
সেটলাররা নাকি শান্তি চায়। তারা নাকি পাহাড়ের আদিবাসী। তারা নাকি ভূমিপুত্র। কিন্তু সত্য হলো, তারা কখনোই পাহাড়ের মানুষ ছিল না। তাদের আনা হয়েছিল রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায়, ট্রাকে বোঝাই করে, বন্দুকের পাহারায়। যাদের ঘরজমি ছিল, যাদের সন্তানরা পাহাড়ের নদী আর বনেই বড় হয়েছে, সেই আদিবাসী মানুষগুলোকে সরিয়ে দিয়েই তাদের বসানো হয়েছিল।
তাদের আগমন কোনো প্রাকৃতিক স্থানান্তর নয়, বরং এক রাজনৈতিক প্রকল্প। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল পাহাড়ের demography পাল্টে দেওয়া, আদিবাসীদের সংখ্যায় কমিয়ে আনা, এবং তাদের ভূমি দখল করা। আজ তারা সেই পরিকল্পনার ফসল খাচ্ছে, আর মুখে বলছে, “আমরাও পাহাড়ের মানুষ।” অথচ তাদের জন্মের ইতিহাসই পাহাড়িদের উচ্ছেদের ইতিহাস।
তারা বলে শান্তি চায়, কিন্তু তাদের শান্তির কণ্ঠস্বরই সবচেয়ে উচ্চ। যে ভূমি কমিশন পাহাড়ের মানুষের অধিকার ফেরানোর কথা বলে, সেই কমিশনের নাম শুনলেই তারা তেতে ওঠে। ভয় পায় কি তারা? নাকি ভয় দেখাতে চায়?
যদি সত্যিই তারা ভূমিপুত্র হতো, তাহলে কমিশনের কাজে তো তাদেরই স্বার্থ রক্ষা হতো। কিন্তু তারা জানে, সত্য প্রকাশিত হলে মুখোশ খুলে যাবে, আর দেখা যাবে, দখলের নিচেই তাদের ভিত্তি।
তাদের শান্তির সংজ্ঞা বড়ই সুবিধাজনক। যেখানে তারা দখলদার, সেটাই শান্তি। যেখানে পাহাড়িরা প্রতিবাদ করে, সেটাই অশান্তি। তাদের মুখে শান্তি, মনে জমির দলিল। তাদের হাতে ফুল নয়, ফাইল। তাদের সভা মানে সংলাপ নয়, সীমারেখা টানা। তারা সহাবস্থান বলে, কিন্তু সহাবস্থানের মানে তাদের কাছে একতরফা আধিপত্য যেখানে পাহাড়িরা শুধু নীরব দর্শক।
ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, “Action speaks louder than words.” কিন্তু তাদের কাজের আওয়াজ এত প্রবল যে, তাদের মুখের কথাই হারিয়ে যায়। তারা শান্তির কথা বলে, অথচ তাদের উপস্থিতিই অশান্তির প্রতীক। তারা উন্নয়নের কথা বলে, অথচ সেই উন্নয়ন মানে পাহাড়িদের উচ্ছেদ, নির্যাতন আর সামরিক নিয়ন্ত্রণ। তারা সহাবস্থানের কথা বলে, অথচ তাদের সহাবস্থানে পাহাড়িরা ক্রমে অনুপস্থিত হয়ে যাচ্ছে।
একটা দেশের আইন কি এমনভাবে লেখা হয়ে গেছে যেখানে আসল মালিককেই নিজের মালিকানা প্রমাণ দিতে হয়, আর দখলদার আদালতে গিয়ে শান্তি দাবি করে? যদি তাই হয়, তাহলে সেই দেশের ন্যায়বিচার কেবল কাগজে লেখা থাকে, মাটিতে নয়। বাংলাদেশ নামের এই রাষ্ট্রে আজ পাহাড়ের জন্য আলাদা আইন চলে—যেখানে মানবিকতা নয়, সংখ্যাই নির্ধারণ করে ন্যায়।
তারা শান্তি চায়, তবে শর্ত একটাই, পাহাড় যেন মুখ না খোলে। তারা সহাবস্থান চায়, তবে শর্ত, পাহাড় যেন প্রশ্ন না তোলে। তারা সমাধান চায়, তবে শর্ত, পাহাড় যেন তার ইতিহাস না মনে রাখে। কিন্তু পাহাড়ের মাটি কখনো ভুলে না। যে মাটি থেকে মানুষ উচ্ছেদ হয়, সেই মাটি একদিন প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে।
ভূমি কমিশনের কাজ তারা হয়তো সাময়িকভাবে থামিয়ে দিতে পারবে, কিন্তু পাহাড়ের সত্যকে কখনো থামাতে পারবে না। কারণ পাহাড়ের ইতিহাস লিখে রাখা আছে শুধু কাগজে নয়, মানুষের রক্তে, অশ্রুতে এবং স্মৃতিতে। পাহাড় কারো দয়া নয়, পাহাড়ের অধিকার তার সন্তানদেরই।
আজ প্রশ্ন নয়, এটি এক নৈতিক হিসাবের সময়। দেশের আইন কি দখলদার সেটলারদের মর্জি অনুযায়ী চলবে, নাকি রাষ্ট্র একদিন সাহস করে সত্যের পাশে দাঁড়াবে বা সমস্যার সমাধান করবে? যারা পাহাড়কে নিজেদের সম্পত্তি মনে করে, তারা হয়তো ভুলে গেছে—পাহাড় কাগজ নয়, বিবেকেরও হিসাব চাইছে।