ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী রাশিয়ার হাতে কতটা ইউক্রেনের ভূখণ্ড যাবে?

ট্রাম্প-শান্তি-আলোচনা

ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে যে ২৮ দফা খসড়া শান্তি পরিকল্পনা তৈরি করেছেন। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই চুক্তি হলে ইউক্রেনের কতটা জমি রাশিয়ার হাতে স্থায়ীভাবে থেকে যাবে। এই খসড়া প্রথমে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP) এবং পরে স্কাই নিউজসহ বড় বড় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম হাতে পায় ও বিস্তারিত প্রকাশ করে।

এই পরিকল্পনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ক্রিমিয়া, লুহানস্ক এবং দোনেৎস্ক—এই তিন অঞ্চলকে “ডি ফ্যাক্টো” অর্থাৎ বাস্তবে রাশিয়ার অংশ হিসেবে ধরে নিতে হবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও এই অবস্থান মেনে নেবে। এখন দোনেৎস্কের প্রায় ১৪% এলাকা ইউক্রেনের হাতে রয়েছে। খসড়ার প্রস্তাব অনুযায়ী সেই অংশ থেকেও ইউক্রেনকে সেনা সরিয়ে নিতে হবে এবং পুরো অঞ্চলটিকে একটি নিরস্ত্রীকৃত বাফার জোনে পরিণত করা হবে এবং এই অঞ্চলকে পরে আন্তর্জাতিকভাবে রাশিয়ার ভূখণ্ড হিসেবেই গণ্য করা হবে।

দক্ষিণের খেরসন ও জাপোরিঝিয়া অঞ্চলের ক্ষেত্রে নিয়ম হবে সোজা। বর্তমান যে “লাইন অব কন্ট্যাক্ট” বা ফ্রন্টলাইন আছে, সেটাকেই স্থায়ী সীমান্ত হিসেবে ধরে নেওয়া। অর্থাৎ যেসব জায়গা এখন রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে আছে, সেগুলোই ভবিষ্যতেও রাশিয়ার কাছে থাকবে। ইউক্রেনের হাতে থাকা অংশে তারা থাকবে ঠিকই, কিন্তু সীমান্ত পরিবর্তন হবে না—সীমান্ত দাঁড়িয়ে যাবে বর্তমান অবস্থানে।

তাহলে মোট কতটা ভূখণ্ড রাশিয়ার হাতে থাকবে?

রয়টার্স বিভিন্ন সামরিক মানচিত্র, স্যাটেলাইট ডেটা ও ওপেন-সোর্স বিশ্লেষণ দেখে হিসাব করেছে যে রাশিয়া এখন ইউক্রেনের প্রায় ১১৪,৫০০ বর্গকিলোমিটার, অর্থাৎ রাশিয়া ইউক্রেনের মোট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এলাকার প্রায় ১৯% নিয়ন্ত্রণ করছে।

এই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে—

  • ক্রিমিয়া: প্রায় ২৭,০০০ বর্গকিমি
  • দোনেৎস্ক + লুহানস্ক (ডনবাস): প্রায় ৪৬,৫৭০ বর্গকিমি
  • জাপোরিঝিয়া + খেরসন (দখলকৃত অংশ): প্রায় ৪১,১৭৬ বর্গকিমি

এই তিনটি অঞ্চলের মোট আকার দাঁড়ায় প্রায় ১১৫,০০০ বর্গকিলোমিটার অর্থাৎ পুরো ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ, বা ২০%–এর কাছাকাছি। বিশ্বের অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠানও প্রায় একই সংখ্যা দিয়েছে।

শুধু ভূখণ্ডই নয়। খসড়ায় আরও কিছু কঠোর রাজনৈতিক ও সামরিক শর্ত আছে। যেমন—

  • ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিতে পারবে না।
  • ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর সংখ্যা ৮৮০,০০০ থেকে কমিয়ে ৬০০,০০০ করতে হবে।
  • রাশিয়ার ওপর দেওয়া অনেক নিষেধাজ্ঞা ধীরে ধীরে তুলে নিতে হবে।
  • পশ্চিমে হিমায়িত রুশ সম্পদের কিছু অংশ ইউক্রেন পুনর্গঠনে ব্যবহার করতে হবে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও কিয়েভের শীর্ষ কর্মকর্তারা এসব শর্তকে একেবারে অগ্রহণযোগ্য বলেছেন।তারা পরিষ্কার করে বলেছেন, ১৯৯১ সালের সীমান্তই ইউক্রেনের বৈধ সীমান্ত, এর কম কিছু মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।

ইউরোপের অনেক দেশও পরিকল্পনাটিকে “আগ্রাসনকে পুরস্কৃত করা” বলে সমালোচনা করেছে।

অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এটিকে আলোচনা শুরু করার ভিত্তি হিসেবে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে রাশিয়া নিজে কোনো এলাকা ছাড়তে রাজি এমন কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সব মিলিয়ে বর্তমান অবস্থা হলো, এই পুরো পরিকল্পনাটি এখনো শুধু একটি খসড়া। কোনো দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে এতে স্বাক্ষর করেনি।

তবে যদি এই কাঠামোই ভবিষ্যতের শান্তি চুক্তির ভিত্তি হয়, তাহলে ইউক্রেনকে যুদ্ধ থামানোর বিনিময়ে তাদের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দিতে হতে পারে—এটাই এই মুহূর্তে পাওয়া তথ্যের সবচেয়ে পরিষ্কার ও সহজ ব্যাখ্যা।

তবে জেলেনস্কি রাজি বলে শোনা যাচ্ছে।


রোহিঙ্গা, সেটলার, সীমান্ত ও ভূরাজনীতি: বাংলাদেশের নতুন সঙ্কটক্ষেত্র পাহাড়

রোহিঙ্গা, সেটলার, সীমান্ত ও ভূরাজনীতি: বাংলাদেশের নতুন সঙ্কটক্ষেত্র পাহাড়
রোহিঙ্গা, সেটলার, সীমান্ত ও ভূরাজনীতি: বাংলাদেশের নতুন সঙ্কটক্ষেত্র পাহাড়

পাহাড়, সীমান্ত, উত্তর-পূর্ব এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে একটি বিচার—শেখ হাসিনার বিচার—আর কেবল আদালতের পরিধিতে সীমাবদ্ধ নেই; তা এখন পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিকে নাড়া দিচ্ছে।

ঢাকায় ব্রিটিশ আইনজীবীদের আগমন দেখেই বোঝা যায়, এই বিচারকে ঘিরে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন উত্তেজনায় প্রবেশ করেছে, আর পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের নীরব যোগাযোগও অস্বাভাবিকভাবে তীব্র হয়ে উঠছে।

ভারত যেদিন দিল্লিতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টার হাতে জঙ্গি মুক্তি, সীমান্তে মৌলবাদী আশ্রয় এবং উত্তরাঞ্চলে চরমপন্থীদের উপস্থিতির তালিকা তুলে দিল, ঠিক সেই দিনই ঢাকায় পাকিস্তানের সামরিক প্রতিনিধিদল ছিল। একদিকে ভারতের উদ্বেগ বাড়ছে, অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রতি বাংলাদেশের সামরিক নৈকট্যও ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হচ্ছে—এমন দ্বিমুখী পরিস্থিতি এর আগে এত স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি।

ইসরায়েল–ভারত অক্ষ দক্ষিণ এশিয়াকে একটি নতুন নিরাপত্তা বলয়ে টানছে, যেখানে জেরুজালেম, দিল্লি ও ভারতের উত্তর-পূর্বের ভবিষ্যৎ একই সুতায় বাঁধা। এর বিপরীতে ঢাকা–ইসলামাবাদের হঠাৎ উষ্ণতা দেখা যাচ্ছে এমন সময়ে, যখন বাংলাদেশে মৌলবাদী উত্থান, কারামুক্ত চরমপন্থী এবং সীমান্ত–নিরাপত্তার দুর্বলতা নিয়ে ভারত প্রকাশ্য উদ্বেগ জানাচ্ছে।

ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন সরাসরি আঞ্চলিক রাজনীতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভারত–ইসরায়েল সম্পর্ক সুদৃঢ় হওয়ার পেছনে এমন কিছু বাস্তবতা আছে যা সাধারণ মানুষের নজরে এখনো পড়ছে না। শোনা যাচ্ছে, কাশ্মীরে হাসপাতালের নিচে গাজা-স্টাইলে হামাসের অস্ত্রভাণ্ডার পাওয়া যাচ্ছে। ইসরায়েল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—হামাস যেখানে থাকুক, ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে। সেই কারণে ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও দৃঢ় হচ্ছে।

পাকিস্তানের অতীত ইতিহাসও এ অঞ্চলে অশান্তির বড় উৎস। আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেন থেকে শুরু করে লস্কর-ই-তৈবা পর্যন্ত বহু সন্ত্রাসী সংগঠন পাকিস্তানের ছত্রচ্ছায়ায় বেড়ে উঠেছে। সন্ত্রাস দমনে ভারত–ইসরায়েল এক পথের পথিক; তাই তাদের ঘনিষ্ঠতা স্বাভাবিক।

কিছু দৈনিক সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, রোহিঙ্গা শিবিরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কিছু ইউনিট প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালাচ্ছে এবং সেখানে মৌলবাদী গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে যে অন্তত পাঁচ লক্ষ রোহিঙ্গা যুবককে জিহাদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। যদি এ অভিযোগ সত্যি হয়, তবে এটি শুধু মিয়ানমারের নয়, ভারতের জন্যও বড় নিরাপত্তা হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

দিল্লির সাম্প্রতিক বিস্ফোরণ ভারতকে নতুন করে স্মরণ করে দিচ্ছে যে মৌলবাদী নেটওয়ার্ক এখন আর সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করছে না; তারা ভারতের ভেতরেও শেকড় ছড়াতে শুরু করেছে। এই অস্বস্তিকর বাস্তবতাই দিল্লিকে কঠোর নিরাপত্তা নীতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন নেতা–আমলা শিলিগুড়ি করিডোর ও কলকাতা নিয়ে ভারতের প্রতি যেসব হুমকিসূচক মন্তব্য করেছেন, তাও দিল্লির উদ্বেগ বাড়ানোর অন্যতম কারণ।

এই সমগ্র অক্ষ-সংঘাতের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে পাহাড়ে। দখল, ধর্মান্তর, জনসংখ্যাগত প্রকৌশল, আর রাতারাতি মসজিদ–মাদ্রাসা নির্মাণ—এসব ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। বরং পাহাড়কে “নীরব অঞ্চল” হিসেবে দেখে বৃহত্তর নিরাপত্তা-রাজনীতির চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। যে পাহাড়ে একটি স্কুল তুলতে বছর লাগে, সেখানে ধর্মীয় কাঠামো রাতারাতি দাঁড়িয়ে যাওয়া সেই চাপেরই ইঙ্গিত বহন করে।

পাহাড়ের রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই ভাঙাগড়ার চক্রে আটকে আছে। চাকমা সমাজের ভেতরের বনবিহার-সংক্রান্ত ধর্মীয় বিতর্ক এমনভাবে তীব্র হয়েছে যে জাতিগত ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট দেখলেও অনেকে তা উপলব্ধি করতে পারছে না। এই ভাঙনই মৌলবাদী শক্তিকে জায়গা দিচ্ছে—কেননা বিভক্ত সমাজে প্রতিরোধ সবসময়ই দুর্বল হয়।

বান্দরবান আজ দ্রুত মৌলবাদী প্রভাবের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। সেখানে আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তির কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব নেই বললেই চলে। নির্বাচন ঘিরে পাহাড়ি সমাজের একাংশের বিএনপি ও অন্যান্য জাতীয় দলে হঠাৎ ঝোঁক প্রমাণ করছে—পাহাড়ের রাজনৈতিক দিশাহীনতা কতটা গভীর হয়েছে। স্বাধীনতার পর এত স্পষ্টভাবে এ চিত্র আর দেখা যায়নি।

চাকমা সমাজ পাহাড়ের রাজনৈতিক চালিকা শক্তি। তারা যখন বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, তখন মারমা, ত্রিপুরা এবং অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীও স্বাভাবিকভাবেই দিশাহীন হয়। পরিবারের বড় ভাই যখন পথ হারায়, তখন ছোট ভাইয়েরা বিচলিত না হয়ে পারে না—পাহাড় এখন সেই অবস্থার মধ্যেই আছে।

এই পরিস্থিতিতে ধর্মীয় সংকটের দ্রুত সমাধান অত্যন্ত জরুরি। তা চাকমা রাজার মধ্যস্থতায় হোক, দায়ক–দায়িকার নির্দেশনায় হোক, কিংবা গণভোটের মাধ্যমেই হোক—পাহাড়কে প্রথমে ধর্মীয় বিভাজন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ এই সমস্যার সমাধানেই ‘রাজনৈতিক ঐক্যের সূত্র’ দেখাতে পারে; সেই ‘রাজনৈতিক ঐক্যের সূত্র’ ছাড়া পাহাড় কোনো বৃহত্তর সংকট মোকাবিলা করতে পারবে না।

হাসিনার বিচার, ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং পাকিস্তানের সামরিক ছায়া—এই তিনটি রেখা এসে আজ পাহাড়ের ওপরই মিলিত হয়েছে। ভূরাজনীতি যখন রূপ বদলায়, আঘাত লাগে আগে সীমান্তে; আর বাংলাদেশের সবচেয়ে সংবেদনশীল সীমান্তই হলো পাহাড়। এই মুহূর্তে নীরব থাকা মানে আত্মসমর্পণ।

এখন প্রশ্ন একটাই, পাহাড় কি দখল, ধর্মান্তর ও মৌলবাদী কাঠামোর সামনে চুপ করে থাকবে, নাকি নিজের ভবিষ্যতের রক্ষক হিসেবে জেগে উঠবে? মানচিত্র বদলে গেলে জাতিও বদলে যায়। ১৯৪৭-এর এক নেহেরুর “নীরবতা”য় ৭৮ বছরে দীর্ঘ পরিক্রমায় পাহাড়ের আদিবাসী জাতিসত্তা প্রায় বিলুপ্ত। তাই এখনই সিদ্ধান্তের সময়, এখনই মাঠে নামার মুহূর্ত, এখন নয়তো আর কখনোই নয়।

পাহাড় একসময়ই ১৩ লক্ষ সেটলার আর ১ লক্ষ ২০ হাজার সেনার অত্যাচারে ক্ষতবিক্ষত ছিল; সেই পাহাড়েই যদি আজ ১৩ লক্ষ রোহিঙ্গা আর তাদের গঠিত পাঁচ লক্ষ জিহাদি যুক্ত হয়, তাহলে আগামী দশ বছরে পাহাড়ের অবস্থা কেমন হবে—তা ভাবলেও শিরদাঁড়া ঠান্ডা হয়ে আসে।


হিন্দু ও সংখ্যালঘুদের বিচার এত কম দামে কেন?

হিন্দু-ধর্ম- নিন্দা
গতকালের ঢাকায় প্রতিবাদের ছবি

বাংলাদেশে হিন্দু ও সংখ্যালঘুদের জন্য বিচার এখনো সমান নয়—এই কথাটি শুধু অনুভূতি নয়, এটি প্রতিদিনের বাস্তবতা। গতকাল হিন্দু ও সংখ্যালঘুরা একজন মুসলিম সংসদ সদস্যের হিন্দু ধর্ম অবমাননার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে। তারা ব্যানার তুলেছে, প্ল্যাকার্ড ধরেছে, এবং প্রকাশ্যে আওয়াজ তুলেছে.

কারণ আর নীরব থাকা সম্ভব নয়। হিন্দু ধর্মকে প্রকাশ্যে অপমান করা হয়েছে, অথচ রাষ্ট্রের কোথাও সেই জরুরি ব্যবস্থা দেখা যায়নি। এই ঘটনাই স্পষ্ট করে দেয়, বাংলাদেশে বিচার আজো পরিচয় দেখে বদলায়—ক্ষমতাবান হলে নিরাপদ, সংখ্যালঘু হলে বিপদ।

অনেক সময় মহাবিপদ। ঘর-বাড়ী এবং কি গ্রাম আক্রমণ করা হয়।

যদি এই অভিযুক্ত লোকটি মুসলিম না হয়ে হিন্দু বা কোনো সংখ্যালঘু হতো আর হিন্দু পরিচয়ে ইসলাম ধর্ম নিয়ে একটি শব্দও বলত, তাহলে অনেক আগেই তার বাড়ি আক্রমণ হতো। তার পরিবার রাতারাতি পালাতে বাধ্য হতো। স্থানীয় ধর্মীয় গোষ্ঠী মাইক হাতে রাস্তায় নামত আর পুলিশ “পরিস্থিতি শান্ত রাখতে” সঙ্গে সঙ্গেই তাকে আটক করত।

যা শুনলেন সেটাই বাংলাদেশের নিত্যদিনের বিচারব্যবস্থা। একটা আইন কিন্তু তার প্রয়োগ দুই রকম: মুসলিমের জন্য এক ধরনের, হিন্দু ও সংখ্যালঘুর জন্য আরেক ধরনের।

বাংলাদেশে হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুর ওপর ধর্ম অবমাননার অভিযোগে যা যা হয়েছে, তা ইতিহাসের সবচেয়ে অসম অধ্যায়। রামুর বৌদ্ধ বিহার পুড়েছে, উখিয়ার মন্দির ভেঙেছে, পাবনায় হিন্দু বাড়িঘর লুট হয়েছে, ভোলায় হিন্দু যুবকের আইডি হ্যাক করে দোষ চাপিয়ে মানুষের প্রাণ গেছে।

রংপুরে গুজব ছড়িয়ে পুরো গ্রাম উচ্ছেদ হয়েছে, কোথাও কুমিল্লায় স্ক্রিনশট ছড়িয়ে ঘরে আগুন লেগেছে। প্রতিটি ঘটনায় একই নাটক—সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তাকে শাস্তি দিতে সবাই এক হয়। কিন্তু সংখ্যালঘু আক্রান্ত হলে রাষ্ট্র “তদন্ত” করে, অপেক্ষা করে, নীরব থাকে।

তারপর একদিন সব কোথায় যেন হারিয়ে যায়। অপরাধী পার পেয়ে যায় এবং আবার সেই একই কাজ করে বীর দর্পে সমাজে ঘুরে বেড়ায়।

হিন্দু ও সংখ্যালঘুর অনুভূতি কি অনুভূতি নয়?

একজন হিন্দু বা সংখ্যালঘু যদি ভুল করে, কিছু লেখে, প্রশ্ন তোলে, তৎক্ষণাৎ ধর্ম অবমাননার মামলা হয়। কিন্তু একজন মুসলিম, তা সে সাধারণ মানুষ হোক বা সংসদ সদস্য, যদি প্রকাশ্যে হিন্দু ধর্মকে অপমান করে তখন কেন সেই একই উত্তেজনা দেখা যায় না? কেন তার বিরুদ্ধে মামলা হয় না? কেন তার বাড়ি আক্রমণ হয় না? কেন প্রশাসন জরুরি সভা ডাকে না?

এই দ্বৈত বিচারই সংখ্যালঘুদের মনে সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা তৈরি করেছে আর সেটাই গতকালে প্রতিবাদে অংশ নেওয়া মানুষের মুখে আগুণ হয়ে বেরিয়ে এসেছে।

হিন্দু ও সংখ্যালঘুরা কারও শত্রু নয়। তারা এই দেশকে ভালোবাসে, কর দেয়, শ্রম দিয়ে এই দেশ তৈরিতে অংশ নেয়, সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখে, উৎসবকে রঙিন করে। অথচ কেন তাদের সম্মানের মূল্য এত কম? কেন তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কেউ ভাবেন না? কেন তাদের সন্তান স্কুলে গেলে দুশ্চিন্তা থাকে, উৎসব এলে আতঙ্ক বাড়ে, আর কোনো অপমান হলে বিচার পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়?

এই প্রশ্নগুলো আজ বাংলাদেশের সামগ্রিক বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

গতকালের সমাবেশ তাই শুধু একটি বিক্ষোভ নয়। সেটি হিন্দু ও সংখ্যালঘুদের দীর্ঘদিনের নীরবতার বিরুদ্ধে প্রথম বড় প্রতিবাদ। এটি জানিয়ে দেওয়া যে হিন্দু ও সংখ্যালঘুরা আর ভয় পাবে না, আর চুপ থাকবে না, আর নিজের অপমান মেনে নেবে না।

এটি জানিয়ে দেওয়া যে হিন্দু ধর্মকে অপমান করার অধিকার কারও নেই তা সে মুসলিম হোক, রাজনৈতিক নেতা হোক, কিংবা ক্ষমতার কেন্দ্রের কেউ হোক। বিচার যদি সবার জন্য সমান হয়, তবে হিন্দু ও সংখ্যালঘুর মর্যাদাও সবার মতো সমান হবে—এটাই আজকের দাবির কেন্দ্রবিন্দু।

বাংলাদেশের ইতিহাসে কত বৌদ্ধ মন্দির পুড়েছে, কত বৌদ্ধমূর্তি ভাঙা হয়েছে, তার পূর্ণ হিসাব কি আমাদের কাছে আছে?

শত শত বছরের পুরোনো বিহার ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। বুদ্ধমূর্তি ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে। তবুও সেগুলোকে কেউ “ধর্ম অবমাননা” বলে মানতে চায় না। একইভাবে কত হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি ভাঙা হয়েছে, কত মন্দিরে আগুন দেওয়া হয়েছে, কত প্রতিমা অবমাননার শিকার হয়েছে তার কোনো বিচার আজও সম্পূর্ণ হয়নি।

তবে যখন সংখ্যালঘুরা কিছু বললে, সামান্য রসিকতা করে বা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয় তখনই হঠাৎ ধর্ম অবমাননার ঝড় উঠে। সংখ্যাগুরু যখন ভাঙে, সেটি দাঙ্গা বা উত্তেজনা। কিন্তু সংখ্যালঘু যখন কথা বলে, সেটি নাকি অপরাধ। এই বৈপরীত্যই বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্মম সত্য।

বাংলাদেশ চাইলে বদলে যেতে পারে, কিন্তু তার প্রথম শর্ত হলো সত্য স্বীকার করা। তবে বদলে যাওয়ার আশা একদম শূন্য কোঠায়। তবু মনে আশা জাগে যদি বদলে যেত।

এই দেশে ধর্মের নামে বহু হিন্দু ও সংখ্যালঘু পরিবার হামলার শিকার হয়েছে, ঘরবাড়ি হারিয়েছে, অপমানিত হয়েছে, আর বহু অপরাধী রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে শাস্তি এড়িয়ে গেছে। ন্যায়বিচার তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন হিন্দু ও সংখ্যালঘুর জীবন, অনুভূতি এবং সম্মানকে সমান মূল্য দেওয়া হবে।

কারণ হিন্দু ও সংখ্যালঘুর জীবনও জীবন, অনুভূতিও অনুভূতি, আর মর্যাদাও মর্যাদা।


ঢাকার ভারত বিরোধিতা বাড়লে পাহাড় কেন প্রথমে জ্বলে ওঠে?

বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান

বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান দিল্লিতে গিয়ে দোভালের টেবিলের সামনে বসে যে “ডসিয়ার” হাতে পেয়েছেন, সেটা শুধু কাগজ নয়—এটা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ টানাটানির খসড়া। কিন্তু তিনি ঢাকায় ফিরে এসে কি একটুও শান্তি পেয়েছেন?

আমার মনে হয় তিনি বিমানবন্দরের দরজার ভেতরে পা রাখতেই বুঝে গেছেন—এই দেশকে বোঝানোই সবচেয়ে কঠিন কাজ।

ব্যথাটা কোথায় জানেন?

দিল্লির দোভাল যতটা কঠোর, ঢাকার জনতা তার চাইতেও কঠোর। যেখানে দেশের ৯৯% মানুষ ভারতকে চোখের শত্রু ভাবে এবং পাকিস্তানকে আদর্শ শ্বশুরবাড়ি বানিয়ে বসে, সেখানে নিরাপত্তা উপদেষ্টা ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করবেন কীভাবে?

কূটনীতি যতই নিখুঁত হোক, জনমতের উত্তাপ তাকে টেনে ধরেই রাখে।

বাংলাদেশের রাজনীতি বহু বছর ধরে একটি অদ্ভুত যাত্রাপথে চলে। ভারতের সঙ্গে শত্রুতা দেখিয়ে পাকিস্তানের প্রতি গোপন মায়া রেখে। নাটক সবাই দেখতে অভ্যস্ত, কিন্তু দোভাল নাটকের ভাষা বোঝেন না; তিনি শুধু রিপোর্ট দেখেন।

আর সেই রিপোর্টে ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে ভারতের ওপর হামলার পরিকল্পনা চলছে। স্যাটেলাইট ছবি, কললগ, ডিজিটাল রেকর্ড—সব তিনি খলিলুর রহমানের হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন।

এই সবকিছু আর কূটনীতির নরম ভাষা নয়; এটা সরাসরি সতর্কতা। দিল্লি আজ কথায় নয়, প্রমাণে কথা বলছে। কিন্তু আমার ভয়টা ঢাকা নয়। আমার ভয়টা পাহাড়। ঢাকার রাজনীতি যত উত্তপ্ত হয়, পাহাড়ের বাতাস তত শুষ্ক হয়ে যায়। ঢাকার মন্ত্রীরা যখন একে অন্যকে দোষ দেয়, সেটলাররা তখন বলে, “সমস্যা পাহাড়িদের।তারা এর জন্য দায়ী!”

এটাই বাংলাদেশের বাস্তবতা।

ঢাকার ভেতরের ভারত বিরোধিতা যত বাড়ে, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি এবং বান্দরবানের রাত তত অস্থির হয়। বলতে খারাপ লাগলেও সত্যি যে ঢাকা–দিল্লির সম্পর্ক যত খারাপ হয়, পাহাড় তত বেশি সেনা–সন্দেহ–চাপের নিচে পড়তে থাকে। রাষ্ট্রের অভ্যাস একই—সমস্যা যেদিকে হোক, পাহাড়িরা সবসময় সন্দেহভাজন। এ বাস্তবতা পাহাড় বহু দশক ধরে বহন করছে।

আমি ভাবি, এই ৯৯% ভারত বিরোধী জনতার মধ্যে দাঁড়িয়ে নিরাপত্তা উপদেষ্টা কী করবেন? দোভালকে তিনি বোঝাতে পারেন। কিন্তু দেশের ভেতরের জনমতকে বোঝাবেন কী দিয়ে? দেশের মানুষজন যখন পাকিস্তানের নাম শুনে হাসে আর ভারতের নাম শুনে রাগে, সেই মাটিতে দাঁড়িয়ে কূটনীতি কি আদৌ দাঁড়াতে পারে?

আর যদি একদিন সত্যিই দু’দেশের সম্পর্ক উত্তপ্ত হয়ে ওঠে—সবচেয়ে আগে কি পাহাড়ই পোড়াবে না? ঢাকা–দিল্লি উত্তেজনায় কলকাতা–ঢাকা সীমান্ত হয়তো খুব বেশি টের পাবে না। কিন্তু খাগড়াছড়ির রাত, রাঙামাটির নৌপথ, বান্দরবানের পাহাড়ি চূড়া—এসব জায়গায় ভয়ের ঘন কুয়াশা নেমে আসবে। ইতিহাস অন্তত তাই বলে। সবসময়ই তা হয়ে এসেছে।

নিরাপত্তা উপদেষ্টা চেষ্টা করছেন—এটা অবশ্যই তাঁর ব্যক্তিগত সাহস। কিন্তু হাজার বছরের রাজনৈতিক অভ্যাস কি এক মানুষের কূটনীতিতে বদলায়? একজন মানুষ ডসিয়ার বয়ে আনতে পারে, কিন্তু দেশের মানসিকতা বয়ে আনতে পারে না। এই সীমাবদ্ধতাই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

তাই প্রশ্নটা থেকে যায়, বাংলাদেশ–ভারতের ভবিষ্যৎ কি সংঘর্ষ ছাড়া টিকবে? আর যদি না টিকে—এই আগুনের প্রথম ঝলসানি কি আবারও পাহাড়কেই পুড়িয়ে দেবে? শেষ পর্যন্ত হয়তো পাহাড়ের মানুষই বলবে, ঢাকা–দিল্লির ঝগড়া তোমাদের, কিন্তু ধুলোটা সবসময় পড়ে আমাদের ঘরেই।

কিন্তু পাহাড় কি সেটা বলার পর চুপ থাকবে?

আমি মনে করি না। তাছাড়া ভারত কিন্তু এবার আগের মত ক্ষমা করবে বলে মনে হয় না। এবার কিছু একটা হতে পারে সেটা বাংলাদেশের সমতলের মানুষ বুঝতে পারছে কিনা আমি জানি না। সীমান্তের বিষয়গুলো আমাদের তা জানিয়ে দিচ্ছে।


রাঙামাটিতে “শান্তিপূর্ণ” হরতাল: শান্তি গেল কোথায়?

সেটলার -হরতাল 2025
(সেটলারেরা ঘিরে ধরেছে আদিবাসীদের ছবিতে দেখা যাচ্ছে)

রাঙামাটিতে আজকের সেটলার হরতালটা ছিল নাকি পুরোটাই শান্তিপূর্ণ—এমনটাই ঘোষণা ছিল। কিন্তু রাস্তায় নেমে দেখা গেল শান্তি নয়, শান্তিকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা।

ভাইরাল হওয়া ছবিগুলোতে দেখা গেছে, পিকেটিংকারীরা আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের থামিয়ে জেরা করছে, ধাক্কাধাক্কি করছে। পরে আদিবাসী যুবকের গায়ে হাত তুলেছে যদিও আদিবাসী ভদ্রলোক শান্ত ছিলেন আর এটাই নাকি সেটলার বাঙালীদের শান্তির সংজ্ঞা।

পুলিশ পাশে দাঁড়িয়ে দেখল কিন্তু থামাল না। পরে আস্তে করে এসে থামানোর চেষ্টা করল। তারা আরো আগে এসে বিষয়টি সামাল দিতে পারত।

কিন্তু করল না।

পুলিশ কি তাহলে আদিবাসীদের ওপর আগে আক্রমণ করা হোক সেই পর্যন্ত অপেক্ষায় ছিল?

আরও মজার ব্যাপার হলো, এক আদিবাসী মহিলা পুলিশকে পর্যন্ত হেনস্তা করেছে সেটলাররা। সব পুলিশ দাঁড়িয়ে তাণ্ডব দেখল; সেটলাররা দাঁড়িয়ে হাতে ধাক্কা দিল; আর শান্তিপূর্ণ হরতাল দাঁড়িয়ে রইল নামের মাঝেই।

পাহাড়ের মানুষ বোঝে যখনই “শান্তি” শব্দটা জোরে বলা হয়, তখনই সবচেয়ে বেশি গোলমাল শুরু হয়।


ফেসবুক নয়, এখন সময় আদিবাসীদের নিজস্ব সংবাদমাধ্যম দাঁড় করানোর

songbad-2

রাঙামাটির জেলাপরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে সেটলারদের যে অমানবিক আচরণ দেখলাম, তা দেখে আমি আশ্চর্য হইনি। কারণ আমি বাল্যকাল থেকেই সেটলারদের এই আচরণ দেখেই বড় হয়েছি। এই দৃশ্য আমার কাছে নতুন নয়, বরং পুরনো এক বাস্তবতার পুনরাবৃত্তি।

শুধু পাহাড়েই নয়, পৃথিবীর অসংখ্য জায়গায় অমুসলিম, আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের প্রতি মুসলিম মৌলবাদের আচরণ কেমন—সেসব বিষয়েও আমি হাতে-কলমে, কখনো সশরীরে উপস্থিত থেকে শেখার সুযোগ পাচ্ছি।

আমার থেকেও হাজারোগুল অভিজ্ঞ অনেক মানুষ পার্বত্য চট্টগ্রামে, বাংলাদেশে, পৃথিবীর নানা দেশে রয়েছেন। তাই সত্যিটা এতটাই স্পষ্ট যে এই আচরণের বিশ্লেষণ করতে খুব আমার গভীরে যেতে হবে না।

ফেসবুকের পোস্ট দেখলেই বোঝা যায় কারা কী বলে। আমাদের পাহাড়ি আদিবাসীদের মধ্যে অনেকেই খুব সুন্দর লজিক সাজিয়ে কথা বলেন, তথ্য দেন, যুক্তি দেন। সমস্যা হলো, এই পোস্টগুলো কখনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে পৌঁছায় না।

অপরদিকে, আদিবাসী পাহাড়ি বিরোধীদের কথার পেছনে বড় মিডিয়ার শক্তি আছে, আর আমাদের কথা সীমাবদ্ধ থাকে ব্যক্তিগত টাইমলাইনে। এখানেই আমরা পিছিয়ে। আমাদের প্রয়োজন ছিল, এখনো আছে—নিজস্ব একটিভাবে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যম।

আমি অনেকদিন ধরেই ভাবছি, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের নিজস্ব সংবাদমাধ্যম থাকা জরুরি। কারণ প্রতিদিন আমি দেখি, ফেসবুকে অসংখ্য আদিবাসী ভাই-বোন কত সুন্দরভাবে লিখছেন। সুযোগ পেলে তারা আরও ভালো লিখতে পারবেন।

কিন্তু সুযোগই তো পাচ্ছেন না। একটু বেশি লিখলেই ফেসবুক তাদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়। যারা চাকরিজীবী, তারা তো কথাই বলতে পারেন না। তবুও যে সময়টা হাতে পান বা সুযোগ পান, জাতির জন্য, অস্তিত্বের জন্য যতটুকু পারেন লিখে যাচ্ছেন।

আদিবাসী যারা সাংবাদিকতায় আছেন, তারাও তো পুরো স্বাধীন নন। কারণ বসেরা অধিকাংশই আদিবাসীবিরোধী মনোভাব পোষণ করেন অথবা সরকারের নীতির অধীনে কাজ করতে বাধ্য। তবুও তারা যে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও লিখে যাচ্ছেন, তারা নিঃসন্দেহে ধন্যবাদ পাবার যোগ্য।

ফেসবুকের পোস্ট বিশ্বের সাংবাদিকতার সামনে খুব ক্ষুদ্র একটি মাধ্যম। হাজারো পাহাড়ি লেখকের পোস্ট এক পাশে, আর একজন জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সাংবাদিকের রিপোর্ট আরেক পাশে—এই তুলনা এক নয়। কারণ দুনিয়া “সাংবাদিক” পরিচয়কে মূল্য দেয়, “ফেসবুকার” পরিচয়কে নয়।
তাই ভাবছি, এই অবস্থা থেকে আমরা কীভাবে বের হবো?

এবিষয়ে আগেও লিখেছি, আজও লিখছি। আমাদের প্রয়োজন নিজস্ব একটি সংবাদপত্র, নিজস্ব কিছু রিপোর্টার। সাংবাদিকতা শেখার জন্য ডিগ্রি অবশ্যই ভালো। কিন্তু সবসময় বাধ্যতামূলক নয়। পাহাড়ে সাংবাদিকতার প্রধান যোগ্যতা হলো—সাহস, সততা, এবং জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা।

আর দক্ষতা?

তা শেখানো যায়। অর্জন করা যায়।

ধরুন, বিদেশে থাকা কোনো আদিবাসী ভাই-বোন স্থানীয় সরকারের অধীনে একটি নন-প্রফিট পত্রিকার নিবন্ধন করল। তারপর পাহাড়ের লেখকদের রিপোর্টার হিসেবে সার্টিফিকেট দিল। তারা ফেসবুকেও সেই পরিচয়ে রিপোর্ট লিখতে পারবে। যাদের অভিজ্ঞতা নেই, তাদের অনলাইনে দু’ঘণ্টার প্রশিক্ষণ দিলেই হয়।

শুরুতে লেখা দুর্বল হতেই পারে, কিন্তু কয়েক মাসে লিখতে লিখতেই দক্ষতা এসে যাবে। আর পেশাদার পাহাড়ি সাংবাদিকরা তো আছেন—অনেকেই সাহায্য করতে পারবেন।

আমি নিজেও তো সাংবাদিকতার ডিগ্রি নিয়ে আসিনি। সাংবাদিকও নই। তবুও লিখি।আমার যেমন IT ডিগ্রি নেই। কিন্তু ওয়েবসাইট বানাই, ডিজাইন করি, চালাই। প্রফেশনাল না হলেও চলার মতো দক্ষতা অর্জন করা যায়। আমাদের পাহাড়ের সাংবাদিকতাও সেভাবেই চলতে পারে।

অন্তত আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে তা বিশ্বাস করি।

এবার টাকার কথায় আসি। কোনো প্রয়োজন হলে তো আমরা লক্ষ লক্ষ টাকা তুলি। কখনো থেমে থাকি না। এবারের খাগড়াছড়ির ঘটনাতেও দেশ–বিদেশের আদিবাসীরা নিজেদের সাধ্যমতো সাহায্য পাঠিয়েছেন।

আমরা বিহার, আশ্রম, গরিব–অসহায় মানুষদের জন্যও প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টাকা দিই। এটা শুধু মানবিক কারণেই নয়, পাহাড়ের প্রতি মায়া থেকেই, পাহাড়কে ভালবাসি বলে দিই। পাহাড়কে ভালোবাসি বলে এই মাতৃভূমি পাহাড়ের মানুষকে ভালোভাবে বাঁচতে দেখতে চাই বলে দিই।

তাহলে পাহাড়ের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য একটি পত্রিকার জন্য কি আমরা সামান্য দান করতে পারি না? নিশ্চয়ই পারি। একবার ফান্ড তৈরি হলে তা দিয়ে আমাদের নিজস্ব মিডিয়া চালানো সম্ভব।

এই পত্রিকার নিয়ম খুব পরিষ্কার হবে—
• এটি হবে শুধুই অধিকারবিষয়ক
• পাহাড়ে যে অবিচার, নির্যাতন, বৈষম্য—সেগুলো তুলে ধরা হবে
• কোনো আঞ্চলিক দলের বিরুদ্ধে প্রচারণা করা যাবে না
• সংবাদের লক্ষ্য হবে মানুষ, দল নয়

এবার একটি বাস্তব উদাহরণ দিই।

কয়েকদিন আগে রাঙামাটির এক তরুণীর ফেসবুক পোস্ট ভাইরাল হয়েছিল, যেখানে তিনি নিজের গ্রামে সেটলার হামলার অভিজ্ঞতা লিখেছিলেন। সেই পোস্ট ডিলিট করে দেওয়া হয় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। তার অ্যাকাউন্টও সাসপেন্ড হয়ে যায়। তিনি আমাকে বলেছিলেন, “আমি যদি সাংবাদিক হতাম, তাহলে হয়তো আমার কথা কেউ মুছতে পারত না।”

এই কথাটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে।

শেষে একটা কথা বলি। এবারের খাগড়াছড়ি ঘটনায় আমি কোনো টাকা দিইনি। দিইনি মানে আমি সহানুভূতিশূন্য নই। সেটা নয়। দিইনি কারণ আমি একটা লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছি। আমার কাছে এক টাকা মানে এক লক্ষ টাকা।

কারণ আমি সত্যিই বিশ্বাস করি, পাহাড়ের নিজস্ব সংবাদমাধ্যমই আজ সবচেয়ে জরুরি। আমি এ বিষয়ে সিরিয়াস, এবং আমি বিশ্বাস করি, আমরা সবাই চাইলে এটি সম্ভব।

কি করে ফান্ড তোলা যায় বা কি করে পত্রিকা শুরু করা যায় আপনার সুচিন্তিত পরামর্শ দিয়ে দিলে ভাল হয়।


বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা কেন ভারতে যেতে বাধ্য হলেন?

India vs Bangladesh
বাংলাদেশ কি রক্ষা পাবে?

দিল্লির লালকেল্লায় ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর ভারতীয় তদন্ত সংস্থাগুলি যে তথ্য প্রকাশ করছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে। বিস্ফোরণে ১৩ জন নিহত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই ভারতের তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুত এগোচ্ছে, এবং সেই তদন্তের কয়েকটি সুত্র অস্বস্তিকরভাবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের দিকে নির্দেশ করছে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টার আকস্মিক দিল্লি সফর শুধু কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়—পরিস্থিতি ব্যাখ্যার একটি প্রয়োজনীয় ধাপ।

ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলি দাবি করছে যে বিস্ফোরণের কিছু দিন আগে ঢাকার বনানিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়, যেখানে পাকিস্তান-ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈবার শীর্ষ কমান্ডার সাইফউল্লাহ সাইফ ভার্চুয়ালি যোগ দেন। তাদের দাবি অনুযায়ী, বৈঠকে আরও কয়েকজন বাংলাদেশি ধর্মীয় সংগঠন ও জঙ্গি কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে বাংলাদেশের সরকারি পদে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। যদিও ঢাকা এই দাবি পুরোপুরি অস্বীকার করেছে, তবুও ভারতের তদন্ত দল এই তথ্যকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।

ভারতের তদন্ত আরও বলছে যে পাকিস্তান থেকে কিছু সরঞ্জাম পশ্চিমবঙ্গে পৌঁছেছিল এবং সম্ভবত বিস্ফোরণে তা ব্যবহৃত হয়েছে। একইসঙ্গে উল্লেখ এসেছে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার একটি নিরাপদ আস্তানার, যেখানে বাংলাদেশের পলাতক এক নাগরিক ইকতিয়ারের সহায়তায় কয়েকজন সন্দেহভাজন ব্যক্তি অবস্থান করেছিল বলে দাবি। বিস্ফোরণের তদন্তে বর্তমানে এই লজিস্টিক নেটওয়ার্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

ঢাকার অবস্থান এখনো স্পষ্ট ও অস্বীকারমূলক। বাংলাদেশ বলছে তাদের ভূমি বা নাগরিক জঙ্গি কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত নয় এবং বিস্ফোরণের ঘটনায় তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। কিন্তু ভারতের তদন্ত দল যেভাবে তথ্য ও সাক্ষ্য সংগ্রহ করছে, তাতে দুই দেশের বক্তব্যের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।

এটাই নিরাপত্তা উপদেষ্টার দিল্লি সফরের মূল কারণ- পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা, তথ্য বিনিময় করা এবং ক্রমবর্ধমান সন্দেহের আবহ কমানো।

দু’দেশের সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক সুফল এনেছে। তাই দিল্লির অভিযোগকে পাশ কাটানো বা একে সাধারণ ভুল বোঝাবুঝি বলা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়।

ভারত এখন বিস্ফোরণের প্রতিটি সূত্র গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখছে, এবং প্রমাণের ভিত্তিতে প্রশ্ন তুলছে, বাংলাদেশ তার নিজস্ব ভূখণ্ডে চলমান কার্যকলাপ সম্পর্কে কতটা অবগত।

এই প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা উপদেষ্টার দিল্লি সফর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক আচরণ নয়; বরং আস্থার সংকট দূর করার একটি বাধ্যতামূলক পদক্ষেপ। কারণ বর্তমান অবস্থায় ভারত শুধু ব্যাখ্যা নয়—স্পষ্ট তথ্য ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে।

বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টার সফরের প্রয়োজনীয়তা এখানেই। অভিযোগের জবাব দেওয়া, সন্দেহ দূর করা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখা। অভিযোগ সত্যি হলে বাংলাদেশের অবস্থা কি হবে আগেভাগে ভেবে রাখুন।

সূত্রঃ zeenews.india

চাকমা রাজা বনাম বনভিক্ষু

Chakma raja vs Bana Bhikkhu
চাকমা রাজা বনাম বনভিক্ষু

বিষয়টি নিয়ে পাহাড়ের মানুষের মধ্যে এখনো বিতর্ক রয়েছে। কারো কাছে বিষয়টি পরিষ্কার, আবার কারো ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে স্বার্থসংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেই মনে হয়।

আমি এ নিয়ে একটি পোস্ট লিখতে চাই। জানি, অনেকে তাদের যুক্তি দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করবেন।

কিন্তু তার আগে কয়েকটি বিষয় আরও স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন।

জাপান একটি উন্নত গণতান্ত্রিক দেশ। কিন্তু এই দেশেও এখনো “Emperor” আছেন। তার রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই—তাই বলে সম্মান নেই, এমন নয়।

জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শপথ নেওয়ার আগে “Emperor”-এর কাছে মাথা নত করে শপথ নেন, তারপর সংসদে গিয়ে দ্বিতীয়বার শপথ নেন। রাষ্ট্রের বড় সিদ্ধান্তেও “Emperor”-এর সম্মতি লাগে।

আর যখন সে Emperor রাস্তা দিয়ে যান, জাপানের মানুষ মাটিতে মাথা রেখে তাকে সম্মান জানায়। তাদের সেই ভক্তি ও শ্রদ্ধা না দেখলে বোঝা যায় না।

এ রকম আরও বহু দেশে রাজাদের সম্মানের অসংখ্য উদাহরণ আছে।

ত্রিপুরা, মারমা—সবারই রাজ্য আছে। চাকমাদের নেই। চাকমারা সবচেয়ে দুর্ভাগা জাতি।

যে জাতির রাজ্য নেই, রাজাও নেই, সেই জাতির মতো দুর্ভাগা জাতি আর কোথায় আছে?

কিন্তু আমাদের সৌভাগ্য, রাজ্য না থাকলেও আমাদের মাননীয় চাকমা রাজাবাবু এখনো জীবিত। আমরা এখনো গর্ব করে বলতে পারি, “রাজ্য হারিয়েছি, কিন্তু রাজা হারাইনি।”

তাছাড়া আমাদের চাকমা রাজা একজন উচ্চ শিক্ষিত এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি। তাকে নিয়ে আমার সত্যি গর্ব হয়।

দেশে-বিদেশে তার একটি বিশাল সম্মান রয়েছে—সেটা আপনাদের অনেকে আমার চেয়ে ভালো জানেন।

এবার মূল প্রশ্ন, চাকমা সমাজের জন্য বনভিক্ষু বড়, নাকি চাকমা রাজাবাবু বড়?

হ্যাঁ, ধর্মীয় দিক দিয়ে বনভিক্ষুরা বড়—এটা সত্য।

কিন্তু জাতির অস্তিত্ব, ভূমির অধিকার, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে রাজাই বড়—এ সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

কারণ, চাকমা রাজা একটি ব্যক্তি নন—তিনি চাকমা জাতির ১,৫০০ বছরের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা।

তিনি জাতির অস্তিত্বের প্রতীক।

বাংলাদেশ ও পাকিস্তান—দুই রাষ্ট্রই বারবার রাজার প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করতে চেয়েছে। কারণ তারা জানত, রাজার প্রতিষ্ঠান শক্ত থাকলে জাতিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

কিন্তু তিনি এখনো টিকে রয়েছেন।

✡️ বনাম রাজনীতি – দুটি ভিন্ন ক্ষেত্র

অনেক ভান্তে মহান, জ্ঞানী, জাতির সম্পদ—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

কিন্তু কিছু ভান্তে যারা ধর্মের নামে রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছেন—তারা জাতির উপকার করছেন না; বরং বিভক্তি বাড়াচ্ছেন।

এখনকার সংকটে রাজাবাবু চুপিসারে সমাধান টানতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু কিছু ভান্তে তা অমান্য করেছেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কি জাতির জন্য ভালো?

সমস্যা সমাধানে রাজার কথা মানা হয় না। তাহলে কার কথা মানবেন? সমাধান তো একটা করতে হবে। সমাধান না করে তো থাকা যায় না। পৃথিবীর কোথাও এরকম নজির নেই।

যারা রাজার সিদ্ধান্ত মানেন না—তারা কার বিচার মানবেন?

হ্যাঁ, গণতান্ত্রিক দেশে কোর্ট আছে। তাহলে কি কোর্টের রায়ও মানতে রাজি হবেন?

✡️ চাকমা সমাজ আজ তিন ভাগে বিভক্ত

১. ধর্মীয় বিভাজন

২. রাজনৈতিক বিভাজন

৩. সংগঠনভিত্তিক বিভাজন

এই ভাঙন যত বাড়ছে, জাতির অস্তিত্ব তত ঝুঁকির দিকে যাচ্ছে।

একটি জাতি রাজা ছাড়া চলতে পারে। কিন্তু বিভক্ত জাতি কখনো টিকে থাকতে পারে না।

কিন্তু সমস্যা সমাধানে রাজার সিদ্ধান্ত মানা এখানে অনেক যুক্তিযুক্ত ছিল।

✡️ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কে চাকমার প্রতিনিধি?

রাজাবাবু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে চাকমা জাতির অস্তিত্বের কথা বলেন—এবং তা বিশ্বমঞ্চে গ্রহণও করা হয়।

জাতিগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি রয়েছে ‘Indigenous Monarch/Headman’—এর।

ধর্মীয় নেতারা কোথাও ‘পলিটিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ’ নন।

কোনো বনভিক্ষু এখনো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চাকমা জাতির হয়ে কথা বলতে পারেননি।

ঘরে সম্মান না থাকলে বাইরে সম্মান হয় না—এটাই বিশ্বসত্য।

অনেক কিছু লিখার আছে। তবে শেষ তো করতে হবে।

সোজা করে বলি, চাকমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে:

রাজাবাবুর কথা মানবেন, নাকি কিছু বিতর্কিত বনভিক্ষুর কথা মানবেন?

জাতির অস্তিত্ব রক্ষা করতে চাইলে, রাজাবাবুকে ঘরে আগে সম্মান দিন। ঘরে সন্মান পেলে বাইরেও সন্মান থাকে। বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। যে ধর্ম জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষা করে না সেই তুচ্ছ বিষয় নিয়ে যে মহান ব্যক্তি আন্তর্জাতিকভাবে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন তার সন্মান ক্ষুণ্ণ করা মঙ্গলজনক নয়।

(বিঃদ্রঃ—কে জাতির জন্য বেশি প্রয়োজন—চাকমা রাজাবাবু না বনভিক্ষু? এ বিষয়ে পাঁচটি তুলনা দিন। আমি সবার মন্তব্য পড়তে চাই এবং সমাজকে দেখাতে চাই, কারণ জাতি এই বিতর্কের সমাপ্তি চায়।)

পাহাড় থেকে উঠে আসা লেখকদের খুঁজছি

আমাদের পাহাড়ি লেখকদের গল্প যেন পৃথিবী শুনতে পায়
আমাদের পাহাড়ি লেখকদের গল্প পৃথিবীকে শুনাতে চাই

বন্ধুরা,
আমি এখন একটি জরিপ (survey) চালাতে চাইছি। আমাদের সেই সব প্রিয় পাহাড়ি ভাই-বোনদের নিয়ে, যারা আজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাস করছেন এবং নিয়মিত লেখালেখি করেন।

আমাদের পাহাড় থেকে অসংখ্য প্রতিভাবান লেখক, কবি, সাংবাদিক ও গল্পকার ছড়িয়ে আছেন—জাপান, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপে। কিন্তু আমরা কি একে অপরকে চিনি?

এই জরিপের লক্ষ্য একটাই—
👉 পৃথিবীর যেখানেই তারা থাকুন, পাহাড়ি লেখকদের একটি আন্তর্জাতিক সংযোগ তৈরি করা।

তাই আপনাদের কাছে আমার ছোট অনুরোধ, আপনার পরিচিত অন্তত ১০ জন পাহাড় থেকে বিদেশে বসবাসকারী লেখক বা লেখিকা—তাদের নাম লিখুন নিচে, অথবা ইনবক্সে পাঠিয়ে দিন।

এটা শুধু একটি তালিকা নয়, এটা হবে আমাদের কণ্ঠগুলোকে একত্রিত করার প্রথম পদক্ষেপ। আমি এই বিষয়ে দীর্ঘ দিন ধরে ভাবছি তাদের প্রতিভা এবং কণ্ঠকে কিভাবে পাহাড়ের জন্য কাজে লাগানো যায়।

আপনাদের একটু সহযোগিতা হয়তো সেই পথকে একটু সামনে এগিয়ে দিতে পারে।

আমরা যদি একে অপরকে চিনতে পারি, একদিন হয়তো পাহাড় থেকে বিশ্বে একটি যৌথ সাহিত্য আন্দোলন গড়ে তুলতে পারব।

আসুন, একে অপরকে চিনিয়ে দিই।

দয়া করে লিখুন, শেয়ার করুন, এবং আমাদের এই উদ্যোগে যুক্ত হোন।

আমাদের পাহাড়ি লেখকদের গল্প যেন পৃথিবী শুনতে পায়।


নাইজেরিয়ার খ্রিস্টানদের কান্না আর ভারতের নতুন সুযোগ

৩১ অক্টোবর ২০২৫। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিলেন নাইজেরিয়াকে ‘Country of Particular Concern’। পরদিন, ১ নভেম্বর, তিনি আরও কঠিন স্বরে বললেন, “আমেরিকা চুপচাপ বসে থাকবে না।”
Good Luck, Nigeria. Good Luck, INDIA.

নাইজেরিয়ার আকাশে আজও ধোঁয়া উড়ে। কেউ আগুন জ্বালায়নি, তবুও গ্রাম পুড়ছে, গির্জা ভস্ম হচ্ছে, শিশুরা হারিয়ে যাচ্ছে। রাত্রির অন্ধকারে খ্রিস্টান পরিবারগুলো একেকটি প্রার্থনা করে, যেন সকালটা বেঁচে দেখে যেতে পারে। তারা জানে না তাদের ঘরে আগুন লাগবে, না শত্রুর বন্দুক উঠবে। তবুও তারা প্রার্থনা করে, “হে প্রভু, ওদের ক্ষমা করো।” তাদের অপরাধ একটাই — তারা খ্রিস্টান।

৩১ অক্টোবর ২০২৫। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিলেন নাইজেরিয়াকে ‘Country of Particular Concern’। পরদিন, ১ নভেম্বর, তিনি আরও কঠিন স্বরে বললেন, “আমেরিকা চুপচাপ বসে থাকবে না।”

এই ঘোষণা ছড়িয়ে পড়ল পৃথিবীজুড়ে। কেউ বলল এটি ন্যায়ের ডাক, কেউ বলল এটি যুদ্ধের হুঁশিয়ারি। কিন্তু আফ্রিকার সেই রক্তাক্ত মাটিতে যাদের প্রিয়জনদের হারিয়েছে, তাদের কাছে এটি ছিল আশার একটুখানি আলো।

তবুও বিশ্ব নীরব। জাতিসংঘের সভায় কেউ নাইজেরিয়ার নাম উচ্চারণ করে না। ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত। আর যারা প্রতিদিন খ্রিস্টানদের কবর দিচ্ছে তারা জানে, পৃথিবী চুপ থাকলে অপরাধীরা আরও শক্ত হয়। তাই আজ নাইজেরিয়ার খ্রিস্টানদের কান্না শুধু এক জাতির নয়, মানবতার কান্না।

একজন মায়ের বুকের ভেতর আগুন জ্বলে ওঠে যখন তার ছেলেকে গির্জার সামনে গুলি করা হয়। এক বৃদ্ধ পাদ্রী শেষ নিঃশ্বাসে প্রার্থনা করেন, “হে ঈশ্বর, আমাদের দেশকে ক্ষমা করো।” তাদের কণ্ঠরোধ করা যায়, কিন্তু তাদের বিশ্বাস ভাঙা যায় না। এই বিশ্বাসই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশ্চর্য হচ্ছে রক্ত ঝরে, তবুও তারা প্রার্থনা করে।

আমরা যারা দূরে বসে কেবল খবর পড়ি, আমাদেরও একদিন ঈশ্বর জিজ্ঞেস করবেন, “যখন আমার সন্তানরা মরছিল, তুমি তখন কোথায় ছিলে?” এই প্রশ্নের কোনো উত্তর আমাদের কাছে নেই। কারণ আমাদের নীরবতাই আজ হত্যার সহচর হয়ে উঠেছে।

নাইজেরিয়ার খ্রিস্টানদের জীবন বাঁচানো মানে কেবল এক ধর্মকে রক্ষা করা নয়, মানবতাকে বাঁচানো। তাদের জন্য আওয়াজ তোলা মানে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো। কারণ প্রতিটি নিঃশব্দ মৃত্যু আমাদের আত্মার বিবেককে আরও কিছুটা মেরে ফেলে। আর যদি পৃথিবী আজও নীরব থাকে, তবে আগামীকাল মানবতা নিজেই নির্বাসিত হবে।

একজন খ্রিষ্টান হিসেবে বা একজন মানুষ হিসেবে নয়, একজন পাহাড়ের শত বছরের নির্যাতিত জাতির একজন আদিবাসী হিসেবে আমি চাই আমেরিকা নাইজেরিয়ায় সৈন্য পাঠাক। এটা যেমন নির্যাতিত খ্রিষ্টানদের রক্ষা করা হবে তেমনি সারা বিশ্ব জুড়ে যে ইসলামি সন্ত্রাসীরা নিধন যজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে তাদের জন্য একটি সতর্ক সংকেত হবে।

তাছাড়াও আমেরিকার একটি যুদ্ধ খুবই প্রয়োজন। আর এটি ভেনেজুলার সাথে যুদ্ধ করার চেয়ে নাইজেরিয়ার ইসলামি সন্ত্রাসী ধ্বংস করা হাজারোগুন লাভ আছে। এবিষয়ে মধ্যপ্রাচ্য কিংবা মুসলিম দেশগুলো এখনো নীরব। নীরব মানে একপ্রকার সমর্থন। সেটা অন্য একদিন বলবো।

তবে খুশির খবর এই ইসরায়েলী NGO গুলো সেখানে পোঁছে গেছে। তবে তারা এককভাবে সামাল দিতে

কিন্তু পাহাড়ে কি লাভ?

অপরিসীম।

কি বলতে হবে?

সম্প্রতি আমেরিকা ও ভারত ১০ বছরের জন্য একটি চুক্তি করেছে। সেই চুক্তি সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি জানি। কেউ সেটিকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছে, আবার কেউ হালকাভাবে নিয়েছে।

হ্যাঁ, আমেরিকা যদি সত্যিই নাইজেরিয়ায় সেনা পাঠায়, তবে ভারতও দেরি করবে না। আপাতত হাসিনা দিদিকে কোনোভাবে দেশে ফিরিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ঠিক করা যায় কিনা তা নিয়ে হিসাব-নিকাশ চলছে। কিন্তু মনে হচ্ছে, সেই পরিকল্পনা এখন মোটামুটি বাতিল। দিদি আর ফিরতে পারবেন না।

তাছাড়া এখনই পাকিস্তানের মাথা টিপে দেওয়ার সময় যখন পাকিস্তান আন্তর্জাতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে টাকার জন্য হাতে ভিক্ষার পাত্র নিয়ে ঋণ বাদ দিয়ে মানবিক সাহায্য চাচ্ছে। পরে হয়তো বা ঘাঁটি বাংলাদেশে শক্ত হয়ে যাবে। এবার না হলে ভারতকে ২০৩০ অপেক্ষা করতে হবে।

Good Luck, Nigeria. Good Luck, INDIA.