জুলাইয়ের দাবির ঠাঁই সংসদে—চেয়ারেই লেগে থাকুন

জুলাই যোদ্ধা
জুলাই যোদ্ধা

প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা দিয়েছেন, যারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে, তাদের ব্যবহৃত কলম আর ছবি জাদুঘরে রাখা হবে। এমন উচ্চারণে পুরো দেশ হঠাৎ ইতিহাসের গন্ধ পেয়ে গেল। মানুষ ভেবেছিল, সরকার হয়তো এবার ইতিহাস তৈরি করবে, কিন্তু দেখা গেল, তারা আসলে ইতিহাস সংরক্ষণ করছে- তাও জীবিত অবস্থায়। যাদের হাতে কলম, তারা নাকি জাতির স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে যাবে। অথচ বাইরে যারা দাঁড়িয়ে আছে, তাদের হাতে এখনো কোনো কলম নেই—তাদের শুধু ক্ষুধা, রাগ আর অধিকারহীনতার নথি।

এই ঘোষণার পর জনগণের মধ্যে এক অদ্ভুত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। তারা বুঝে গেল, এখন ইতিহাসে জায়গা পাওয়ার জন্য ভোটের দরকার নেই, দরকার শুধু কলম। কেউ কেউ ভেবেছে, যদি কলমে সই করলেই নাম ওঠে জাদুঘরে, তাহলে একটু আগে ঢুকে সই করাই ভালো।

তাই হাজারো মানুষ দেয়াল টপকে সংসদে প্রবেশ করল। তারা জানত না এটা অপরাধ না ঐতিহাসিক অংশগ্রহণ। কেউ বলল, “আমরাও ইতিহাসে জায়গা চাই।” কেউ আবার মজা করে বলল, “যারা জীবনে চাকরি পেল না, তারা অন্তত জাদুঘরে জায়গা পাক।”

সংসদ ভবন আজ যেন জীবন্ত জাদুঘরে পরিণত হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী চিৎকার করছে, টিয়ারশেল ছুড়ছে, আর মানুষ দৌড়ে ঢুকছে। কারণ সবাই শুনেছে, সেখানে ইতিহাস লেখা হচ্ছে। কেউ পতাকা হাতে দৌড়াচ্ছে, কেউ সংসদের দেয়াল ছুঁয়ে বলছে, “এটাই সেই জায়গা, যেখানে কলম উঠবে।”

এমন দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল, মানুষ নয়, সময় নিজেই ভেতরে ঢুকে পড়ছে নিজেকে সংরক্ষণের জন্য। যাদের বলা হয়েছিল ‘জনগণ’, তারা আজ দর্শক নয়, প্রদর্শনী।

সরকার হয়তো চেয়েছিল একটা অনুষ্ঠান হবে ফুলের মালা, বক্তৃতা, ফিতা কাটা আর কিছু ধামাধার্মিক ছবি আর মুখে আনন্দের তৃপ্তি হাসি দিয়ে। কিন্তু জনগণ অন্য কিছু ভেবেছে। তারা অনুষ্ঠান নয়, অংশগ্রহণ চায়। তারা চেয়েছে নিজেদের উপস্থিতি দিয়ে প্রমাণ করতে, জাদুঘরে রাখার মতো এখনো তারা বেঁচে আছে।

হ্যাঁ, সরকারের চোখে এ এক বিশৃঙ্খলা। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল জীবিত ইতিহাসের আত্মপ্রকাশ। যে দেশে মানুষ দেয়াল টপকে সংসদে ঢোকে, সেখানে বোঝা যায় জনগণ এখন দর্শক হতে রাজি নয়।

এখন সবাই আলোচনা করছে, কলমগুলো কোন জাদুঘরে রাখা হবে, আর সইকারীদের ছবি কোন দেয়ালে ঝুলবে। কেউ বলছে, “যারা দেয়াল টপকে ঢুকেছে, তাদেরও জায়গা দেওয়া উচিত। কারণ তারাই প্রমাণ করেছে ইতিহাসে ঢোকার আসল পথ।”

এমন মন্তব্য শুনে মনে হয়, দেশের রাজনীতি এখন সত্যিই এক শিল্পমাধ্যম—যেখানে প্রতিবাদ মানেই পারফরম্যান্স, আর ক্ষমতা মানেই প্রদর্শনী। সরকার হয়তো ভাবছে, ইতিহাস তারা বানাচ্ছে, অথচ বাস্তবে ইতিহাস তাদের ঘিরে তৈরি হচ্ছে—তাদের অজান্তেই।

প্রধান উপদেষ্টার মুখে হাসি, হয়তো তিনি ভাবছেন জনগণ তাঁকে সমর্থন করছে। কিন্তু আসলে জনগণ তাঁকে জবাব দিচ্ছে—একটি নীরব, তীক্ষ্ণ রসিকতার মাধ্যমে। তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, যারা জনগণকে জাদুঘরে পাঠাতে চায়, তাদেরও একদিন প্রদর্শনীতে পরিণত হতে হয়।

ইতিহাসের এই দেয়াল টপকানো ঘটনা হয়তো পুলিশের রিপোর্টে “অবৈধ অনুপ্রবেশ” নামে লেখা থাকবে, কিন্তু মানুষের মনে তা “জাতীয় প্রবেশ” হিসেবেই থেকে যাবে।

শেষে একটা প্রশ্ন রেখে যায়, যে দেশে মানুষ জীবিত অবস্থায় জাদুঘরে জায়গা পেতে দেয়াল টপকায়, সে দেশে রাজনীতি কি এখনো জীবিত, নাকি কাচের বাক্সে বন্দি? হয়তো ভবিষ্যতের কোনো গাইড একদিন দর্শকদের বলবে, “এটাই সেই ইউনুস সাহেবের দেশ, যেখানে সরকার ইতিহাস লেখার আগে জনগণ নিজেই ইতিহাসে ঢুকে পড়েছিল।”


Leave a Reply