
টোকিওর রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই ব্যানারটি কেবল শব্দ নয় — এটি একটি দাবি, একটি ঘোর দৃষ্টি ও নিঃশব্দ প্রতিবাদ। পাহাড়ের যে মানুষগুলো তাদের জন্মভূমিতে কথা বলার অধিকার হারিয়েছে, তারাই আজ জাপানের রাজধানীর হৃদয়ে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছে, আমরা আর চুপ করে থাকবো না।
পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ দেশগুলোর একটি শহর, টোকিও — যেখানে শান্তি প্রতিদিনের অভ্যাস। আর ঠিক সেই শহরের নিস্তব্ধ রাস্তায় আজ প্রতিধ্বনিত হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের আর্তনাদ, জুম্ম জাতি মানুষের ঘোষণা, “STOP STATE-SPONSORED ATTACK ON INDIGENOUS JUMMA PEOPLES IN CHT.”
বিদেশের আলোয় যারা বাস করছে, তারা আজও পাহাড়ের আঁধার ভুলে যায়নি। টোকিওর ট্রেনের শব্দ, গাড়ির হর্ণ, আকাশছোঁয়া দালানের মাঝে তাদের চোখে এখনো জ্বলছে জ্বালিয়ে দেওয়া গ্রামগুলোর আগুন। তারা জানে, পাহাড়ের মাটি থেকে যদি কণ্ঠরোধ করা হয়, তবে সেই কণ্ঠ অন্য কোনো শহর থেকে জেগে উঠবেই। আজ সেই কণ্ঠ জেগেছে টোকিওতে, বিশ্বের অন্যতম কূটনৈতিক কেন্দ্রের সামনে।
সেখানে বলা হয়েছে স্পষ্ট ভাষায়, “তোমরা শান্তিচুক্তি বাতিল করে দেখাও, আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বাধীনতা ঘোষণা দিতে পারি কিনা।”
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা যেন এক অনন্ত নিপীড়নের ইতিহাসে বন্দি হয়ে আছে। পাকিস্তান আমলে শুরু হওয়া বৈষম্য স্বাধীন বাংলাদেশের অর্ধশতকেও শেষ হয়নি; বরং নতুন রূপে ফিরে এসেছে। ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি পাহাড়ে একটুখানি আশার আলো জ্বালিয়েছিল, কিন্তু তিন দশক পরও সেই আলো বাস্তব হয়নি। চুক্তিটি সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুলিয়ে রেখেছে—যেন শান্তির নামে আরেকটি প্রতারণা।
এটি কোনো হুমকি নয়, এটি একটি জাতির আত্মরক্ষার অধিকার। প্রায় আট দশকের নিপীড়ন আর তিন দশকের ভঙ্গ প্রতিশ্রুতির পর পাহাড়ের মানুষ আজও দাঁড়িয়ে আছে ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষায়। বাংলাদেশ সরকার, সেনাবাহিনী এবং সেটলার গোষ্ঠী মিলেই শান্তিচুক্তির প্রতিটি ধারা লঙ্ঘন করেছে। অথচ পাহাড়ের মানুষ কখনো সংঘাত চায়নি; তারা শুধু চেয়েছে ন্যায্য অধিকার, সম্মান, এবং শান্তিতে বাঁচার নিশ্চয়তা।
আমরা যারা পাহাড়ের সন্তান, আমরা বলতে চাই, আমাদের ঘর পুড়েছে, আমাদের মায়ের কান্না থামেনি, আমাদের শিশুরা ভয় শেখে ভাষার আগেই। এই ভয় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি রাষ্ট্রের তৈরি ভয়ের রাজনীতি। আর আজ টোকিও থেকে আমরা বলেছি — এই ভয় আমরা মানি না, এই নীরবতা আমরা আর মানবো না।
আজকের সমাবেশে সেই ব্যানারেই লেখা ছিল, “We demand withdrawal of military forces, removal of illegal settlers, justice for the gang-raped 12-year-old Jumma schoolgirl, indigenous youths killed by army gunfire, burning down of Jumma houses and Rangamati massacres, with implementation of the 1997 CHT Peace Accord. Urgently need global solidarity and international intervention to save CHT’s indigenous peoples!”
এই বাক্যগুলো শুধু প্রতিবাদের নয়; এগুলো মানবতার পরীক্ষা। কারণ পাহাড়ে আজও সেনার বুটের নিচে চাপা পড়ছে শিশুদের স্বপ্ন, মায়ের আহাজারি, আর তরুণদের ভবিষ্যৎ।
জাপানের রাজধানীতে এই প্রতিবাদ কেবল বাংলাদেশের সরকারের উদ্দেশ্যে নয়; এটি জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও বিশ্বের সব মানবাধিকার রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে এক সরাসরি বার্তা— চুপ থেকো না। তোমাদের নীরবতা আজ অন্যায়ের সহযোগী হয়ে উঠেছে। পাহাড়ের মানুষ ন্যায় চায়, ন্যায্যতা চায়, তাদের নিজ ভূমিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর অধিকার চায়।
যদি শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন না হয়, যদি দমননীতি অব্যাহত থাকে, তবে পাহাড়ের মানুষ বাধ্য হবে নতুন পথ বেছে নিতে — আর সেই পথের নাম হবে স্বাধীনতা।
শেষে, টোকিওর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণদের চোখে আমি দেখেছি সেই পাহাড় — যেখানে আগুন আছে, কিন্তু আলোও আছে; যেখানে রক্ত আছে, কিন্তু আশাও আছে। তারা আজ প্রমাণ করেছে, নির্বাসনেও জাতি টিকে থাকে, যদি স্মৃতি ও প্রতিরোধ বেঁচে থাকে।
আর সেই প্রতিরোধের শপথ আজ টোকিওর বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে, “তোমরা শান্তিচুক্তি বাতিল করে দেখাও, পাহাড় তার স্বাধীনতা ঘোষণা করবেই। কারণ ভয়ে নীরব থাকার সময় নেই; নীরবতা আর বাঁচানোর নিশ্চয়তা দেয় না।”