
বর্মাছড়ির বনবিহারে গতকাল সেনারা হানা দিয়েছে। ঘটনাটি কোনো আকস্মিক বিষয় নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত সূচনা। সরকার জানে কখন কোথায় আঘাত হানতে হবে, আর সেই হিসাবেই একের পর এক বিহার আজ টার্গেটে পরিণত হয়। আজ বর্মাছড়ি, কাল অন্য কোথাও। এই আঘাত শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনার নয়, এটি পাহাড়ের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের ওপর সরাসরি আঘাত।
জনগণ রাস্তায় নামবে, প্রতিবাদ করবে—এটি অনুমেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাতে কি কোনো পরিবর্তন আসবে?
আমার তো মনে হয় না।
অতীতের ইতিহাস বলে, পাহাড়ের প্রতিবাদ বারবার দমন করা হয়েছে। কারণ পাহাড়ে এখনো সেই জাতিগত ঐক্য নেই, যা প্রতিবাদকে শক্তিতে রূপ দিতে পারে। যদি ভিক্ষু সংঘ একত্রে দাঁড়ায়, দেশ-বিদেশে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, আন্তর্জাতিক মহলও বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নেয়। কিন্তু বনভিক্ষুরা কি কখনো সেই পথে হেঁটেছেন?
না। পাহাড়ে তা নজির নেই।
অতীতে বহু বিহার ভাঙচুর হয়েছে, আগুনে পুড়েছে, তবু বনভিক্ষুরা থেকেছেন নীরব। প্রতিবাদ, জাতি রক্ষা, শিক্ষা, অস্তিত্ব—এসব শব্দ যেন তাঁদের অভিধানে নেই। এই নীরবতা কাদের জন্য, কার স্বার্থে—এ প্রশ্ন আজ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এখন বনবিহারের পালা এসেছে। এবারও যদি তাঁরা নীরব থাকেন, তাহলে পাহাড়ের মানুষ তাঁদের পাশে দাঁড়াবে কেন?
আপনার কাছে এই প্রশ্ন উঠেছে কিনা আমি জানি না।
আমার মনে আজ অনেক প্রশ্ন। অনেকে হয়তো বলবে, এই বিষয়টি নিয়ে আমার ভাবার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমি জানি, আমার মতো অসংখ্য সাধারণ মানুষ পাহাড়ে আছে, যারা নীরবে ভাবে, চিন্তা করে, আর সত্যকে উপলব্ধি করে। তারা হয়তো রাজনীতি বোঝে না, কিন্তু অবিচারের গন্ধ চিনতে পারে।
বনবিহারের এই নীরব নীতি নতুন নয়; এর শিকড় বনভান্তের সময় থেকেই। পাহাড়ে সেটলার প্রকল্পের উত্থান, সামরিক ছাউনির বিস্তার, আর একই সঙ্গে বনবিহারের প্রসার—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে ঘটেছিল। এটি কোনো কাকতাল নয়। তা স্বীকার করবেন কিনা জানি না।
সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো, বনভান্তে কখনো সেটলার বা সামরিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলেননি; বরং পাহাড়ের তৎকালীন একমাত্র মুক্তিকামী শক্তি, শান্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি তাঁদের গালাগাল করেছেন এমন সময়ে, যখন শান্তিবাহিনী ছিল পাহাড়ের অস্তিত্ব ও আত্মসম্মানের একমাত্র প্রতীক। তার আগে পাহাড়ের কোন অপশক্তি শান্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায় নি।
আমি আজ পর্যন্ত এই তাৎপর্যের ব্যাখ্যা খুঁজে চলেছি- কেন ভান্তে অত্যাচারীদের বিষয়ে নীরব ছিলেন কিন্তু স্বজাতীয় মুক্তিকামীদের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন।
বলা যায়, বনভান্তের এই নীরবতা এবং পরবর্তীকালে বনবিহারের বিস্তার ছিল কোনো আধ্যাত্মিক আন্দোলন নয়, বরং এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত ধর্মীয় প্রভাব প্রতিষ্ঠার প্রকল্প।
আজ যুক্তির খাতিরে স্বীকার করতে হয়, বনবিহারের এই বিস্তারও এক রাজনৈতিক কর্মসূচিরই অংশ। নাম ধর্ম, ভিতরে রাজনীতি। লক্ষ্য একটাই—পাহাড়ি সমাজের ঐক্য, সংস্কৃতি ও স্বাধীন চিন্তার শিকড় কেটে ফেলা। আজ বনবিহারকে ঘিরে যে সংঘাত শুরু হয়েছে, তা ধর্মীয় নয়, এটি এক গভীর সাংস্কৃতিক যুদ্ধের সূচনা।
এই ধারা যদি চলতে থাকে, তাহলে শুধু বিহার নয়, হারিয়ে যাবে পাহাড়ের আত্মা, তার সংস্কৃতি, তার মানুষ হওয়ার অধিকার। আমি বনবিহারের নীতির বিরুদ্ধে লিখি, ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়।
আমি জানি, অনেক বনভিক্ষু আছেন যাদের প্রতি আমার ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা আছে। তাঁরা প্রজ্ঞাবান, জাতি ও ধর্ম সম্পর্কে সচেতন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের কঠোর নীতির বাইরে তাঁরা যেতে পারেন না। সেই কারণেই তাঁরা কালা, বোবা, এবং অনেক সময় নিজের বিবেককেও স্তব্ধ করে রাখেন।
আমি বারবার বলে যাচ্ছি, যদি কিছু নীতি শিথিল করা যায়, তাহলে জাতি ও ধর্ম—দুটিই টিকে যাবে। কিন্তু যদি তা না হয়, তবে মনে রাখতে হবে—এটি কেবল শুরু।
আজ বনবিহারের বর্মাছড়ির জমি, কাল অন্য কোনো কুতুকছড়ি বিহার, পরশু হয়তো পাহাড়ের আত্মপরিচয়ই মুছে যাবে। যদি বনবিহার অন্যের বিপদের সময় চুপ থাকে, তবে অন্যরাও তাদের বিপদে চুপ থাকবে।এটা একদম সরল সমীকরণ। এই নীরবতা একদিন সমষ্টিগত আত্মবিনাশে রূপ নেবে। তাই এখন সময় এসেছে, বনদের নীরবতা ভাঙার।
আমি জানি না যা বলছি কতজন বুঝবেন। কিন্তু যারা ২০৩০ সালের এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে নীরবে পর্যবেক্ষণ করছেন, তারা জানেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে কী ঘটতে যাচ্ছে, তার ইঙ্গিত আজই স্পষ্ট। এই আগুন আজ বর্মাছড়ি বনবিহারের দরজায়, কাল সেটা ছড়িয়ে পড়বে পুরো পাহাড়ের বনবিহার জুড়ে, পুরো পাহাড় জুড়ে। বনরা পাহাড়ের এক নীরব শক্তি। আজ তারা নীরবতা যদি না ভাঙে, এই নীরবতাই হবে পাহাড়ের শেষ নির্বাণ টিকেট।
ভাল থাকবেন।