে আওয়াজ তুলেছে.

কারণ আর নীরব থাকা সম্ভব নয়। হিন্দু ধর্মকে প্রকাশ্যে অপমান করা হয়েছে, অথচ রাষ্ট্রের কোথাও সেই জরুরি ব্যবস্থা দেখা যায়নি। এই ঘটনাই স্পষ্ট করে দেয়, বাংলাদেশে বিচার আজো পরিচয় দেখে বদলায়—ক্ষমতাবান হলে নিরাপদ, সংখ্যালঘু হলে বিপদ।

অনেক সময় মহাবিপদ। ঘর-বাড়ী এবং কি গ্রাম আক্রমণ করা হয়।

যদি এই অভিযুক্ত লোকটি মুসলিম না হয়ে হিন্দু বা কোনো সংখ্যালঘু হতো আর হিন্দু পরিচয়ে ইসলাম ধর্ম নিয়ে একটি শব্দও বলত, তাহলে অনেক আগেই তার বাড়ি আক্রমণ হতো। তার পরিবার রাতারাতি পালাতে বাধ্য হতো। স্থানীয় ধর্মীয় গোষ্ঠী মাইক হাতে রাস্তায় নামত আর পুলিশ “পরিস্থিতি শান্ত রাখতে” সঙ্গে সঙ্গেই তাকে আটক করত।

যা শুনলেন সেটাই বাংলাদেশের নিত্যদিনের বিচারব্যবস্থা। একটা আইন কিন্তু তার প্রয়োগ দুই রকম: মুসলিমের জন্য এক ধরনের, হিন্দু ও সংখ্যালঘুর জন্য আরেক ধরনের।

বাংলাদেশে হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুর ওপর ধর্ম অবমাননার অভিযোগে যা যা হয়েছে, তা ইতিহাসের সবচেয়ে অসম অধ্যায়। রামুর বৌদ্ধ বিহার পুড়েছে, উখিয়ার মন্দির ভেঙেছে, পাবনায় হিন্দু বাড়িঘর লুট হয়েছে, ভোলায় হিন্দু যুবকের আইডি হ্যাক করে দোষ চাপিয়ে মানুষের প্রাণ গেছে।

রংপুরে গুজব ছড়িয়ে পুরো গ্রাম উচ্ছেদ হয়েছে, কোথাও কুমিল্লায় স্ক্রিনশট ছড়িয়ে ঘরে আগুন লেগেছে। প্রতিটি ঘটনায় একই নাটক—সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তাকে শাস্তি দিতে সবাই এক হয়। কিন্তু সংখ্যালঘু আক্রান্ত হলে রাষ্ট্র “তদন্ত” করে, অপেক্ষা করে, নীরব থাকে।

তারপর একদিন সব কোথায় যেন হারিয়ে যায়। অপরাধী পার পেয়ে যায় এবং আবার সেই একই কাজ করে বীর দর্পে সমাজে ঘুরে বেড়ায়।

হিন্দু ও সংখ্যালঘুর অনুভূতি কি অনুভূতি নয়?

একজন হিন্দু বা সংখ্যালঘু যদি ভুল করে, কিছু লেখে, প্রশ্ন তোলে, তৎক্ষণাৎ ধর্ম অবমাননার মামলা হয়। কিন্তু একজন মুসলিম, তা সে সাধারণ মানুষ হোক বা সংসদ সদস্য, যদি প্রকাশ্যে হিন্দু ধর্মকে অপমান করে তখন কেন সেই একই উত্তেজনা দেখা যায় না? কেন তার বিরুদ্ধে মামলা হয় না? কেন তার বাড়ি আক্রমণ হয় না? কেন প্রশাসন জরুরি সভা ডাকে না?

এই দ্বৈত বিচারই সংখ্যালঘুদের মনে সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা তৈরি করেছে আর সেটাই গতকালে প্রতিবাদে অংশ নেওয়া মানুষের মুখে আগুণ হয়ে বেরিয়ে এসেছে।

হিন্দু ও সংখ্যালঘুরা কারও শত্রু নয়। তারা এই দেশকে ভালোবাসে, কর দেয়, শ্রম দিয়ে এই দেশ তৈরিতে অংশ নেয়, সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখে, উৎসবকে রঙিন করে। অথচ কেন তাদের সম্মানের মূল্য এত কম? কেন তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কেউ ভাবেন না? কেন তাদের সন্তান স্কুলে গেলে দুশ্চিন্তা থাকে, উৎসব এলে আতঙ্ক বাড়ে, আর কোনো অপমান হলে বিচার পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়?

এই প্রশ্নগুলো আজ বাংলাদেশের সামগ্রিক বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

গতকালের সমাবেশ তাই শুধু একটি বিক্ষোভ নয়। সেটি হিন্দু ও সংখ্যালঘুদের দীর্ঘদিনের নীরবতার বিরুদ্ধে প্রথম বড় প্রতিবাদ। এটি জানিয়ে দেওয়া যে হিন্দু ও সংখ্যালঘুরা আর ভয় পাবে না, আর চুপ থাকবে না, আর নিজের অপমান মেনে নেবে না।

এটি জানিয়ে দেওয়া যে হিন্দু ধর্মকে অপমান করার অধিকার কারও নেই তা সে মুসলিম হোক, রাজনৈতিক নেতা হোক, কিংবা ক্ষমতার কেন্দ্রের কেউ হোক। বিচার যদি সবার জন্য সমান হয়, তবে হিন্দু ও সংখ্যালঘুর মর্যাদাও সবার মতো সমান হবে—এটাই আজকের দাবির কেন্দ্রবিন্দু।

বাংলাদেশের ইতিহাসে কত বৌদ্ধ মন্দির পুড়েছে, কত বৌদ্ধমূর্তি ভাঙা হয়েছে, তার পূর্ণ হিসাব কি আমাদের কাছে আছে?

শত শত বছরের পুরোনো বিহার ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। বুদ্ধমূর্তি ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে। তবুও সেগুলোকে কেউ “ধর্ম অবমাননা” বলে মানতে চায় না। একইভাবে কত হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি ভাঙা হয়েছে, কত মন্দিরে আগুন দেওয়া হয়েছে, কত প্রতিমা অবমাননার শিকার হয়েছে তার কোনো বিচার আজও সম্পূর্ণ হয়নি।

তবে যখন সংখ্যালঘুরা কিছু বললে, সামান্য রসিকতা করে বা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয় তখনই হঠাৎ ধর্ম অবমাননার ঝড় উঠে। সংখ্যাগুরু যখন ভাঙে, সেটি দাঙ্গা বা উত্তেজনা। কিন্তু সংখ্যালঘু যখন কথা বলে, সেটি নাকি অপরাধ। এই বৈপরীত্যই বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্মম সত্য।

বাংলাদেশ চাইলে বদলে যেতে পারে, কিন্তু তার প্রথম শর্ত হলো সত্য স্বীকার করা। তবে বদলে যাওয়ার আশা একদম শূন্য কোঠায়। তবু মনে আশা জাগে যদি বদলে যেত।

এই দেশে ধর্মের নামে বহু হিন্দু ও সংখ্যালঘু পরিবার হামলার শিকার হয়েছে, ঘরবাড়ি হারিয়েছে, অপমানিত হয়েছে, আর বহু অপরাধী রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে শাস্তি এড়িয়ে গেছে। ন্যায়বিচার তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন হিন্দু ও সংখ্যালঘুর জীবন, অনুভূতি এবং সম্মানকে সমান মূল্য দেওয়া হবে।

কারণ হিন্দু ও সংখ্যালঘুর জীবনও জীবন, অনুভূতিও অনুভূতি, আর মর্যাদাও মর্যাদা।


ঢাকার ভারত বিরোধিতা বাড়লে পাহাড় কেন প্রথমে জ্বলে ওঠে?

বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান

বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান দিল্লিতে গিয়ে দোভালের টেবিলের সামনে বসে যে “ডসিয়ার” হাতে পেয়েছেন, সেটা শুধু কাগজ নয়—এটা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ টানাটানির খসড়া। কিন্তু তিনি ঢাকায় ফিরে এসে কি একটুও শান্তি পেয়েছেন?

আমার মনে হয় তিনি বিমানবন্দরের দরজার ভেতরে পা রাখতেই বুঝে গেছেন—এই দেশকে বোঝানোই সবচেয়ে কঠিন কাজ।

ব্যথাটা কোথায় জানেন?

দিল্লির দোভাল যতটা কঠোর, ঢাকার জনতা তার চাইতেও কঠোর। যেখানে দেশের ৯৯% মানুষ ভারতকে চোখের শত্রু ভাবে এবং পাকিস্তানকে আদর্শ শ্বশুরবাড়ি বানিয়ে বসে, সেখানে নিরাপত্তা উপদেষ্টা ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করবেন কীভাবে?

কূটনীতি যতই নিখুঁত হোক, জনমতের উত্তাপ তাকে টেনে ধরেই রাখে।

বাংলাদেশের রাজনীতি বহু বছর ধরে একটি অদ্ভুত যাত্রাপথে চলে। ভারতের সঙ্গে শত্রুতা দেখিয়ে পাকিস্তানের প্রতি গোপন মায়া রেখে। নাটক সবাই দেখতে অভ্যস্ত, কিন্তু দোভাল নাটকের ভাষা বোঝেন না; তিনি শুধু রিপোর্ট দেখেন।

আর সেই রিপোর্টে ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে ভারতের ওপর হামলার পরিকল্পনা চলছে। স্যাটেলাইট ছবি, কললগ, ডিজিটাল রেকর্ড—সব তিনি খলিলুর রহমানের হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন।

এই সবকিছু আর কূটনীতির নরম ভাষা নয়; এটা সরাসরি সতর্কতা। দিল্লি আজ কথায় নয়, প্রমাণে কথা বলছে। কিন্তু আমার ভয়টা ঢাকা নয়। আমার ভয়টা পাহাড়। ঢাকার রাজনীতি যত উত্তপ্ত হয়, পাহাড়ের বাতাস তত শুষ্ক হয়ে যায়। ঢাকার মন্ত্রীরা যখন একে অন্যকে দোষ দেয়, সেটলাররা তখন বলে, “সমস্যা পাহাড়িদের।তারা এর জন্য দায়ী!”

এটাই বাংলাদেশের বাস্তবতা।

ঢাকার ভেতরের ভারত বিরোধিতা যত বাড়ে, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি এবং বান্দরবানের রাত তত অস্থির হয়। বলতে খারাপ লাগলেও সত্যি যে ঢাকা–দিল্লির সম্পর্ক যত খারাপ হয়, পাহাড় তত বেশি সেনা–সন্দেহ–চাপের নিচে পড়তে থাকে। রাষ্ট্রের অভ্যাস একই—সমস্যা যেদিকে হোক, পাহাড়িরা সবসময় সন্দেহভাজন। এ বাস্তবতা পাহাড় বহু দশক ধরে বহন করছে।

আমি ভাবি, এই ৯৯% ভারত বিরোধী জনতার মধ্যে দাঁড়িয়ে নিরাপত্তা উপদেষ্টা কী করবেন? দোভালকে তিনি বোঝাতে পারেন। কিন্তু দেশের ভেতরের জনমতকে বোঝাবেন কী দিয়ে? দেশের মানুষজন যখন পাকিস্তানের নাম শুনে হাসে আর ভারতের নাম শুনে রাগে, সেই মাটিতে দাঁড়িয়ে কূটনীতি কি আদৌ দাঁড়াতে পারে?

আর যদি একদিন সত্যিই দু’দেশের সম্পর্ক উত্তপ্ত হয়ে ওঠে—সবচেয়ে আগে কি পাহাড়ই পোড়াবে না? ঢাকা–দিল্লি উত্তেজনায় কলকাতা–ঢাকা সীমান্ত হয়তো খুব বেশি টের পাবে না। কিন্তু খাগড়াছড়ির রাত, রাঙামাটির নৌপথ, বান্দরবানের পাহাড়ি চূড়া—এসব জায়গায় ভয়ের ঘন কুয়াশা নেমে আসবে। ইতিহাস অন্তত তাই বলে। সবসময়ই তা হয়ে এসেছে।

নিরাপত্তা উপদেষ্টা চেষ্টা করছেন—এটা অবশ্যই তাঁর ব্যক্তিগত সাহস। কিন্তু হাজার বছরের রাজনৈতিক অভ্যাস কি এক মানুষের কূটনীতিতে বদলায়? একজন মানুষ ডসিয়ার বয়ে আনতে পারে, কিন্তু দেশের মানসিকতা বয়ে আনতে পারে না। এই সীমাবদ্ধতাই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

তাই প্রশ্নটা থেকে যায়, বাংলাদেশ–ভারতের ভবিষ্যৎ কি সংঘর্ষ ছাড়া টিকবে? আর যদি না টিকে—এই আগুনের প্রথম ঝলসানি কি আবারও পাহাড়কেই পুড়িয়ে দেবে? শেষ পর্যন্ত হয়তো পাহাড়ের মানুষই বলবে, ঢাকা–দিল্লির ঝগড়া তোমাদের, কিন্তু ধুলোটা সবসময় পড়ে আমাদের ঘরেই।

কিন্তু পাহাড় কি সেটা বলার পর চুপ থাকবে?

আমি মনে করি না। তাছাড়া ভারত কিন্তু এবার আগের মত ক্ষমা করবে বলে মনে হয় না। এবার কিছু একটা হতে পারে সেটা বাংলাদেশের সমতলের মানুষ বুঝতে পারছে কিনা আমি জানি না। সীমান্তের বিষয়গুলো আমাদের তা জানিয়ে দিচ্ছে।


রাঙামাটিতে “শান্তিপূর্ণ” হরতাল: শান্তি গেল কোথায়?

সেটলার -হরতাল 2025
(সেটলারেরা ঘিরে ধরেছে আদিবাসীদের ছবিতে দেখা যাচ্ছে)

রাঙামাটিতে আজকের সেটলার হরতালটা ছিল নাকি পুরোটাই শান্তিপূর্ণ—এমনটাই ঘোষণা ছিল। কিন্তু রাস্তায় নেমে দেখা গেল শান্তি নয়, শান্তিকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা।

ভাইরাল হওয়া ছবিগুলোতে দেখা গেছে, পিকেটিংকারীরা আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের থামিয়ে জেরা করছে, ধাক্কাধাক্কি করছে। পরে আদিবাসী যুবকের গায়ে হাত তুলেছে যদিও আদিবাসী ভদ্রলোক শান্ত ছিলেন আর এটাই নাকি সেটলার বাঙালীদের শান্তির সংজ্ঞা।

পুলিশ পাশে দাঁড়িয়ে দেখল কিন্তু থামাল না। পরে আস্তে করে এসে থামানোর চেষ্টা করল। তারা আরো আগে এসে বিষয়টি সামাল দিতে পারত।

কিন্তু করল না।

পুলিশ কি তাহলে আদিবাসীদের ওপর আগে আক্রমণ করা হোক সেই পর্যন্ত অপেক্ষায় ছিল?

আরও মজার ব্যাপার হলো, এক আদিবাসী মহিলা পুলিশকে পর্যন্ত হেনস্তা করেছে সেটলাররা। সব পুলিশ দাঁড়িয়ে তাণ্ডব দেখল; সেটলাররা দাঁড়িয়ে হাতে ধাক্কা দিল; আর শান্তিপূর্ণ হরতাল দাঁড়িয়ে রইল নামের মাঝেই।

পাহাড়ের মানুষ বোঝে যখনই “শান্তি” শব্দটা জোরে বলা হয়, তখনই সবচেয়ে বেশি গোলমাল শুরু হয়।


ফেসবুক নয়, এখন সময় আদিবাসীদের নিজস্ব সংবাদমাধ্যম দাঁড় করানোর

songbad-2

রাঙামাটির জেলাপরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে সেটলারদের যে অমানবিক আচরণ দেখলাম, তা দেখে আমি আশ্চর্য হইনি। কারণ আমি বাল্যকাল থেকেই সেটলারদের এই আচরণ দেখেই বড় হয়েছি। এই দৃশ্য আমার কাছে নতুন নয়, বরং পুরনো এক বাস্তবতার পুনরাবৃত্তি।

শুধু পাহাড়েই নয়, পৃথিবীর অসংখ্য জায়গায় অমুসলিম, আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের প্রতি মুসলিম মৌলবাদের আচরণ কেমন—সেসব বিষয়েও আমি হাতে-কলমে, কখনো সশরীরে উপস্থিত থেকে শেখার সুযোগ পাচ্ছি।

আমার থেকেও হাজারোগুল অভিজ্ঞ অনেক মানুষ পার্বত্য চট্টগ্রামে, বাংলাদেশে, পৃথিবীর নানা দেশে রয়েছেন। তাই সত্যিটা এতটাই স্পষ্ট যে এই আচরণের বিশ্লেষণ করতে খুব আমার গভীরে যেতে হবে না।

ফেসবুকের পোস্ট দেখলেই বোঝা যায় কারা কী বলে। আমাদের পাহাড়ি আদিবাসীদের মধ্যে অনেকেই খুব সুন্দর লজিক সাজিয়ে কথা বলেন, তথ্য দেন, যুক্তি দেন। সমস্যা হলো, এই পোস্টগুলো কখনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে পৌঁছায় না।

অপরদিকে, আদিবাসী পাহাড়ি বিরোধীদের কথার পেছনে বড় মিডিয়ার শক্তি আছে, আর আমাদের কথা সীমাবদ্ধ থাকে ব্যক্তিগত টাইমলাইনে। এখানেই আমরা পিছিয়ে। আমাদের প্রয়োজন ছিল, এখনো আছে—নিজস্ব একটিভাবে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যম।

আমি অনেকদিন ধরেই ভাবছি, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের নিজস্ব সংবাদমাধ্যম থাকা জরুরি। কারণ প্রতিদিন আমি দেখি, ফেসবুকে অসংখ্য আদিবাসী ভাই-বোন কত সুন্দরভাবে লিখছেন। সুযোগ পেলে তারা আরও ভালো লিখতে পারবেন।

কিন্তু সুযোগই তো পাচ্ছেন না। একটু বেশি লিখলেই ফেসবুক তাদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়। যারা চাকরিজীবী, তারা তো কথাই বলতে পারেন না। তবুও যে সময়টা হাতে পান বা সুযোগ পান, জাতির জন্য, অস্তিত্বের জন্য যতটুকু পারেন লিখে যাচ্ছেন।

আদিবাসী যারা সাংবাদিকতায় আছেন, তারাও তো পুরো স্বাধীন নন। কারণ বসেরা অধিকাংশই আদিবাসীবিরোধী মনোভাব পোষণ করেন অথবা সরকারের নীতির অধীনে কাজ করতে বাধ্য। তবুও তারা যে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও লিখে যাচ্ছেন, তারা নিঃসন্দেহে ধন্যবাদ পাবার যোগ্য।

ফেসবুকের পোস্ট বিশ্বের সাংবাদিকতার সামনে খুব ক্ষুদ্র একটি মাধ্যম। হাজারো পাহাড়ি লেখকের পোস্ট এক পাশে, আর একজন জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সাংবাদিকের রিপোর্ট আরেক পাশে—এই তুলনা এক নয়। কারণ দুনিয়া “সাংবাদিক” পরিচয়কে মূল্য দেয়, “ফেসবুকার” পরিচয়কে নয়।
তাই ভাবছি, এই অবস্থা থেকে আমরা কীভাবে বের হবো?

এবিষয়ে আগেও লিখেছি, আজও লিখছি। আমাদের প্রয়োজন নিজস্ব একটি সংবাদপত্র, নিজস্ব কিছু রিপোর্টার। সাংবাদিকতা শেখার জন্য ডিগ্রি অবশ্যই ভালো। কিন্তু সবসময় বাধ্যতামূলক নয়। পাহাড়ে সাংবাদিকতার প্রধান যোগ্যতা হলো—সাহস, সততা, এবং জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা।

আর দক্ষতা?

তা শেখানো যায়। অর্জন করা যায়।

ধরুন, বিদেশে থাকা কোনো আদিবাসী ভাই-বোন স্থানীয় সরকারের অধীনে একটি নন-প্রফিট পত্রিকার নিবন্ধন করল। তারপর পাহাড়ের লেখকদের রিপোর্টার হিসেবে সার্টিফিকেট দিল। তারা ফেসবুকেও সেই পরিচয়ে রিপোর্ট লিখতে পারবে। যাদের অভিজ্ঞতা নেই, তাদের অনলাইনে দু’ঘণ্টার প্রশিক্ষণ দিলেই হয়।

শুরুতে লেখা দুর্বল হতেই পারে, কিন্তু কয়েক মাসে লিখতে লিখতেই দক্ষতা এসে যাবে। আর পেশাদার পাহাড়ি সাংবাদিকরা তো আছেন—অনেকেই সাহায্য করতে পারবেন।

আমি নিজেও তো সাংবাদিকতার ডিগ্রি নিয়ে আসিনি। সাংবাদিকও নই। তবুও লিখি।আমার যেমন IT ডিগ্রি নেই। কিন্তু ওয়েবসাইট বানাই, ডিজাইন করি, চালাই। প্রফেশনাল না হলেও চলার মতো দক্ষতা অর্জন করা যায়। আমাদের পাহাড়ের সাংবাদিকতাও সেভাবেই চলতে পারে।

অন্তত আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে তা বিশ্বাস করি।

এবার টাকার কথায় আসি। কোনো প্রয়োজন হলে তো আমরা লক্ষ লক্ষ টাকা তুলি। কখনো থেমে থাকি না। এবারের খাগড়াছড়ির ঘটনাতেও দেশ–বিদেশের আদিবাসীরা নিজেদের সাধ্যমতো সাহায্য পাঠিয়েছেন।

আমরা বিহার, আশ্রম, গরিব–অসহায় মানুষদের জন্যও প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টাকা দিই। এটা শুধু মানবিক কারণেই নয়, পাহাড়ের প্রতি মায়া থেকেই, পাহাড়কে ভালবাসি বলে দিই। পাহাড়কে ভালোবাসি বলে এই মাতৃভূমি পাহাড়ের মানুষকে ভালোভাবে বাঁচতে দেখতে চাই বলে দিই।

তাহলে পাহাড়ের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য একটি পত্রিকার জন্য কি আমরা সামান্য দান করতে পারি না? নিশ্চয়ই পারি। একবার ফান্ড তৈরি হলে তা দিয়ে আমাদের নিজস্ব মিডিয়া চালানো সম্ভব।

এই পত্রিকার নিয়ম খুব পরিষ্কার হবে—
• এটি হবে শুধুই অধিকারবিষয়ক
• পাহাড়ে যে অবিচার, নির্যাতন, বৈষম্য—সেগুলো তুলে ধরা হবে
• কোনো আঞ্চলিক দলের বিরুদ্ধে প্রচারণা করা যাবে না
• সংবাদের লক্ষ্য হবে মানুষ, দল নয়

এবার একটি বাস্তব উদাহরণ দিই।

কয়েকদিন আগে রাঙামাটির এক তরুণীর ফেসবুক পোস্ট ভাইরাল হয়েছিল, যেখানে তিনি নিজের গ্রামে সেটলার হামলার অভিজ্ঞতা লিখেছিলেন। সেই পোস্ট ডিলিট করে দেওয়া হয় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। তার অ্যাকাউন্টও সাসপেন্ড হয়ে যায়। তিনি আমাকে বলেছিলেন, “আমি যদি সাংবাদিক হতাম, তাহলে হয়তো আমার কথা কেউ মুছতে পারত না।”

এই কথাটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে।

শেষে একটা কথা বলি। এবারের খাগড়াছড়ি ঘটনায় আমি কোনো টাকা দিইনি। দিইনি মানে আমি সহানুভূতিশূন্য নই। সেটা নয়। দিইনি কারণ আমি একটা লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছি। আমার কাছে এক টাকা মানে এক লক্ষ টাকা।

কারণ আমি সত্যিই বিশ্বাস করি, পাহাড়ের নিজস্ব সংবাদমাধ্যমই আজ সবচেয়ে জরুরি। আমি এ বিষয়ে সিরিয়াস, এবং আমি বিশ্বাস করি, আমরা সবাই চাইলে এটি সম্ভব।

কি করে ফান্ড তোলা যায় বা কি করে পত্রিকা শুরু করা যায় আপনার সুচিন্তিত পরামর্শ দিয়ে দিলে ভাল হয়।


চাকমা রাজা বনাম বনভিক্ষু

Chakma raja vs Bana Bhikkhu
চাকমা রাজা বনাম বনভিক্ষু

বিষয়টি নিয়ে পাহাড়ের মানুষের মধ্যে এখনো বিতর্ক রয়েছে। কারো কাছে বিষয়টি পরিষ্কার, আবার কারো ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে স্বার্থসংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেই মনে হয়।

আমি এ নিয়ে একটি পোস্ট লিখতে চাই। জানি, অনেকে তাদের যুক্তি দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করবেন।

কিন্তু তার আগে কয়েকটি বিষয় আরও স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন।

জাপান একটি উন্নত গণতান্ত্রিক দেশ। কিন্তু এই দেশেও এখনো “Emperor” আছেন। তার রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই—তাই বলে সম্মান নেই, এমন নয়।

জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শপথ নেওয়ার আগে “Emperor”-এর কাছে মাথা নত করে শপথ নেন, তারপর সংসদে গিয়ে দ্বিতীয়বার শপথ নেন। রাষ্ট্রের বড় সিদ্ধান্তেও “Emperor”-এর সম্মতি লাগে।

আর যখন সে Emperor রাস্তা দিয়ে যান, জাপানের মানুষ মাটিতে মাথা রেখে তাকে সম্মান জানায়। তাদের সেই ভক্তি ও শ্রদ্ধা না দেখলে বোঝা যায় না।

এ রকম আরও বহু দেশে রাজাদের সম্মানের অসংখ্য উদাহরণ আছে।

ত্রিপুরা, মারমা—সবারই রাজ্য আছে। চাকমাদের নেই। চাকমারা সবচেয়ে দুর্ভাগা জাতি।

যে জাতির রাজ্য নেই, রাজাও নেই, সেই জাতির মতো দুর্ভাগা জাতি আর কোথায় আছে?

কিন্তু আমাদের সৌভাগ্য, রাজ্য না থাকলেও আমাদের মাননীয় চাকমা রাজাবাবু এখনো জীবিত। আমরা এখনো গর্ব করে বলতে পারি, “রাজ্য হারিয়েছি, কিন্তু রাজা হারাইনি।”

তাছাড়া আমাদের চাকমা রাজা একজন উচ্চ শিক্ষিত এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি। তাকে নিয়ে আমার সত্যি গর্ব হয়।

দেশে-বিদেশে তার একটি বিশাল সম্মান রয়েছে—সেটা আপনাদের অনেকে আমার চেয়ে ভালো জানেন।

এবার মূল প্রশ্ন, চাকমা সমাজের জন্য বনভিক্ষু বড়, নাকি চাকমা রাজাবাবু বড়?

হ্যাঁ, ধর্মীয় দিক দিয়ে বনভিক্ষুরা বড়—এটা সত্য।

কিন্তু জাতির অস্তিত্ব, ভূমির অধিকার, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে রাজাই বড়—এ সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

কারণ, চাকমা রাজা একটি ব্যক্তি নন—তিনি চাকমা জাতির ১,৫০০ বছরের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা।

তিনি জাতির অস্তিত্বের প্রতীক।

বাংলাদেশ ও পাকিস্তান—দুই রাষ্ট্রই বারবার রাজার প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করতে চেয়েছে। কারণ তারা জানত, রাজার প্রতিষ্ঠান শক্ত থাকলে জাতিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

কিন্তু তিনি এখনো টিকে রয়েছেন।

✡️ বনাম রাজনীতি – দুটি ভিন্ন ক্ষেত্র

অনেক ভান্তে মহান, জ্ঞানী, জাতির সম্পদ—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

কিন্তু কিছু ভান্তে যারা ধর্মের নামে রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছেন—তারা জাতির উপকার করছেন না; বরং বিভক্তি বাড়াচ্ছেন।

এখনকার সংকটে রাজাবাবু চুপিসারে সমাধান টানতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু কিছু ভান্তে তা অমান্য করেছেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কি জাতির জন্য ভালো?

সমস্যা সমাধানে রাজার কথা মানা হয় না। তাহলে কার কথা মানবেন? সমাধান তো একটা করতে হবে। সমাধান না করে তো থাকা যায় না। পৃথিবীর কোথাও এরকম নজির নেই।

যারা রাজার সিদ্ধান্ত মানেন না—তারা কার বিচার মানবেন?

হ্যাঁ, গণতান্ত্রিক দেশে কোর্ট আছে। তাহলে কি কোর্টের রায়ও মানতে রাজি হবেন?

✡️ চাকমা সমাজ আজ তিন ভাগে বিভক্ত

১. ধর্মীয় বিভাজন

২. রাজনৈতিক বিভাজন

৩. সংগঠনভিত্তিক বিভাজন

এই ভাঙন যত বাড়ছে, জাতির অস্তিত্ব তত ঝুঁকির দিকে যাচ্ছে।

একটি জাতি রাজা ছাড়া চলতে পারে। কিন্তু বিভক্ত জাতি কখনো টিকে থাকতে পারে না।

কিন্তু সমস্যা সমাধানে রাজার সিদ্ধান্ত মানা এখানে অনেক যুক্তিযুক্ত ছিল।

✡️ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কে চাকমার প্রতিনিধি?

রাজাবাবু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে চাকমা জাতির অস্তিত্বের কথা বলেন—এবং তা বিশ্বমঞ্চে গ্রহণও করা হয়।

জাতিগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি রয়েছে ‘Indigenous Monarch/Headman’—এর।

ধর্মীয় নেতারা কোথাও ‘পলিটিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ’ নন।

কোনো বনভিক্ষু এখনো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চাকমা জাতির হয়ে কথা বলতে পারেননি।

ঘরে সম্মান না থাকলে বাইরে সম্মান হয় না—এটাই বিশ্বসত্য।

অনেক কিছু লিখার আছে। তবে শেষ তো করতে হবে।

সোজা করে বলি, চাকমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে:

রাজাবাবুর কথা মানবেন, নাকি কিছু বিতর্কিত বনভিক্ষুর কথা মানবেন?

জাতির অস্তিত্ব রক্ষা করতে চাইলে, রাজাবাবুকে ঘরে আগে সম্মান দিন। ঘরে সন্মান পেলে বাইরেও সন্মান থাকে। বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। যে ধর্ম জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষা করে না সেই তুচ্ছ বিষয় নিয়ে যে মহান ব্যক্তি আন্তর্জাতিকভাবে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন তার সন্মান ক্ষুণ্ণ করা মঙ্গলজনক নয়।

(বিঃদ্রঃ—কে জাতির জন্য বেশি প্রয়োজন—চাকমা রাজাবাবু না বনভিক্ষু? এ বিষয়ে পাঁচটি তুলনা দিন। আমি সবার মন্তব্য পড়তে চাই এবং সমাজকে দেখাতে চাই, কারণ জাতি এই বিতর্কের সমাপ্তি চায়।)

পাহাড় থেকে উঠে আসা লেখকদের খুঁজছি

আমাদের পাহাড়ি লেখকদের গল্প যেন পৃথিবী শুনতে পায়
আমাদের পাহাড়ি লেখকদের গল্প পৃথিবীকে শুনাতে চাই

বন্ধুরা,
আমি এখন একটি জরিপ (survey) চালাতে চাইছি। আমাদের সেই সব প্রিয় পাহাড়ি ভাই-বোনদের নিয়ে, যারা আজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাস করছেন এবং নিয়মিত লেখালেখি করেন।

আমাদের পাহাড় থেকে অসংখ্য প্রতিভাবান লেখক, কবি, সাংবাদিক ও গল্পকার ছড়িয়ে আছেন—জাপান, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপে। কিন্তু আমরা কি একে অপরকে চিনি?

এই জরিপের লক্ষ্য একটাই—
👉 পৃথিবীর যেখানেই তারা থাকুন, পাহাড়ি লেখকদের একটি আন্তর্জাতিক সংযোগ তৈরি করা।

তাই আপনাদের কাছে আমার ছোট অনুরোধ, আপনার পরিচিত অন্তত ১০ জন পাহাড় থেকে বিদেশে বসবাসকারী লেখক বা লেখিকা—তাদের নাম লিখুন নিচে, অথবা ইনবক্সে পাঠিয়ে দিন।

এটা শুধু একটি তালিকা নয়, এটা হবে আমাদের কণ্ঠগুলোকে একত্রিত করার প্রথম পদক্ষেপ। আমি এই বিষয়ে দীর্ঘ দিন ধরে ভাবছি তাদের প্রতিভা এবং কণ্ঠকে কিভাবে পাহাড়ের জন্য কাজে লাগানো যায়।

আপনাদের একটু সহযোগিতা হয়তো সেই পথকে একটু সামনে এগিয়ে দিতে পারে।

আমরা যদি একে অপরকে চিনতে পারি, একদিন হয়তো পাহাড় থেকে বিশ্বে একটি যৌথ সাহিত্য আন্দোলন গড়ে তুলতে পারব।

আসুন, একে অপরকে চিনিয়ে দিই।

দয়া করে লিখুন, শেয়ার করুন, এবং আমাদের এই উদ্যোগে যুক্ত হোন।

আমাদের পাহাড়ি লেখকদের গল্প যেন পৃথিবী শুনতে পায়।