
পাহাড়, সীমান্ত, উত্তর-পূর্ব এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে একটি বিচার—শেখ হাসিনার বিচার—আর কেবল আদালতের পরিধিতে সীমাবদ্ধ নেই; তা এখন পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিকে নাড়া দিচ্ছে।
ঢাকায় ব্রিটিশ আইনজীবীদের আগমন দেখেই বোঝা যায়, এই বিচারকে ঘিরে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন উত্তেজনায় প্রবেশ করেছে, আর পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের নীরব যোগাযোগও অস্বাভাবিকভাবে তীব্র হয়ে উঠছে।
ভারত যেদিন দিল্লিতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টার হাতে জঙ্গি মুক্তি, সীমান্তে মৌলবাদী আশ্রয় এবং উত্তরাঞ্চলে চরমপন্থীদের উপস্থিতির তালিকা তুলে দিল, ঠিক সেই দিনই ঢাকায় পাকিস্তানের সামরিক প্রতিনিধিদল ছিল। একদিকে ভারতের উদ্বেগ বাড়ছে, অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রতি বাংলাদেশের সামরিক নৈকট্যও ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হচ্ছে—এমন দ্বিমুখী পরিস্থিতি এর আগে এত স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি।
ইসরায়েল–ভারত অক্ষ দক্ষিণ এশিয়াকে একটি নতুন নিরাপত্তা বলয়ে টানছে, যেখানে জেরুজালেম, দিল্লি ও ভারতের উত্তর-পূর্বের ভবিষ্যৎ একই সুতায় বাঁধা। এর বিপরীতে ঢাকা–ইসলামাবাদের হঠাৎ উষ্ণতা দেখা যাচ্ছে এমন সময়ে, যখন বাংলাদেশে মৌলবাদী উত্থান, কারামুক্ত চরমপন্থী এবং সীমান্ত–নিরাপত্তার দুর্বলতা নিয়ে ভারত প্রকাশ্য উদ্বেগ জানাচ্ছে।
ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন সরাসরি আঞ্চলিক রাজনীতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারত–ইসরায়েল সম্পর্ক সুদৃঢ় হওয়ার পেছনে এমন কিছু বাস্তবতা আছে যা সাধারণ মানুষের নজরে এখনো পড়ছে না। শোনা যাচ্ছে, কাশ্মীরে হাসপাতালের নিচে গাজা-স্টাইলে হামাসের অস্ত্রভাণ্ডার পাওয়া যাচ্ছে। ইসরায়েল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—হামাস যেখানে থাকুক, ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে। সেই কারণে ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও দৃঢ় হচ্ছে।
পাকিস্তানের অতীত ইতিহাসও এ অঞ্চলে অশান্তির বড় উৎস। আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেন থেকে শুরু করে লস্কর-ই-তৈবা পর্যন্ত বহু সন্ত্রাসী সংগঠন পাকিস্তানের ছত্রচ্ছায়ায় বেড়ে উঠেছে। সন্ত্রাস দমনে ভারত–ইসরায়েল এক পথের পথিক; তাই তাদের ঘনিষ্ঠতা স্বাভাবিক।
কিছু দৈনিক সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, রোহিঙ্গা শিবিরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কিছু ইউনিট প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালাচ্ছে এবং সেখানে মৌলবাদী গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে যে অন্তত পাঁচ লক্ষ রোহিঙ্গা যুবককে জিহাদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। যদি এ অভিযোগ সত্যি হয়, তবে এটি শুধু মিয়ানমারের নয়, ভারতের জন্যও বড় নিরাপত্তা হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
দিল্লির সাম্প্রতিক বিস্ফোরণ ভারতকে নতুন করে স্মরণ করে দিচ্ছে যে মৌলবাদী নেটওয়ার্ক এখন আর সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করছে না; তারা ভারতের ভেতরেও শেকড় ছড়াতে শুরু করেছে। এই অস্বস্তিকর বাস্তবতাই দিল্লিকে কঠোর নিরাপত্তা নীতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন নেতা–আমলা শিলিগুড়ি করিডোর ও কলকাতা নিয়ে ভারতের প্রতি যেসব হুমকিসূচক মন্তব্য করেছেন, তাও দিল্লির উদ্বেগ বাড়ানোর অন্যতম কারণ।
এই সমগ্র অক্ষ-সংঘাতের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে পাহাড়ে। দখল, ধর্মান্তর, জনসংখ্যাগত প্রকৌশল, আর রাতারাতি মসজিদ–মাদ্রাসা নির্মাণ—এসব ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। বরং পাহাড়কে “নীরব অঞ্চল” হিসেবে দেখে বৃহত্তর নিরাপত্তা-রাজনীতির চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। যে পাহাড়ে একটি স্কুল তুলতে বছর লাগে, সেখানে ধর্মীয় কাঠামো রাতারাতি দাঁড়িয়ে যাওয়া সেই চাপেরই ইঙ্গিত বহন করে।
পাহাড়ের রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই ভাঙাগড়ার চক্রে আটকে আছে। চাকমা সমাজের ভেতরের বনবিহার-সংক্রান্ত ধর্মীয় বিতর্ক এমনভাবে তীব্র হয়েছে যে জাতিগত ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট দেখলেও অনেকে তা উপলব্ধি করতে পারছে না। এই ভাঙনই মৌলবাদী শক্তিকে জায়গা দিচ্ছে—কেননা বিভক্ত সমাজে প্রতিরোধ সবসময়ই দুর্বল হয়।
বান্দরবান আজ দ্রুত মৌলবাদী প্রভাবের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। সেখানে আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তির কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব নেই বললেই চলে। নির্বাচন ঘিরে পাহাড়ি সমাজের একাংশের বিএনপি ও অন্যান্য জাতীয় দলে হঠাৎ ঝোঁক প্রমাণ করছে—পাহাড়ের রাজনৈতিক দিশাহীনতা কতটা গভীর হয়েছে। স্বাধীনতার পর এত স্পষ্টভাবে এ চিত্র আর দেখা যায়নি।
চাকমা সমাজ পাহাড়ের রাজনৈতিক চালিকা শক্তি। তারা যখন বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, তখন মারমা, ত্রিপুরা এবং অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীও স্বাভাবিকভাবেই দিশাহীন হয়। পরিবারের বড় ভাই যখন পথ হারায়, তখন ছোট ভাইয়েরা বিচলিত না হয়ে পারে না—পাহাড় এখন সেই অবস্থার মধ্যেই আছে।
এই পরিস্থিতিতে ধর্মীয় সংকটের দ্রুত সমাধান অত্যন্ত জরুরি। তা চাকমা রাজার মধ্যস্থতায় হোক, দায়ক–দায়িকার নির্দেশনায় হোক, কিংবা গণভোটের মাধ্যমেই হোক—পাহাড়কে প্রথমে ধর্মীয় বিভাজন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ এই সমস্যার সমাধানেই ‘রাজনৈতিক ঐক্যের সূত্র’ দেখাতে পারে; সেই ‘রাজনৈতিক ঐক্যের সূত্র’ ছাড়া পাহাড় কোনো বৃহত্তর সংকট মোকাবিলা করতে পারবে না।
হাসিনার বিচার, ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং পাকিস্তানের সামরিক ছায়া—এই তিনটি রেখা এসে আজ পাহাড়ের ওপরই মিলিত হয়েছে। ভূরাজনীতি যখন রূপ বদলায়, আঘাত লাগে আগে সীমান্তে; আর বাংলাদেশের সবচেয়ে সংবেদনশীল সীমান্তই হলো পাহাড়। এই মুহূর্তে নীরব থাকা মানে আত্মসমর্পণ।
এখন প্রশ্ন একটাই, পাহাড় কি দখল, ধর্মান্তর ও মৌলবাদী কাঠামোর সামনে চুপ করে থাকবে, নাকি নিজের ভবিষ্যতের রক্ষক হিসেবে জেগে উঠবে? মানচিত্র বদলে গেলে জাতিও বদলে যায়। ১৯৪৭-এর এক নেহেরুর “নীরবতা”য় ৭৮ বছরে দীর্ঘ পরিক্রমায় পাহাড়ের আদিবাসী জাতিসত্তা প্রায় বিলুপ্ত। তাই এখনই সিদ্ধান্তের সময়, এখনই মাঠে নামার মুহূর্ত, এখন নয়তো আর কখনোই নয়।
পাহাড় একসময়ই ১৩ লক্ষ সেটলার আর ১ লক্ষ ২০ হাজার সেনার অত্যাচারে ক্ষতবিক্ষত ছিল; সেই পাহাড়েই যদি আজ ১৩ লক্ষ রোহিঙ্গা আর তাদের গঠিত পাঁচ লক্ষ জিহাদি যুক্ত হয়, তাহলে আগামী দশ বছরে পাহাড়ের অবস্থা কেমন হবে—তা ভাবলেও শিরদাঁড়া ঠান্ডা হয়ে আসে।