পাকিস্তানপ্রেমে মৌলবাদীদের নতুন প্রেমপত্র

পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধে
পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধে বাংলাদেশি পাকি সমর্থন

বাংলাদেশের মৌলবাদীরা আজকাল বেশ রোমান্টিক হয়ে উঠেছে। আগে যাদের চোখে পাকিস্তান ছিল “কাফের রাষ্ট্র”, এখন সেই পাকিস্তানই তাদের প্রিয়তমা। তারা প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যমে পাকিস্তানের জন্য প্রেমপত্র লিখছে, যেন সাতচল্লিশের পুরোনো ভালোবাসা আবার জেগে উঠেছে। মনে হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধটা যেন ভুলে গেছে, কিন্তু ইসলামাবাদের প্রেমটা এখনও টাটকা!

যুদ্ধবিরতির খবর শুনে তারা হাততালি দেয়, আর পাকিস্তানের বিমান হামলার সময় চোখ বন্ধ করে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে। আফগানিস্তানের তিন ক্রিকেটার মারা গেছে—তাতে কী! তাদের চোখে তো সবই “জয়ধ্বনি”। কেউ বোমা মারে, কেউ টুইটে প্রশংসা লিখে তাকে আশীর্বাদ পাঠায়। এটাই এখন নতুন ধারার মৌলবাদী দাতব্য—কারো মৃত্যুতে শোক নয়, বরং প্রশংসার ছোঁয়া!

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এরা এখন পাকিস্তানের পক্ষে এমনভাবে পোস্ট দিচ্ছে, যেন নিজেদের দেশের নামটাই বদলে ফেলেছে। একজন লিখেছে, “পাকিস্তান মুসলিম উম্মাহর গর্ব!” মনে হলো, সে যেন জন্মেছে করাচিতে, আর শৈশব কেটেছে ইসলামাবাদের বাতাসে। আরেকজন বলল, “আফগানরা ভারতের দালাল।” অথচ সে ভারতই ৭১ স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল।

এই পাকিস্তান-ভক্তদের মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, পাকিস্তান কিন্তু একসময় এ দেশেই সেনা পাঠিয়ে দেড় লাখ মানুষ হত্যা করেছিল। তারা ভেবেছিল, এই দেশের মানুষ মুসলমান, তাই নিশ্চয়ই তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হবে। হায়, কতটা ভুল ধারণা! এখন মনে হয় সেই ইতিহাস এদের কাছে “ইমাম সাহেবের শুক্রবারের খুতবার মতো”—প্রতিবার শুনে মাথা নেড়ে বেরিয়ে আসে, কিন্তু মনে রাখে না কিছুই।

পাকিস্তানের আজকের ধর্মভিত্তিক রাজনীতি দেখে বাংলাদেশি মৌলবাদীরা হয়তো ভাবছে, “এই তো স্বপ্নের ইসলামি ইউটোপিয়া!” সেখানে কেউ সিনেমা দেখে না, সংগীত বাজায় না, নারী সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে মন্ত্রী সাহেব পালিয়ে যান—আদর্শ সমাজ! যেন স্বর্গীয় মডেল, যেখানে জ্ঞানের আলো নিষিদ্ধ আর অন্ধকারই পূণ্য।

তারা পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে ইসলামের সৈনিক ভাবে, কিন্তু ভুলে যায় যে সেই সেনাবাহিনীই একদিন ঢাকায় মসজিদের ভেতর বন্দুক তাকিয়েছিল। তারা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে মুসলিম নায়ক ভাবে, অথচ নিজের দেশের স্বাধীনতার শহীদের নাম জানে না। এরা ইতিহাসকে দেখে না, শুধুই ধর্মীয় নাটক দেখে।

বাংলাদেশের মৌলবাদী সমাজ আজ পাকিস্তানের প্রতি এমন প্রেমে পড়েছে, যেন দীর্ঘদিনের হারানো প্রেমিকা হঠাৎ হোয়াটসঅ্যাপে “সালাম” পাঠিয়েছে। এখন তারা আবার পুরোনো ছবিগুলো বের করছে—মাওলানা মওদুদীর উক্তি, ইসলামি ব্রাদারহুডের গালভরা গল্প, আর মাঝে মাঝে ভারতবিদ্বেষের ছিটেফোঁটা। প্রেমেরও তো একটা অজুহাত লাগে, তাই না?

কিন্তু এই পাকিস্তানপ্রেমের এক ভয়াবহ দিকও আছে—এটা কোনো ধর্মীয় একতার প্রকাশ নয়, বরং আত্মপরিচয়ের সংকটের চূড়ান্ত রূপ। যারা নিজেদের দেশ, নিজেদের শহীদ, নিজেদের স্বাধীনতাকে ভুলে বিদেশের পতাকায় প্রেম খোঁজে, তারা আসলে ধর্ম নয়, বিভ্রান্তির পূজা করে।

শেষে মনে হয়, বাংলাদেশের মৌলবাদীদের এখন একটা নতুন স্লোগান দরকার, “পাকিস্তান জিন্দাবাদ, বাংলাদেশ ধৈর্য ধরো!” কারণ তারা প্রেমে পড়েছে এমন এক দেশের, যে দেশ একসময় তাদের মায়ের বুক ছিন্ন করেছিল। প্রেমের চেয়ে বড় অন্ধত্ব আর কী হতে পারে?


Leave a Reply