
নাইজেরিয়ায় এখন এক অদ্ভুত নীরব যুদ্ধ চলছে।
বাইরের চোখে এটি হয়তো “সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই”, কিন্তু ভেতরে এটি আসলে ধর্ম, জাতি ও ক্ষমতার সংঘর্ষ।
এই সংঘর্ষের কেন্দ্রে আছে এক নাম— ননদি কানু (Nnamdi Kanu) এবং তার নেতৃত্বাধীন আন্দোলন আইপিওবি (IPOB), যাকে সরকার “সন্ত্রাসী সংগঠন” বলে চিহ্নিত করেছে।
কিন্তু যখন আমেরিকা ঘোষণা দিল যে তারা নাইজেরিয়ায় এসে সন্ত্রাস দমন করবে, তখন দেখা গেল, যাদের সরকার সন্ত্রাসী বলে, তারাই বরং খুশি।
আর যারা সন্ত্রাস দমনের পক্ষপাতী ছিল, তারাই এখন আমেরিকার বিরোধিতা করছে।
প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে আসল সন্ত্রাসী কারা?
ধর্ম ও ভূগোলের বিভাজন
নাইজেরিয়ার ধর্মীয় ও জাতিগত মানচিত্র এই সংকটের মূলে।
দেশটির উত্তরাঞ্চল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, যেখানে চরমপন্থী ইসলামী সংগঠন বোকো হারাম (Boko Haram) এবং আইএসডব্লিউএপি (ISWAP) দীর্ঘদিন ধরে খ্রিষ্টানদের উপর হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বসবাসরত ইগবো জনগোষ্ঠী প্রায় সবাই খ্রিষ্টান, এবং তারাই ‘বিয়াফ্রা’ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র চায়।
এই স্বাধীনতার দাবিতেই জন্ম নেয় IPOB (Indigenous People of Biafra) — যা মূলত এক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন।
কারা মারছে খ্রিষ্টানদের?
খ্রিষ্টান হত্যার মূল উৎস উত্তরের ইসলামী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো।
বোকো হারাম ও আইএসডব্লিউএপি গত এক দশকে হাজার হাজার খ্রিষ্টানকে হত্যা করেছে, গির্জা জ্বালিয়ে দিয়েছে। মেয়েদের অপহরণ করেছে নিয়ে ধর্ষণ করে যাচ্ছে এবং গ্রাম ধ্বংস করেছে।
তাদের লক্ষ্য একটাই, নাইজেরিয়াকে ইসলামী রাষ্ট্রে রূপান্তর করা।
অন্যদিকে, দক্ষিণ-পূর্বের IPOB বা ইগবো জনগণ এসব হত্যার শিকার।
তাদের দাবি—সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে খ্রিষ্টান ও ইগবো সম্প্রদায়ের ওপর দমননীতি চালাচ্ছে, অথচ উত্তরাঞ্চলের আসল সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে তেমন কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
সরকারের ভূমিকা: নীরবতা ও দ্বিমুখী আচরণ
নাইজেরিয়ার সরকার প্রকাশ্যে বলে—“আমরা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে আছি।”
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সরকার উত্তরের ইসলামী জঙ্গিদের বিরুদ্ধে দুর্বল, আর দক্ষিণ-পূর্বের খ্রিষ্টান বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কঠোর।
অর্থাৎ, যারা রাষ্ট্র ভাঙার দাবি করছে, তারা সরকারের শত্রু; কিন্তু যারা ধর্মের নামে খ্রিষ্টান হত্যা করছে, তারা সরকারের সুবিধাভোগী নীরবতার মধ্যে রয়ে গেছে।
এই দ্বিমুখী অবস্থানের কারণেই আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, নাইজেরিয়ার সরকার কি সত্যিই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়ছে, নাকি ধর্মীয় পক্ষপাতিত্বের রাজনীতি চালাচ্ছে?
খ্রিষ্টানদের প্রসঙ্গ কেন গুরুত্বপূর্ণ
IPOB-এর আন্দোলনের কেন্দ্র খ্রিষ্টানপ্রধান ইগবো সমাজ।
তারা যখন স্বাধীনতার দাবি তোলে, তখন সরকার তাদের “সন্ত্রাসী” বলে দমন করে।
কিন্তু একই সময়ে, ইসলামী জঙ্গিরা যখন খ্রিষ্টান গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়, তখন সরকার “গণসংঘর্ষ” বলে দায় এড়িয়ে যায়।
এ কারণেই পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষত আমেরিকা ও ইউরোপ, নাইজেরিয়ার খ্রিষ্টান নিপীড়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
আর যখন আমেরিকা ঘোষণা করল যে তারা নাইজেরিয়ায় এসে “সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অভিযান” চালাবে, তখন IPOB সদস্যরা এবং দক্ষিণ-পূর্বের খ্রিষ্টানরা স্বস্তি পেল। তারা ভাবল, এবার হয়তো তাদের হত্যার বিচার হবে।
বিরোধের চূড়ান্ত প্রশ্ন
কিন্তু এখানেই শুরু হলো নতুন দ্বন্দ্ব।
সরকার ও উত্তরাঞ্চলের মুসলিম নেতারা হঠাৎই আমেরিকার উপস্থিতির বিরোধিতা শুরু করল।
যারা এতদিন বলেছিল IPOB সন্ত্রাসী, তারা এখন আমেরিকাকে বলছে, “আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করো না।”
অন্যদিকে, যাদের ‘সন্ত্রাসী’ বলা হয়েছিল, তারা আমেরিকাকে স্বাগত জানাচ্ছে।
এখানেই সাধারণ নাগরিকদের মনে প্রশ্ন জাগছে—
👉 তাহলে আসল সন্ত্রাসী কে?
যারা হত্যা করছে, নাকি যারা ন্যায়বিচার চাইছে?
একটি দেশের বিবেকের প্রশ্ন
নাইজেরিয়ার এই লড়াই ধর্ম, জাতি বা রাজনীতির চেয়ে অনেক গভীর কিছু।
এটি এক জাতির বিবেকের পরীক্ষা যেখানে শাসক আর বিদ্রোহীর সীমারেখা ক্রমেই মুছে যাচ্ছে।
যে সরকার জনগণের রক্তপাতের দায় এড়ায়, সে নিজেই নীরব সন্ত্রাসের অংশ।
আর যে জনগণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খোলে, তাকে যদি বিদ্রোহী বলা হয়, তাহলে হয়তো ইতিহাসের প্রতিটি মুক্তিযুদ্ধই “সন্ত্রাসবাদ” ছিল।
শেষ করবো যদিও আরও অনেক লেখার আছে। পরে সময় করে লিখবো।
নাইজেরিয়ার এই লড়াই আজ শুধু এক দেশের নয়। এটি বিশ্বের প্রতিটি নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর আয়না।
কারণ একদিন না একদিন, সবাইকেই এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, “কে আসল সন্ত্রাসী—যে অস্ত্র ধরে, নাকি যে সত্য বলে?”
এবার বলুন, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিচ্ছবি এখানে দেখতে পান কিনা? আর যদি দেখতে পান দয়া করে শেয়ার করবেন, জানিয়ে দিবেন যে আমরা পাহাড়ে যারা আছি আমরা একা নই। কিন্তু আমাদের কোন পথে হাঁটতে হবে?