
বাংলাদেশে হিন্দু ও সংখ্যালঘুদের জন্য বিচার এখনো সমান নয়—এই কথাটি শুধু অনুভূতি নয়, এটি প্রতিদিনের বাস্তবতা। গতকাল হিন্দু ও সংখ্যালঘুরা একজন মুসলিম সংসদ সদস্যের হিন্দু ধর্ম অবমাননার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে। তারা ব্যানার তুলেছে, প্ল্যাকার্ড ধরেছে, এবং প্রকাশ্যে আওয়াজ তুলেছে.
কারণ আর নীরব থাকা সম্ভব নয়। হিন্দু ধর্মকে প্রকাশ্যে অপমান করা হয়েছে, অথচ রাষ্ট্রের কোথাও সেই জরুরি ব্যবস্থা দেখা যায়নি। এই ঘটনাই স্পষ্ট করে দেয়, বাংলাদেশে বিচার আজো পরিচয় দেখে বদলায়—ক্ষমতাবান হলে নিরাপদ, সংখ্যালঘু হলে বিপদ।
অনেক সময় মহাবিপদ। ঘর-বাড়ী এবং কি গ্রাম আক্রমণ করা হয়।
যদি এই অভিযুক্ত লোকটি মুসলিম না হয়ে হিন্দু বা কোনো সংখ্যালঘু হতো আর হিন্দু পরিচয়ে ইসলাম ধর্ম নিয়ে একটি শব্দও বলত, তাহলে অনেক আগেই তার বাড়ি আক্রমণ হতো। তার পরিবার রাতারাতি পালাতে বাধ্য হতো। স্থানীয় ধর্মীয় গোষ্ঠী মাইক হাতে রাস্তায় নামত আর পুলিশ “পরিস্থিতি শান্ত রাখতে” সঙ্গে সঙ্গেই তাকে আটক করত।
যা শুনলেন সেটাই বাংলাদেশের নিত্যদিনের বিচারব্যবস্থা। একটা আইন কিন্তু তার প্রয়োগ দুই রকম: মুসলিমের জন্য এক ধরনের, হিন্দু ও সংখ্যালঘুর জন্য আরেক ধরনের।
বাংলাদেশে হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুর ওপর ধর্ম অবমাননার অভিযোগে যা যা হয়েছে, তা ইতিহাসের সবচেয়ে অসম অধ্যায়। রামুর বৌদ্ধ বিহার পুড়েছে, উখিয়ার মন্দির ভেঙেছে, পাবনায় হিন্দু বাড়িঘর লুট হয়েছে, ভোলায় হিন্দু যুবকের আইডি হ্যাক করে দোষ চাপিয়ে মানুষের প্রাণ গেছে।
রংপুরে গুজব ছড়িয়ে পুরো গ্রাম উচ্ছেদ হয়েছে, কোথাও কুমিল্লায় স্ক্রিনশট ছড়িয়ে ঘরে আগুন লেগেছে। প্রতিটি ঘটনায় একই নাটক—সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তাকে শাস্তি দিতে সবাই এক হয়। কিন্তু সংখ্যালঘু আক্রান্ত হলে রাষ্ট্র “তদন্ত” করে, অপেক্ষা করে, নীরব থাকে।
তারপর একদিন সব কোথায় যেন হারিয়ে যায়। অপরাধী পার পেয়ে যায় এবং আবার সেই একই কাজ করে বীর দর্পে সমাজে ঘুরে বেড়ায়।
হিন্দু ও সংখ্যালঘুর অনুভূতি কি অনুভূতি নয়?
একজন হিন্দু বা সংখ্যালঘু যদি ভুল করে, কিছু লেখে, প্রশ্ন তোলে, তৎক্ষণাৎ ধর্ম অবমাননার মামলা হয়। কিন্তু একজন মুসলিম, তা সে সাধারণ মানুষ হোক বা সংসদ সদস্য, যদি প্রকাশ্যে হিন্দু ধর্মকে অপমান করে তখন কেন সেই একই উত্তেজনা দেখা যায় না? কেন তার বিরুদ্ধে মামলা হয় না? কেন তার বাড়ি আক্রমণ হয় না? কেন প্রশাসন জরুরি সভা ডাকে না?
এই দ্বৈত বিচারই সংখ্যালঘুদের মনে সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা তৈরি করেছে আর সেটাই গতকালে প্রতিবাদে অংশ নেওয়া মানুষের মুখে আগুণ হয়ে বেরিয়ে এসেছে।
হিন্দু ও সংখ্যালঘুরা কারও শত্রু নয়। তারা এই দেশকে ভালোবাসে, কর দেয়, শ্রম দিয়ে এই দেশ তৈরিতে অংশ নেয়, সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখে, উৎসবকে রঙিন করে। অথচ কেন তাদের সম্মানের মূল্য এত কম? কেন তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কেউ ভাবেন না? কেন তাদের সন্তান স্কুলে গেলে দুশ্চিন্তা থাকে, উৎসব এলে আতঙ্ক বাড়ে, আর কোনো অপমান হলে বিচার পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়?
এই প্রশ্নগুলো আজ বাংলাদেশের সামগ্রিক বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
গতকালের সমাবেশ তাই শুধু একটি বিক্ষোভ নয়। সেটি হিন্দু ও সংখ্যালঘুদের দীর্ঘদিনের নীরবতার বিরুদ্ধে প্রথম বড় প্রতিবাদ। এটি জানিয়ে দেওয়া যে হিন্দু ও সংখ্যালঘুরা আর ভয় পাবে না, আর চুপ থাকবে না, আর নিজের অপমান মেনে নেবে না।
এটি জানিয়ে দেওয়া যে হিন্দু ধর্মকে অপমান করার অধিকার কারও নেই তা সে মুসলিম হোক, রাজনৈতিক নেতা হোক, কিংবা ক্ষমতার কেন্দ্রের কেউ হোক। বিচার যদি সবার জন্য সমান হয়, তবে হিন্দু ও সংখ্যালঘুর মর্যাদাও সবার মতো সমান হবে—এটাই আজকের দাবির কেন্দ্রবিন্দু।
বাংলাদেশের ইতিহাসে কত বৌদ্ধ মন্দির পুড়েছে, কত বৌদ্ধমূর্তি ভাঙা হয়েছে, তার পূর্ণ হিসাব কি আমাদের কাছে আছে?
শত শত বছরের পুরোনো বিহার ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। বুদ্ধমূর্তি ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে। তবুও সেগুলোকে কেউ “ধর্ম অবমাননা” বলে মানতে চায় না। একইভাবে কত হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি ভাঙা হয়েছে, কত মন্দিরে আগুন দেওয়া হয়েছে, কত প্রতিমা অবমাননার শিকার হয়েছে তার কোনো বিচার আজও সম্পূর্ণ হয়নি।
তবে যখন সংখ্যালঘুরা কিছু বললে, সামান্য রসিকতা করে বা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয় তখনই হঠাৎ ধর্ম অবমাননার ঝড় উঠে। সংখ্যাগুরু যখন ভাঙে, সেটি দাঙ্গা বা উত্তেজনা। কিন্তু সংখ্যালঘু যখন কথা বলে, সেটি নাকি অপরাধ। এই বৈপরীত্যই বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্মম সত্য।
বাংলাদেশ চাইলে বদলে যেতে পারে, কিন্তু তার প্রথম শর্ত হলো সত্য স্বীকার করা। তবে বদলে যাওয়ার আশা একদম শূন্য কোঠায়। তবু মনে আশা জাগে যদি বদলে যেত।
এই দেশে ধর্মের নামে বহু হিন্দু ও সংখ্যালঘু পরিবার হামলার শিকার হয়েছে, ঘরবাড়ি হারিয়েছে, অপমানিত হয়েছে, আর বহু অপরাধী রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে শাস্তি এড়িয়ে গেছে। ন্যায়বিচার তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন হিন্দু ও সংখ্যালঘুর জীবন, অনুভূতি এবং সম্মানকে সমান মূল্য দেওয়া হবে।
কারণ হিন্দু ও সংখ্যালঘুর জীবনও জীবন, অনুভূতিও অনুভূতি, আর মর্যাদাও মর্যাদা।