বনভান্তে: যে প্রশ্নগুলো ভক্তির আড়ালে এতদিন চাপা ছিল

বনভান্তেকে নিয়ে আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত ভয় কাজ করে। তাঁর ধর্মীয় অবদান নিয়ে প্রশংসা করা যায়, কিন্তু তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেই অনেকে সেটিকে ধর্মবিরোধিতা মনে করেন। অথচ একজন ধর্মগুরুকে শ্রদ্ধা করা আর তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্তকে ইতিহাসের প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা এক কথা নয়।

আমি বনভান্তেকে ছোট করতে লিখছি না। রাজগুরু অগ্রবংশ মহাস্থবিরকেও বনভান্তের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে বড় করতে চাই না। আমি জানতে চাই, ১৯৭০-এর দশক থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে সংকটময় সময়ে আমাদের ধর্মীয় নেতৃত্ব সমাজকে কোন পথে নিয়েছিল এবং তার দীর্ঘমেয়াদি ফল কী হয়েছে।

ইতিহাসের শুরুটা গুরুত্বপূর্ণ। রাজগুরু অগ্রবংশ মহাস্থবির ছিলেন তঞ্চঙ্গ্যা। ১৯৫৮ সালে তিনি চাকমা রাজগুরু হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং পার্বত্য ভিক্ষুসংঘ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষা, প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ও সমাজসেবাকে তাঁর ধারার ভিক্ষুরা গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

বনভান্তেও শুরু থেকেই তাঁর বিরোধী ছিলেন না। রাজবন বিহারের নিজস্ব তথ্যপঞ্জিতে বলা হয়েছে, ১৯৬১ সালে রাজগুরু অগ্রবংশ ও জ্ঞানশ্রী মহাস্থবিরের অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতায় বনভান্তে উপসম্পদা লাভ করেন। অর্থাৎ তাঁদের সম্পর্কের শুরু ছিল সহযোগিতার মধ্য দিয়ে, বিরোধের মধ্য দিয়ে নয়।

কিন্তু পরে সম্পর্ক বদলে যায়। পার্বত্য ভিক্ষুসংঘঘনিষ্ঠ পুরনো লেখাগুলোতে অভিযোগ করা হয়েছে, বনভান্তে পার্বত্য ভিক্ষুসংঘের ভিক্ষুদের কঠোর ভাষায় সমালোচনা করতেন এবং পরে “বন সংঘ সুশীল, পার্বত্য ভিক্ষু সংঘ দুঃশীল”—এমন ধারণা সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। রাজগুরু অগ্রবংশও সেই সমালোচনার বাইরে ছিলেন না বলে লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়।

সময়রেখাটিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি ধারার লেখায় বলা হয়েছে, রাজগুরু অগ্রবংশ ১৯৭৬ সালের শেষদিকে রাঙ্গামাটির রাজবিহার ছেড়ে যান। অন্যদিকে রাজবন বিহারের তথ্য অনুযায়ী, বনভান্তে ১৯৭৬ সালে প্রথম রাজবন বিহারে বর্ষাবাস করেন এবং ১৯৭৭ সালে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। অর্থাৎ সত্তরের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে রাঙ্গামাটির বৌদ্ধ নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছিল।

এই পরিবর্তন কি শুধু ধর্মীয় মতপার্থক্যের ফল ছিল, নাকি এর সঙ্গে জাতিগত পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা এবং গোষ্ঠীগত স্বার্থও জড়িয়ে ছিল—এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রাজগুরু অগ্রবংশ ছিলেন তঞ্চঙ্গ্যা। প্রবীণদের মুখে আজও শোনা যায়, চাকমা সমাজের একটি অংশ তখন বলতে শুরু করেছিল, “আমাদের চাকমাদের কি একজনও বড় ভান্তে নেই?”

এই মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে চাকমা সমাজের কিছু প্রভাবশালী ও তথাকথিত উচ্চশ্রেণির মানুষ বনভান্তেকে সামনে নিয়ে আসেন—এমন বয়ানও বহুদিন ধরে প্রচলিত। পরে “আমা ভান্তে”—অর্থাৎ “আমাদের চাকমা ভান্তে”—ধারণাটি চাকমা সমাজে এত শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে বনভান্তের বক্তব্য, সিদ্ধান্ত বা অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলা অনেকের কাছে যেন নিজের জাতির বিরুদ্ধে কথা বলার সমান হয়ে দাঁড়ায়।

সমস্যা এখানেই। কোনো ধর্মগুরুর প্রতি শ্রদ্ধা যখন সমালোচনাহীন আনুগত্যে পরিণত হয়, তখন যুক্তি ও আত্মসমালোচনা দুর্বল হয়ে যায়। বনভান্তে যা বলতেন, তার সবকিছুই অনেকে মাথা পেতে নিতেন—পাছে তাঁকে প্রশ্ন করলে চাকমা সমাজেরই বদনাম হয়। এই মানসিকতার ফলে ব্যক্তির ধর্মীয় মর্যাদা আর জাতিগত অহংকার একসঙ্গে মিশে যায়।

আজও বনভান্তের কিছু শিষ্য ও অনুসারীকে ঘিরে চাকমা সমাজে একই প্রবণতা দেখা যায়। তাঁদের বক্তব্য বা আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই অনেক সময় যুক্তির বদলে “আমাদের ভান্তে”, “আমাদের সংঘ”, “আমাদের মর্যাদা”—এই আবেগ সামনে চলে আসে। তখন সত্যের চেয়ে গোষ্ঠীগত সম্মান রক্ষা বড় হয়ে ওঠে।

এ কারণেই “আমা ভান্তে” শুধু একটি স্নেহের সম্বোধন ছিল কি না, নাকি এটি ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী চাকমাকেন্দ্রিক ধর্মীয় পরিচয় তৈরি করেছিল—এই প্রশ্নও ইতিহাসের আলোচনায় আসা দরকার।

তাহলে প্রশ্ন আসে, এই “আমা ভান্তে” ধারণার মধ্যে শুধু ধর্মীয় শ্রদ্ধা ছিল, নাকি চাকমাকেন্দ্রিক জাতিগত আবেগও কাজ করেছিল? বনভান্তের প্রধান শিষ্যদের মধ্যে কতজন মারমা ছিলেন, কতজন তঞ্চঙ্গ্যা, কতজন অন্য জুম্ম জনগোষ্ঠীর? তাঁর ধর্মীয় আন্দোলন বৃহত্তর জুম্ম বৌদ্ধ সমাজে সমানভাবে বিস্তৃত হয়েছিল, নাকি মূলত চাকমা সমাজকেন্দ্রিক শক্তিশালী ধর্মীয় পুনর্জাগরণে পরিণত হয়েছিল?

এই প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে নয়, তথ্য দিয়ে দেওয়া সম্ভব। তাঁর প্রধান শিষ্যদের তালিকা সামনে আসুক।

শিক্ষার প্রশ্নে বনভান্তেকে নিয়ে আরও বড় বিতর্ক আছে। তাঁর বহু পুরনো দেশনা আজও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়ায়। বিভিন্ন লেখায় তাঁর নামে এমন বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে, যেখানে ভিক্ষুদের আধুনিক পড়াশোনা, স্কুল বা অনাথ আশ্রম পরিচালনা, চাকরি, বিদেশে পড়াশোনা কিংবা আধুনিক জীবনযাপনের কিছু অংশকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

এখানে কথাটি ঘুরিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। যদি এসব বক্তব্য সত্য এবং পূর্ণ প্রেক্ষাপটেও একই অর্থ বহন করে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—একটি শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা, রাজনৈতিকভাবে দুর্বল এবং অস্তিত্বের সংকটে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য এমন শিক্ষা কতটা উপকারী ছিল?

ধর্মীয় শিক্ষা প্রয়োজন, শীল প্রয়োজন, ধ্যান প্রয়োজন। কিন্তু একটি জাতিকে টিকিয়ে রাখতে ডাক্তার লাগে, আইনজীবী লাগে, শিক্ষক লাগে, গবেষক লাগে, সাংবাদিক লাগে, প্রশাসন বোঝা মানুষ লাগে, আন্তর্জাতিক ভাষা জানা তরুণ লাগে এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন সমাজ লাগে। শুধু পুণ্য দিয়ে ভূমি রক্ষা হয় না, শুধু ধ্যান দিয়ে রাজনৈতিক অধিকার পাওয়া যায় না, আর শুধু বিহার নির্মাণ করে একটি জাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা যায় না।

তবে বনভান্তের ইতিবাচক অবদানও অস্বীকার করা যাবে না। তিনি বহু মানুষকে শীল, ধ্যান, সংযম ও ধর্মচর্চার দিকে নিয়ে গেছেন। কুসংস্কার, তন্ত্র-মন্ত্র ও নানা অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে তাঁর ভূমিকা ছিল। তাঁর কারণে চাকমা সমাজে বৌদ্ধ ধর্মীয় চেতনা গভীর হয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় অবদান স্বীকার করলেই তাঁর সামাজিক দর্শনের সমালোচনা বন্ধ হয়ে যায় না।

এরপর আসে শান্তিবাহিনীর প্রশ্ন। পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত একটি কথা হলো, বনভান্তে শান্তিবাহিনীর প্রতি বিরূপ ছিলেন এবং তাঁর কিছু দেশনায় সেই মনোভাব পাওয়া যায়। আজও সেই ধরনের দেশনার অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়ায়।

এখানে পূর্ণ সত্য সামনে আসা দরকার। তিনি কি শুধু হত্যা ও সশস্ত্র যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন, নাকি শান্তিবাহিনী যে রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতর থেকে জন্মেছিল—ভূমি, পরিচয়, স্বায়ত্তশাসন ও জুম্মদের রাজনৈতিক অধিকার—সেই আন্দোলনের প্রতিও তাঁর বিরোধিতা ছিল? এই দুই অবস্থান এক নয়।

তাই তাঁর পুরনো অডিও দেশনা সামনে আনা হোক। কোন সালে, কোন পরিস্থিতিতে, কোন বক্তব্য তিনি দিয়েছিলেন—সব প্রকাশ হোক। বনভান্তের নামে কেউ নতুন কথা যোগ করবে না, আবার ভক্তির কারণে তাঁর কঠিন রাজনৈতিক বক্তব্যও লুকিয়ে রাখা হবে না।

এরপর আসে সবচেয়ে অস্বস্তিকর অধ্যায়—সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক। এখানে অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আর শুধু শোনা কথা নয়। রাজবন বিহারের নিজস্ব তথ্যপঞ্জিতে লেখা আছে, ১৯৯১ সালে বনভান্তে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে যমচুগ, রূপকারী এবং খাগড়াছড়ির মহাজনপাড়ায় ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেন। একই বছর রাঙ্গামাটির রিজিয়ন কমান্ডার আহসান নাজমুল আমীন সস্ত্রীক রাজবন বিহারের কঠিন চীবরদানের বেইন বুনা দেখতে আসেন।

এই তথ্য ছোট নয়। সেই সময়ের পাহাড়ে একজন ধর্মগুরুর ধর্মীয় সফরের জন্য সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার কেন প্রয়োজন হলো? সেনা সাহায্য ছাড়া কি ধর্ম প্রচার সম্ভব ছিল না?

আরও একটি গুরুতর অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় আছে। বলা হয়, রাঙ্গামাটিতে দায়িত্ব পালনকালে লে. কর্নেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম বনভান্তের বিপুল ধর্মীয় প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে পাহাড়িদের কাছে সেনাবাহিনীর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। বিভিন্ন বর্ণনায় রাজবন বিহারের অনুষ্ঠানে সেনা সহযোগিতা, ফেরিঘাটে সুবিধা, আর্থিক অনুদান, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সেনা কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ এবং বনভান্তেকে হেলিকপ্টারে নিয়ে যাওয়ার কথাও এসেছে।

এই অভিযোগের প্রতিটি অংশ স্বাধীনভাবে যাচাই করা দরকার। কিন্তু রাজবন বিহারের নিজের তথ্যপঞ্জিতেই সেনা হেলিকপ্টার ব্যবহারের ঘটনা নথিভুক্ত থাকায় সামরিক কর্তৃপক্ষ ও বনভান্তের প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠতার প্রশ্নটি আর নিছক গুজব বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

২০১৩ সালের “পার্বত্য এলাকার বৌদ্ধ ধর্মের অতীত ও বর্তমান প্রেক্ষাপট” লেখায় আরও সরাসরি বলা হয়েছে, তৎকালীন সময়ে বনভান্তেকে “সামরিক অফিসারেরা ব্যবহার করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি।” এটি কোনো সরকারি তদন্তের সিদ্ধান্ত নয়; লেখকের মূল্যায়ন। কিন্তু অভিযোগটি লিখিতভাবে আছে এবং সেই সময়কার সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা দরকার।

কারণ প্রবীণ জুম্মদের স্মৃতিতে একটি বিষয় বারবার উঠে আসে—সেই সময় সাধারণ পাহাড়িরা সেনাবাহিনীর সাহায্য গ্রহণকে স্বাভাবিকভাবে দেখত না। সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল সংঘাত, অভিযান, ভয়, সন্দেহ ও নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত।

তখন সেনাদের সাহায্য নেওয়াকে অনেকেই নিছক সাহায্য মনে করত না। বিষয়টি ছিল অনেকটা “দেওয়া-নেওয়া”—give and take। সেনাবাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলে বিনিময়ে তথ্য দিতে হবে কি না, সহযোগিতা করতে হবে কি না, কিংবা সেই ব্যক্তি সেনাদের হয়ে কাজ করছে কি না—এসব সন্দেহ তৈরি হতো।

এ কারণেই যারা সেনাদের তথ্য দিত বা নিয়মিত সুবিধা নিত, তাদের অনেককে সাধারণ জুম্মরা নিজেদের স্বার্থের বিপরীত পক্ষ হিসেবে দেখত। এমন বাস্তবতায় বনভান্তের মতো অত্যন্ত জনপ্রিয় ধর্মগুরু প্রকাশ্যে সেনা হেলিকপ্টার ব্যবহার করলে এবং সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলে তার সামাজিক প্রভাব অবশ্যই বড় ছিল।

আমার মূল্যায়ন স্পষ্ট—বনভান্তে সেনাবাহিনীর সাহায্যকে বৈধতা দিয়েছিলেন। আগে যে সেনা সাহায্য সাধারণ জুম্ম সমাজে সন্দেহ, ভয় ও বিরাগের বিষয় ছিল, বনভান্তের মতো সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় ধর্মগুরুর প্রকাশ্য সেনা সহায়তা গ্রহণ সেই সামাজিক বাধা ভাঙতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

আজ পাহাড়ে আমরা সেনাবাহিনীকে বিহারে অনুদান দিতে, স্কুলে সামগ্রী দিতে, ক্লাবকে সহায়তা করতে, ব্যক্তিকে টাকা দিতে এবং নানা সামাজিক কর্মসূচি পরিচালনা করতে দেখি। এখন এসব অনেকের কাছেই স্বাভাবিক। কিন্তু এটি সবসময় স্বাভাবিক ছিল না।

এই পরিবর্তন হঠাৎ হয়নি। সমাজের সবচেয়ে প্রভাবশালী ধর্মগুরু যদি সেনা সাহায্য গ্রহণ করেন, সেনা হেলিকপ্টারে ধর্মীয় সফর করেন এবং সামরিক কর্মকর্তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক অতিথিতে পরিণত করেন, তাহলে সাধারণ মানুষের কাছেও সেনা সাহায্য নেওয়ার মানসিক বাধা দুর্বল হওয়াই স্বাভাবিক।

এই কারণেই বনভান্তের সময়কে পাহাড়ে সেনা সাহায্য গ্রহণের সামাজিক বৈধতা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা দরকার।

আরও বড় প্রশ্ন হলো, সরকারি সাহায্য সেনাবাহিনীর হাত দিয়ে জনগণের কাছে যাবে কেন? জনসেবা করার জন্য মেম্বার আছে, চেয়ারম্যান আছে, উপজেলা প্রশাসন আছে, পার্বত্য জেলা পরিষদ আছে, উন্নয়ন বোর্ড আছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তর আছে। জনগণের জন্য বরাদ্দ সরকারি অর্থ এসব বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই জনগণের কাছে পৌঁছাতে পারে।

রাজবন বিহারের নিজের ইতিহাসই এর উদাহরণ। তাদের তথ্যপঞ্জিতে উল্লেখ আছে, ২০০০ সালে রাজবন বিহারের অতিথিশালা এবং ১০ শয্যার হাসপাতাল সরকারি অনুদানে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে নির্মিত হয়েছিল। অর্থাৎ সরকার চাইলে বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে সাহায্য দিতে পারে।

তাহলে ধর্মীয় সফর, বিহার, স্কুল, ক্লাব কিংবা সাধারণ মানুষের সামাজিক সাহায্যে সেনাবাহিনীকে মধ্যস্থতাকারী হতে হবে কেন? রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা আর স্থানীয় জনসেবা এক কাজ নয়। সামরিক প্রতিষ্ঠান যখন নিয়মিত বেসামরিক উন্নয়ন ও সামাজিক সাহায্যের দায়িত্ব নেয়, তখন শুধু সাহায্যই দেওয়া হয় না; সেই প্রতিষ্ঠানের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও তৈরি হয়।

এই কারণেই প্রশ্নটি আরও সরাসরি হওয়া উচিত—সেনা সাহায্য ছাড়া কি ধর্ম প্রচার হয় না? সাধারণ মানুষের দান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বেসামরিক প্রশাসন এবং সমাজের নিজস্ব শক্তি দিয়ে কি বিহার ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান চালানো সম্ভব নয়?

এর বিপরীতে রাজগুরু অগ্রবংশের নেতৃত্বের ধরনও দেখা দরকার। তাঁকে বনভান্তের বিপরীতে বড় করার জন্য নয়, বরং একজন ধর্মগুরু একই পরিস্থিতিতে আর কী ভূমিকা নিতে পারেন তা বোঝার জন্য।

অগ্রবংশ শুধু ধর্মদেশনায় সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তাঁর জীবনীতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের দুর্দশা তুলে ধরার কথা পাওয়া যায়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত পার্বত্য ভিক্ষুসংঘের পরবর্তী ইতিহাসেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য প্রতিবাদের নজির আছে।

২০০৩ সালের মহালছড়ি হামলার পর পার্বত্য ভিক্ষুসংঘ খাগড়াছড়ি সদরে মৌনমিছিল করে। তারা বিচার, মানুষের নিরাপত্তা, ধ্বংস হওয়া বৌদ্ধ বিহার পুনর্নির্মাণ, অপরাধীদের শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দাবি করে প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দেয়।

এখানে পরিষ্কার করে বলা দরকার, ২০০৩ সালের সেই মিছিলে বৃদ্ধ রাজগুরু অগ্রবংশ নিজে হেঁটেছিলেন—এমন প্রমাণ আমার হাতে নেই। কিন্তু তিনি যে ভিক্ষুসংঘ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই ধারাটি দেখিয়েছে যে ধর্মচর্চার পাশাপাশি মানুষের ওপর অন্যায় হলে ভিক্ষুরাও প্রতিবাদে দাঁড়াতে পারেন।

এটাই আসল প্রশ্ন। একজন ধর্মগুরু কি শুধু পুণ্য, ধ্যান ও নির্বাণের কথা বলবেন, নাকি তাঁর সামনে একটি জাতির ওপর অন্যায় হলে সেই জাতির পাশে দাঁড়াবেন? ধর্মচর্চা, শিক্ষা, সমাজসেবা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ—এসব একসঙ্গে করা কি অসম্ভব?

বনভান্তের অবদান আছে এবং তাঁর ধর্মীয় প্রভাব অসাধারণ ছিল। কিন্তু সেই প্রভাবের সামাজিক মূল্যও বিচার করতে হবে। তিনি যদি আধুনিক শিক্ষাকে নিরুৎসাহিত করে থাকেন, সেটি আলোচনায় আসবে। তিনি যদি শান্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য দিয়ে থাকেন, পুরো বক্তব্য সামনে আসবে। তিনি যদি সেনাবাহিনীর সহায়তা গ্রহণ করে পাহাড়ে সেনা সাহায্যকে বৈধতা দিয়ে থাকেন, সেটিও ইতিহাসের আলোচনায় আসবে। তাঁর ধর্মীয় আন্দোলন যদি মূলত চাকমাকেন্দ্রিক হয়ে থাকে, তাঁর শিষ্যদের জাতিগত পরিচয়ের তথ্য দিয়ে সেটিও যাচাই করা হবে।

এসব প্রশ্ন ধর্ম অবমাননা নয়। এগুলো ইতিহাসের প্রশ্ন। আর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শত্রু অন্ধ ভক্তি।

তাই কয়েকটি প্রশ্ন সামনে থাকুক। “আমা ভান্তে” কথাটি কখন থেকে জনপ্রিয় হলো? বনভান্তের প্রধান মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা ও অন্য জুম্ম শিষ্য কারা ছিলেন? তিনি শান্তিবাহিনী সম্পর্কে ঠিক কী বলেছিলেন? আধুনিক শিক্ষা সম্পর্কে তাঁর সম্পূর্ণ বক্তব্য কী ছিল? সেনাবাহিনীর সঙ্গে রাজবন বিহারের সম্পর্ক কখন শুরু হয়েছিল? কী কী সহায়তা নেওয়া হয়েছিল? আর সেনা সহায়তা গ্রহণকে পাহাড়ি সমাজে স্বাভাবিক করে তোলার ইতিহাস কোথা থেকে শুরু?

যাঁরা জানেন, তাঁরা লিখুন। যাঁদের কাছে পুরনো অডিও, ছবি, চিঠি, দলিল বা প্রত্যক্ষ স্মৃতি আছে, তাঁরা সামনে আনুন। কেউ যদি বলেন এসব অভিযোগ মিথ্যা, দলিল দিন; কেউ যদি বলেন সত্য, তাহলেও দলিল দিন।

১৯৮০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত যখন পাহাড়ের মানুষের ভূমি, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক অধিকার ও অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে ছিল, তখন আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল কী—আরও বেশি ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও পুণ্য, নাকি আরও বেশি স্কুল, উচ্চশিক্ষিত তরুণ, সামাজিক সংগঠন, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস?

আর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি রয়ে যায়—যে জুম্ম সমাজ একসময় সেনাবাহিনীর সাহায্য নেওয়াকে ঘৃণা ও সন্দেহের চোখে দেখত, সেই সমাজে আজ সেনা সাহায্য এত স্বাভাবিক হয়ে গেল কীভাবে? সেই পরিবর্তনের ইতিহাসে বনভান্তের ভূমিকা কতটা?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হবে। কারণ পাহাড়ের ইতিহাস শুধু কে কত বড় ধর্মগুরু ছিলেন তার ইতিহাস নয়; পাহাড়ের ইতিহাস এটাও—কার নেতৃত্ব সমাজকে শিক্ষিত, সংগঠিত, সচেতন ও নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে, আর কোন সামাজিক পরিবর্তন বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের বদলে সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরতার সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক করেছে।

বনভান্তে কত বড় সাধক ছিলেন, সেটি ধর্মীয় ইতিহাস বিচার করবে। কিন্তু তাঁর সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবও ইতিহাস বিচার করবে। একজন ধর্মগুরুকে শ্রদ্ধা করা মানে তাঁর প্রভাবের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন করা নিষিদ্ধ নয়। ভক্তি ধর্মের বিষয়; ইতিহাস প্রমাণের বিষয়। দুটিকে এক করে ফেললে সত্য হারিয়ে যায়।

পড়ার জন্য সূত্র: রাজবন বিহার—বনভান্তের তথ্যপঞ্জি · পার্বত্য এলাকার বৌদ্ধ ধর্মের অতীত ও বর্তমান প্রেক্ষাপট · পার্বত্য ভিক্ষুসংঘ—রাজগুরু অগ্রবংশ মহাস্থবির · মহালছড়ি হামলার পর পার্বত্য ভিক্ষুসংঘের প্রতিবাদ.

Do you want to know more?

Please check here


Leave a Reply