দীর্ঘদিনের বিভাজন, সন্দেহ আর অবিশ্বাসের রাজনীতির পর বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব দিন দেখা গেল।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে আয়োজিত “জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫” স্বাক্ষর অনুষ্ঠান সেই ইতিহাসের দিন—যেদিন ডান, বাম, ইসলামি, জাতীয়তাবাদী, প্রগতিশীল, মুক্তিযোদ্ধা ও তরুণ প্রজন্মের নেতারা একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে ঐক্যের প্রতিশ্রুতি দিলেন।
এই অনুষ্ঠান ছিল কেবল কাগজে কলমে একটি চুক্তি নয়—এটি ছিল এক রাজনৈতিক পুনর্জন্মের মুহূর্ত। ভিন্ন মত, ভিন্ন ইতিহাস, ভিন্ন দর্শনের মানুষরা এই দিনে একত্রিত হন দেশের বৃহত্তর স্বার্থে।
নিচে সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ২৫টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নাম ও পদবী উল্লেখ করা হলো—
১। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)
- ড. রেদোয়ান আহমেদ, মহাসচিব
- ড. নেয়ামূল বশির, প্রেসিডিয়াম সদস্য
২। খেলাফত মজলিস
- মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ, আমীর
- ড. আহমদ আবদুল কাদের, মহাসচিব
৩। রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন
- হাসনাত কাইয়ুম, প্রধান সমন্বয়ক
- সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন, মিডিয়া সমন্বয়ক
৪। আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)
- মোহাম্মদ মজিবুর রহমান ভূঁইয়া মঞ্জু, চেয়ারম্যান
- ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, সাধারণ সম্পাদক
৫। নাগরিক ঐক্য
- মাহমুদুর রহমান মান্না, সভাপতি
- শহীদুল্লাহ কায়সার, সাধারণ সম্পাদক
৬। জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম)
- ববি হাজ্জাজ, চেয়ারম্যান
- মোমিনুল আমিন, মহাসচিব
৭। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)
- মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মহাসচিব
- সালাহউদ্দিন আহমেদ, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য
৮। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস
- মাওলানা ইউসুফ আশরাফ, সিনিয়র নায়েবে আমীর
- মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ, মহাসচিব
৯। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
- ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের, কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর
- মিয়া গোলাম পরওয়ার, সেক্রেটারি জেনারেল
১০। গণসংহতি আন্দোলন
- জোনায়েদ সাকি, প্রধান সমন্বয়কারী
- আবুল হাসান রুবেল, নির্বাহী সমন্বয়কারী
১১। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)
- শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, সাধারণ সম্পাদক
- মিসেস তানিয়া রব, সিনিয়র সহ-সভাপতি
১২। গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি)
- নুরুল হক নুর, সভাপতি
- মোঃ রাশেদ খান, সাধারণ সম্পাদক
১৩। বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি
- সাইফুল হক, সাধারণ সম্পাদক
- বহ্নিশিখা জামালী, রাজনৈতিক পরিষদ সদস্য
১৪। জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট
- ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, সমন্বয়ক, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট ও চেয়ারম্যান, এনপিপি
- বীর মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার লুৎফর রহমান, সভাপতি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)
১৫। ১২ দলীয় জোট
- শাহাদাত হোসেন সেলিম, মুখপাত্র, ১২ দলীয় জোট ও চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ এলডিপি
১৬। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ
- অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন, প্রেসিডিয়াম সদস্য
- মাওলানা গাজী আতাউর রহমান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব
১৭। গণফোরাম
- বীর মুক্তিযোদ্ধা সুব্রত চৌধুরী, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি
- ডা. মো. মিজানুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক
১৮। জাকের পার্টি
- আলহাজ্ব শহীদুল ইসলাম ভুইয়া, ভাইস চেয়ারম্যান
- জহিরুল হাসান শেখ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, গাজীপুর জেলা ছাত্রফ্রন্ট
১৯। জাতীয় গণফ্রন্ট
- আমিনুল হক টিপু বিশ্বাস, কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক
- মঞ্জুরুল আরেফিন লিটু বিশ্বাস, সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি
২০। বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি
- মাওলানা আব্দুল মাজেদ আতহারী, সিনিয়র নায়েবে আমীর
- মাওলানা মুসা বিন ইযহার, মহাসচিব
২১। বাংলাদেশ লেবার পার্টি
- ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, চেয়ারম্যান
- খন্দকার মিরাজুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব
২২। ভাসানী জনশক্তি পার্টি
- বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ রফিকুল ইসলাম (বাবলু), চেয়ারম্যান
- ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ (সেলিম), মহাসচিব
২৩। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ
- মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফী, সহ-সভাপতি
- মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, মহাসচিব
২৪। ইসলামী ঐক্যজোট
- মাওলানা আব্দুল কাদের, চেয়ারম্যান
- মুফতী সাখাওয়াত হোসাইন রাজী, মহাসচিব
২৫। আমজনতার দল
- কর্নেল মিয়া মশিউজ্জামান (অবঃ), সভাপতি
- মোঃ তারেক রহমান, সাধারণ সম্পাদক
শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকেও উপস্থিত ছিলেন শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান এবং শহীদ তাহির জামান প্রিয়র মা শামসী আরা বেগম।
তাঁদের উপস্থিতি এই অনুষ্ঠানকে এক নতুন আবেগে ভরিয়ে তুলেছিল। কিন্তু প্রশাসনের আচরণ ছিল তীব্র বিতর্কিত। পুলিশের সঙ্গে প্রকৃত শহীদ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে হাতাহাতি, ধাক্কাধাক্কি এমনকি ব্যাপক সংঘর্ষ পর্যন্ত ঘটে।
তবুও অনুষ্ঠান বন্ধ হয়নি বরং সরকার তার নির্ধারিত পথে এগিয়েছে, যেন শক্তিই সত্যের বিকল্প। (এ পোস্ট লেখার সময়ও তারা মশাল হাতে প্রতিবাদ করে যাচ্ছেন।)
এই দৃশ্য নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনীতির এক প্রতীকী চিত্র—যেখানে জাতীয় ঐকমত্যের কথা বলা হয়, অথচ প্রকৃত মানুষ, শহীদের উত্তরাধিকারী, যেন অবাঞ্ছিত হয়ে পড়েন।
সবশেষে যে প্রশ্নটি থেকে যায়, তা হলো, এই জাতীয় ঐকমত্যে প্রকৃত আদিবাসী জাতিগুলো কোথায়?
কারণ ২৫টি দলের এই বিশাল তালিকায় নেই কোনো আদিবাসী বা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বা সংখ্যালঘু মানুষের প্রতিনিধি, যারা এই ভূখণ্ডের প্রাচীনতম নাগরিক। সেই অনুপস্থিতি একটি নীরব বৈষম্যের দাগ টেনে দিয়েছে ঐক্যের দলিলের প্রান্তে।
বাংলাদেশে ঐক্যের স্বপ্ন যতবার দেখা যায়, ততবারই কেউ না কেউ বাদ পড়ে যায়।
এইবারও তাই হলো। সনদে কলম ধরলেন অনেকে, কিন্তু স্বীকৃতি পেলেন না সেই মানুষগুলো, যাদের রক্তে, ত্যাগে, আর পাহাড়ের নীরবতায় এই ভূখণ্ড দাঁড়িয়ে আছে।
আমি এ বৈষম্যকে ধিক্কার জানাই।
⸻