বাংলাদেশে আইন এখন ঘুমন্ত। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ হচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আছে, কিন্তু তারা দায়িত্ব পালন করছে না। কারণ কেউ তাদের আর পাত্তাই দিচ্ছে না।
এটা কোনো তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নয়। থানায়, আদালতে, রাস্তায় সাধারণ মানুষ প্রতিদিন এই বাস্তবতা দেখছে এবং ভোগ করছে।
এই সব কিছু মিলেই মানুষ বুঝে যায়, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি অরাজক দেশে পরিণত হয়েছে। যদিও দেশের মানুষ মনে মনে এই সত্য মেনে নেয়, তবু কথাটা মুখে স্বীকার করতে আত্মসম্মানে লাগে। ভয়, অভ্যাস আর “আর কীই বা করা যাবে”—এই মানসিকতাই মানুষকে নীরব করে রাখে।
এবার যে কথায় আসছিলাম, সেখানে ফিরে আসি।
অনেকেই বলছে, বাংলাদেশে নির্বাচন হলে দেশ আবার সুন্দর করে চলবে। কারণ বিরোধী দল তো নেই বললেই চলে। দেশে এখন কার্যত বিএনপি আর ইসলামি জামায়াতের জোট।
এরা বহু বছর ধরেই একসাথে ঘুমাচ্ছে, খাচ্ছে, বেড়াচ্ছে। একসাথে লীগ সরকার উৎখাত করেছে, লীগকে ধ্বংস করেছে। সুতরাং এবার একসাথেই দেশ চালাবে। তাদের মধ্যে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
তাই ভাগ-বাটোয়ারা করে দেশ চালাবে, অর্থাৎ খেয়ে ফেলবে—এই ধারণাটাই অনেকের।
কিন্তু বাস্তব রাজনীতি এত সহজ নয়। ক্ষমতার ভাগাভাগি শুনতে সহজ হলেও, ক্ষমতার ভেতরের দ্বন্দ্ব কখনো এত শান্তভাবে মেটে না। বাংলাদেশের বাঙালীদের মধ্যে তা একেবারে অসম্ভব।
এই যুক্তিটা ভালোভাবে বোঝার জন্য একটু পিছনে যাওয়া দরকার।
নির্বাচন ঘোষণার আগে ইউনুস সর্বদলীয় জোট গঠনের চেষ্টা করেছিলেন। বলা যায়, তিনি লাখবার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পারেন নি।
সর্বদলীয় জোট হলে তিনিও তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে আরও কিছুদিন ক্ষমতায় থাকতে পারতেন। তিনি ব্যর্থ হন। সময় গড়িয়েছে, চাপ বেড়েছে, আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত চাপে পড়ে তিনি নির্বাচনের নাটক শুরু করেন।
এই নির্বাচনের নাটকের ভেতরে তার হিসাব ছিল আলাদা। তিনি ভেবেছিলেন, বিএনপি আর জামায়াত জোট মিলে দেশ চালাবে, আর তিনি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে যাবেন। ক্ষমতার কেন্দ্র থাকবে, শুধু ভারসাম্য বদলাবে। সর্বদলীয় সরকার হলে যতটা সুবিধা রাখা যেত, নির্বাচিত জোট সরকারে সেটা কম হবে—এই বাস্তবতাও তিনি জানতেন।
বিষয়টি আরো একটু সহজ করে বলি। বিশ দিন অভুক্ত প্রাণী যখন রাজভাণ্ডারে খাবার দেখে, তখন সে লোক মনে করে সব খাবার সে একাই খেয়ে ফেলবে। সে ভুলে যায়, যত ক্ষুধাই লাগুক না কেন, মানুষের পেট রাজভাণ্ডার খালি করতে পারে না।
রাষ্ট্রও ঠিক তেমন। ক্ষমতা দেখলে অসীম মনে হয়, কিন্তু বাস্তবে তার সীমা আছে।
একইভাবে, প্রাণীর মধ্যেও পার্থক্য আছে। কেউ আস্তে আস্তে খায়। কেউ আবার কামড়া-কামড়ি করে খায়। ফলে যা হয় – খাওয়ার চেয়ে খাবার নষ্ট হয় বেশি। বিএনপি আর জামায়াত জোটের অবস্থাও অনেকটা সেরকম। দীর্ঘ দুই দশক ধরে তারা কার্যত না খেয়েই আছে।
তাই এখন তারা ভাগাভাগি করে খাবে এমন আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। অন্তত আমার মনে হয় না। আর এই কামড়া-কামড়ির ভিড়েই সবচেয়ে আগে ছিঁড়ে যায় রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা আর মানুষের আস্থা।
এই অবস্থাতেই দেশের আইন-শৃঙ্খলা আরও অবনতি হবে। মারামারি বাড়বে। শাসন থাকবে, কিন্তু শাসন করার সক্ষমতা ও নৈতিক বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। ফলে অবধারিতভাবেই নতুন করে নির্বাচনের ডাক উঠবে। কয়েক মাস বা কয়েক বছরের মধ্যেই সরকার ভেঙে পড়বে এবং আবার নতুন নির্বাচন হবে। পাঁচ বছর সরকার টিকতে পারবে না।
তাই এই বাস্তবতাকে এখন থেকেই চোখে রেখে চলতে পারলে পাহাড়ে আগাম বড় বিপদের কিছুটা অন্তত পথ রোধ করা যাবে। দালাল এক দিনে উধাও হবে না, তবে আজকের অবস্থান থেকে অন্তত একটু ভালো জায়গায় থাকা সম্ভব। এই সময় অন্ধ আনুগত্য বা ভুল পক্ষ বেছে নেওয়ার মাশুল ভবিষ্যতে পাহাড়কে অনেক বড় করে দিতে পারে—এই বোধটুকু মনে রাখা দরকার।
সবচেয়ে বড় কথা, সর্বদলীয় সরকার হোক বা নির্বাচিত সরকার—এই সরকারের মেয়াদ হবে খুবই অল্প।