
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যাদের নাম একসময় নিষিদ্ধ উচ্চারণের মতো ছিল, আজ সেই চারজনের নাম আবার উঠে এসেছে — গোলাম আজমের ছেলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আজমী, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী, মীর কাসেম আলীর ছেলে ব্যারিস্টার আরমান (মীর আহমেদ বিন কাসেম) এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি নেতা মাইকেল চাকমা।
চারজনের চারটি গল্প আলাদা, কিন্তু তাদের এক সূত্রে বেঁধে রাখে একটি অভিজ্ঞতা—রাষ্ট্রীয় গুম, বন্দিত্ব ও অদৃশ্য ক্ষমতার ছায়া।
আজ যখন মাইকেল চাকমা আবারও একটি পুরোনো মামলায় রাঙামাটির আদালত থেকে ৮ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন, তখন প্রশ্ন জেগেছে—এই মানুষটি কি সত্যিই অপরাধী, নাকি রাজনীতির খেলায় “মাঝখানে পড়ে যাওয়া” এক বলি?
গুম থেকে আদালত পর্যন্ত এক রাজনৈতিক নাটক:
২০১৯ সালে হঠাৎ নিখোঁজ হওয়া মাইকেল চাকমা সেই সময় “ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (UPDF)”-এর অন্যতম সংগঠক ছিলেন। তার গুমের অভিযোগের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল কুখ্যাত “আয়না ঘর” কারাগারের নাম। দীর্ঘ সময় পর ২০২৪ সালের অগাস্টে গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তিনি ফিরে এসে বলেছিলেন, “আমাকে সাদা পোশাকে তুলে নিয়ে অন্ধকারে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। শুনেছি বাইরে অনেকে মরছে, কিন্তু ভিতরে আমরা তখনও জীবিত লাশ।”
এই সাক্ষ্য কেবল একজন নেতার নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের নীরব আর্কাইভ। কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেই মানুষটি আজ আবার আদালতে অভিযুক্ত—একটি ২০০৭ সালের চাঁদাবাজির মামলায়, যেখানে তিনি নাকি এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা আদায়ের চেষ্টা করেছিলেন।
প্রশ্ন হলো—১৭ বছর পর কেন এই মামলার রায়? এখন কেনই বা এই সাজা?
চারজনের সমান্তরাল ইতিহাস:
আজমী, হুম্মাম, আরমান এবং মাইকেল—এই চারজনের জীবনরেখা আলাদা হলেও রাষ্ট্রীয় আচরণের ধরন প্রায় একই।
- আজমী ছিলেন সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার, কিন্তু গোলাম আজমের পুত্র হওয়ার অপরাধে আট বছর গুম থেকে ফিরে এলেন।
- হুম্মাম কাদের চৌধুরী আদালত থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ, পরে ফিরে এসে বললেন—“বাবার রায় ট্রাইব্যুনালে লেখা হয়নি, লেখা হয়েছিল মন্ত্রণালয়ে।”
- মীর আহমেদ বিন কাসেম (আরমান) তার বাবার মৃত্যুদণ্ডের পর নিখোঁজ, পরে একইভাবে ফিরে এলেন।
- আর পাহাড়ের মাইকেল চাকমা—একজন ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ—যার অপরাধ হয়তো তার অস্তিত্বই।
এই চারজনই একসময় “মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল”কে প্রশ্ন করেছিলেন, এবং অনেকেই মনে করেন তারা শেষ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালত বা মানবাধিকার কমিশনে আইনি পদক্ষেপ নিতে চেয়েছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে তাদের গুম, মামলা ও নিগ্রহ কাকতালীয় বলে মনে হয় না।
তাহলে মাইকেল চাকমা কি সেনাবাহিনীর সঙ্গে আপস করেছেন?
প্রশ্নটি রাজনৈতিক এবং জটিল। কারণ, পাহাড়ে সেনাবাহিনী কেবল নিরাপত্তা বাহিনী নয়, বরং একটি অদৃশ্য প্রশাসন—যাদের উপস্থিতিতে শান্তিচুক্তিও আজ ভঙ্গুর।
মাইকেল চাকমা একদিকে সেই সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, আবার অন্যদিকে আদালতে হাজির হয়েছেন, নির্বাচনের সময় নীরব থেকেছেন, এমনকি কিছু সভায় অংশও নিয়েছেন—যা অনেকের চোখে “আপস”।
তবে বাস্তবতা হলো, “আপস” এবং “বেঁচে থাকা”—বাংলাদেশে প্রায়ই একই জিনিস। যে দেশে গুম হওয়া মানুষ ফিরে আসে শুধুমাত্র রাজনৈতিক পালাবদলের পর, সেখানে আদালতের মুখোমুখি দাঁড়ানোই হয়তো একধরনের প্রতিরোধ।
মাঝখানে পড়া নাকি পরিকল্পিত বিচ্ছিন্নতা:
মাইকেল চাকমা হয়তো সত্যিই “মাঝখানে পড়ে” গেছেন—একদিকে রাষ্ট্র, অন্যদিকে নিজের দল। পাহাড়ের রাজনীতি এখন বিভক্ত: একাংশ ইউপিডিএফ, আরেকাংশ পার্বত্য চুক্তিপন্থী জনসংহতি সমিতি, আর মাঝখানে রয়েছেন সাধারণ পাহাড়িরা।
সেনাবাহিনী যেভাবে এসব বিভক্তিকে কাজে লাগায়, তাতে মনে হয় “মাইকেল” নামটি আসলে এক রাজনৈতিক উদাহরণ—যাকে দমনও করা যায়, আবার প্রয়োজনমতো ব্যবহারও করা যায়।কাজ শেষ হয়ে গেলে বন্দি করে রাখা যায় বা ক্রসফায়ার দেওয়া যায়।
আমার শেষ কথা:
আমার শেষ কথা হয়তো নির্মম শোনাবে। কিন্তু বাস্তব। মাইকেল বাবু আমার কেউন নন। কিন্তু তিনি আমার পাহাড়ের ভাই। অনেক কিছুর মধ্যে আমার সাথে অমিল থাকতে পারে কিন্তু হাজারো বিষয় মিল আছে।
হ্যাঁ, বাংলাদেশে রাষ্ট্র যখন “অপরাধ” ও “রাজনীতি”র সীমারেখা নিজেই মুছে ফেলে, তখন বিচার আর ন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য থাকে শুধু কাগজে। আজ মাইকেল চাকমা হয়তো বাইরে আগামীকাল হয়তো কারাগারে কিংবা পলাতক আসামী কিংবা ক্রসফায়ারে মৃত একটি লাশ, কিন্তু প্রশ্নটা পাহাড়ের বাতাসে রয়ে গেছে, তিনি কি অপরাধী, না কি রাষ্ট্রের চোখে অদৃশ্য হওয়া এক প্রতীক?
যদি তিনি সত্যিই আপস করেন, তবুও সেটা হয়তো নিজের বাঁচার জন্য; আর যদি তিনি মাঝখানে পড়েন, তবে সেই মাঝখানটাই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অন্ধকারতম অঞ্চল—যেখানে আইন, বিচার আর জাতিগত সত্য একে অপরের শত্রু হয়ে আছে।
কিন্তু পরিশেষে পাহাড়ের একটি দ্বীপ নিভে দেওয়া। তাই সরকারের পোষা কারখানায় যেন কোন পাহাড়ের দ্বীপ জন্ম না নেয়। আমাদের প্রত্যকের এই পরিণতি আগেভাবে ভাবতে হবে।