বাংলাদেশ এখন বক্তব্যমাতৃক

দেশ এখন বক্তব্যমাতৃক
দেশ এখন বক্তব্যমাতৃক

বাংলাদেশ এখন নদীমাতৃক নয়, বক্তব্যমাতৃক। নদীগুলো শুকিয়ে গেছে, কিন্তু বক্তব্যের জোয়ার থামেনি। এখন এই দেশে পানি পাওয়ার চেয়ে বক্তব্য পাওয়া সহজ। একদিন কারও মুখে শোনা যায় “রাষ্ট্রবিরোধী!”, পরদিন অন্য মুখে “রাষ্ট্ররক্ষাকারী!” শব্দদুটো এখন নতুন জাতীয় খেলা—কে আগে কার গায়ে লাগাতে পারে এই ট্যাগ, সেটাই মূল প্রতিযোগিতা।

বক্তৃতা এখন এক ধরনের অস্ত্র, আর ব্যাখ্যা হলো ঢাল। সকালবেলায় যে বলেছে, বিকেলে সে-ই বলছে “ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে”, রাতে আবার কেউ বলছে “প্রকাশিত বক্তব্য বিকৃত করা হয়েছে।” রাষ্ট্র এখন যেন এক অবিরাম বক্তৃতার কারখানা—প্রতিদিন নতুন নতুন শব্দ উৎপাদিত হচ্ছে, কিন্তু কাজ থেমে আছে সেই পুরোনো জায়গাতেই।

এই দেশে এখন একটা নতুন বিভাগ খোলা উচিত, “স্পষ্টীকরণ মন্ত্রণালয়।” কাজ হবে শুধু একটাই, কে কাকে কীভাবে ভুল বুঝল, আর সেই ভুল বোঝা ঠিক করতে ক’টা নতুন ব্যাখ্যা লাগবে। একসময় শুনতাম, মন্ত্রীসভা বসে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নেয়, এখন দেখি তারা বসে আলোচনা করে—কার বক্তব্য কার মনে কষ্ট দিয়েছে।

আমাদের সেনাবাহিনীর চরিত্রও পাল্টে গেছে, তারা শুধু অস্ত্র চালায় না, এখন সোশ্যাল মিডিয়াও চালায়। আগে যুদ্ধ হতো সীমান্তে, এখন যুদ্ধ চলে কমেন্ট সেকশনে। সৈন্যদের নতুন অস্ত্র হলো হ্যাশট্যাগ। একসময় যে সেনা কুচকাওয়াজ হতো মাঠে, এখন তা হয় ফেসবুকে। সকালবেলায় নামাজ, দুপুরে ব্রিফিং, রাতে পোস্ট—এই ত্রয়ী এখন নতুন শৃঙ্খলা।

এই বাস্তবতার মধ্যেই জন্ম নিয়েছে নতুন এক সংস্কৃতি, ‘ইনডেমনিটি সংস্কৃতি’। এখন মানুষ অপরাধ করে না, ভুল বক্তব্য দেয়। আর তার শাস্তি হয় না, হয় ব্যাখ্যা। শোনা যাচ্ছে একটি নতুন অ্যাপ আসছে, “ইনডেমনিটি ডটকম।” সেখানে লগইন করলেই জিজ্ঞেস করবে, “আজ কোন কথার জন্য ক্ষমা চাইবেন?” নিচে থাকবে তিনটি অপশন—ভুল কথা, ভুল সময়, ভুল শ্রোতা। এ যেন আধুনিক রাষ্ট্রের ডিজিটাল পাপমোচন।

কিন্তু এই হাস্যরসের আড়ালে ভয় আছে, আর সেই ভয়ই আজ জাতির নতুন পরিচয়। পাহাড়ে কেউ প্রতিবাদ করলে বলা হয় সন্ত্রাসী, শহরে কেউ প্রশ্ন করলে বলা হয় রাষ্ট্রবিরোধী। যেন সবাই একই ভয় নিয়ে বেঁচে আছে, শুধু তাদের ভাষা আর পোশাক ভিন্ন। পাহাড়ের যুবক বন্দুকের ভয়ে চুপ থাকে, শহরের যুবক কমেন্টের ভয়ে।

এই ভয়ই আজ রাষ্ট্রের নীরব ইঞ্জিন। আমরা সবাই তা চালিয়ে রাখি নিজের অজান্তে—কেউ মসজিদের মাইকে, কেউ মিডিয়ার লাইভে, কেউ নিজের মনে। অথচ এই ভয়ই একদিন সব বিভাজনের দেয়াল ভেঙে দেবে। কারণ ভয়কে একবার চেনা মানেই অর্ধেক মুক্তি পাওয়া।

আমি বিশ্বাস করি, যেদিন পাহাড়ের তরুণ আর সমতলের ছাত্র একই সাথে বলবে, “তোমার ভয়ও আমার মতো”—সেদিন বাংলাদেশ আবার মানুষমাতৃক হবে। ততদিন আমরা বক্তব্যমাতৃকই থাকব—তসবিহ হাতে সেনাপ্রধান, মোবাইল হাতে জনগণ, আর বক্তৃতা হাতে রাষ্ট্র।


Leave a Reply