সেটলারদের চেনা মুখোশ

সেটলাররা যে মুখোশই পরুক না কেন প্রতিটি পাহাড়ের আদিবাসী চোখ বন্ধ করে বুঝতে পারবে। কারণ তারা দশকের পর দশক এ মুখোশ দেখে আসছে।

শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনে দাঁড়িয়ে যে মিছিলের ছবি আজ ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেটি দেখলেই সত্যটা চোখে পড়ে। কারণ এখানে একজনও পাহাড়ি নেই, অথচ ব্যানারে লেখা “পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ।”

এই নাম পাহাড়িদের ৫০ বছরের ইতিহাস বহন করে।কিন্তু সেটলাররা এখন সেই নামকেই নিজেদের দখলে নিয়ে পাহাড়িদের স্মৃতি পর্যন্ত কপি করে ফেলতে চায়।

ঢাকার ফুটপাতেই নকল পরিচয়ের জন্ম হলো, অথচ পাহাড়ের মাটিতে দাঁড়ানোর সাহস তাদের নেই।

ছবির দিকে তাকালেই আরেকটা ব্যঙ্গ চোখে পড়ে, যারা পাহাড়কে বাঁচাতে একটি ধুলিকনা পর্যন্ত স্পর্শ করেনি, তারাই আজ পাহাড় রক্ষার বক্তৃতা দিচ্ছে। একেকজন এমন স্বরে কথা বলছে, যেন পাহাড়ে গিয়ে মানুষের চোখে চোখ রেখে সত্য দেখেছে।

হ্যাঁ, তারা জানে, পাহাড়ে গেলে পাহাড়ি আদিবাসীরা প্রশ্ন করবে, “আপনারা কে? আমাদের নামে রাজনীতি করছেন কেন?”

সেই বিব্রতকর সত্য এড়াতে তারা ঢাকার নিরাপদ জায়গায় দাঁড়িয়ে পাহাড়িদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অভিনয় করছে।

সবচেয়ে হাস্যকর হলো, এরা দাবি করছে “আদিবাসী শব্দ নিষিদ্ধ করতে হবে।”

যারা নিজেরাই পাহাড়ে আগন্তুক, তারাই আজ পাহাড়িদের পরিচয় বাতিল করতে চায়। যেন একদিন বলে বসবে, “পাহাড় শব্দটাও নিষিদ্ধ, কারণ পাহাড়ে পাহাড়িদের দাবী বেশি।”

যে পরিচয়ে পাহাড়িরা বাঁচে, সেই পরিচয়ই সেটলারদের চোখে ঝুঁকি; কারণ এটিই প্রমাণ করে দেয় কোন জাতিগোষ্ঠী ভূমির প্রকৃত সন্তান, আর কে আগন্তুক সেটলার হয়ে দখলদারি প্রতিষ্ঠা করেছে।

এদের মুখে আরেক নাটক, “সেনা ক্যাম্প বাড়াতে হবে।”

এটি পাহাড়িদের নিরাপত্তা নয়, বরং তাদের ঘরহারা করার পুরনো ছক। পাহাড়ে যা কিছু ঘটে, তার দায় পাহাড়িদের ঘাড়ে চাপিয়ে সেটলাররা নিজেদের দখলকে রক্ষা করার জন্যই এই দাবি করে।

যে পাহাড়ে বছরের পর বছর গুম-খুন, জমি দখল, মিথ্যা মামলা, গ্রাম উচ্ছেদ—সবচেয়ে বেশি বেড়েছে সেটলার আগ্রাসনই, সেই সত্য চাপা দিতে এরা সন্ত্রাসের গল্প বানিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

বিদেশী ষড়যন্ত্রের গল্প তো আরো বড় হাসি। তারা বলছে ভারত-চীন-আমেরিকা নাকি পাহাড়িদের সাহায্য করছে।

যে পাহাড়িরা বছরের পর বছর নিজের জমিতে টিকে থাকার ন্যূনতম অধিকার পর্যন্ত পায় না, তাদের সংগ্রামকে বিদেশী সাহায্যের হাত ধরে সন্ত্রাস বানিয়ে দেখানো হয় শুধু একটি কারণে আর সেটা হলো সেটলারদের দখলকে জাতীয়তাবাদের মুখোশ পরাতে। পাহাড়িদের অধিকারকে অপরাধ বানানোই ওদের একমাত্র রাজনীতি।

এই সমাবেশ পাহাড়িদের কোনো প্রতিবাদ বা দাবি নয়; বরং পাহাড়িদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এক সুপরিকল্পিত অভিযোজন।

যাদের মধ্যে একজন পাহাড়িও নেই, তারা পাহাড়িদের নামে কথা বলছে কেবল বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে। নাম নকল, ইতিহাস নকল, গল্প নকল—শুধু উদ্দেশ্যটাই অরিজিনাল: পাহাড়িদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া।

শেষমেশ ছবিটা যে সত্যটি সবচেয়ে জোরে বলে, সেটা হলো পাহাড়ি হওয়া অভিনয় করে দেখানো যায় না। পরিচয় চুরি করা যায়, ব্যানার ছাপানো যায়, ঢাকায় দাঁড়িয়ে বক্তৃতা মারা যায়।

কিন্তু পাহাড়ি মানুষের শত বছরের ব্যথা, সংগ্রাম আর ইতিহাস কেউই নিজের বানিয়ে নিতে পারে না।

পাহাড়িদের কণ্ঠ যতবার চেপে ধরার চেষ্টা হবে, ততবারই এমন ছবি উল্টো প্রমাণ হবে—দখলদারির রাজনীতি যতই মুখোশ পরে দাঁড়াক, সত্যের সামনে তা টেকে না।

সেটলাররা বুঝবে কবে? দয়া করে, এদের একটু কেউ বুঝানোর চেষ্টা করুন।


Leave a Reply