৯৯% নিয়ে কান্না, ৯.২৫% নিয়ে নাটক — আসলে কার বদহজম?”

বাংলাদেশের ৯৯% ভারত–বিরোধী বলেছি শুনে অনেকে হাঁসফাঁস। কিন্তু আসল ভুলটা কোথায় জানেন?

যেদিন আমি লিখলাম, “বাংলাদেশের ৯৯% ভারত–বিরোধী”, সেদিন ফেসবুক যেন হঠাৎ করে বদহজমের জরুরি বিভাগের মতো হয়ে গেল।

কেউ পানি খেল, কেউ ওষুধ খেল, আর কেউ মনে করল আমি বুঝি দেশের সবাইকেই এক ট্রালিতে তুলে পাঠিয়ে দিয়েছি!

অনেকেই ভেবে নিল, আমি নাকি সেই সংখ্যালঘু ৯.২৫%—অর্থাৎ:

✔ আদিবাসী ১%
✔ হিন্দু ৭.৯৫%
✔ খ্রিষ্টান ০.৩০%

এই বিশাল জনগোষ্ঠীকেও ৯৯%–এর মধ্যে গুঁজে দিয়েছি।

হে দয়াময় মানুষজন, একটু মাথা ঠান্ডা করে ভাবুন তো
বাংলাদেশের মৌলবাদীরা যাদের নাগরিকই মনে করে না, তাদের আমি কেন ওই তালিকায় ঢোকাবো?

৯.২৫% আসলে কতজন?

বাংলাদেশের আনুমানিক জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৫৭ লাখ (১৭৫.৭ মিলিয়ন)।

তাহলে ৯.২৫% দাঁড়ায়—

👉 ১ কোটি ৬২ লাখ ৮০ হাজার মানুষ (প্রায়)

হ্যাঁ, শুধু শতাংশ নয়। বাস্তবে একটি পুরো দেশের সমান মানুষের সংখ্যা!

কিন্তু মৌলবাদীদের চোখে এরা আছে কোথায়?

ওদের হিসাবের খাতায় এরা থাকে ঠিক সেই জায়গায় আর সে জায়গা হচ্ছে গণিতের “অপ্রাসঙ্গিক” তথ্য খাতায়।

কি ভুল বললাম?

নির্বাচনের কয়েক ঘন্টার আগের শ্লোগানের কথা মনে করিয়ে দেবো?

হিন্দু-মুসলিম ভাই- –
পাহাড়ী বাঙালি ভাই – –

নির্বাচনের রেজাল্টের পর শ্লোগান বদলে যায়।

তখন কি হয় শ্লোগান?

কেউ বলুন ( কমেন্ট খালি রেখে দিলাম)

মৌলবাদীরা যাদের নাগরিকই মনে করে না তাদের আমি কেন “৯৯% ভারত–বিরোধী”-এর ভেতরে ঢোকাবো?

বাংলাদেশের মৌলবাদী শক্তির কাছে—

👉 আদিবাসী মানেই “দেশের বাইরে থেকে আসা”,
👉 হিন্দু মানেই “ভারতপন্থী”,
👉 খ্রিষ্টান মানেই “পশ্চিমা এজেন্ট”।

অথচ এরা এই দেশেরই মানুষ।
জন্ম এখানেই, মাটি এখানেই, ইতিহাস এখানেই।

কিন্তু মৌলবাদীদের চোখে এই ৯.২৫% মানুষ নাগরিক নয়, ভোট নয়, মানুষও নয়। এরা শুধু রাজনৈতিক স্লোগানের কাঁচামাল।

তাই আমি যখন বলি “৯৯% ভারত–বিরোধী। আমি এই ৯.২৫% মানুষকে সেই সংখ্যার বাইরে রাখি।

কারণ ওদের নাগরিকত্বই যাদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ তাদের কীভাবে ওই হিসাবের ভেতরে নেবো?

কিছু মানুষ ভারতে পালিয়ে গিয়ে হঠাৎ অসাম্প্রদায়িকতার আলোকপ্রাপ্তি হয়।বড় হাস‍্যকর।

আরেকটা ঘটনা আরও রসিক।

বাংলাদেশে নির্যাতন, জমি দখল বা আগুন লেগে পালিয়ে ভারত যাওয়া কিছু মানুষ হঠাৎ করেই সেখানে গিয়ে—

👉 কংগ্রেসে যোগ দেয়,
👉 অসাম্প্রদায়িকতার পবিত্র চাদর মুড়ি দেয়,
👉 আর বলে, “বাংলাদেশ তো সহিংসতার দেশ নয়—সবই মিডিয়ার গল্প!”

মনে হয় যেন বাংলাদেশে ওরা স্পা রিসোর্টে বড় হয়েছে, আর আমরা নাকি গল্প বানাই!

তাই শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্যই এখানে সোজা মাথায় লাগে

শুভেন্দু অধিকারীর সেই বিখ্যাত মন্তব্য—

“এ পারের সাম্যবাদী!”

কথাটা শুধু রসিকই নয় বরং প্রায় শল্যচিকিৎসার মতো সঠিক জায়গায় কাটে।

এই শব্দটি অনেকের অন্ত্র–উদর নাড়া দিয়ে দেয়। কারণ সত্য কথা সবসময়ই একটু তেতো।

আমার হিসাব ঠিক, পেটব্যথা যাদের ওষুধ তাদের লিখে দিচ্ছি। খাবেন কিন্তু। কলকাতাতে পাওয়া যাবে।

আমি যখন বলেছি “বাংলাদেশের ৯৯% ভারত–বিরোধী”—
সেটা বলেছি পরিষ্কার যুক্তিতে।

✔ যে ৯.২৫% মানুষকে মৌলবাদীরা নাগরিকই মনে করে না তাদের আমি ওই তালিকায় রাখিনি।

✔ তারা দেশের প্রকৃত সম্পদ, কিন্তু চরমপন্থীদের চোখে তারা “ফুটনোট”।

✔ আর ভারতে পালিয়ে গিয়ে যারা হঠাৎ অসাম্প্রদায়িকতার গুরু হয়ে যান তাদের জন্যই শুভেন্দু অধিকারীর লাইন যথাযথ, “এ পারের সাম্যবাদী!”

যদি কারও টনক নড়ে, তাহলে বুঝবেন পোস্টটি তার গন্তব্যে পৌঁছেছে।

আর যদি আবার বদহজম হয় তাহলে সত্য কথার ওষুধ সকালে–বিকালে দুই বেলা।

(নোটঃ ছবিটি দুদিন আগে ঢাকায় হিন্দু ধর্ম অবমাননার বিচার চেয়ে হিন্দু ভাই-বোনদের সমাবেশ।সরকার এর পদক্ষেপ নিয়েছে কি? গত ২৪ ঘন্টায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে কি ঘটেছে খবর নিন)

প্রথম দুই বিশ্বযুদ্ধের গোপন সংকেতের অবিশ্বাস্য গল্প

মোবাইল নেই, এসএমএস নেই, ইন্টারনেটের নামগন্ধও নেই— তবুও প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিশাল বিস্তৃত ফ্রন্টলাইনে প্রতিটি মিনিটে হাজারো বার্তা আদান–প্রদান হতো।

আজকের পাঠক ভাবলে অবাক হবেন, কিন্তু এক একটি বার্তার ওপর নির্ভর করত পুরো ব্যাটালিয়নের জীবন, পুরো শহরের নিরাপত্তা, কখনো কখনো যুদ্ধের ভাগ্যও। তখন প্রযুক্তির অভাব ছিল না; প্রযুক্তির মানে ছিল ভিন্ন।

সামরিক ঘাঁটি থেকে যুদ্ধের ট্রেঞ্চ—সবচেয়ে বিশ্বস্ত ছিল একেকটি যুদ্ধকবুতর। গুলির মধ্য দিয়ে উড়ে গিয়ে তারা যে কাগজের টুকরো বহন করত, তাতে লেখা থাকত শত মানুষের জীবন বাঁচানোর নির্দেশ।

এক কবুতর, Cher Ami, গুলিবিদ্ধ, একটি পা হারানো অবস্থাতেও বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল—১৯৪ সৈনিক বাঁচিয়ে সে ইতিহাসে বীর হয়ে আছে। আজকার মোবাইল নেটওয়ার্কও এমন নিষ্ঠা দেখায় না।

রাত নেমে এলে দূরসমুদ্রে আরেক বিস্ময় দেখা যেত—টর্চলাইটের দপদপে আলো। যুদ্ধজাহাজগুলো এক ধরনের আলো–সংকেতের নাচ করত। মর্স কোডের মতো এই আলো জ্বালানো–নেভানো প্যাটার্ন দেখে বোঝা যেত শত্রু সামনে নাকি পাশ কাটিয়ে গেছে। ভুল একটি আলোর ঝলক মানে ভুল দিক, ভুল আক্রমণ, ভুল মৃত্যু—যুদ্ধ কখনো ক্ষমা করত না।

স্থলে তখন সৈনিকরা হাতের দুই পাশে রঙিন পতাকা ধরে অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করত। দূর থেকে দেখলে মনে হতো কেউ বাতাসের সঙ্গে নাচছে। আসলে সেটা ছিল সেমাফোর সিগন্যাল—একটি ভঙ্গি মানে অক্ষর, আরেকটি মানে বিপদ। এমনভাবে বার্তা পাঠানো হতো যে শব্দের দরকারই পড়ত না, শুধু ভঙ্গি আর দৃষ্টিশক্তি।

ট্রেঞ্চের ভেতরে চলত আরেক যুদ্ধ—মাটির নিচে পাতানো তারের টেলিফোন। শেল পড়ে একটি তার কেটে গেলেই পুরো সামনে থাকা ইউনিট অন্ধ হয়ে যেত।

তখন সৈনিকরা গুলির মধ্যেই হামাগুড়ি দিয়ে যেত সেই তার সারাই করতে—নিঃশব্দ সাহসী কাজ, কেউ দেখত না, কেউ জানত না, কিন্তু যুদ্ধ টিকে থাকত তাদের কারণেই।

বিমান হামলার শব্দ ছিল আরেক বড় সংকেত। রাসায়নিক গ্যাস আসছে কিনা, পিছু হটতে হবে নাকি এগোতে—সবই সাইরেন, হুইসেল, কিংবা ড্রামের ছন্দে বুঝে নিতে হতো। এক মুহূর্ত দেরি মানেই শ্বাস না নিতে পারা, চোখ জ্বালা, জীবন ছুটে যাওয়া।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আরেক বিস্ময় ছিল জার্মানির এনিগমা মেশিন। কয়েক সেকেন্ডে কোড বদলে ফেলত, দিনে হাজার হাজার বার্তা পাঠানো হতো যা কেউ ভাঙতে পারত না।

পুরো ইউরোপ যেন সেই রহস্যময় যন্ত্রের ছায়ায় বন্দি ছিল। পরে অ্যালান টুরিং সেই কোড ভেঙে ফেলে যুদ্ধের গতিপথ পাল্টে দেন—একটি যন্ত্র, একটি কোড, আর মানুষের মস্তিষ্কের লড়াই।

যুদ্ধক্ষেত্রে তখন নারীরাও ছিল গোপন শক্তি। অনেক নারী অপারেটর এত দ্রুত মর্স কোড পাঠাতেন যে শত্রুপক্ষ মনে করত কোনো বিশেষ সামরিক যন্ত্র কাজ করছে। আসলে ছিল রিদম, ভাষা, অভিজ্ঞতা। তাদের গতির সঙ্গে মেশিনও হেরে যেত।

শেষে থেকে যেত সবচেয়ে বিপজ্জনক ভূমিকা- ঘোড়সওয়ার, মোটরসাইকেল-রাইডার, বা দৌড়ে বার্তা বহনকারী “রানার”। গুলি–বোমার ঝড়ের মধ্যে শুধু এই কথাটাই ছিল তাদের মাথায়: “বার্তা না পৌঁছালে ইউনিট মরবে।”

অনেকেই পৌঁছাতে পারেননি, ইতিহাস তাদের নাম মনে রাখেনি; কিন্তু তাদের এক একটি দৌড় যুদ্ধের মানচিত্র বদলে দিয়েছে।

আজ আমরা নেটওয়ার্ক একটু কম পেলেই বিরক্ত হয়ে যাই। অথচ এক শতাব্দী আগে যুদ্ধের ভাগ্য নির্ধারিত হতো আলো, পাখি, পতাকা, বা মাটির নিচের একটি পাতলা তার দিয়ে। প্রযুক্তি তখনও ছিল—শুধু যন্ত্রে নয়, মানুষের মস্তিষ্কে। আর সেই মানবিক সংকেতই আজকের ডিজিটাল যুগের ভিত্তি।


হিন্দু ও সংখ্যালঘুদের বিচার এত কম দামে কেন?

হিন্দু-ধর্ম- নিন্দা
গতকালের ঢাকায় প্রতিবাদের ছবি

বাংলাদেশে হিন্দু ও সংখ্যালঘুদের জন্য বিচার এখনো সমান নয়—এই কথাটি শুধু অনুভূতি নয়, এটি প্রতিদিনের বাস্তবতা। গতকাল হিন্দু ও সংখ্যালঘুরা একজন মুসলিম সংসদ সদস্যের হিন্দু ধর্ম অবমাননার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে। তারা ব্যানার তুলেছে, প্ল্যাকার্ড ধরেছে, এবং প্রকাশ্যে আওয়াজ তুলেছে.

কারণ আর নীরব থাকা সম্ভব নয়। হিন্দু ধর্মকে প্রকাশ্যে অপমান করা হয়েছে, অথচ রাষ্ট্রের কোথাও সেই জরুরি ব্যবস্থা দেখা যায়নি। এই ঘটনাই স্পষ্ট করে দেয়, বাংলাদেশে বিচার আজো পরিচয় দেখে বদলায়—ক্ষমতাবান হলে নিরাপদ, সংখ্যালঘু হলে বিপদ।

অনেক সময় মহাবিপদ। ঘর-বাড়ী এবং কি গ্রাম আক্রমণ করা হয়।

যদি এই অভিযুক্ত লোকটি মুসলিম না হয়ে হিন্দু বা কোনো সংখ্যালঘু হতো আর হিন্দু পরিচয়ে ইসলাম ধর্ম নিয়ে একটি শব্দও বলত, তাহলে অনেক আগেই তার বাড়ি আক্রমণ হতো। তার পরিবার রাতারাতি পালাতে বাধ্য হতো। স্থানীয় ধর্মীয় গোষ্ঠী মাইক হাতে রাস্তায় নামত আর পুলিশ “পরিস্থিতি শান্ত রাখতে” সঙ্গে সঙ্গেই তাকে আটক করত।

যা শুনলেন সেটাই বাংলাদেশের নিত্যদিনের বিচারব্যবস্থা। একটা আইন কিন্তু তার প্রয়োগ দুই রকম: মুসলিমের জন্য এক ধরনের, হিন্দু ও সংখ্যালঘুর জন্য আরেক ধরনের।

বাংলাদেশে হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুর ওপর ধর্ম অবমাননার অভিযোগে যা যা হয়েছে, তা ইতিহাসের সবচেয়ে অসম অধ্যায়। রামুর বৌদ্ধ বিহার পুড়েছে, উখিয়ার মন্দির ভেঙেছে, পাবনায় হিন্দু বাড়িঘর লুট হয়েছে, ভোলায় হিন্দু যুবকের আইডি হ্যাক করে দোষ চাপিয়ে মানুষের প্রাণ গেছে।

রংপুরে গুজব ছড়িয়ে পুরো গ্রাম উচ্ছেদ হয়েছে, কোথাও কুমিল্লায় স্ক্রিনশট ছড়িয়ে ঘরে আগুন লেগেছে। প্রতিটি ঘটনায় একই নাটক—সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তাকে শাস্তি দিতে সবাই এক হয়। কিন্তু সংখ্যালঘু আক্রান্ত হলে রাষ্ট্র “তদন্ত” করে, অপেক্ষা করে, নীরব থাকে।

তারপর একদিন সব কোথায় যেন হারিয়ে যায়। অপরাধী পার পেয়ে যায় এবং আবার সেই একই কাজ করে বীর দর্পে সমাজে ঘুরে বেড়ায়।

হিন্দু ও সংখ্যালঘুর অনুভূতি কি অনুভূতি নয়?

একজন হিন্দু বা সংখ্যালঘু যদি ভুল করে, কিছু লেখে, প্রশ্ন তোলে, তৎক্ষণাৎ ধর্ম অবমাননার মামলা হয়। কিন্তু একজন মুসলিম, তা সে সাধারণ মানুষ হোক বা সংসদ সদস্য, যদি প্রকাশ্যে হিন্দু ধর্মকে অপমান করে তখন কেন সেই একই উত্তেজনা দেখা যায় না? কেন তার বিরুদ্ধে মামলা হয় না? কেন তার বাড়ি আক্রমণ হয় না? কেন প্রশাসন জরুরি সভা ডাকে না?

এই দ্বৈত বিচারই সংখ্যালঘুদের মনে সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা তৈরি করেছে আর সেটাই গতকালে প্রতিবাদে অংশ নেওয়া মানুষের মুখে আগুণ হয়ে বেরিয়ে এসেছে।

হিন্দু ও সংখ্যালঘুরা কারও শত্রু নয়। তারা এই দেশকে ভালোবাসে, কর দেয়, শ্রম দিয়ে এই দেশ তৈরিতে অংশ নেয়, সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখে, উৎসবকে রঙিন করে। অথচ কেন তাদের সম্মানের মূল্য এত কম? কেন তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কেউ ভাবেন না? কেন তাদের সন্তান স্কুলে গেলে দুশ্চিন্তা থাকে, উৎসব এলে আতঙ্ক বাড়ে, আর কোনো অপমান হলে বিচার পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়?

এই প্রশ্নগুলো আজ বাংলাদেশের সামগ্রিক বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

গতকালের সমাবেশ তাই শুধু একটি বিক্ষোভ নয়। সেটি হিন্দু ও সংখ্যালঘুদের দীর্ঘদিনের নীরবতার বিরুদ্ধে প্রথম বড় প্রতিবাদ। এটি জানিয়ে দেওয়া যে হিন্দু ও সংখ্যালঘুরা আর ভয় পাবে না, আর চুপ থাকবে না, আর নিজের অপমান মেনে নেবে না।

এটি জানিয়ে দেওয়া যে হিন্দু ধর্মকে অপমান করার অধিকার কারও নেই তা সে মুসলিম হোক, রাজনৈতিক নেতা হোক, কিংবা ক্ষমতার কেন্দ্রের কেউ হোক। বিচার যদি সবার জন্য সমান হয়, তবে হিন্দু ও সংখ্যালঘুর মর্যাদাও সবার মতো সমান হবে—এটাই আজকের দাবির কেন্দ্রবিন্দু।

বাংলাদেশের ইতিহাসে কত বৌদ্ধ মন্দির পুড়েছে, কত বৌদ্ধমূর্তি ভাঙা হয়েছে, তার পূর্ণ হিসাব কি আমাদের কাছে আছে?

শত শত বছরের পুরোনো বিহার ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। বুদ্ধমূর্তি ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে। তবুও সেগুলোকে কেউ “ধর্ম অবমাননা” বলে মানতে চায় না। একইভাবে কত হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি ভাঙা হয়েছে, কত মন্দিরে আগুন দেওয়া হয়েছে, কত প্রতিমা অবমাননার শিকার হয়েছে তার কোনো বিচার আজও সম্পূর্ণ হয়নি।

তবে যখন সংখ্যালঘুরা কিছু বললে, সামান্য রসিকতা করে বা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয় তখনই হঠাৎ ধর্ম অবমাননার ঝড় উঠে। সংখ্যাগুরু যখন ভাঙে, সেটি দাঙ্গা বা উত্তেজনা। কিন্তু সংখ্যালঘু যখন কথা বলে, সেটি নাকি অপরাধ। এই বৈপরীত্যই বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্মম সত্য।

বাংলাদেশ চাইলে বদলে যেতে পারে, কিন্তু তার প্রথম শর্ত হলো সত্য স্বীকার করা। তবে বদলে যাওয়ার আশা একদম শূন্য কোঠায়। তবু মনে আশা জাগে যদি বদলে যেত।

এই দেশে ধর্মের নামে বহু হিন্দু ও সংখ্যালঘু পরিবার হামলার শিকার হয়েছে, ঘরবাড়ি হারিয়েছে, অপমানিত হয়েছে, আর বহু অপরাধী রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে শাস্তি এড়িয়ে গেছে। ন্যায়বিচার তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন হিন্দু ও সংখ্যালঘুর জীবন, অনুভূতি এবং সম্মানকে সমান মূল্য দেওয়া হবে।

কারণ হিন্দু ও সংখ্যালঘুর জীবনও জীবন, অনুভূতিও অনুভূতি, আর মর্যাদাও মর্যাদা।


শান্তিপূর্ণ সেটলারদের স্লোগান, “জ্বালো রে জ্বালো”

শান্তিপূর্ণ সেটলারদের স্লোগান, “জ্বালো রে জ্বালো”
(শান্তিপূর্ণ সেটলারদের স্লোগান, “জ্বালো রে জ্বালো”)

শান্তিপূর্ণ সেটলার! শান্তিপূর্ণ হরতাল!

নামটা শুনলে যেন মনে হয় ফুলের মালা হাতে কেউ রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু মাঠে নেমে দেখা গেলো অন্য চিত্র। যারা নিজেদের শান্তিপ্রিয় বলে পরিচয় দেয়, তারাই আজ রাস্তায় আগুন লাগানোর মতো স্লোগান দিচ্ছে, “জ্বালো রে জ্বালো, আগুণ জ্বালো।”

হাসি পাচ্ছে?

একবার স্লোগানটা শুনলেই বোঝা যায়, শান্তির সঙ্গে এর কোনো দূরবর্তী সম্পর্কও নেই। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের নামে এই স্লোগান আসলে কী বার্তা দেয়? কাকে জ্বালাতে চায় তারা? কার বিরুদ্ধে এই আগুন?

গতকালকের ঘটনা আরও পরিষ্কার। “শান্তিপূর্ণ হরতাল”-এর নাম করে যাদের রাস্তায় শান্তিপূর্ণ থাকার কথা ছিল, তারাই আদিবাসী ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর হামলা করেছে। শুধু তাই নয়, দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া একজন আদিবাসী মহিলা পুলিশকেও হেনস্তা করা হয়েছে—এমন ভিডিও এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরছে।

যেখানে শান্তি, সেখানে হামলা নেই; যেখানে হামলা, সেখানে শান্তি নেই—এই সাধারণ সত্যটাই যেন তারা মানতে নারাজ।

আজকের ছবিটায় দেখা যায়, ব্যানার হাতে একদল সেটলার রাস্তায় মিছিল করছে। মুখে শান্তির কথা, কিন্তু ব্যানারের ভাষা আর স্লোগানের আগুনে সেই শান্তিই যেন ধোঁয়ায় মিলিয়ে যায়। তাদের মুখ থেকে ভেসে আসে আগুন ধরানোর আহ্বান—এই স্লোগান শুনে কি কাউকে শান্তিপ্রিয় মনে হয়?

হরতালের নামে যখন আগুনের ডাক পড়ে, যখন সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হয়, যখন পুলিশও রেহাই পায় না—তখন সেই হরতালকে শান্তিপূর্ণ বলা আর মিথ্যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছাড়া আর কিছুই নয়।

শান্তিপূর্ণ?
নাকি শান্তির মুখোশ পরে সহিংসতার মহড়া?

পাহাড়ের সমাজ জানে, আগুনে জ্বলে শুধু ঘর নয়—জ্বলে ওঠে সত্যও। আর সেই সত্যটা আজ আবার চোখের সামনে, শান্তির নামে যে আগুন জ্বলে, সেটা কখনোই শান্তি নয়; সেটা শুধু আগুন।


পদক কি আজ পোষ মানানোর নতুন হাতিয়ার?

আজকের ছবিটা শুধু চোখে পড়ে না—মাথায় প্রশ্নও তোলে। পাকিস্তানের জেনারেলদের দেখি গায়ে যত রঙিন পদক, যেন যুদ্ধের চেয়ে বেশি লড়াই হয়েছে সাজসজ্জার মঞ্চে। আজ ঢাকার সেনানিবাসে সেই একই দৃশ্যের প্রতিচ্ছবি দেখতে হলো।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বুকে পদক ঝুলিয়ে দিচ্ছেন, আর আমরা ভাবছি, এই পদকের মানে আসলে কী?

যুদ্ধ হয়নি। বিজয় নেই। সীমান্তে কোনো নতুন স্থিরতা নেই। দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রতিদিন প্রশ্নবিদ্ধ। তবু পদক!

কেন? কীসের জন্য? জনগণকে দেখানোর জন্য যে দেশের সেনাবাহিনী “খুবই খুশি”? নাকি যারা ক্ষমতা ধরে রেখেছে তারা নিশ্চিত হতে চায় যে সেনাবাহিনী যেন ভুলে না যায় কার প্রতি আনুগত্য দেখাতে হবে?

যখন রাষ্ট্র দুর্বল হয় এবং নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন পদক সবচেয়ে বেশি ঝলমল করে। পাকিস্তান সেই পথ অনেক আগেই হেঁটেছে। এখন মনে হচ্ছে বাংলাদেশও সেই পথেই পা বাড়াচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে মনে হলো, পদকের ঝিলিক দিয়ে আজকাল আনুগত্য কেনা হয়, আর রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বস্ততা নয়—ক্ষমতাধারীদের প্রতি ভক্তি নিশ্চিত করা হয়।

কেউ কি সত্যিই বিশ্বাস করে যে এই পদক দেশের মানুষের নিরাপত্তা বাড়াবে? সেনাপ্রধান বুকে নতুন লোহা ঝুলালেই কি দেশে জঙ্গি কমে যাবে? নাকি আজকাল রাষ্ট্রের সাফল্য পরিমাপ হয় পদক-ঝুলের সংখ্যায়, জনগণের শান্তি-নিরাপত্তায় নয়?

যে দেশটির ভেতরে প্রতিদিন অস্থিরতা বাড়ছে, যে দেশের সীমান্তে সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে, যে দেশের পাহাড়ে প্রতিটি রাতে আতঙ্ক লেগেই থাকে—সেই দেশের সেনাপ্রধানের বুকে আজ উজ্জ্বল পদক ঝুলছে, যেন রাষ্ট্রের সব সমস্যাই কাগজ দিয়ে ঢেকে রাখা যায়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো, এই পদক কি শুধু “সম্মান” নয়, বরং একটি বার্তা?

হ্যাঁ, হয়তো বা বার্তাটি হলো, “আমরা তোমাকে সম্মান দিচ্ছি, তুমি আমাদের প্রতি আনুগত্য দেখাও।”

রাষ্ট্র যখন দুর্বল হয়, ক্ষমতায় থাকা মানুষরা আনুগত্য নিশ্চিত করতে চায়—এটাই সব সরকারের প্রাচীন কৌশল।

আজকের এই দৃশ্যে একটাই প্রশ্ন আরও তীব্রভাবে ফিরে আসে, এই পদক কি দেশের জন্য, নাকি ক্ষমতার জন্য? নাগরিকরা কি জানতে পারে না পদক দেওয়ার আসল কারণ কী? নাকি আমাদের বলাই হচ্ছে—চুপ করে থাকতে, ছবি দেখে খুশি হতে?

দেশে যত অস্থিরতা, ততই পদকের ঝিলিক বাড়ছে—এই পাঠ পাকিস্তান আমাদের দেখিয়েছে।
তবে বাংলাদেশ কি সেই পাঠই পুনরাবৃত্তি করছে?

আপনারাই বলুন।

নিরাপত্তা উপদেষ্টা ভারত থেকে যে সংবাদ নিয়ে এসেছেন তাতে কি ইউনুস সাহেবের সরকারের টনক নড়ে যাচ্ছে?

ঢাকার ভারত বিরোধিতা বাড়লে পাহাড় কেন প্রথমে জ্বলে ওঠে?

বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান

বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান দিল্লিতে গিয়ে দোভালের টেবিলের সামনে বসে যে “ডসিয়ার” হাতে পেয়েছেন, সেটা শুধু কাগজ নয়—এটা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ টানাটানির খসড়া। কিন্তু তিনি ঢাকায় ফিরে এসে কি একটুও শান্তি পেয়েছেন?

আমার মনে হয় তিনি বিমানবন্দরের দরজার ভেতরে পা রাখতেই বুঝে গেছেন—এই দেশকে বোঝানোই সবচেয়ে কঠিন কাজ।

ব্যথাটা কোথায় জানেন?

দিল্লির দোভাল যতটা কঠোর, ঢাকার জনতা তার চাইতেও কঠোর। যেখানে দেশের ৯৯% মানুষ ভারতকে চোখের শত্রু ভাবে এবং পাকিস্তানকে আদর্শ শ্বশুরবাড়ি বানিয়ে বসে, সেখানে নিরাপত্তা উপদেষ্টা ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করবেন কীভাবে?

কূটনীতি যতই নিখুঁত হোক, জনমতের উত্তাপ তাকে টেনে ধরেই রাখে।

বাংলাদেশের রাজনীতি বহু বছর ধরে একটি অদ্ভুত যাত্রাপথে চলে। ভারতের সঙ্গে শত্রুতা দেখিয়ে পাকিস্তানের প্রতি গোপন মায়া রেখে। নাটক সবাই দেখতে অভ্যস্ত, কিন্তু দোভাল নাটকের ভাষা বোঝেন না; তিনি শুধু রিপোর্ট দেখেন।

আর সেই রিপোর্টে ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে ভারতের ওপর হামলার পরিকল্পনা চলছে। স্যাটেলাইট ছবি, কললগ, ডিজিটাল রেকর্ড—সব তিনি খলিলুর রহমানের হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন।

এই সবকিছু আর কূটনীতির নরম ভাষা নয়; এটা সরাসরি সতর্কতা। দিল্লি আজ কথায় নয়, প্রমাণে কথা বলছে। কিন্তু আমার ভয়টা ঢাকা নয়। আমার ভয়টা পাহাড়। ঢাকার রাজনীতি যত উত্তপ্ত হয়, পাহাড়ের বাতাস তত শুষ্ক হয়ে যায়। ঢাকার মন্ত্রীরা যখন একে অন্যকে দোষ দেয়, সেটলাররা তখন বলে, “সমস্যা পাহাড়িদের।তারা এর জন্য দায়ী!”

এটাই বাংলাদেশের বাস্তবতা।

ঢাকার ভেতরের ভারত বিরোধিতা যত বাড়ে, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি এবং বান্দরবানের রাত তত অস্থির হয়। বলতে খারাপ লাগলেও সত্যি যে ঢাকা–দিল্লির সম্পর্ক যত খারাপ হয়, পাহাড় তত বেশি সেনা–সন্দেহ–চাপের নিচে পড়তে থাকে। রাষ্ট্রের অভ্যাস একই—সমস্যা যেদিকে হোক, পাহাড়িরা সবসময় সন্দেহভাজন। এ বাস্তবতা পাহাড় বহু দশক ধরে বহন করছে।

আমি ভাবি, এই ৯৯% ভারত বিরোধী জনতার মধ্যে দাঁড়িয়ে নিরাপত্তা উপদেষ্টা কী করবেন? দোভালকে তিনি বোঝাতে পারেন। কিন্তু দেশের ভেতরের জনমতকে বোঝাবেন কী দিয়ে? দেশের মানুষজন যখন পাকিস্তানের নাম শুনে হাসে আর ভারতের নাম শুনে রাগে, সেই মাটিতে দাঁড়িয়ে কূটনীতি কি আদৌ দাঁড়াতে পারে?

আর যদি একদিন সত্যিই দু’দেশের সম্পর্ক উত্তপ্ত হয়ে ওঠে—সবচেয়ে আগে কি পাহাড়ই পোড়াবে না? ঢাকা–দিল্লি উত্তেজনায় কলকাতা–ঢাকা সীমান্ত হয়তো খুব বেশি টের পাবে না। কিন্তু খাগড়াছড়ির রাত, রাঙামাটির নৌপথ, বান্দরবানের পাহাড়ি চূড়া—এসব জায়গায় ভয়ের ঘন কুয়াশা নেমে আসবে। ইতিহাস অন্তত তাই বলে। সবসময়ই তা হয়ে এসেছে।

নিরাপত্তা উপদেষ্টা চেষ্টা করছেন—এটা অবশ্যই তাঁর ব্যক্তিগত সাহস। কিন্তু হাজার বছরের রাজনৈতিক অভ্যাস কি এক মানুষের কূটনীতিতে বদলায়? একজন মানুষ ডসিয়ার বয়ে আনতে পারে, কিন্তু দেশের মানসিকতা বয়ে আনতে পারে না। এই সীমাবদ্ধতাই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

তাই প্রশ্নটা থেকে যায়, বাংলাদেশ–ভারতের ভবিষ্যৎ কি সংঘর্ষ ছাড়া টিকবে? আর যদি না টিকে—এই আগুনের প্রথম ঝলসানি কি আবারও পাহাড়কেই পুড়িয়ে দেবে? শেষ পর্যন্ত হয়তো পাহাড়ের মানুষই বলবে, ঢাকা–দিল্লির ঝগড়া তোমাদের, কিন্তু ধুলোটা সবসময় পড়ে আমাদের ঘরেই।

কিন্তু পাহাড় কি সেটা বলার পর চুপ থাকবে?

আমি মনে করি না। তাছাড়া ভারত কিন্তু এবার আগের মত ক্ষমা করবে বলে মনে হয় না। এবার কিছু একটা হতে পারে সেটা বাংলাদেশের সমতলের মানুষ বুঝতে পারছে কিনা আমি জানি না। সীমান্তের বিষয়গুলো আমাদের তা জানিয়ে দিচ্ছে।


রাঙামাটিতে “শান্তিপূর্ণ” হরতাল: শান্তি গেল কোথায়?

সেটলার -হরতাল 2025
(সেটলারেরা ঘিরে ধরেছে আদিবাসীদের ছবিতে দেখা যাচ্ছে)

রাঙামাটিতে আজকের সেটলার হরতালটা ছিল নাকি পুরোটাই শান্তিপূর্ণ—এমনটাই ঘোষণা ছিল। কিন্তু রাস্তায় নেমে দেখা গেল শান্তি নয়, শান্তিকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা।

ভাইরাল হওয়া ছবিগুলোতে দেখা গেছে, পিকেটিংকারীরা আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের থামিয়ে জেরা করছে, ধাক্কাধাক্কি করছে। পরে আদিবাসী যুবকের গায়ে হাত তুলেছে যদিও আদিবাসী ভদ্রলোক শান্ত ছিলেন আর এটাই নাকি সেটলার বাঙালীদের শান্তির সংজ্ঞা।

পুলিশ পাশে দাঁড়িয়ে দেখল কিন্তু থামাল না। পরে আস্তে করে এসে থামানোর চেষ্টা করল। তারা আরো আগে এসে বিষয়টি সামাল দিতে পারত।

কিন্তু করল না।

পুলিশ কি তাহলে আদিবাসীদের ওপর আগে আক্রমণ করা হোক সেই পর্যন্ত অপেক্ষায় ছিল?

আরও মজার ব্যাপার হলো, এক আদিবাসী মহিলা পুলিশকে পর্যন্ত হেনস্তা করেছে সেটলাররা। সব পুলিশ দাঁড়িয়ে তাণ্ডব দেখল; সেটলাররা দাঁড়িয়ে হাতে ধাক্কা দিল; আর শান্তিপূর্ণ হরতাল দাঁড়িয়ে রইল নামের মাঝেই।

পাহাড়ের মানুষ বোঝে যখনই “শান্তি” শব্দটা জোরে বলা হয়, তখনই সবচেয়ে বেশি গোলমাল শুরু হয়।


ফেসবুক নয়, এখন সময় আদিবাসীদের নিজস্ব সংবাদমাধ্যম দাঁড় করানোর

songbad-2

রাঙামাটির জেলাপরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে সেটলারদের যে অমানবিক আচরণ দেখলাম, তা দেখে আমি আশ্চর্য হইনি। কারণ আমি বাল্যকাল থেকেই সেটলারদের এই আচরণ দেখেই বড় হয়েছি। এই দৃশ্য আমার কাছে নতুন নয়, বরং পুরনো এক বাস্তবতার পুনরাবৃত্তি।

শুধু পাহাড়েই নয়, পৃথিবীর অসংখ্য জায়গায় অমুসলিম, আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের প্রতি মুসলিম মৌলবাদের আচরণ কেমন—সেসব বিষয়েও আমি হাতে-কলমে, কখনো সশরীরে উপস্থিত থেকে শেখার সুযোগ পাচ্ছি।

আমার থেকেও হাজারোগুল অভিজ্ঞ অনেক মানুষ পার্বত্য চট্টগ্রামে, বাংলাদেশে, পৃথিবীর নানা দেশে রয়েছেন। তাই সত্যিটা এতটাই স্পষ্ট যে এই আচরণের বিশ্লেষণ করতে খুব আমার গভীরে যেতে হবে না।

ফেসবুকের পোস্ট দেখলেই বোঝা যায় কারা কী বলে। আমাদের পাহাড়ি আদিবাসীদের মধ্যে অনেকেই খুব সুন্দর লজিক সাজিয়ে কথা বলেন, তথ্য দেন, যুক্তি দেন। সমস্যা হলো, এই পোস্টগুলো কখনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে পৌঁছায় না।

অপরদিকে, আদিবাসী পাহাড়ি বিরোধীদের কথার পেছনে বড় মিডিয়ার শক্তি আছে, আর আমাদের কথা সীমাবদ্ধ থাকে ব্যক্তিগত টাইমলাইনে। এখানেই আমরা পিছিয়ে। আমাদের প্রয়োজন ছিল, এখনো আছে—নিজস্ব একটিভাবে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যম।

আমি অনেকদিন ধরেই ভাবছি, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের নিজস্ব সংবাদমাধ্যম থাকা জরুরি। কারণ প্রতিদিন আমি দেখি, ফেসবুকে অসংখ্য আদিবাসী ভাই-বোন কত সুন্দরভাবে লিখছেন। সুযোগ পেলে তারা আরও ভালো লিখতে পারবেন।

কিন্তু সুযোগই তো পাচ্ছেন না। একটু বেশি লিখলেই ফেসবুক তাদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়। যারা চাকরিজীবী, তারা তো কথাই বলতে পারেন না। তবুও যে সময়টা হাতে পান বা সুযোগ পান, জাতির জন্য, অস্তিত্বের জন্য যতটুকু পারেন লিখে যাচ্ছেন।

আদিবাসী যারা সাংবাদিকতায় আছেন, তারাও তো পুরো স্বাধীন নন। কারণ বসেরা অধিকাংশই আদিবাসীবিরোধী মনোভাব পোষণ করেন অথবা সরকারের নীতির অধীনে কাজ করতে বাধ্য। তবুও তারা যে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও লিখে যাচ্ছেন, তারা নিঃসন্দেহে ধন্যবাদ পাবার যোগ্য।

ফেসবুকের পোস্ট বিশ্বের সাংবাদিকতার সামনে খুব ক্ষুদ্র একটি মাধ্যম। হাজারো পাহাড়ি লেখকের পোস্ট এক পাশে, আর একজন জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সাংবাদিকের রিপোর্ট আরেক পাশে—এই তুলনা এক নয়। কারণ দুনিয়া “সাংবাদিক” পরিচয়কে মূল্য দেয়, “ফেসবুকার” পরিচয়কে নয়।
তাই ভাবছি, এই অবস্থা থেকে আমরা কীভাবে বের হবো?

এবিষয়ে আগেও লিখেছি, আজও লিখছি। আমাদের প্রয়োজন নিজস্ব একটি সংবাদপত্র, নিজস্ব কিছু রিপোর্টার। সাংবাদিকতা শেখার জন্য ডিগ্রি অবশ্যই ভালো। কিন্তু সবসময় বাধ্যতামূলক নয়। পাহাড়ে সাংবাদিকতার প্রধান যোগ্যতা হলো—সাহস, সততা, এবং জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা।

আর দক্ষতা?

তা শেখানো যায়। অর্জন করা যায়।

ধরুন, বিদেশে থাকা কোনো আদিবাসী ভাই-বোন স্থানীয় সরকারের অধীনে একটি নন-প্রফিট পত্রিকার নিবন্ধন করল। তারপর পাহাড়ের লেখকদের রিপোর্টার হিসেবে সার্টিফিকেট দিল। তারা ফেসবুকেও সেই পরিচয়ে রিপোর্ট লিখতে পারবে। যাদের অভিজ্ঞতা নেই, তাদের অনলাইনে দু’ঘণ্টার প্রশিক্ষণ দিলেই হয়।

শুরুতে লেখা দুর্বল হতেই পারে, কিন্তু কয়েক মাসে লিখতে লিখতেই দক্ষতা এসে যাবে। আর পেশাদার পাহাড়ি সাংবাদিকরা তো আছেন—অনেকেই সাহায্য করতে পারবেন।

আমি নিজেও তো সাংবাদিকতার ডিগ্রি নিয়ে আসিনি। সাংবাদিকও নই। তবুও লিখি।আমার যেমন IT ডিগ্রি নেই। কিন্তু ওয়েবসাইট বানাই, ডিজাইন করি, চালাই। প্রফেশনাল না হলেও চলার মতো দক্ষতা অর্জন করা যায়। আমাদের পাহাড়ের সাংবাদিকতাও সেভাবেই চলতে পারে।

অন্তত আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে তা বিশ্বাস করি।

এবার টাকার কথায় আসি। কোনো প্রয়োজন হলে তো আমরা লক্ষ লক্ষ টাকা তুলি। কখনো থেমে থাকি না। এবারের খাগড়াছড়ির ঘটনাতেও দেশ–বিদেশের আদিবাসীরা নিজেদের সাধ্যমতো সাহায্য পাঠিয়েছেন।

আমরা বিহার, আশ্রম, গরিব–অসহায় মানুষদের জন্যও প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টাকা দিই। এটা শুধু মানবিক কারণেই নয়, পাহাড়ের প্রতি মায়া থেকেই, পাহাড়কে ভালবাসি বলে দিই। পাহাড়কে ভালোবাসি বলে এই মাতৃভূমি পাহাড়ের মানুষকে ভালোভাবে বাঁচতে দেখতে চাই বলে দিই।

তাহলে পাহাড়ের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য একটি পত্রিকার জন্য কি আমরা সামান্য দান করতে পারি না? নিশ্চয়ই পারি। একবার ফান্ড তৈরি হলে তা দিয়ে আমাদের নিজস্ব মিডিয়া চালানো সম্ভব।

এই পত্রিকার নিয়ম খুব পরিষ্কার হবে—
• এটি হবে শুধুই অধিকারবিষয়ক
• পাহাড়ে যে অবিচার, নির্যাতন, বৈষম্য—সেগুলো তুলে ধরা হবে
• কোনো আঞ্চলিক দলের বিরুদ্ধে প্রচারণা করা যাবে না
• সংবাদের লক্ষ্য হবে মানুষ, দল নয়

এবার একটি বাস্তব উদাহরণ দিই।

কয়েকদিন আগে রাঙামাটির এক তরুণীর ফেসবুক পোস্ট ভাইরাল হয়েছিল, যেখানে তিনি নিজের গ্রামে সেটলার হামলার অভিজ্ঞতা লিখেছিলেন। সেই পোস্ট ডিলিট করে দেওয়া হয় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। তার অ্যাকাউন্টও সাসপেন্ড হয়ে যায়। তিনি আমাকে বলেছিলেন, “আমি যদি সাংবাদিক হতাম, তাহলে হয়তো আমার কথা কেউ মুছতে পারত না।”

এই কথাটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে।

শেষে একটা কথা বলি। এবারের খাগড়াছড়ি ঘটনায় আমি কোনো টাকা দিইনি। দিইনি মানে আমি সহানুভূতিশূন্য নই। সেটা নয়। দিইনি কারণ আমি একটা লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছি। আমার কাছে এক টাকা মানে এক লক্ষ টাকা।

কারণ আমি সত্যিই বিশ্বাস করি, পাহাড়ের নিজস্ব সংবাদমাধ্যমই আজ সবচেয়ে জরুরি। আমি এ বিষয়ে সিরিয়াস, এবং আমি বিশ্বাস করি, আমরা সবাই চাইলে এটি সম্ভব।

কি করে ফান্ড তোলা যায় বা কি করে পত্রিকা শুরু করা যায় আপনার সুচিন্তিত পরামর্শ দিয়ে দিলে ভাল হয়।


হাসিনার বিচারের অন্তরালে যে কথা জনগণ জানে না

গতকাল বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক দিন পার হলো, যেদিন একটি দেশের মনোযোগ দুইদিকে টেনে ভাগ করা হলো—একদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়, আর অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত।

প্রথমটি খুব বড় সংবাদ, কিন্তু ব্যক্তিগত; দ্বিতীয়টি নিঃশব্দ, কিন্তু জাতীয়। আর এই দুই ঘটনাই একই দিনে ঘটল—এটাই যেন সর্ববৃহৎ রহস্য। একজন ব্যক্তির বিচার নিয়ে সব মিডিয়া উত্তাল, কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্তটি নিখুঁতভাবে আড়ালে চলে গেল।

তাহলে প্রশ্নটা উঠেই যায়, এটা কি সত্যিই কাকতালীয়, নাকি জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে রাখার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত করা একটি নিখুঁত সময় নির্বাচন?

হাসিনার রায় নিয়ে মানুষের আবেগ, তর্ক, রাজনীতি—সব কিছু গতকাল একাকার হয়ে গিয়েছিল। এর সুযোগে চট্টগ্রাম বন্দর—যে বন্দরের ওপর বাংলাদেশের ৯০% আমদানি–রপ্তানি নির্ভর করে—তার ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নেওয়া হলো। বন্দর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া মানে শুধু ব্যবস্থাপনা বদলানো নয়; এর মানে হলো কৌশলগত রুট, লজিস্টিক তথ্য, অর্থনৈতিক প্রবাহ, শ্রমিকদের জীবিকা এবং জাতীয় নিরাপত্তা অন্যের হাতে দেওয়া। এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ৩০ বছরের জন্য।

তাহলে এমন একটি সিদ্ধান্ত জনআলোচনার বাইরে, প্রায় গোপনে, ঠিক সেই দিনেই নেওয়া হলো কেন যেদিন পুরো জাতি এক ব্যক্তির বিচার নিয়ে ব্যস্ত?

যদি সত্যিই কিছু লুকানোর উদ্দেশ্য না থাকে, তাহলে এত গোপনীয়তার দরকার কী ছিল? কেন সাধারণ মানুষকে কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হলো না? কেন সংবাদমাধ্যমকে বিশ্লেষণের সময়ও দেওয়া হলো না? কী এমন তাড়া ছিল যে অনির্বাচিত সরকার—যাদের ম্যান্ডেট জনগণের কাছে নেই—তারা দেশের সবচেয়ে কৌশলগত সম্পদ নিয়ে এত বড় সিদ্ধান্ত এত দ্রুত নিল? দেশে সীমান্ত উত্তেজনা, অর্থনৈতিক সংকট, অভিবাসী সমস্যা, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা—এতগুলো জরুরি বিষয় যখন রয়ে গেছে, তখন সরকার বন্দরকেই আগে দেখল কেন? এটি কি সত্যিই দেশের স্বার্থে ছিল, নাকি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের আড়ালে অন্য কোনও অদৃশ্য স্বার্থ কাজ করছে?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, একজন ব্যক্তির বিচার কি ইচ্ছাকৃতভাবে সেই দিনেই করা হলো, যেদিন বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ বিদেশিকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে? কারণ একজনের রায়ের উত্তাপে দেশ এমনিতেই উত্তাল থাকে, আর সেই উত্তেজনার আড়ালে জনগণের চোখ–কান সব ব্যস্ত থাকে। বন্দর নিয়ে সরকারের অস্বাভাবিক তাড়াহুড়া আর হাসিনার রায়ের মুহূর্তগত নাটকীয়তা—এই দুইয়ের মিল এত নিখুঁত যে সন্দেহ জাগে: এখানে কি কেবল আইন কাজ করেছে, নাকি রাজনৈতিক কৌশলও ছায়ায় কাজ করেছে?

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বন্দর বিদেশিদের হাতে গেলে এর প্রভাব সাধারণ মানুষই প্রথমে টের পাবে। ট্যারিফ বাড়লে বাজারে চাল–ডাল–তেল–চিনি—সবকিছুর দাম বাড়বে। শ্রমিক ছাঁটাই হলে হাজার পরিবার পথে নামবে। বৈশ্বিক কোম্পানিগুলো নিজেদের লাভ তুলতে চাইলে দেশের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জাতীয় নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হবে, কারণ বন্দর শুধু বাণিজ্য নয়—এটি ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র। তাহলে জনগণের অধিকার কি এক দিনের রায়ের উত্তেজনায় ঢাকা পড়ে গেল?

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো—এই নিখুঁত সমাপতন কি সত্যিই ইতিহাসের একটি সাধারণ ক্যালেন্ডার-দুর্ঘটনা, নাকি গণমানুষের দৃষ্টি সরানোর জন্য প্রস্তুত একটি রাজনৈতিক পর্দা? হাসিনার রায় আজ বা কাল বিতর্ক হতেই পারে, কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরের সিদ্ধান্ত আগামী ৩০ বছর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করবে। একজন মানুষের বিচারকে সামনে রেখে কোটি মানুষের ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত ঢেকে দেওয়া—এটাই কি আজকের রাষ্ট্রচালনার নতুন কৌশল?

সময় হয়তো উত্তর দেবে। কিন্তু আজ যে নীরবতা দেখা গেল—তাই সবচেয়ে জোরালো ইঙ্গিত। জনগণকে ব্যস্ত রেখে, প্রশ্ন থেকে দূরে রেখে, চট্টগ্রাম বন্দরের মতো কৌশলগত সম্পদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা—এটা নিঃসন্দেহে একটি বড় রাজনৈতিক সংকেত। আর সেই সংকেতের মানে আমরা আজ না বুঝলেও, দেশ বুঝবে—খুব শিগগিরই।


বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা কেন ভারতে যেতে বাধ্য হলেন?

India vs Bangladesh
বাংলাদেশ কি রক্ষা পাবে?

দিল্লির লালকেল্লায় ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর ভারতীয় তদন্ত সংস্থাগুলি যে তথ্য প্রকাশ করছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে। বিস্ফোরণে ১৩ জন নিহত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই ভারতের তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুত এগোচ্ছে, এবং সেই তদন্তের কয়েকটি সুত্র অস্বস্তিকরভাবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের দিকে নির্দেশ করছে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টার আকস্মিক দিল্লি সফর শুধু কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়—পরিস্থিতি ব্যাখ্যার একটি প্রয়োজনীয় ধাপ।

ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলি দাবি করছে যে বিস্ফোরণের কিছু দিন আগে ঢাকার বনানিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়, যেখানে পাকিস্তান-ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈবার শীর্ষ কমান্ডার সাইফউল্লাহ সাইফ ভার্চুয়ালি যোগ দেন। তাদের দাবি অনুযায়ী, বৈঠকে আরও কয়েকজন বাংলাদেশি ধর্মীয় সংগঠন ও জঙ্গি কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে বাংলাদেশের সরকারি পদে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। যদিও ঢাকা এই দাবি পুরোপুরি অস্বীকার করেছে, তবুও ভারতের তদন্ত দল এই তথ্যকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।

ভারতের তদন্ত আরও বলছে যে পাকিস্তান থেকে কিছু সরঞ্জাম পশ্চিমবঙ্গে পৌঁছেছিল এবং সম্ভবত বিস্ফোরণে তা ব্যবহৃত হয়েছে। একইসঙ্গে উল্লেখ এসেছে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার একটি নিরাপদ আস্তানার, যেখানে বাংলাদেশের পলাতক এক নাগরিক ইকতিয়ারের সহায়তায় কয়েকজন সন্দেহভাজন ব্যক্তি অবস্থান করেছিল বলে দাবি। বিস্ফোরণের তদন্তে বর্তমানে এই লজিস্টিক নেটওয়ার্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

ঢাকার অবস্থান এখনো স্পষ্ট ও অস্বীকারমূলক। বাংলাদেশ বলছে তাদের ভূমি বা নাগরিক জঙ্গি কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত নয় এবং বিস্ফোরণের ঘটনায় তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। কিন্তু ভারতের তদন্ত দল যেভাবে তথ্য ও সাক্ষ্য সংগ্রহ করছে, তাতে দুই দেশের বক্তব্যের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।

এটাই নিরাপত্তা উপদেষ্টার দিল্লি সফরের মূল কারণ- পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা, তথ্য বিনিময় করা এবং ক্রমবর্ধমান সন্দেহের আবহ কমানো।

দু’দেশের সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক সুফল এনেছে। তাই দিল্লির অভিযোগকে পাশ কাটানো বা একে সাধারণ ভুল বোঝাবুঝি বলা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়।

ভারত এখন বিস্ফোরণের প্রতিটি সূত্র গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখছে, এবং প্রমাণের ভিত্তিতে প্রশ্ন তুলছে, বাংলাদেশ তার নিজস্ব ভূখণ্ডে চলমান কার্যকলাপ সম্পর্কে কতটা অবগত।

এই প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা উপদেষ্টার দিল্লি সফর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক আচরণ নয়; বরং আস্থার সংকট দূর করার একটি বাধ্যতামূলক পদক্ষেপ। কারণ বর্তমান অবস্থায় ভারত শুধু ব্যাখ্যা নয়—স্পষ্ট তথ্য ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে।

বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টার সফরের প্রয়োজনীয়তা এখানেই। অভিযোগের জবাব দেওয়া, সন্দেহ দূর করা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখা। অভিযোগ সত্যি হলে বাংলাদেশের অবস্থা কি হবে আগেভাগে ভেবে রাখুন।

সূত্রঃ zeenews.india