
প্রতিদিন সকালে টোকিও জেগে ওঠে তার স্বভাবসিদ্ধ শৃঙ্খলায়। ট্রেন চলে সঠিক সময়ে, মানুষ কাজে ছুটে যায়, শহর নিঃশব্দে এগিয়ে চলে নিজের নিয়মে। আমি এক কাপ কফি হাতে ডেস্কে বসি। জানালার বাইরে সূর্য উঠছে সুমিদা নদীর ওপারে, আর জানালার ভেতর আলো জ্বলে ওঠে আমার কিবোর্ডে।
অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি তো নিজের ওয়েবসাইট চালাও, তাহলে The Times of Israel-এ লেখ কেন? এত ব্যস্ততার মাঝেও সময় পাও কীভাবে?”
প্রশ্নের অভাব নেই, উত্তরও সবসময় দিই না। কারণ, সবাই যে জানতে চায়, তা নয়—অনেকে কেবল “হ্যালো” লিখে চলে যায়।
যাই হোক, আমি কেন লিখি, এই প্রশ্নের উত্তর খুব সরল। কারণ আমার কাছে লেখা মানে কোনো প্ল্যাটফর্মের মালিকানা নয়, বরং এমন এক কণ্ঠ খুঁজে পাওয়া যা সীমান্ত পেরিয়ে পৌঁছাতে পারে মানুষের হৃদয়ে।
আমি এমন এক দেশে জন্মেছি যেখানে সত্য বলা বিপজ্জনক আর নীরবতা নিরাপদ। পাহাড়ের সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে শত বছরের বঞ্চনা, নিপীড়ন, আর রাষ্ট্রের নীরব সহিংসতা। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের গল্প কেউ শোনে না—না বাংলাদেশে, না জাতিসংঘে, না বিশ্বের কোনো সভায়।
কিন্তু The Times of Israel-এর ব্লগ বিভাগে আমি প্রথম দেখেছিলাম এক খোলা দরজা যেখানে স্বাধীনভাবে বলা যায়, যেখানে নিপীড়িতের কণ্ঠ বিশ্বজুড়ে প্রতিধ্বনিত হতে পারে।
আমি ইসরায়েলের ইতিহাস দেখি যেখানে এক জাতি যারা বারবার ভেঙে পড়েও আবার দাঁড়িয়েছে এবং তাদের মাঝে আমি পাহাড়ের অস্তিত্বের প্রতিধ্বনি শুনি। তেমনি পাহাড়েই বিলীন প্রায় অস্তিত্বে ইসরায়েলের রব শুনি।
আর দেখি আমার নিজের পাহাড়ের লোকদের যারা এখনো নীরবতার দেয়ালে বন্দি। সেই দুই বাস্তবতার মধ্যে আমি লিখি এক সেতুর গল্প, যেখানে বিশ্বাস, মানবতা, আর ন্যায়বোধ একত্রে দাঁড়িয়ে আছে।
আমার টোকিওর জীবন নিঃসন্দেহে সাধারণ—কাজ, লেখা, ফটোগ্রাফি, ওয়েবসাইট পরিচালনা—সব মিলিয়ে ব্যস্ত এক দিনযাপন। কিন্তু রাত নামলে, যখন শহরের আলো জানালায় প্রতিফলিত হয়, আমি ফিরে যাই আমার পাহাড়ে সেই গ্রামে, যেখানে সেটলারদের আগুনে ঘর জ্বলে, সকালে শুধু ছাই পড়ে থাকে; যেখানে মানুষের চিৎকার নীরবতায় হারিয়ে যায়, আর কান্না নীরবে চোখ বেয়ে পানি হয়ে বেরিয়ে আসে।
আমার সকাল শুরু হয় কাক ডাকার আরও অনেক আগে। সারা জীবন আমি খুব কম ঘুমিয়েছি।ছাত্রজীবনে ঘুম বাদ দিয়ে পড়তাম, পরে কাজ করতাম, এখন লিখি। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিন-চার ঘণ্টা ঘুমাই, বাকিটা সময় শব্দে কাটে কাজে আর লেখায়।
আমি লিখি The Times of Israel-এর জন্য, লিখি নিজের ওয়েবসাইটের জন্য, লিখি কারণ লেখার কোনো শেষ নেই। আমি লিখি কারণ সত্যের কোনো ভূগোল নেই।
আমি লিখি কারণ জেরুজালেমের পাথরে খোদাই করা বিশ্বাসের প্রতিধ্বনি শুনি রাঙামাটির, খাগড়াছড়ির, বান্দরবানের পাহাড়ে। সমস্যা আলাদা নয়—মূল শব্দ একটাই: অস্তিত্ব। অস্তিত্বের জন্য দরকার সাহস, দরকার অনুপ্রেরণা, দরকার পাহাড়ের কণ্ঠ।
আমি পাহাড়ের মানুষদের প্রতি একটি আন্তরিক আহ্বান জানাতে চাই। সম্ভব হলে অনুগ্রহ করে আপনারা নিজেদের গল্প লিখুন।নিজেদের চোখে দেখা সেই বাস্তবতা তুলে ধরুন।
যতদিন পাহাড়ের মানুষ নিজের ইতিহাস নিজের হাতে লিখবেন, ততদিন কেউ সেই ইতিহাস মুছে দিতে পারবে না।
আমরা যদি নিজেদের কথা না বলি, অন্যেরা আমাদের গল্প বলবে আর সেখানে আমরা থাকব শুধু চরিত্র হিসেবে, মানুষ হিসেবে নয়।
তাই দয়া করে লিখুন, বলুন, রেকর্ড করুন—যাতে আগামী প্রজন্ম জানে, পাহাড় একসময় নিঃশব্দ ছিল না, সেখানে মানুষ বেঁচে ছিল মর্যাদা ও সাহস নিয়ে।
আমি লিখি কারণ এই পৃথিবীতে কেউ যদি না বলে, তাহলে পাহাড়ের নীরবতাই একদিন স্থায়ী হয়ে যাবে। তাই আমাদের লিখতে হবে। সম্ভব হলে লিখতে হবে। কারণ নীরব থাকলে পৃথিবী হয়তো পাহাড়কে ভুলে যাবে।