
শরণার্থী শিবিরে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় ছিল বন্দুক নয়, বরং নীরবতা। সেই নীরবতার ভেতরেই একসময় আমাদের মতো অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের কানে কানে ভেসে বেড়াত একটি নাম—০০৫।
ভারতের পঞ্চরাম পাড়া শরণার্থী শিবিরে ০০৫ ছিল এক ধরনের কিংবদন্তি। নামটা যে গোয়েন্দা সিনেমা ০০৭ থেকে অনুপ্রাণিত, সে বিষয়ে কারও বিশেষ সন্দেহ ছিল না। কিন্তু ০০৭–এর মতো তারা ছিল না চোখে পড়ার মতো। তারা কারা, কোন ব্লকে থাকত—এসব কেউ নিশ্চিতভাবে জানত না। তবু তাদের অস্তিত্ব নিয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না। কারণ তারা কোনো ব্যানার বা পরিচয় দিয়ে কাজ করত না; তারা কাজ করত নীরবে, কিন্তু ফলাফল রেখে যেত স্পষ্ট।
শিবিরের প্রতিটি ব্লকে যারা সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম করত, তাদের মুখোশ খুলে দেওয়াই ছিল এই ছোট্ট দলের কাজ। নারী কেলেঙ্কারি, সুদের টাকার নামে নির্যাতন, জমিজমা নিয়ে বিরোধ, চুরি কিংবা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব—এই সব ঘটনার পেছনের সত্য তারা গোপনে খুঁজে বের করত। তারা বিচার করত না, শাস্তি দিত না; তারা শুধু সত্যটা বের করে দিত।
বাইরের চোখে এসব সমস্যা হয়তো তুচ্ছ মনে হতে পারে। কিন্তু শরণার্থী শিবিরে ছোট অন্যায় মানেই বড় ক্ষত। সেখানে আদালত নেই, স্থায়ী পুলিশ নেই, আইনের নির্ভরযোগ্য আশ্রয় নেই। একটি মিথ্যা অভিযোগ পুরো একটি পরিবারকে শেষ করে দিতে পারে। তাই এই “ছোট” অপরাধগুলোই ছিল মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ।
এই সব অভিযোগ নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই শিবিরে বিচারসভা বসত। ব্লকে সমাধান না হলে বিষয় যেত কেন্দ্রীয় কমিটিতে। কখনো কখনো কেন্দ্রীয় কমিটিকে পর্যন্ত আত্মীয়করণ বা মধ্যস্থতার পথে যেতে হতো। আর এই সব জায়গাতেই ০০৫–এর ছায়া অনুভূত হতো।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল—এই নীরব গোয়েন্দা কাজে শিশুদের ভূমিকা। শত শত ছোট ছেলেমেয়ে তাদের অজান্তেই সহায়তা করত। তারা প্রশ্ন করত না, পরিচয় চাইত না। শুধু জানত—সত্যটা পৌঁছাতে হবে। কীভাবে, কার মাধ্যমে রিপোর্টগুলো কেন্দ্রীয় কমিটির দু-একজনের হাতে পৌঁছাত—তা কেউ জানত না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্য উন্মোচিত হতো।
শুনেছিলাম, ভারত থেকে ফিরে এসে এই দলটি নাকি ১৭ জনে উন্নীত হয়। তবে আজ পর্যন্ত তাদের কাউকেই সরাসরি দেখার বা চেনার সৌভাগ্য আমার হয়নি। শুধু এটুকুই শুনেছি—ভারতে থাকার সময় তারা কখনো একসঙ্গে চলাফেরা করত না, এমনকি বিজুর সময়ও একসঙ্গে খেত না।
একটি স্মৃতি আজও স্পষ্ট। ভারতের শিবিরে থাকা এক শিক্ষক—সুপ্রিয় চাকমা, যিনি পরে দীঘিনালা উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছিলেন—২০০১ সালে উপেন্দ্র লাল চাকমার বাড়িতে আমাকে বলেছিলেন, সেদিন নাকি ওই ১৭ জনের দলটি সেখানে আসার কথা ছিল। তাঁকে নাকি কেউ একজন জানিয়েছিল।
কারণ সেদিন UPDF নেতারা উপেন্দ্র লালের বাড়িতে ভোটের নিমন্ত্রণ জানাতে আসবেন। তারা আসলেন এবং নিমন্ত্রণ জানিয়ে চলে গেলেন। আমি সেই রাতে রাত দুইটা পর্যন্ত উপেন্দ্র লালের বাড়িতেই ছিলাম। অনেক শরণার্থী বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। কিন্তু সেই ১৭ জনের কাউকেই টের পাওয়া যায়নি।
সেদিন বুঝেছিলাম যারা সত্যিকারের গোপন থাকে, তারা চোখে পড়ে না। তারা উপস্থিত থেকেও অনুপস্থিত থাকে।
আজ দীর্ঘ তিন দশক পর হঠাৎ এক বন্ধু ইমেইল করে ০০৫–এর কথা জানতে চাইল। লিখেছে, তারা নাকি আবার সক্রিয় হচ্ছে। শুনে ভালো লাগল। কারণ এই দল-বেদল আর সত্য-মিথা বুঝা মুশকিল। তারা সঠিক কাজটাই করত। তবে আজকের বাস্তবতায় তারা কতটা পারবে, তা বলা কঠিন। এত বছর পরেও আমি ভাবতে পারি না আসলে তারা কারা ছিল।
তবু একটি কথা আজকের তরুণ-তরুণীদের বলতে চাই। আধুনিক যুগে ০০৫–এর মতো নীরব গোয়েন্দা দল গঠন করা এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ, আবার অনেক বেশি জরুরি। এটি তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। সত্য উদ্ঘাটন এখন কঠিন নয়। একটি মোবাইল ফোনেই তথ্য সংগ্রহ করা যায়, পাঠানো যায়, মানুষের মুখোশ খুলে দেওয়া যায়।
আজ ০০৫–এর জন্য পাহাড় ছাড়তে হয় না। আজ ০০৫ আপনার পকেটেই আছে—একটি ফোনের ভেতরে। চাইলে পাহাড়ে এমন অসংখ্য নীরব গোয়েন্দা গোষ্ঠী গড়ে তোলা সম্ভব, যারা সাধারণ মানুষের কাছে সত্য পৌঁছে দেবে।
মনে রাখবেন, আন্দোলন শুধু বন্দুক দিয়ে হয় না। দেশপ্রেম শুধু টাকার বিনিময়ে কেনা যায় না। টাকা দিয়ে জিনিস কেনা যায়, কিন্তু দেশপ্রেম বা জাতিপ্রেম কেনা যায় না। যারা অস্তিত্ব ও দেশের জন্য কাজ করে, তারা বেশিরভাগ সময় কোনো পারিশ্রমিকের আশায় কাজ করে না। যদি টাকা পাওয়ার আশাতেই দেশপ্রেম টিকে থাকত, তবে বহু আগেই মানব ইতিহাস থেকে দেশপ্রেম শব্দটি মুছে যেত।
মনে রাখবেন, গোয়েন্দার সবচেয়ে বড় শক্তি অস্ত্র নয়; বরং নিজেকে অদৃশ্য রেখে সত্যকে দৃশ্যমান করা।



