হাসিনার বিচারের অন্তরালে যে কথা জনগণ জানে না

গতকাল বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক দিন পার হলো, যেদিন একটি দেশের মনোযোগ দুইদিকে টেনে ভাগ করা হলো—একদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়, আর অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত।

প্রথমটি খুব বড় সংবাদ, কিন্তু ব্যক্তিগত; দ্বিতীয়টি নিঃশব্দ, কিন্তু জাতীয়। আর এই দুই ঘটনাই একই দিনে ঘটল—এটাই যেন সর্ববৃহৎ রহস্য। একজন ব্যক্তির বিচার নিয়ে সব মিডিয়া উত্তাল, কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্তটি নিখুঁতভাবে আড়ালে চলে গেল।

তাহলে প্রশ্নটা উঠেই যায়, এটা কি সত্যিই কাকতালীয়, নাকি জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে রাখার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত করা একটি নিখুঁত সময় নির্বাচন?

হাসিনার রায় নিয়ে মানুষের আবেগ, তর্ক, রাজনীতি—সব কিছু গতকাল একাকার হয়ে গিয়েছিল। এর সুযোগে চট্টগ্রাম বন্দর—যে বন্দরের ওপর বাংলাদেশের ৯০% আমদানি–রপ্তানি নির্ভর করে—তার ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নেওয়া হলো। বন্দর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া মানে শুধু ব্যবস্থাপনা বদলানো নয়; এর মানে হলো কৌশলগত রুট, লজিস্টিক তথ্য, অর্থনৈতিক প্রবাহ, শ্রমিকদের জীবিকা এবং জাতীয় নিরাপত্তা অন্যের হাতে দেওয়া। এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ৩০ বছরের জন্য।

তাহলে এমন একটি সিদ্ধান্ত জনআলোচনার বাইরে, প্রায় গোপনে, ঠিক সেই দিনেই নেওয়া হলো কেন যেদিন পুরো জাতি এক ব্যক্তির বিচার নিয়ে ব্যস্ত?

যদি সত্যিই কিছু লুকানোর উদ্দেশ্য না থাকে, তাহলে এত গোপনীয়তার দরকার কী ছিল? কেন সাধারণ মানুষকে কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হলো না? কেন সংবাদমাধ্যমকে বিশ্লেষণের সময়ও দেওয়া হলো না? কী এমন তাড়া ছিল যে অনির্বাচিত সরকার—যাদের ম্যান্ডেট জনগণের কাছে নেই—তারা দেশের সবচেয়ে কৌশলগত সম্পদ নিয়ে এত বড় সিদ্ধান্ত এত দ্রুত নিল? দেশে সীমান্ত উত্তেজনা, অর্থনৈতিক সংকট, অভিবাসী সমস্যা, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা—এতগুলো জরুরি বিষয় যখন রয়ে গেছে, তখন সরকার বন্দরকেই আগে দেখল কেন? এটি কি সত্যিই দেশের স্বার্থে ছিল, নাকি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের আড়ালে অন্য কোনও অদৃশ্য স্বার্থ কাজ করছে?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, একজন ব্যক্তির বিচার কি ইচ্ছাকৃতভাবে সেই দিনেই করা হলো, যেদিন বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ বিদেশিকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে? কারণ একজনের রায়ের উত্তাপে দেশ এমনিতেই উত্তাল থাকে, আর সেই উত্তেজনার আড়ালে জনগণের চোখ–কান সব ব্যস্ত থাকে। বন্দর নিয়ে সরকারের অস্বাভাবিক তাড়াহুড়া আর হাসিনার রায়ের মুহূর্তগত নাটকীয়তা—এই দুইয়ের মিল এত নিখুঁত যে সন্দেহ জাগে: এখানে কি কেবল আইন কাজ করেছে, নাকি রাজনৈতিক কৌশলও ছায়ায় কাজ করেছে?

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বন্দর বিদেশিদের হাতে গেলে এর প্রভাব সাধারণ মানুষই প্রথমে টের পাবে। ট্যারিফ বাড়লে বাজারে চাল–ডাল–তেল–চিনি—সবকিছুর দাম বাড়বে। শ্রমিক ছাঁটাই হলে হাজার পরিবার পথে নামবে। বৈশ্বিক কোম্পানিগুলো নিজেদের লাভ তুলতে চাইলে দেশের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জাতীয় নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হবে, কারণ বন্দর শুধু বাণিজ্য নয়—এটি ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র। তাহলে জনগণের অধিকার কি এক দিনের রায়ের উত্তেজনায় ঢাকা পড়ে গেল?

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো—এই নিখুঁত সমাপতন কি সত্যিই ইতিহাসের একটি সাধারণ ক্যালেন্ডার-দুর্ঘটনা, নাকি গণমানুষের দৃষ্টি সরানোর জন্য প্রস্তুত একটি রাজনৈতিক পর্দা? হাসিনার রায় আজ বা কাল বিতর্ক হতেই পারে, কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরের সিদ্ধান্ত আগামী ৩০ বছর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করবে। একজন মানুষের বিচারকে সামনে রেখে কোটি মানুষের ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত ঢেকে দেওয়া—এটাই কি আজকের রাষ্ট্রচালনার নতুন কৌশল?

সময় হয়তো উত্তর দেবে। কিন্তু আজ যে নীরবতা দেখা গেল—তাই সবচেয়ে জোরালো ইঙ্গিত। জনগণকে ব্যস্ত রেখে, প্রশ্ন থেকে দূরে রেখে, চট্টগ্রাম বন্দরের মতো কৌশলগত সম্পদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা—এটা নিঃসন্দেহে একটি বড় রাজনৈতিক সংকেত। আর সেই সংকেতের মানে আমরা আজ না বুঝলেও, দেশ বুঝবে—খুব শিগগিরই।


Leave a Reply