
বিষয়টি নিয়ে পাহাড়ের মানুষের মধ্যে এখনো বিতর্ক রয়েছে। কারো কাছে বিষয়টি পরিষ্কার, আবার কারো ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে স্বার্থসংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেই মনে হয়।
আমি এ নিয়ে একটি পোস্ট লিখতে চাই। জানি, অনেকে তাদের যুক্তি দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করবেন।
কিন্তু তার আগে কয়েকটি বিষয় আরও স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন।
জাপান একটি উন্নত গণতান্ত্রিক দেশ। কিন্তু এই দেশেও এখনো “Emperor” আছেন। তার রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই—তাই বলে সম্মান নেই, এমন নয়।
জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শপথ নেওয়ার আগে “Emperor”-এর কাছে মাথা নত করে শপথ নেন, তারপর সংসদে গিয়ে দ্বিতীয়বার শপথ নেন। রাষ্ট্রের বড় সিদ্ধান্তেও “Emperor”-এর সম্মতি লাগে।
আর যখন সে Emperor রাস্তা দিয়ে যান, জাপানের মানুষ মাটিতে মাথা রেখে তাকে সম্মান জানায়। তাদের সেই ভক্তি ও শ্রদ্ধা না দেখলে বোঝা যায় না।
এ রকম আরও বহু দেশে রাজাদের সম্মানের অসংখ্য উদাহরণ আছে।
ত্রিপুরা, মারমা—সবারই রাজ্য আছে। চাকমাদের নেই। চাকমারা সবচেয়ে দুর্ভাগা জাতি।
যে জাতির রাজ্য নেই, রাজাও নেই, সেই জাতির মতো দুর্ভাগা জাতি আর কোথায় আছে?
কিন্তু আমাদের সৌভাগ্য, রাজ্য না থাকলেও আমাদের মাননীয় চাকমা রাজাবাবু এখনো জীবিত। আমরা এখনো গর্ব করে বলতে পারি, “রাজ্য হারিয়েছি, কিন্তু রাজা হারাইনি।”
তাছাড়া আমাদের চাকমা রাজা একজন উচ্চ শিক্ষিত এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি। তাকে নিয়ে আমার সত্যি গর্ব হয়।
দেশে-বিদেশে তার একটি বিশাল সম্মান রয়েছে—সেটা আপনাদের অনেকে আমার চেয়ে ভালো জানেন।
এবার মূল প্রশ্ন, চাকমা সমাজের জন্য বনভিক্ষু বড়, নাকি চাকমা রাজাবাবু বড়?
হ্যাঁ, ধর্মীয় দিক দিয়ে বনভিক্ষুরা বড়—এটা সত্য।
কিন্তু জাতির অস্তিত্ব, ভূমির অধিকার, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে রাজাই বড়—এ সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
কারণ, চাকমা রাজা একটি ব্যক্তি নন—তিনি চাকমা জাতির ১,৫০০ বছরের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা।
তিনি জাতির অস্তিত্বের প্রতীক।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তান—দুই রাষ্ট্রই বারবার রাজার প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করতে চেয়েছে। কারণ তারা জানত, রাজার প্রতিষ্ঠান শক্ত থাকলে জাতিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
কিন্তু তিনি এখনো টিকে রয়েছেন।
✡️ বনাম রাজনীতি – দুটি ভিন্ন ক্ষেত্র
অনেক ভান্তে মহান, জ্ঞানী, জাতির সম্পদ—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
কিন্তু কিছু ভান্তে যারা ধর্মের নামে রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছেন—তারা জাতির উপকার করছেন না; বরং বিভক্তি বাড়াচ্ছেন।
এখনকার সংকটে রাজাবাবু চুপিসারে সমাধান টানতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু কিছু ভান্তে তা অমান্য করেছেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কি জাতির জন্য ভালো?
সমস্যা সমাধানে রাজার কথা মানা হয় না। তাহলে কার কথা মানবেন? সমাধান তো একটা করতে হবে। সমাধান না করে তো থাকা যায় না। পৃথিবীর কোথাও এরকম নজির নেই।
যারা রাজার সিদ্ধান্ত মানেন না—তারা কার বিচার মানবেন?
হ্যাঁ, গণতান্ত্রিক দেশে কোর্ট আছে। তাহলে কি কোর্টের রায়ও মানতে রাজি হবেন?
✡️ চাকমা সমাজ আজ তিন ভাগে বিভক্ত
১. ধর্মীয় বিভাজন
২. রাজনৈতিক বিভাজন
৩. সংগঠনভিত্তিক বিভাজন
এই ভাঙন যত বাড়ছে, জাতির অস্তিত্ব তত ঝুঁকির দিকে যাচ্ছে।
একটি জাতি রাজা ছাড়া চলতে পারে। কিন্তু বিভক্ত জাতি কখনো টিকে থাকতে পারে না।
কিন্তু সমস্যা সমাধানে রাজার সিদ্ধান্ত মানা এখানে অনেক যুক্তিযুক্ত ছিল।
✡️ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কে চাকমার প্রতিনিধি?
রাজাবাবু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে চাকমা জাতির অস্তিত্বের কথা বলেন—এবং তা বিশ্বমঞ্চে গ্রহণও করা হয়।
জাতিগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি রয়েছে ‘Indigenous Monarch/Headman’—এর।
ধর্মীয় নেতারা কোথাও ‘পলিটিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ’ নন।
কোনো বনভিক্ষু এখনো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চাকমা জাতির হয়ে কথা বলতে পারেননি।
ঘরে সম্মান না থাকলে বাইরে সম্মান হয় না—এটাই বিশ্বসত্য।
অনেক কিছু লিখার আছে। তবে শেষ তো করতে হবে।
সোজা করে বলি, চাকমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে:
রাজাবাবুর কথা মানবেন, নাকি কিছু বিতর্কিত বনভিক্ষুর কথা মানবেন?
জাতির অস্তিত্ব রক্ষা করতে চাইলে, রাজাবাবুকে ঘরে আগে সম্মান দিন। ঘরে সন্মান পেলে বাইরেও সন্মান থাকে। বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। যে ধর্ম জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষা করে না সেই তুচ্ছ বিষয় নিয়ে যে মহান ব্যক্তি আন্তর্জাতিকভাবে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন তার সন্মান ক্ষুণ্ণ করা মঙ্গলজনক নয়।
(বিঃদ্রঃ—কে জাতির জন্য বেশি প্রয়োজন—চাকমা রাজাবাবু না বনভিক্ষু? এ বিষয়ে পাঁচটি তুলনা দিন। আমি সবার মন্তব্য পড়তে চাই এবং সমাজকে দেখাতে চাই, কারণ জাতি এই বিতর্কের সমাপ্তি চায়।)
সহমত পোষণ করছি
অনেক ধন্যবাদ আর জুজু।
এই মহান ব্যক্তির তুলনা হয় না। দুঃখজনক হচ্ছে যে আমাদের সমাজের কিছু মানুষ বিষয়টি বুঝতে পারছে না।