মানবতা ও আইন সন্ত্রাসের বিপরীতে

গাজার আকাশে যুদ্ধবিরতির গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। সংবাদ এসেছে—হামাস ২০ জন জিম্মিকে মুক্তি দেবে, বিনিময়ে ইসরায়েল প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনি বন্দিকে ছেড়ে দেবে। সংখ্যার হিসাবে এটি এক “চুক্তি”, কিন্তু মানবতার হিসাবে এটি এক ভয়াবহ লজ্জা। কারণ এই বিনিময় মানবিকতার বিজয় নয়, বরং সন্ত্রাসের বাণিজ্যিক সফলতা। যে সংগঠন নিরপরাধ নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের জিম্মি করে রেখে রাজনীতি করে, তার সঙ্গে কোনো সভ্য রাষ্ট্রের সমঝোতা আসলে দয়ার নয়, দায়ের। হামাস জানে মানুষের আবেগকে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়—তারা জানে, একজন শিশুর মুখ বিশ্ব বিবেককে নরম করে দেয়, আর সেই আবেগের ফাঁক দিয়েই তারা নিজেদের অপরাধকে “আলোচনা”র বিষয় বানিয়ে ফেলে।

মানবতা ও আইনের ইতিহাসে জিম্মি নেওয়ার কোনো বৈধতা নেই। জেনেভা কনভেনশন থেকে শুরু করে প্রতিটি আন্তর্জাতিক নীতি এই কাজকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে। কিন্তু হামাসের কাছে আইন মানে এক কৌশল, ধর্ম মানে এক অস্ত্র, আর জীবন মানে এক ক্রীড়নক। তারা জানে, তাদের প্রতিটি অপরাধের পরও কোনো না কোনো দেশ, কোনো না কোনো সংগঠন তাদের ‘দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পক্ষ’ হিসেবে আহ্বান করবে। এটাই সন্ত্রাসের নতুন কূটনীতি—ভয়কে পুঁজিতে পরিণত করা।

ইসরায়েল এই চুক্তিতে অংশ নিচ্ছে মানবতার জন্য, কিন্তু হামাস এতে অংশ নিচ্ছে হিসাবের জন্য। একদিকে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জীবনের জন্য লড়ছে, অন্যদিকে সন্ত্রাসীরা তাদের জিম্মি বানিয়ে দরকষাকষি করছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে পার্থক্যই সভ্যতা ও বর্বরতার সীমারেখা। রাষ্ট্র ভুল করতে পারে, কিন্তু তার ভুল বিচার হয়, আলোচনায় আসে, সমালোচিত হয়। সন্ত্রাসের ভুল কেবল আরও রক্ত চায়। হামাসের কাছে প্রতিটি যুদ্ধবিরতি নতুন কৌশলের সময়, আর প্রতিটি বন্দি বিনিময় নতুন প্রচারণার হাতিয়ার।

তাদের হাতে বন্দি কেবল মানুষ নয়, বন্দি রয়েছে সত্য, ন্যায়, আর শান্তির সম্ভাবনাও। কারণ প্রতিটি বন্দি যখন মুক্তি পায়, হামাস সেই মুহূর্তকেই ব্যবহার করে “সমতা”র ভান দেখাতে—যেন সন্ত্রাস ও রাষ্ট্র একই টেবিলের আলোচক। কিন্তু সত্য হলো, সন্ত্রাস কখনো রাষ্ট্রের সমান হয় না, আর ঘৃণা কখনো ন্যায়ের বিকল্প নয়। হামাসের প্রতিটি পদক্ষেপ প্রমাণ করে তারা শুধু ইসরায়েলের শত্রু নয়, ফিলিস্তিনের ভবিষ্যতেরও শত্রু। কারণ যে সংগঠন শিশুদের স্কুলে পাঠানোর বদলে সুড়ঙ্গ খোঁড়ে, যারা জীবনকে শেখায় ঘৃণার ভাষা, তারা আসলে নিজের জাতিকেই বন্দি বানায়।

আজকের এই চুক্তি হয়তো অস্থায়ী শান্তি দেবে, হয়তো কিছু কান্না থামাবে, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর প্রশ্ন—মানবতার নাম নিয়ে আর কতবার মানবতাকে ব্যবহার করা হবে? যদি কোনো সংগঠন বিশ্বাস করে যে হত্যা, জিম্মি, আর প্রতারণাই ন্যায়ের পথ, তাহলে সেই পথ শেষ হয় শুধু ধ্বংসে। ইসরায়েল যতই সমালোচনার মুখে পড়ুক, তারা অন্তত আইন ও জবাবদিহির কাঠামোর মধ্যে আছে। হামাস আছে অন্ধকারের রাজনীতিতে, যেখানে দায়িত্ব মানে প্রতিশোধ আর ধর্ম মানে রক্তের শপথ।

মানবতা কোনো পক্ষ নয়—মানবতা সেই নীতি, যা সন্ত্রাসের বিপরীতে দাঁড়ায়। আজ হামাসের হাতে বন্দি কেবল ইসরায়েলি মানুষ নয়, বরং মানবতার বিবেকও। যে দিন পৃথিবী আবার স্পষ্টভাবে বলবে—কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিরীহ প্রাণের চেয়ে বড় নয়—সেদিনই মানবতা ফিরে আসবে। ততদিন পর্যন্ত এই পৃথিবীকে বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে, আইন সন্ত্রাসের শত্রু, আর মানবতা তার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ।


Leave a Reply