
ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে যে ২৮ দফা খসড়া শান্তি পরিকল্পনা তৈরি করেছেন। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই চুক্তি হলে ইউক্রেনের কতটা জমি রাশিয়ার হাতে স্থায়ীভাবে থেকে যাবে। এই খসড়া প্রথমে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP) এবং পরে স্কাই নিউজসহ বড় বড় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম হাতে পায় ও বিস্তারিত প্রকাশ করে।
এই পরিকল্পনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ক্রিমিয়া, লুহানস্ক এবং দোনেৎস্ক—এই তিন অঞ্চলকে “ডি ফ্যাক্টো” অর্থাৎ বাস্তবে রাশিয়ার অংশ হিসেবে ধরে নিতে হবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও এই অবস্থান মেনে নেবে। এখন দোনেৎস্কের প্রায় ১৪% এলাকা ইউক্রেনের হাতে রয়েছে। খসড়ার প্রস্তাব অনুযায়ী সেই অংশ থেকেও ইউক্রেনকে সেনা সরিয়ে নিতে হবে এবং পুরো অঞ্চলটিকে একটি নিরস্ত্রীকৃত বাফার জোনে পরিণত করা হবে এবং এই অঞ্চলকে পরে আন্তর্জাতিকভাবে রাশিয়ার ভূখণ্ড হিসেবেই গণ্য করা হবে।
দক্ষিণের খেরসন ও জাপোরিঝিয়া অঞ্চলের ক্ষেত্রে নিয়ম হবে সোজা। বর্তমান যে “লাইন অব কন্ট্যাক্ট” বা ফ্রন্টলাইন আছে, সেটাকেই স্থায়ী সীমান্ত হিসেবে ধরে নেওয়া। অর্থাৎ যেসব জায়গা এখন রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে আছে, সেগুলোই ভবিষ্যতেও রাশিয়ার কাছে থাকবে। ইউক্রেনের হাতে থাকা অংশে তারা থাকবে ঠিকই, কিন্তু সীমান্ত পরিবর্তন হবে না—সীমান্ত দাঁড়িয়ে যাবে বর্তমান অবস্থানে।
তাহলে মোট কতটা ভূখণ্ড রাশিয়ার হাতে থাকবে?
রয়টার্স বিভিন্ন সামরিক মানচিত্র, স্যাটেলাইট ডেটা ও ওপেন-সোর্স বিশ্লেষণ দেখে হিসাব করেছে যে রাশিয়া এখন ইউক্রেনের প্রায় ১১৪,৫০০ বর্গকিলোমিটার, অর্থাৎ রাশিয়া ইউক্রেনের মোট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এলাকার প্রায় ১৯% নিয়ন্ত্রণ করছে।
এই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে—
- ক্রিমিয়া: প্রায় ২৭,০০০ বর্গকিমি
- দোনেৎস্ক + লুহানস্ক (ডনবাস): প্রায় ৪৬,৫৭০ বর্গকিমি
- জাপোরিঝিয়া + খেরসন (দখলকৃত অংশ): প্রায় ৪১,১৭৬ বর্গকিমি
এই তিনটি অঞ্চলের মোট আকার দাঁড়ায় প্রায় ১১৫,০০০ বর্গকিলোমিটার অর্থাৎ পুরো ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ, বা ২০%–এর কাছাকাছি। বিশ্বের অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠানও প্রায় একই সংখ্যা দিয়েছে।
শুধু ভূখণ্ডই নয়। খসড়ায় আরও কিছু কঠোর রাজনৈতিক ও সামরিক শর্ত আছে। যেমন—
- ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিতে পারবে না।
- ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর সংখ্যা ৮৮০,০০০ থেকে কমিয়ে ৬০০,০০০ করতে হবে।
- রাশিয়ার ওপর দেওয়া অনেক নিষেধাজ্ঞা ধীরে ধীরে তুলে নিতে হবে।
- পশ্চিমে হিমায়িত রুশ সম্পদের কিছু অংশ ইউক্রেন পুনর্গঠনে ব্যবহার করতে হবে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও কিয়েভের শীর্ষ কর্মকর্তারা এসব শর্তকে একেবারে অগ্রহণযোগ্য বলেছেন।তারা পরিষ্কার করে বলেছেন, ১৯৯১ সালের সীমান্তই ইউক্রেনের বৈধ সীমান্ত, এর কম কিছু মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
ইউরোপের অনেক দেশও পরিকল্পনাটিকে “আগ্রাসনকে পুরস্কৃত করা” বলে সমালোচনা করেছে।
অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এটিকে আলোচনা শুরু করার ভিত্তি হিসেবে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে রাশিয়া নিজে কোনো এলাকা ছাড়তে রাজি এমন কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে বর্তমান অবস্থা হলো, এই পুরো পরিকল্পনাটি এখনো শুধু একটি খসড়া। কোনো দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে এতে স্বাক্ষর করেনি।
তবে যদি এই কাঠামোই ভবিষ্যতের শান্তি চুক্তির ভিত্তি হয়, তাহলে ইউক্রেনকে যুদ্ধ থামানোর বিনিময়ে তাদের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দিতে হতে পারে—এটাই এই মুহূর্তে পাওয়া তথ্যের সবচেয়ে পরিষ্কার ও সহজ ব্যাখ্যা।
তবে জেলেনস্কি রাজি বলে শোনা যাচ্ছে।








