ঢাকার ভারত বিরোধিতা বাড়লে পাহাড় কেন প্রথমে জ্বলে ওঠে?

বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান

বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান দিল্লিতে গিয়ে দোভালের টেবিলের সামনে বসে যে “ডসিয়ার” হাতে পেয়েছেন, সেটা শুধু কাগজ নয়—এটা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ টানাটানির খসড়া। কিন্তু তিনি ঢাকায় ফিরে এসে কি একটুও শান্তি পেয়েছেন?

আমার মনে হয় তিনি বিমানবন্দরের দরজার ভেতরে পা রাখতেই বুঝে গেছেন—এই দেশকে বোঝানোই সবচেয়ে কঠিন কাজ।

ব্যথাটা কোথায় জানেন?

দিল্লির দোভাল যতটা কঠোর, ঢাকার জনতা তার চাইতেও কঠোর। যেখানে দেশের ৯৯% মানুষ ভারতকে চোখের শত্রু ভাবে এবং পাকিস্তানকে আদর্শ শ্বশুরবাড়ি বানিয়ে বসে, সেখানে নিরাপত্তা উপদেষ্টা ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করবেন কীভাবে?

কূটনীতি যতই নিখুঁত হোক, জনমতের উত্তাপ তাকে টেনে ধরেই রাখে।

বাংলাদেশের রাজনীতি বহু বছর ধরে একটি অদ্ভুত যাত্রাপথে চলে। ভারতের সঙ্গে শত্রুতা দেখিয়ে পাকিস্তানের প্রতি গোপন মায়া রেখে। নাটক সবাই দেখতে অভ্যস্ত, কিন্তু দোভাল নাটকের ভাষা বোঝেন না; তিনি শুধু রিপোর্ট দেখেন।

আর সেই রিপোর্টে ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে ভারতের ওপর হামলার পরিকল্পনা চলছে। স্যাটেলাইট ছবি, কললগ, ডিজিটাল রেকর্ড—সব তিনি খলিলুর রহমানের হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন।

এই সবকিছু আর কূটনীতির নরম ভাষা নয়; এটা সরাসরি সতর্কতা। দিল্লি আজ কথায় নয়, প্রমাণে কথা বলছে। কিন্তু আমার ভয়টা ঢাকা নয়। আমার ভয়টা পাহাড়। ঢাকার রাজনীতি যত উত্তপ্ত হয়, পাহাড়ের বাতাস তত শুষ্ক হয়ে যায়। ঢাকার মন্ত্রীরা যখন একে অন্যকে দোষ দেয়, সেটলাররা তখন বলে, “সমস্যা পাহাড়িদের।তারা এর জন্য দায়ী!”

এটাই বাংলাদেশের বাস্তবতা।

ঢাকার ভেতরের ভারত বিরোধিতা যত বাড়ে, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি এবং বান্দরবানের রাত তত অস্থির হয়। বলতে খারাপ লাগলেও সত্যি যে ঢাকা–দিল্লির সম্পর্ক যত খারাপ হয়, পাহাড় তত বেশি সেনা–সন্দেহ–চাপের নিচে পড়তে থাকে। রাষ্ট্রের অভ্যাস একই—সমস্যা যেদিকে হোক, পাহাড়িরা সবসময় সন্দেহভাজন। এ বাস্তবতা পাহাড় বহু দশক ধরে বহন করছে।

আমি ভাবি, এই ৯৯% ভারত বিরোধী জনতার মধ্যে দাঁড়িয়ে নিরাপত্তা উপদেষ্টা কী করবেন? দোভালকে তিনি বোঝাতে পারেন। কিন্তু দেশের ভেতরের জনমতকে বোঝাবেন কী দিয়ে? দেশের মানুষজন যখন পাকিস্তানের নাম শুনে হাসে আর ভারতের নাম শুনে রাগে, সেই মাটিতে দাঁড়িয়ে কূটনীতি কি আদৌ দাঁড়াতে পারে?

আর যদি একদিন সত্যিই দু’দেশের সম্পর্ক উত্তপ্ত হয়ে ওঠে—সবচেয়ে আগে কি পাহাড়ই পোড়াবে না? ঢাকা–দিল্লি উত্তেজনায় কলকাতা–ঢাকা সীমান্ত হয়তো খুব বেশি টের পাবে না। কিন্তু খাগড়াছড়ির রাত, রাঙামাটির নৌপথ, বান্দরবানের পাহাড়ি চূড়া—এসব জায়গায় ভয়ের ঘন কুয়াশা নেমে আসবে। ইতিহাস অন্তত তাই বলে। সবসময়ই তা হয়ে এসেছে।

নিরাপত্তা উপদেষ্টা চেষ্টা করছেন—এটা অবশ্যই তাঁর ব্যক্তিগত সাহস। কিন্তু হাজার বছরের রাজনৈতিক অভ্যাস কি এক মানুষের কূটনীতিতে বদলায়? একজন মানুষ ডসিয়ার বয়ে আনতে পারে, কিন্তু দেশের মানসিকতা বয়ে আনতে পারে না। এই সীমাবদ্ধতাই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

তাই প্রশ্নটা থেকে যায়, বাংলাদেশ–ভারতের ভবিষ্যৎ কি সংঘর্ষ ছাড়া টিকবে? আর যদি না টিকে—এই আগুনের প্রথম ঝলসানি কি আবারও পাহাড়কেই পুড়িয়ে দেবে? শেষ পর্যন্ত হয়তো পাহাড়ের মানুষই বলবে, ঢাকা–দিল্লির ঝগড়া তোমাদের, কিন্তু ধুলোটা সবসময় পড়ে আমাদের ঘরেই।

কিন্তু পাহাড় কি সেটা বলার পর চুপ থাকবে?

আমি মনে করি না। তাছাড়া ভারত কিন্তু এবার আগের মত ক্ষমা করবে বলে মনে হয় না। এবার কিছু একটা হতে পারে সেটা বাংলাদেশের সমতলের মানুষ বুঝতে পারছে কিনা আমি জানি না। সীমান্তের বিষয়গুলো আমাদের তা জানিয়ে দিচ্ছে।


Leave a Reply