
ঢাকায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রতিনিধি দল এসেছে।দিনক্ষণ হচ্ছে ১৪ থেকে ১৬ অক্টোবর। ঘোষণায় বলা হয়েছিল চার সদস্য, কিন্তু বাস্তবে উপস্থিত ছিলেন অন্তত আঠারো জন। দলের নেতৃত্বে আছেন মেজর জেনারেল কুন্দন কুমার সিংহ। তারা ঢাকায় এসে একাধিক বৈঠকে অংশ নিয়েছেন, যার অধিকাংশই হয়েছে বন্ধ দরজার আড়ালে।
তারা শুধু ঢাকায় বৈঠকেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; কক্সবাজারেও গিয়েছেন। সেখানে একটি বিশেষ সামরিক স্থাপনা ও উপকূলীয় নিরাপত্তা ঘাঁটি পরিদর্শন করেছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। যদিও সরকারিভাবে কক্সবাজার সফরের কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, তবে স্থানীয় পর্যায়ে ভারতীয় প্রতিনিধিদের উপস্থিতি নিয়ে নীরব আলোচনার ঝড় উঠেছে।
সরকারিভাবে শুধু বলা হয়েছে, এটি একটি সৌজন্যমূলক সামরিক সফর। কিন্তু সময়, প্রেক্ষাপট এবং উপস্থিতির মাত্রা—সবকিছু মিলিয়ে এটি নিছক সৌজন্য নয়, বরং কৌশলগত একটি উদ্যোগ বলেই মনে হচ্ছে। মজার বিষয় হচ্ছে সামারিক ওয়েবসাইট ছাড়া কোন খবরের কাগজ বিষয়টি নিয়ে লেখার অনুমতি পায় নি।
আর এই সফর ঘটছে এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ দিনের বন্ধুত্ব এখন অবিশ্বাসে জর্জরিত। অনেকের ধারণা, এই সফরের উদ্দেশ্য বাংলাদেশের সামরিক যোগাযোগের পুরোনো প্রভাব পুনরুদ্ধার করা।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভেতরেও দেখা দিয়েছে স্পষ্ট মতপার্থক্য। এক অংশ মনে করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কই মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার রক্ষার একমাত্র পথ; অন্য অংশ বিশ্বাস করে পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন সামরিক ও ধর্মীয় ঘনিষ্ঠতাই ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। সেই ঘনিষ্ঠতা থেকে আবার মাথা তুলছে ইসলামি রাষ্ট্র গঠনের ধারণা। এই দুই মতাদর্শের সংঘাত এখন নীরবে কিন্তু গভীরভাবে সেনাবাহিনীর কাঠামো ও নেতৃত্বে প্রভাব ফেলছে।
একদিকে ভারতপন্থী গোষ্ঠী মনে করছে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দিল্লির সমর্থন অপরিহার্য, অন্যদিকে পাকিস্তানপন্থীরা ভাবছে দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ ইসলামি জোটের মধ্যেই নিহিত। এই জোটের লক্ষ্য কেবল বাংলাদেশ নয়—এর প্রভাব বিস্তার হতে পারে পার্বত্য চট্টগ্রাম, আরাকান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত। এমন প্রেক্ষাপটে ভারতীয় গোয়েন্দা দলের সফর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
এরই মধ্যে সেনাপ্রধান ঠাকুরগাঁওয়ের পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটি পরিদর্শন করেছেন এবং পাশের ক্যাম্পে বৈঠক করেছেন। কেন গেছেন, কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে—তা নিয়ে সরকারি কোনো ব্যাখ্যা মেলেনি। অনেকেই মনে করছেন, ওই বিমানঘাঁটি সম্ভবত জরুরি সামরিক ব্যবহারের জন্য পুনরায় সক্রিয় করা হচ্ছে। যদি তা সত্য হয়, তবে বাংলাদেশ নীরবে এক নতুন নিরাপত্তা কৌশল তৈরি করছে—যেখানে ভবিষ্যতের আঞ্চলিক সংঘাতের সম্ভাবনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই ঘটনাগুলো আলাদা নয়; সবকিছু যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। এর আগে পাকিস্তান থেকেও গোয়েন্দা ও মন্ত্রীপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসেছিল। তখন সেনাপ্রধান ছিলেন চীন সফরে। এবার এসেছে ভারত। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত দায়িত্ব নিয়েছেন, এবং সেই পর থেকেই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি নতুন মোড় নিচ্ছে। ওয়াশিংটন আবার ভারতকেন্দ্রিক কৌশলে ফিরছে, আর সেই স্রোতে বাংলাদেশকেও টানার চেষ্টা চলছে।
বিশ্বপরিসরে ট্রাম্পের ইসরায়েল সফর, হামাসের অস্ত্রসমর্পণ ও বন্দি বিনিময়ের ঘটনাগুলো, এবং নেতানিয়াহুর প্রভাবে তার হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন—এসব ঘটনাও এই অঞ্চলের রাজনৈতিক স্রোতের সঙ্গে যুক্ত। ট্রাম্প ইসরায়েলে অবতরণের পর মুহূর্তের মধ্যে ভারত–পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে নিজের অবস্থান পাল্টে দেন।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু তাঁকে খুব স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সহযোগী। এর প্রতিফলনই এখন দেখা যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার নতুন কূটনৈতিক অক্ষ গঠনে।
অন্যদিকে মিয়ানমার সীমান্তে পরিস্থিতি ক্রমেই অস্থির হচ্ছে। রোহিঙ্গারা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন ভিডিও ও ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। অভিযোগ উঠেছে, তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর একাংশ।
একই সময় চীন তিন দিকেই খেলছে—জান্তা সরকার, আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা বিদ্রোহী—সব পক্ষকেই অস্ত্র ও সহায়তা দিচ্ছে এবং বলছে, “যুদ্ধ করো।” এই বহুমুখী খেলায় পাকিস্তানও যুক্ত হয়েছে; তারা রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের সরাসরি সমর্থন দিচ্ছে। ফলে পুরো অঞ্চল এখন সম্ভাব্য এক নতুন প্রক্সি যুদ্ধের মঞ্চে পরিণত হচ্ছে।
এই জটিল প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত সূক্ষ্ম। একদিকে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাপ, অন্যদিকে চীন ও পাকিস্তানের প্রভাব। এর মাঝখানে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ও পররাষ্ট্রনীতি আজ বিভক্ত ও দ্বিধাগ্রস্ত। প্রশ্ন এখন একটাই—বাংলাদেশ কার পাশে দাঁড়াবে? পুরোনো মিত্রতার ধারাবাহিকতায়, নাকি নতুন ইসলামি অক্ষের সঙ্গে?
এই অজানা সমীকরণের মাঝে উঠে আসছে সেনাপ্রধানের ভূমিকাও। সময় যত এগোচ্ছে, তাঁর নীতির দ্বিমুখী চরিত্র তত স্পষ্ট হচ্ছে। তিনি একদিকে হাসিনা সরকারের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখে লীগ নেতাদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন, আবার অন্যদিকে পাকিস্তানপন্থীদের প্রতি নীরব সমর্থন দিয়ে ২০২৪ সালের আন্দোলন সফল করেছেন। অনেকেই মনে করেন, এখানে মুখ্য চরিত্র নোবেল বিজয়ী ড. ইউনুস নন—মূল খেলোয়াড় সেনাপ্রধান নিজেই।
এখন তিনি এক প্রকার বুমেরাং অবস্থায়—মানবতাবিরোধী অভিযুক্ত সেনাকর্তাদের রক্ষা করলে যেমন বিপদ, না রক্ষা করলেও বিপদ। আইনের হাতে ছেড়ে দিলে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসবে, আর সেই সাপ হয়তো তিনিই। তাই অনেকের ধারণা, তিনি ভারতের সঙ্গে আপস করে নিজের নিরাপদ প্রস্থান বা safe exit তৈরি করতে চাইছেন।
সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়া আবারও ভাগ হয়ে যাচ্ছে—একদিকে ভারত–আমেরিকা–ইসরায়েল অক্ষ। অন্যদিকে পাকিস্তান–চীন–ইসলামি অক্ষ। বাংলাদেশ তাদের মাঝখানে এক নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। ঠাকুরগাঁওয়ের আকাশ থেকে চট্টগ্রামের পাহাড় পর্যন্ত এই নীরবতা এখন আর শুধু ভৌগোলিক নয়—এটি এক রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রতিধ্বনি।
আগামী দিনগুলোতে এই অক্ষগুলোর টানাপোড়েন আরও বাড়বে, এবং সেই টান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে আরও উন্মোচিত করবে। পাহাড় ও সীমান্তের নীরব সংঘর্ষ হয়তো একদিন রাষ্ট্রীয় কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসবে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া—অন্য কারও ছায়ায় নয়, নিজের সার্বভৌম অবস্থানে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং দেশের অন্যন্যা সংখ্যালঘুদের পুড়িয়ে তো তার সমাধান আসবে না। চাই রাজনৈতিক সমাধান।
প্রশ্ন এখন একটাই, বাংলাদেশ কি সেই সাহস দেখাতে পারবে?
পারবে না। কারণ যে দেশে ৯৯% ভাগ মানুষ অমুসলিম-বিরোধী, সে দেশে অমুসলিমদের অধিকার দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।
হ্যাঁ, সঙ্কেত দিয়ে রাখি, ভারত আপাতত হাসিনা দিদিকে দেশে ফিরিয়ে দিতে চায়। যদি সফল হয়, তাহলে বন্দর বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার ‘বাম হাতের টাকা’ সরকারের সেই প্রভাবশালী মানুষের পকেটে যাবে না। এমনও হতে পারে, বন্দর দেশের মানুষের হাতেই থাকতে পারে। কিন্তু পাহাড়ের মানুষের ভাগ্য একই থেকে যাবে।
আর সেই চাল যদি পাকিস্তান রোধ করতে পারে, তবে নতুন চালটা কী হবে তা আমরা সবাই জানি। এই সরকারকে টিকিয়ে রাখতে একটা উছিলা দরকার আর তা হতে পারে সীমান্তঘেঁষা ছোটখাটো যুদ্ধ। নির্বাচন আপাতত হচ্ছে না। তবে সবচেয়ে দুঃস্বপ্ন হচ্ছে পাহাড়ি দালালদের জন্য। তাদের জন্য আমার সত্যিই মায়া হচ্ছে।
এবার বলুন তো দেখি, কার সঙ্গে যাচ্ছে বাংলাদেশ?
আমি কিন্তু জানি না। আপনি জানলে একটু বলুন।