এস আই সন্তোষ কি সেনার বলি?

তিনি একজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। পদে সাব-ইন্সপেক্টর। নাম তার সন্তোষ চৌধুরী।

সময়টা জুলাই। একটি ভয়াবহ রাত। রাষ্ট্র তখন ভেঙে পড়ছে। থানা ভাঙচুর হয়। লুট চলে। আইনের কোনো উপস্থিতি নেই।

বানিয়াচং থানায় বহু পুলিশ সদস্য আটকা পড়ে যায় নিজেদের থানায়। বাইরে উত্তপ্ত জনতা। ভেতরে ভয়।

উদ্ধারে আসে সেনাবাহিনীর একটি দল। কিন্তু পরিস্থিতি তখন আর সহজ নয়।

মবের একটাই শর্ত। একজনকে চাই। সন্তোষকে।

ওদের কথা স্পষ্ট ছিল। এই একজনকে দাও। তাহলেই বাকিরা বাঁচবে। না দিলে সবাই মরবে।

সেই মুহূর্তে রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী একটি সিদ্ধান্ত নেয়।

একজনকে ছেড়ে মবের হাতে দেওয়া হয়। বাকিদের ফিরিয়ে আনা হয়।

এরপর যা ঘটে তা শুধু হত্যা নয়। এটি ছিল বর্বরতা প্রদর্শন।

পিটিয়ে হত্যা। তারপর মৃতদেহ ঝুলিয়ে রাখা। উঁচু গাছে। দেখানোর জন্য। এটা যেন দিপু চন্দ্র দাসের আগাম মৃত্যু পূর্বাবাস।

একই নকশা। একই বার্তা।

আমরা এই দৃশ্য আগে দেখেছি। ভুলে গেছি। অথবা ভুলে থাকার ভান করেছি।

আজ আবার সেই স্মৃতি সামনে এনে দেওয়া হলো।

আরও ভয়াবহ বিষয়। খুনিরা লুকায়নি। গর্ব করেছে।

সন্তোষের সহকর্মীদের সামনে সামনে বসে একজন ঘাতক দম্ভ করে বলেছে, “আমরাই তাকে মেরে ঝুলিয়ে পুড়িয়েছি।”

ভাবুন তো সেই সহকর্মীদের কথা। যারা বেঁচে ফিরেছিল। যারা জানে, তারা একজনকে রেখে এসেছিল। সেই সন্তোষের জীবনের বিনিময়ে আজ যারা বেঁচে আছে।

সন্তোষের বাবা-মা কোথায়। সে বিবাহিত ছিল কি না। তার সন্তান ছিল কি না। সে সব তথ্য কেউ জানে না। শুধু জানে সে একজন সংখ্যালঘু।

এই অজানাগুলোই ঘটনাটাকে আরও নিষ্ঠুর করে তোলে।

মানুষ খুন করে। তা নিয়ে উল্লাস করে। এটা যেন সমাজের স্বভাব না হয়ে যায়।

কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।

যে ব্যক্তি খুনের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিল, যে দম্ভ করে নিজের অপরাধ ঘোষণা করেছিল, তার কী হলো?

কিছুই হয়নি।

দম্ভের ক্লিপ ভাইরাল হওয়াতে লোক দেখানো গ্রেপ্তার করা হল। বিচার নয়। খুনিকে ১২ ঘণ্টা না পেরুতে ছেড়ে দেওয়া হলো।

সে হেঁটে বেড়াল। তাকে বীরের সম্বর্ধনা দেওয়া হল। রাষ্ট্র নীরব রইল।

এখানেই প্রশ্নটা গভীর হয়।

একজন পুলিশ কর্মকর্তা নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হলো। হত্যার পর লাশ ঝুলিয়ে রাখা হলো।

আর হত্যাকারী—সে মুক্ত রইল?

এই নীরবতা কি কাকতালীয়?

নাকি এই সিদ্ধান্ত, এই ছেড়ে দেওয়া, সংখ্যালঘু নিপীড়নের একটি বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ?

যে সেনাবাহিনী একজনকে বাঁচাতে গিয়ে আরেকজনকে মৃত্যুর হাতে তুলে দেয় আর পরে খুনিকে ছেড়ে দেয়—তারা কি কেবল পরিস্থিতির শিকার?

নাকি এই নীরব সম্মতিই সহিংসতাকে অনুমোদনে রূপ দেয়?

যখন খুনি শাস্তি পায় না আর রাষ্ট্র চোখ ফিরিয়ে নেয়, তখন সহিংসতা আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকে না।

তা নীতিতে পরিণত হয়। আর সেই নীতির নাম নির্বাচিত নীরবতা।

এই নীরবতার দায় কি দেশের সুযোগ্য সেনাবাহিনী তাদের কৃতকর্মের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে নাকি রাষ্ট্র এড়িয়ে যেতে পারে?

পাহাড় থেকে সমতলে আদিবাসী বা সংখ্যালঘুদের জন্য কোন ন্যায় বিচার নেই। নিধন আর অত্যাচার। এই দায় কার ?

এই দায় একদিন কাউকে না কাউকে নিতেই হবে। রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

Leave a Reply