ফেসবুক নয়, এখন সময় আদিবাসীদের নিজস্ব সংবাদমাধ্যম দাঁড় করানোর

songbad-2

রাঙামাটির জেলাপরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে সেটলারদের যে অমানবিক আচরণ দেখলাম, তা দেখে আমি আশ্চর্য হইনি। কারণ আমি বাল্যকাল থেকেই সেটলারদের এই আচরণ দেখেই বড় হয়েছি। এই দৃশ্য আমার কাছে নতুন নয়, বরং পুরনো এক বাস্তবতার পুনরাবৃত্তি।

শুধু পাহাড়েই নয়, পৃথিবীর অসংখ্য জায়গায় অমুসলিম, আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের প্রতি মুসলিম মৌলবাদের আচরণ কেমন—সেসব বিষয়েও আমি হাতে-কলমে, কখনো সশরীরে উপস্থিত থেকে শেখার সুযোগ পাচ্ছি।

আমার থেকেও হাজারোগুল অভিজ্ঞ অনেক মানুষ পার্বত্য চট্টগ্রামে, বাংলাদেশে, পৃথিবীর নানা দেশে রয়েছেন। তাই সত্যিটা এতটাই স্পষ্ট যে এই আচরণের বিশ্লেষণ করতে খুব আমার গভীরে যেতে হবে না।

ফেসবুকের পোস্ট দেখলেই বোঝা যায় কারা কী বলে। আমাদের পাহাড়ি আদিবাসীদের মধ্যে অনেকেই খুব সুন্দর লজিক সাজিয়ে কথা বলেন, তথ্য দেন, যুক্তি দেন। সমস্যা হলো, এই পোস্টগুলো কখনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে পৌঁছায় না।

অপরদিকে, আদিবাসী পাহাড়ি বিরোধীদের কথার পেছনে বড় মিডিয়ার শক্তি আছে, আর আমাদের কথা সীমাবদ্ধ থাকে ব্যক্তিগত টাইমলাইনে। এখানেই আমরা পিছিয়ে। আমাদের প্রয়োজন ছিল, এখনো আছে—নিজস্ব একটিভাবে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যম।

আমি অনেকদিন ধরেই ভাবছি, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের নিজস্ব সংবাদমাধ্যম থাকা জরুরি। কারণ প্রতিদিন আমি দেখি, ফেসবুকে অসংখ্য আদিবাসী ভাই-বোন কত সুন্দরভাবে লিখছেন। সুযোগ পেলে তারা আরও ভালো লিখতে পারবেন।

কিন্তু সুযোগই তো পাচ্ছেন না। একটু বেশি লিখলেই ফেসবুক তাদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়। যারা চাকরিজীবী, তারা তো কথাই বলতে পারেন না। তবুও যে সময়টা হাতে পান বা সুযোগ পান, জাতির জন্য, অস্তিত্বের জন্য যতটুকু পারেন লিখে যাচ্ছেন।

আদিবাসী যারা সাংবাদিকতায় আছেন, তারাও তো পুরো স্বাধীন নন। কারণ বসেরা অধিকাংশই আদিবাসীবিরোধী মনোভাব পোষণ করেন অথবা সরকারের নীতির অধীনে কাজ করতে বাধ্য। তবুও তারা যে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও লিখে যাচ্ছেন, তারা নিঃসন্দেহে ধন্যবাদ পাবার যোগ্য।

ফেসবুকের পোস্ট বিশ্বের সাংবাদিকতার সামনে খুব ক্ষুদ্র একটি মাধ্যম। হাজারো পাহাড়ি লেখকের পোস্ট এক পাশে, আর একজন জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সাংবাদিকের রিপোর্ট আরেক পাশে—এই তুলনা এক নয়। কারণ দুনিয়া “সাংবাদিক” পরিচয়কে মূল্য দেয়, “ফেসবুকার” পরিচয়কে নয়।
তাই ভাবছি, এই অবস্থা থেকে আমরা কীভাবে বের হবো?

এবিষয়ে আগেও লিখেছি, আজও লিখছি। আমাদের প্রয়োজন নিজস্ব একটি সংবাদপত্র, নিজস্ব কিছু রিপোর্টার। সাংবাদিকতা শেখার জন্য ডিগ্রি অবশ্যই ভালো। কিন্তু সবসময় বাধ্যতামূলক নয়। পাহাড়ে সাংবাদিকতার প্রধান যোগ্যতা হলো—সাহস, সততা, এবং জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা।

আর দক্ষতা?

তা শেখানো যায়। অর্জন করা যায়।

ধরুন, বিদেশে থাকা কোনো আদিবাসী ভাই-বোন স্থানীয় সরকারের অধীনে একটি নন-প্রফিট পত্রিকার নিবন্ধন করল। তারপর পাহাড়ের লেখকদের রিপোর্টার হিসেবে সার্টিফিকেট দিল। তারা ফেসবুকেও সেই পরিচয়ে রিপোর্ট লিখতে পারবে। যাদের অভিজ্ঞতা নেই, তাদের অনলাইনে দু’ঘণ্টার প্রশিক্ষণ দিলেই হয়।

শুরুতে লেখা দুর্বল হতেই পারে, কিন্তু কয়েক মাসে লিখতে লিখতেই দক্ষতা এসে যাবে। আর পেশাদার পাহাড়ি সাংবাদিকরা তো আছেন—অনেকেই সাহায্য করতে পারবেন।

আমি নিজেও তো সাংবাদিকতার ডিগ্রি নিয়ে আসিনি। সাংবাদিকও নই। তবুও লিখি।আমার যেমন IT ডিগ্রি নেই। কিন্তু ওয়েবসাইট বানাই, ডিজাইন করি, চালাই। প্রফেশনাল না হলেও চলার মতো দক্ষতা অর্জন করা যায়। আমাদের পাহাড়ের সাংবাদিকতাও সেভাবেই চলতে পারে।

অন্তত আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে তা বিশ্বাস করি।

এবার টাকার কথায় আসি। কোনো প্রয়োজন হলে তো আমরা লক্ষ লক্ষ টাকা তুলি। কখনো থেমে থাকি না। এবারের খাগড়াছড়ির ঘটনাতেও দেশ–বিদেশের আদিবাসীরা নিজেদের সাধ্যমতো সাহায্য পাঠিয়েছেন।

আমরা বিহার, আশ্রম, গরিব–অসহায় মানুষদের জন্যও প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টাকা দিই। এটা শুধু মানবিক কারণেই নয়, পাহাড়ের প্রতি মায়া থেকেই, পাহাড়কে ভালবাসি বলে দিই। পাহাড়কে ভালোবাসি বলে এই মাতৃভূমি পাহাড়ের মানুষকে ভালোভাবে বাঁচতে দেখতে চাই বলে দিই।

তাহলে পাহাড়ের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য একটি পত্রিকার জন্য কি আমরা সামান্য দান করতে পারি না? নিশ্চয়ই পারি। একবার ফান্ড তৈরি হলে তা দিয়ে আমাদের নিজস্ব মিডিয়া চালানো সম্ভব।

এই পত্রিকার নিয়ম খুব পরিষ্কার হবে—
• এটি হবে শুধুই অধিকারবিষয়ক
• পাহাড়ে যে অবিচার, নির্যাতন, বৈষম্য—সেগুলো তুলে ধরা হবে
• কোনো আঞ্চলিক দলের বিরুদ্ধে প্রচারণা করা যাবে না
• সংবাদের লক্ষ্য হবে মানুষ, দল নয়

এবার একটি বাস্তব উদাহরণ দিই।

কয়েকদিন আগে রাঙামাটির এক তরুণীর ফেসবুক পোস্ট ভাইরাল হয়েছিল, যেখানে তিনি নিজের গ্রামে সেটলার হামলার অভিজ্ঞতা লিখেছিলেন। সেই পোস্ট ডিলিট করে দেওয়া হয় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। তার অ্যাকাউন্টও সাসপেন্ড হয়ে যায়। তিনি আমাকে বলেছিলেন, “আমি যদি সাংবাদিক হতাম, তাহলে হয়তো আমার কথা কেউ মুছতে পারত না।”

এই কথাটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে।

শেষে একটা কথা বলি। এবারের খাগড়াছড়ি ঘটনায় আমি কোনো টাকা দিইনি। দিইনি মানে আমি সহানুভূতিশূন্য নই। সেটা নয়। দিইনি কারণ আমি একটা লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছি। আমার কাছে এক টাকা মানে এক লক্ষ টাকা।

কারণ আমি সত্যিই বিশ্বাস করি, পাহাড়ের নিজস্ব সংবাদমাধ্যমই আজ সবচেয়ে জরুরি। আমি এ বিষয়ে সিরিয়াস, এবং আমি বিশ্বাস করি, আমরা সবাই চাইলে এটি সম্ভব।

কি করে ফান্ড তোলা যায় বা কি করে পত্রিকা শুরু করা যায় আপনার সুচিন্তিত পরামর্শ দিয়ে দিলে ভাল হয়।


Leave a Reply