গোয়েন্দা 005

০০৫ তারা কারা?

গোয়েন্দা 005

শরণার্থী শিবিরে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় ছিল বন্দুক নয়, বরং নীরবতা। সেই নীরবতার ভেতরেই একসময় আমাদের মতো অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের কানে কানে ভেসে বেড়াত একটি নাম—০০৫।

ভারতের পঞ্চরাম পাড়া শরণার্থী শিবিরে ০০৫ ছিল এক ধরনের কিংবদন্তি। নামটা যে গোয়েন্দা সিনেমা ০০৭ থেকে অনুপ্রাণিত, সে বিষয়ে কারও বিশেষ সন্দেহ ছিল না। কিন্তু ০০৭–এর মতো তারা ছিল না চোখে পড়ার মতো। তারা কারা, কোন ব্লকে থাকত—এসব কেউ নিশ্চিতভাবে জানত না। তবু তাদের অস্তিত্ব নিয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না। কারণ তারা কোনো ব্যানার বা পরিচয় দিয়ে কাজ করত না; তারা কাজ করত নীরবে, কিন্তু ফলাফল রেখে যেত স্পষ্ট।

শিবিরের প্রতিটি ব্লকে যারা সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম করত, তাদের মুখোশ খুলে দেওয়াই ছিল এই ছোট্ট দলের কাজ। নারী কেলেঙ্কারি, সুদের টাকার নামে নির্যাতন, জমিজমা নিয়ে বিরোধ, চুরি কিংবা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব—এই সব ঘটনার পেছনের সত্য তারা গোপনে খুঁজে বের করত। তারা বিচার করত না, শাস্তি দিত না; তারা শুধু সত্যটা বের করে দিত।

বাইরের চোখে এসব সমস্যা হয়তো তুচ্ছ মনে হতে পারে। কিন্তু শরণার্থী শিবিরে ছোট অন্যায় মানেই বড় ক্ষত। সেখানে আদালত নেই, স্থায়ী পুলিশ নেই, আইনের নির্ভরযোগ্য আশ্রয় নেই। একটি মিথ্যা অভিযোগ পুরো একটি পরিবারকে শেষ করে দিতে পারে। তাই এই “ছোট” অপরাধগুলোই ছিল মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ।

এই সব অভিযোগ নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই শিবিরে বিচারসভা বসত। ব্লকে সমাধান না হলে বিষয় যেত কেন্দ্রীয় কমিটিতে। কখনো কখনো কেন্দ্রীয় কমিটিকে পর্যন্ত আত্মীয়করণ বা মধ্যস্থতার পথে যেতে হতো। আর এই সব জায়গাতেই ০০৫–এর ছায়া অনুভূত হতো।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল—এই নীরব গোয়েন্দা কাজে শিশুদের ভূমিকা। শত শত ছোট ছেলেমেয়ে তাদের অজান্তেই সহায়তা করত। তারা প্রশ্ন করত না, পরিচয় চাইত না। শুধু জানত—সত্যটা পৌঁছাতে হবে। কীভাবে, কার মাধ্যমে রিপোর্টগুলো কেন্দ্রীয় কমিটির দু-একজনের হাতে পৌঁছাত—তা কেউ জানত না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্য উন্মোচিত হতো।

শুনেছিলাম, ভারত থেকে ফিরে এসে এই দলটি নাকি ১৭ জনে উন্নীত হয়। তবে আজ পর্যন্ত তাদের কাউকেই সরাসরি দেখার বা চেনার সৌভাগ্য আমার হয়নি। শুধু এটুকুই শুনেছি—ভারতে থাকার সময় তারা কখনো একসঙ্গে চলাফেরা করত না, এমনকি বিজুর সময়ও একসঙ্গে খেত না।

একটি স্মৃতি আজও স্পষ্ট। ভারতের শিবিরে থাকা এক শিক্ষক—সুপ্রিয় চাকমা, যিনি পরে দীঘিনালা উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছিলেন—২০০১ সালে উপেন্দ্র লাল চাকমার বাড়িতে আমাকে বলেছিলেন, সেদিন নাকি ওই ১৭ জনের দলটি সেখানে আসার কথা ছিল। তাঁকে নাকি কেউ একজন জানিয়েছিল।

কারণ সেদিন UPDF নেতারা উপেন্দ্র লালের বাড়িতে ভোটের নিমন্ত্রণ জানাতে আসবেন। তারা আসলেন এবং নিমন্ত্রণ জানিয়ে চলে গেলেন। আমি সেই রাতে রাত দুইটা পর্যন্ত উপেন্দ্র লালের বাড়িতেই ছিলাম। অনেক শরণার্থী বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। কিন্তু সেই ১৭ জনের কাউকেই টের পাওয়া যায়নি।

সেদিন বুঝেছিলাম যারা সত্যিকারের গোপন থাকে, তারা চোখে পড়ে না। তারা উপস্থিত থেকেও অনুপস্থিত থাকে।

আজ দীর্ঘ তিন দশক পর হঠাৎ এক বন্ধু ইমেইল করে ০০৫–এর কথা জানতে চাইল। লিখেছে, তারা নাকি আবার সক্রিয় হচ্ছে। শুনে ভালো লাগল। কারণ এই দল-বেদল আর সত্য-মিথা বুঝা মুশকিল। তারা সঠিক কাজটাই করত। তবে আজকের বাস্তবতায় তারা কতটা পারবে, তা বলা কঠিন। এত বছর পরেও আমি ভাবতে পারি না আসলে তারা কারা ছিল।

তবু একটি কথা আজকের তরুণ-তরুণীদের বলতে চাই। আধুনিক যুগে ০০৫–এর মতো নীরব গোয়েন্দা দল গঠন করা এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ, আবার অনেক বেশি জরুরি। এটি তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। সত্য উদ্ঘাটন এখন কঠিন নয়। একটি মোবাইল ফোনেই তথ্য সংগ্রহ করা যায়, পাঠানো যায়, মানুষের মুখোশ খুলে দেওয়া যায়।

আজ ০০৫–এর জন্য পাহাড় ছাড়তে হয় না। আজ ০০৫ আপনার পকেটেই আছে—একটি ফোনের ভেতরে। চাইলে পাহাড়ে এমন অসংখ্য নীরব গোয়েন্দা গোষ্ঠী গড়ে তোলা সম্ভব, যারা সাধারণ মানুষের কাছে সত্য পৌঁছে দেবে।

মনে রাখবেন, আন্দোলন শুধু বন্দুক দিয়ে হয় না। দেশপ্রেম শুধু টাকার বিনিময়ে কেনা যায় না। টাকা দিয়ে জিনিস কেনা যায়, কিন্তু দেশপ্রেম বা জাতিপ্রেম কেনা যায় না। যারা অস্তিত্ব ও দেশের জন্য কাজ করে, তারা বেশিরভাগ সময় কোনো পারিশ্রমিকের আশায় কাজ করে না। যদি টাকা পাওয়ার আশাতেই দেশপ্রেম টিকে থাকত, তবে বহু আগেই মানব ইতিহাস থেকে দেশপ্রেম শব্দটি মুছে যেত।

মনে রাখবেন, গোয়েন্দার সবচেয়ে বড় শক্তি অস্ত্র নয়; বরং নিজেকে অদৃশ্য রেখে সত্যকে দৃশ্যমান করা।

ভারতীয় গোয়েন্দা সূত্র: বাংলাদেশে সহিংসতা ও আসন্ন নির্বাচন ঘিরে আঞ্চলিক অস্থিরতার আশঙ্কা

ভারতীয় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা মহলের একটি অংশ দাবি করেছে যে, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলের অংশ হতে পারে। তবে এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

গোয়েন্দা সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। ভারতীয় কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক কয়েক মাসে সংঘটিত সহিংস ঘটনাগুলো—বিশেষ করে নির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ডের পর সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া—একটি পূর্বপরিকল্পিত কৌশলের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে এই মূল্যায়নগুলো সরকারিভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।

ভারতীয় নিরাপত্তা মহলের একাংশ আরও দাবি করেছে, ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশন–সংক্রান্ত কিছু কার্যক্রম নিয়ে তারা নজরদারি চালাচ্ছে। তবে এ বিষয়ে কোনো কূটনৈতিক নোট, বহিষ্কার বা প্রকাশ্য প্রমাণ এখনো সামনে আসেনি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্থিরতার সময়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। ভারতীয় গোয়েন্দা সূত্রের দাবি অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতি নির্বাচনী পরিবেশকে প্রভাবিত করার চেষ্টা হিসেবেও দেখা যেতে পারে—হোক তা সহিংসতা বাড়িয়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল রাখা, কিংবা নির্বাচন বিলম্বের জন্য চাপ তৈরি করা। তবে নির্বাচনকে লক্ষ্য করে এমন কোনো পরিকল্পনার প্রামাণ্য তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি

ভারতীয় কর্মকর্তারা বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচন–পূর্ব সময়কাল প্রায়ই স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে। অতীতে শ্রীলঙ্কা ও অন্যান্য অঞ্চলে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভাঙার নজির থাকলেও, বর্তমান বাংলাদেশের ঘটনাবলির সঙ্গে সরাসরি সংযোগের প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই।

ভারতীয় নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সীমান্ত–সংক্রান্ত বা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে। একই সঙ্গে তারা এও জানিয়েছে, এসব মূল্যায়ন চলমান বিশ্লেষণের অংশ, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।

মানবাধিকার পর্যবেক্ষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, নির্বাচন–পূর্ব সময়ে সহিংসতা—বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে—গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। এ ক্ষেত্রে তারা স্বচ্ছ তদন্ত, রাজনৈতিক সংযম এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।

খেলা শুরু

জাতীয় রাজনীতির অস্থির প্রেক্ষাপটে শুক্রবার দুপুরে রাজধানীতে ঘটে গেল একটি গুরুতর ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। জাতীয় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের এমপি পদপ্রার্থী শরিফ ওসমান হাদী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। প্রকাশ্য দিবালোকে এই হামলার ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা ও শঙ্কা তৈরি করেছে।

শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে দুর্বৃত্তরা শরিফ ওসমান হাদীকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। ঘটনার পরপরই তিনি গুরুতর আহত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আশপাশে থাকা লোকজন দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, তার শরীরে গুলির আঘাত রয়েছে এবং চিকিৎসকরা তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, ঘটনাটি খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঘটে। হামলাকারীরা পরিকল্পিতভাবেই আসে এবং গুলি চালানোর পর দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে। হামলার ধরন দেখে অনেকেই এটিকে নিছক সন্ত্রাসী ঘটনা না বলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণ হিসেবে দেখছেন। তবে ঘটনার পরপরই কেউ হামলার দায় স্বীকার করেনি।

জাতীয় ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এটি একটি সরাসরি রাজনৈতিক হামলা এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে ভয় দেখানোর চেষ্টা। তারা অবিলম্বে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে, তবে আন্দোলনের পথ থেকে সরে না যাওয়ার কথাও স্পষ্ট করা হয়েছে।

এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং তদন্ত শুরু করেছে বলে জানিয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হামলার পেছনের কারণ ও জড়িতদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

একদিকে নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে, অন্যদিকে প্রকাশ্য দিবালোকে একজন এমপি পদপ্রার্থীর ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনা প্রশ্ন তুলছে দেশের রাজনৈতিক নিরাপত্তা ও সহনশীলতা নিয়ে। এই হামলা শুধু একজন রাজনীতিকের ওপর আঘাত নয়, বরং পুরো রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য একটি অশনিসংকেত। অনেকের চোখে, এখান থেকেই শুরু হলো আরও বড় কোনো ‘খেলা’, যার পরিণতি কী হবে—তা এখনো অজানা।

সেটলারদের চেনা মুখোশ

সেটলাররা যে মুখোশই পরুক না কেন প্রতিটি পাহাড়ের আদিবাসী চোখ বন্ধ করে বুঝতে পারবে। কারণ তারা দশকের পর দশক এ মুখোশ দেখে আসছে।

শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনে দাঁড়িয়ে যে মিছিলের ছবি আজ ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেটি দেখলেই সত্যটা চোখে পড়ে। কারণ এখানে একজনও পাহাড়ি নেই, অথচ ব্যানারে লেখা “পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ।”

এই নাম পাহাড়িদের ৫০ বছরের ইতিহাস বহন করে।কিন্তু সেটলাররা এখন সেই নামকেই নিজেদের দখলে নিয়ে পাহাড়িদের স্মৃতি পর্যন্ত কপি করে ফেলতে চায়।

ঢাকার ফুটপাতেই নকল পরিচয়ের জন্ম হলো, অথচ পাহাড়ের মাটিতে দাঁড়ানোর সাহস তাদের নেই।

ছবির দিকে তাকালেই আরেকটা ব্যঙ্গ চোখে পড়ে, যারা পাহাড়কে বাঁচাতে একটি ধুলিকনা পর্যন্ত স্পর্শ করেনি, তারাই আজ পাহাড় রক্ষার বক্তৃতা দিচ্ছে। একেকজন এমন স্বরে কথা বলছে, যেন পাহাড়ে গিয়ে মানুষের চোখে চোখ রেখে সত্য দেখেছে।

হ্যাঁ, তারা জানে, পাহাড়ে গেলে পাহাড়ি আদিবাসীরা প্রশ্ন করবে, “আপনারা কে? আমাদের নামে রাজনীতি করছেন কেন?”

সেই বিব্রতকর সত্য এড়াতে তারা ঢাকার নিরাপদ জায়গায় দাঁড়িয়ে পাহাড়িদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অভিনয় করছে।

সবচেয়ে হাস্যকর হলো, এরা দাবি করছে “আদিবাসী শব্দ নিষিদ্ধ করতে হবে।”

যারা নিজেরাই পাহাড়ে আগন্তুক, তারাই আজ পাহাড়িদের পরিচয় বাতিল করতে চায়। যেন একদিন বলে বসবে, “পাহাড় শব্দটাও নিষিদ্ধ, কারণ পাহাড়ে পাহাড়িদের দাবী বেশি।”

যে পরিচয়ে পাহাড়িরা বাঁচে, সেই পরিচয়ই সেটলারদের চোখে ঝুঁকি; কারণ এটিই প্রমাণ করে দেয় কোন জাতিগোষ্ঠী ভূমির প্রকৃত সন্তান, আর কে আগন্তুক সেটলার হয়ে দখলদারি প্রতিষ্ঠা করেছে।

এদের মুখে আরেক নাটক, “সেনা ক্যাম্প বাড়াতে হবে।”

এটি পাহাড়িদের নিরাপত্তা নয়, বরং তাদের ঘরহারা করার পুরনো ছক। পাহাড়ে যা কিছু ঘটে, তার দায় পাহাড়িদের ঘাড়ে চাপিয়ে সেটলাররা নিজেদের দখলকে রক্ষা করার জন্যই এই দাবি করে।

যে পাহাড়ে বছরের পর বছর গুম-খুন, জমি দখল, মিথ্যা মামলা, গ্রাম উচ্ছেদ—সবচেয়ে বেশি বেড়েছে সেটলার আগ্রাসনই, সেই সত্য চাপা দিতে এরা সন্ত্রাসের গল্প বানিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

বিদেশী ষড়যন্ত্রের গল্প তো আরো বড় হাসি। তারা বলছে ভারত-চীন-আমেরিকা নাকি পাহাড়িদের সাহায্য করছে।

যে পাহাড়িরা বছরের পর বছর নিজের জমিতে টিকে থাকার ন্যূনতম অধিকার পর্যন্ত পায় না, তাদের সংগ্রামকে বিদেশী সাহায্যের হাত ধরে সন্ত্রাস বানিয়ে দেখানো হয় শুধু একটি কারণে আর সেটা হলো সেটলারদের দখলকে জাতীয়তাবাদের মুখোশ পরাতে। পাহাড়িদের অধিকারকে অপরাধ বানানোই ওদের একমাত্র রাজনীতি।

এই সমাবেশ পাহাড়িদের কোনো প্রতিবাদ বা দাবি নয়; বরং পাহাড়িদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এক সুপরিকল্পিত অভিযোজন।

যাদের মধ্যে একজন পাহাড়িও নেই, তারা পাহাড়িদের নামে কথা বলছে কেবল বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে। নাম নকল, ইতিহাস নকল, গল্প নকল—শুধু উদ্দেশ্যটাই অরিজিনাল: পাহাড়িদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া।

শেষমেশ ছবিটা যে সত্যটি সবচেয়ে জোরে বলে, সেটা হলো পাহাড়ি হওয়া অভিনয় করে দেখানো যায় না। পরিচয় চুরি করা যায়, ব্যানার ছাপানো যায়, ঢাকায় দাঁড়িয়ে বক্তৃতা মারা যায়।

কিন্তু পাহাড়ি মানুষের শত বছরের ব্যথা, সংগ্রাম আর ইতিহাস কেউই নিজের বানিয়ে নিতে পারে না।

পাহাড়িদের কণ্ঠ যতবার চেপে ধরার চেষ্টা হবে, ততবারই এমন ছবি উল্টো প্রমাণ হবে—দখলদারির রাজনীতি যতই মুখোশ পরে দাঁড়াক, সত্যের সামনে তা টেকে না।

সেটলাররা বুঝবে কবে? দয়া করে, এদের একটু কেউ বুঝানোর চেষ্টা করুন।


মুর্শিদাবাদ থেকে ফিরতে পারে ২ লক্ষ বাংলাদেশি

ভারতের মুর্শিদাবাদ থেকে প্রায় ২ লক্ষ বাংলাদেশি দেশে ফিরে আসতে পারে এমন খবর এখন দুই দেশের সীমান্ত অঞ্চলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। অনেকে দাবি করছে, এরা ভারতে গিয়ে ধর্মান্তরিত হয়ে হিন্দু পরিচয় নিয়েছিল, কেউবা আধার কার্ড তৈরি করে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করছিল।

তারা যে বর্তমান সরকার বা লীগ সরকার গঠন করবে সে টানে ফিরে আসছে তা নয়। বরং SIR-এর ভয়, অর্থাৎ ভারতের নাগরিকত্ব যাচাই ও একের পর এক পরিচয়–তদন্তের কারণে তারা আবার বাংলাদেশেই ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে আগে মুর্শিদাবাদের সামাজিক ও জনসংখ্যাগত অবস্থাটা জানা দরকার। চলুন দেখি।

মুর্শিদাবাদ পশ্চিমবঙ্গের ২৩টি জেলার একটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ জেলা। এর সদর বহরমপুর, আর পুরো অঞ্চলই গঙ্গার তীর ধরে বিস্তৃত। আয়তন প্রায় ৫,৩২৪ বর্গকিলোমিটার, যা রাজ্যের অন্যতম বৃহৎ প্রশাসনিক এলাকা।

২০১১ সালের সরকারি গণনায় জেলার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭১ লাখ—পুরুষ প্রায় ৩৬ লাখ এবং নারী প্রায় ৩৫ লাখ। প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১,৩৩৪ জন মানুষ থাকায় এটি পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ জেলাগুলোর একটি।

দ্রুত বাড়ছে জনসংখ্যা। জনসংখ্যা এই বৃদ্ধির হার দেখে ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৫ সালে মুর্শিদাবাদের জনসংখ্যা ৭৭ লাখের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

ধর্মীয় গঠনে এই জেলা পশ্চিমবঙ্গের অন্য যে কোনো জেলার তুলনায় বেশি সংবেদনশীল। মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ—প্রায় ৪৭ লাখ মানুষ—মুসলিম। হিন্দু রয়েছে প্রায় ২৩ লাখ, আর খ্রিষ্টান খুবই কম—মাত্র ১৮ হাজারের মতো।

এছাড়া শিখ ও অন্য ধর্মের অনুসারী সংখ্যা এতটাই কম যে আলাদা করে পরিসংখ্যানে তেমন উঠে আসে না।

শিক্ষার দিক থেকেও মুর্শিদাবাদ পিছিয়ে থাকা জেলার একটি। মোট সাক্ষরতার হার প্রায় ৬৬%, যেখানে পুরুষদের হার তুলনামূলক বেশি এবং নারীদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

জেলার প্রায় ৮০% মানুষই গ্রামে বসবাস করে, এবং অধিকাংশই কৃষিনির্ভর জীবিকা অনুসরণ করে।

সব মিলিয়ে মুর্শিদাবাদ একটি ঘনবসতিপূর্ণ, মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ, কৃষিনির্ভর এবং ঐতিহাসিক জেলা।

ঠিক এই কারণেই, পরিচয় যাচাই–সংক্রান্ত যে কঠোর নীতি এখন ভারতজুড়ে আলোচনায়—তার চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে মুর্শিদাবাদে থাকা বাংলাদেশিদের ওপর।

ফলে আগামী দিনে হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আবার বাংলাদেশেই ফিরে আসতে পারে এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

কোথায় রাখা হবে তাদের?


ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী রাশিয়ার হাতে কতটা ইউক্রেনের ভূখণ্ড যাবে?

ট্রাম্প-শান্তি-আলোচনা

ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে যে ২৮ দফা খসড়া শান্তি পরিকল্পনা তৈরি করেছেন। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই চুক্তি হলে ইউক্রেনের কতটা জমি রাশিয়ার হাতে স্থায়ীভাবে থেকে যাবে। এই খসড়া প্রথমে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP) এবং পরে স্কাই নিউজসহ বড় বড় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম হাতে পায় ও বিস্তারিত প্রকাশ করে।

এই পরিকল্পনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ক্রিমিয়া, লুহানস্ক এবং দোনেৎস্ক—এই তিন অঞ্চলকে “ডি ফ্যাক্টো” অর্থাৎ বাস্তবে রাশিয়ার অংশ হিসেবে ধরে নিতে হবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও এই অবস্থান মেনে নেবে। এখন দোনেৎস্কের প্রায় ১৪% এলাকা ইউক্রেনের হাতে রয়েছে। খসড়ার প্রস্তাব অনুযায়ী সেই অংশ থেকেও ইউক্রেনকে সেনা সরিয়ে নিতে হবে এবং পুরো অঞ্চলটিকে একটি নিরস্ত্রীকৃত বাফার জোনে পরিণত করা হবে এবং এই অঞ্চলকে পরে আন্তর্জাতিকভাবে রাশিয়ার ভূখণ্ড হিসেবেই গণ্য করা হবে।

দক্ষিণের খেরসন ও জাপোরিঝিয়া অঞ্চলের ক্ষেত্রে নিয়ম হবে সোজা। বর্তমান যে “লাইন অব কন্ট্যাক্ট” বা ফ্রন্টলাইন আছে, সেটাকেই স্থায়ী সীমান্ত হিসেবে ধরে নেওয়া। অর্থাৎ যেসব জায়গা এখন রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে আছে, সেগুলোই ভবিষ্যতেও রাশিয়ার কাছে থাকবে। ইউক্রেনের হাতে থাকা অংশে তারা থাকবে ঠিকই, কিন্তু সীমান্ত পরিবর্তন হবে না—সীমান্ত দাঁড়িয়ে যাবে বর্তমান অবস্থানে।

তাহলে মোট কতটা ভূখণ্ড রাশিয়ার হাতে থাকবে?

রয়টার্স বিভিন্ন সামরিক মানচিত্র, স্যাটেলাইট ডেটা ও ওপেন-সোর্স বিশ্লেষণ দেখে হিসাব করেছে যে রাশিয়া এখন ইউক্রেনের প্রায় ১১৪,৫০০ বর্গকিলোমিটার, অর্থাৎ রাশিয়া ইউক্রেনের মোট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এলাকার প্রায় ১৯% নিয়ন্ত্রণ করছে।

এই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে—

  • ক্রিমিয়া: প্রায় ২৭,০০০ বর্গকিমি
  • দোনেৎস্ক + লুহানস্ক (ডনবাস): প্রায় ৪৬,৫৭০ বর্গকিমি
  • জাপোরিঝিয়া + খেরসন (দখলকৃত অংশ): প্রায় ৪১,১৭৬ বর্গকিমি

এই তিনটি অঞ্চলের মোট আকার দাঁড়ায় প্রায় ১১৫,০০০ বর্গকিলোমিটার অর্থাৎ পুরো ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ, বা ২০%–এর কাছাকাছি। বিশ্বের অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠানও প্রায় একই সংখ্যা দিয়েছে।

শুধু ভূখণ্ডই নয়। খসড়ায় আরও কিছু কঠোর রাজনৈতিক ও সামরিক শর্ত আছে। যেমন—

  • ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিতে পারবে না।
  • ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর সংখ্যা ৮৮০,০০০ থেকে কমিয়ে ৬০০,০০০ করতে হবে।
  • রাশিয়ার ওপর দেওয়া অনেক নিষেধাজ্ঞা ধীরে ধীরে তুলে নিতে হবে।
  • পশ্চিমে হিমায়িত রুশ সম্পদের কিছু অংশ ইউক্রেন পুনর্গঠনে ব্যবহার করতে হবে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও কিয়েভের শীর্ষ কর্মকর্তারা এসব শর্তকে একেবারে অগ্রহণযোগ্য বলেছেন।তারা পরিষ্কার করে বলেছেন, ১৯৯১ সালের সীমান্তই ইউক্রেনের বৈধ সীমান্ত, এর কম কিছু মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।

ইউরোপের অনেক দেশও পরিকল্পনাটিকে “আগ্রাসনকে পুরস্কৃত করা” বলে সমালোচনা করেছে।

অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এটিকে আলোচনা শুরু করার ভিত্তি হিসেবে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে রাশিয়া নিজে কোনো এলাকা ছাড়তে রাজি এমন কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সব মিলিয়ে বর্তমান অবস্থা হলো, এই পুরো পরিকল্পনাটি এখনো শুধু একটি খসড়া। কোনো দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে এতে স্বাক্ষর করেনি।

তবে যদি এই কাঠামোই ভবিষ্যতের শান্তি চুক্তির ভিত্তি হয়, তাহলে ইউক্রেনকে যুদ্ধ থামানোর বিনিময়ে তাদের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দিতে হতে পারে—এটাই এই মুহূর্তে পাওয়া তথ্যের সবচেয়ে পরিষ্কার ও সহজ ব্যাখ্যা।

তবে জেলেনস্কি রাজি বলে শোনা যাচ্ছে।


পাহাড়ে আঞ্চলিক দলের সহিংসতা বেড়ে গেল কেন?

উত্তরটা সবাই না জানলেও পাহাড়ের সচেতন সমাজ বিষয়টি টের পেয়েছে। বিষয়টি ক্রমশ পরিষ্কার হবে। কিন্তু কেউ বলতে চাইছে না।

এটি জটিল এমন নয়, বরং ভয়ের। মনে হচ্ছে সাধারণ কর্মীরা বিষয়টি জানে না। তারা নেতাদের কথায় স্বপ্নে বিভোর রয়েছে।

ভুরাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যারা চোখ খোলা রেখেছে তারা না দেখেও বুঝতে পারছে পাহাড়ে কি হতে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে আগেও অনেক লিখেছি। কিন্তু আমার মতো সাধারণ মানুষের কথা শুনার মতো মানুষ নেই।

ফুটবল খেলায় মানুষ সব সময় ভালো খেলোয়াড়ের দলে খেলতে চায়। শিকারে মানুষ সব সময় সেরা হাতিয়ার নিয়ে যায়। বিশ্ব রাজনীতি খেলায় দেশ সব সময় মানবাধিকার রক্ষাকারী দলকে বেছে নেয়। আর সেই ভুরাজনীতির দেশ যদি ভারত বা ইসরায়েল হয়, তাহলে এই কথা 100% গ্যারান্টি।

এখানে ভারত আর বাংলাদেশের দ্বন্দ্ব চলছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে পাকিস্তান এবং ইসলামী দেশের সংগঠন গুলো। কাজেই কান টানলে মাথা আছে। ইসলামী দলের বিপরীতে সবসময় ইসরায়েল অবস্থান করে। তাই ভারতের সহায়ক শক্তি এখন ইসরায়েল।

তাছাড়া রাশিয়া তো ভারতের পাশে আছেই।

পাহাড়ের দলগুলির মধ্যে যারা এর বিপরীত স্রোতে থাকবে তারা মাথা তুলতে পারবে না। সেটা স্পষ্ট।

আমার কথা আজ না মানলে কি হবে আগামীকাল মেনে নিতে হবে। এটা ভুরাজনীতি। দেখতে দেখতে ৫০টি বছর পার করেছি।

এই ভুরাজনীতির খেলায় পাহাড়ের রাজনীতি ৮ মাস আগে মোড় ফিরেছে। সরকারি দালাল যারা আছে, তারা কাজ না করলে মাইনাস করে দেবে। খাগড়াছড়ির ‘মগ পার্টি’র নেতার কথা মনে আছে তো?

সেটা এখনো পাহাড়ের জনগণ বুঝতে পারেনি। খেলা এখনো সোজাসাপটা হয়নি। বিষয়টি এখনো অন্তরালে চলছে। পরিষ্কার হতে আরও কয়েক মাস লেগে যেতে পারে।


রোহিঙ্গা, সেটলার, সীমান্ত ও ভূরাজনীতি: বাংলাদেশের নতুন সঙ্কটক্ষেত্র পাহাড়

রোহিঙ্গা, সেটলার, সীমান্ত ও ভূরাজনীতি: বাংলাদেশের নতুন সঙ্কটক্ষেত্র পাহাড়
রোহিঙ্গা, সেটলার, সীমান্ত ও ভূরাজনীতি: বাংলাদেশের নতুন সঙ্কটক্ষেত্র পাহাড়

পাহাড়, সীমান্ত, উত্তর-পূর্ব এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে একটি বিচার—শেখ হাসিনার বিচার—আর কেবল আদালতের পরিধিতে সীমাবদ্ধ নেই; তা এখন পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিকে নাড়া দিচ্ছে।

ঢাকায় ব্রিটিশ আইনজীবীদের আগমন দেখেই বোঝা যায়, এই বিচারকে ঘিরে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন উত্তেজনায় প্রবেশ করেছে, আর পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের নীরব যোগাযোগও অস্বাভাবিকভাবে তীব্র হয়ে উঠছে।

ভারত যেদিন দিল্লিতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টার হাতে জঙ্গি মুক্তি, সীমান্তে মৌলবাদী আশ্রয় এবং উত্তরাঞ্চলে চরমপন্থীদের উপস্থিতির তালিকা তুলে দিল, ঠিক সেই দিনই ঢাকায় পাকিস্তানের সামরিক প্রতিনিধিদল ছিল। একদিকে ভারতের উদ্বেগ বাড়ছে, অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রতি বাংলাদেশের সামরিক নৈকট্যও ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হচ্ছে—এমন দ্বিমুখী পরিস্থিতি এর আগে এত স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি।

ইসরায়েল–ভারত অক্ষ দক্ষিণ এশিয়াকে একটি নতুন নিরাপত্তা বলয়ে টানছে, যেখানে জেরুজালেম, দিল্লি ও ভারতের উত্তর-পূর্বের ভবিষ্যৎ একই সুতায় বাঁধা। এর বিপরীতে ঢাকা–ইসলামাবাদের হঠাৎ উষ্ণতা দেখা যাচ্ছে এমন সময়ে, যখন বাংলাদেশে মৌলবাদী উত্থান, কারামুক্ত চরমপন্থী এবং সীমান্ত–নিরাপত্তার দুর্বলতা নিয়ে ভারত প্রকাশ্য উদ্বেগ জানাচ্ছে।

ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন সরাসরি আঞ্চলিক রাজনীতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভারত–ইসরায়েল সম্পর্ক সুদৃঢ় হওয়ার পেছনে এমন কিছু বাস্তবতা আছে যা সাধারণ মানুষের নজরে এখনো পড়ছে না। শোনা যাচ্ছে, কাশ্মীরে হাসপাতালের নিচে গাজা-স্টাইলে হামাসের অস্ত্রভাণ্ডার পাওয়া যাচ্ছে। ইসরায়েল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—হামাস যেখানে থাকুক, ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে। সেই কারণে ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও দৃঢ় হচ্ছে।

পাকিস্তানের অতীত ইতিহাসও এ অঞ্চলে অশান্তির বড় উৎস। আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেন থেকে শুরু করে লস্কর-ই-তৈবা পর্যন্ত বহু সন্ত্রাসী সংগঠন পাকিস্তানের ছত্রচ্ছায়ায় বেড়ে উঠেছে। সন্ত্রাস দমনে ভারত–ইসরায়েল এক পথের পথিক; তাই তাদের ঘনিষ্ঠতা স্বাভাবিক।

কিছু দৈনিক সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, রোহিঙ্গা শিবিরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কিছু ইউনিট প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালাচ্ছে এবং সেখানে মৌলবাদী গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে যে অন্তত পাঁচ লক্ষ রোহিঙ্গা যুবককে জিহাদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। যদি এ অভিযোগ সত্যি হয়, তবে এটি শুধু মিয়ানমারের নয়, ভারতের জন্যও বড় নিরাপত্তা হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

দিল্লির সাম্প্রতিক বিস্ফোরণ ভারতকে নতুন করে স্মরণ করে দিচ্ছে যে মৌলবাদী নেটওয়ার্ক এখন আর সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করছে না; তারা ভারতের ভেতরেও শেকড় ছড়াতে শুরু করেছে। এই অস্বস্তিকর বাস্তবতাই দিল্লিকে কঠোর নিরাপত্তা নীতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন নেতা–আমলা শিলিগুড়ি করিডোর ও কলকাতা নিয়ে ভারতের প্রতি যেসব হুমকিসূচক মন্তব্য করেছেন, তাও দিল্লির উদ্বেগ বাড়ানোর অন্যতম কারণ।

এই সমগ্র অক্ষ-সংঘাতের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে পাহাড়ে। দখল, ধর্মান্তর, জনসংখ্যাগত প্রকৌশল, আর রাতারাতি মসজিদ–মাদ্রাসা নির্মাণ—এসব ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। বরং পাহাড়কে “নীরব অঞ্চল” হিসেবে দেখে বৃহত্তর নিরাপত্তা-রাজনীতির চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। যে পাহাড়ে একটি স্কুল তুলতে বছর লাগে, সেখানে ধর্মীয় কাঠামো রাতারাতি দাঁড়িয়ে যাওয়া সেই চাপেরই ইঙ্গিত বহন করে।

পাহাড়ের রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই ভাঙাগড়ার চক্রে আটকে আছে। চাকমা সমাজের ভেতরের বনবিহার-সংক্রান্ত ধর্মীয় বিতর্ক এমনভাবে তীব্র হয়েছে যে জাতিগত ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট দেখলেও অনেকে তা উপলব্ধি করতে পারছে না। এই ভাঙনই মৌলবাদী শক্তিকে জায়গা দিচ্ছে—কেননা বিভক্ত সমাজে প্রতিরোধ সবসময়ই দুর্বল হয়।

বান্দরবান আজ দ্রুত মৌলবাদী প্রভাবের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। সেখানে আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তির কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব নেই বললেই চলে। নির্বাচন ঘিরে পাহাড়ি সমাজের একাংশের বিএনপি ও অন্যান্য জাতীয় দলে হঠাৎ ঝোঁক প্রমাণ করছে—পাহাড়ের রাজনৈতিক দিশাহীনতা কতটা গভীর হয়েছে। স্বাধীনতার পর এত স্পষ্টভাবে এ চিত্র আর দেখা যায়নি।

চাকমা সমাজ পাহাড়ের রাজনৈতিক চালিকা শক্তি। তারা যখন বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, তখন মারমা, ত্রিপুরা এবং অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীও স্বাভাবিকভাবেই দিশাহীন হয়। পরিবারের বড় ভাই যখন পথ হারায়, তখন ছোট ভাইয়েরা বিচলিত না হয়ে পারে না—পাহাড় এখন সেই অবস্থার মধ্যেই আছে।

এই পরিস্থিতিতে ধর্মীয় সংকটের দ্রুত সমাধান অত্যন্ত জরুরি। তা চাকমা রাজার মধ্যস্থতায় হোক, দায়ক–দায়িকার নির্দেশনায় হোক, কিংবা গণভোটের মাধ্যমেই হোক—পাহাড়কে প্রথমে ধর্মীয় বিভাজন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ এই সমস্যার সমাধানেই ‘রাজনৈতিক ঐক্যের সূত্র’ দেখাতে পারে; সেই ‘রাজনৈতিক ঐক্যের সূত্র’ ছাড়া পাহাড় কোনো বৃহত্তর সংকট মোকাবিলা করতে পারবে না।

হাসিনার বিচার, ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং পাকিস্তানের সামরিক ছায়া—এই তিনটি রেখা এসে আজ পাহাড়ের ওপরই মিলিত হয়েছে। ভূরাজনীতি যখন রূপ বদলায়, আঘাত লাগে আগে সীমান্তে; আর বাংলাদেশের সবচেয়ে সংবেদনশীল সীমান্তই হলো পাহাড়। এই মুহূর্তে নীরব থাকা মানে আত্মসমর্পণ।

এখন প্রশ্ন একটাই, পাহাড় কি দখল, ধর্মান্তর ও মৌলবাদী কাঠামোর সামনে চুপ করে থাকবে, নাকি নিজের ভবিষ্যতের রক্ষক হিসেবে জেগে উঠবে? মানচিত্র বদলে গেলে জাতিও বদলে যায়। ১৯৪৭-এর এক নেহেরুর “নীরবতা”য় ৭৮ বছরে দীর্ঘ পরিক্রমায় পাহাড়ের আদিবাসী জাতিসত্তা প্রায় বিলুপ্ত। তাই এখনই সিদ্ধান্তের সময়, এখনই মাঠে নামার মুহূর্ত, এখন নয়তো আর কখনোই নয়।

পাহাড় একসময়ই ১৩ লক্ষ সেটলার আর ১ লক্ষ ২০ হাজার সেনার অত্যাচারে ক্ষতবিক্ষত ছিল; সেই পাহাড়েই যদি আজ ১৩ লক্ষ রোহিঙ্গা আর তাদের গঠিত পাঁচ লক্ষ জিহাদি যুক্ত হয়, তাহলে আগামী দশ বছরে পাহাড়ের অবস্থা কেমন হবে—তা ভাবলেও শিরদাঁড়া ঠান্ডা হয়ে আসে।


৯৯% নিয়ে কান্না, ৯.২৫% নিয়ে নাটক — আসলে কার বদহজম?”

বাংলাদেশের ৯৯% ভারত–বিরোধী বলেছি শুনে অনেকে হাঁসফাঁস। কিন্তু আসল ভুলটা কোথায় জানেন?

যেদিন আমি লিখলাম, “বাংলাদেশের ৯৯% ভারত–বিরোধী”, সেদিন ফেসবুক যেন হঠাৎ করে বদহজমের জরুরি বিভাগের মতো হয়ে গেল।

কেউ পানি খেল, কেউ ওষুধ খেল, আর কেউ মনে করল আমি বুঝি দেশের সবাইকেই এক ট্রালিতে তুলে পাঠিয়ে দিয়েছি!

অনেকেই ভেবে নিল, আমি নাকি সেই সংখ্যালঘু ৯.২৫%—অর্থাৎ:

✔ আদিবাসী ১%
✔ হিন্দু ৭.৯৫%
✔ খ্রিষ্টান ০.৩০%

এই বিশাল জনগোষ্ঠীকেও ৯৯%–এর মধ্যে গুঁজে দিয়েছি।

হে দয়াময় মানুষজন, একটু মাথা ঠান্ডা করে ভাবুন তো
বাংলাদেশের মৌলবাদীরা যাদের নাগরিকই মনে করে না, তাদের আমি কেন ওই তালিকায় ঢোকাবো?

৯.২৫% আসলে কতজন?

বাংলাদেশের আনুমানিক জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৫৭ লাখ (১৭৫.৭ মিলিয়ন)।

তাহলে ৯.২৫% দাঁড়ায়—

👉 ১ কোটি ৬২ লাখ ৮০ হাজার মানুষ (প্রায়)

হ্যাঁ, শুধু শতাংশ নয়। বাস্তবে একটি পুরো দেশের সমান মানুষের সংখ্যা!

কিন্তু মৌলবাদীদের চোখে এরা আছে কোথায়?

ওদের হিসাবের খাতায় এরা থাকে ঠিক সেই জায়গায় আর সে জায়গা হচ্ছে গণিতের “অপ্রাসঙ্গিক” তথ্য খাতায়।

কি ভুল বললাম?

নির্বাচনের কয়েক ঘন্টার আগের শ্লোগানের কথা মনে করিয়ে দেবো?

হিন্দু-মুসলিম ভাই- –
পাহাড়ী বাঙালি ভাই – –

নির্বাচনের রেজাল্টের পর শ্লোগান বদলে যায়।

তখন কি হয় শ্লোগান?

কেউ বলুন ( কমেন্ট খালি রেখে দিলাম)

মৌলবাদীরা যাদের নাগরিকই মনে করে না তাদের আমি কেন “৯৯% ভারত–বিরোধী”-এর ভেতরে ঢোকাবো?

বাংলাদেশের মৌলবাদী শক্তির কাছে—

👉 আদিবাসী মানেই “দেশের বাইরে থেকে আসা”,
👉 হিন্দু মানেই “ভারতপন্থী”,
👉 খ্রিষ্টান মানেই “পশ্চিমা এজেন্ট”।

অথচ এরা এই দেশেরই মানুষ।
জন্ম এখানেই, মাটি এখানেই, ইতিহাস এখানেই।

কিন্তু মৌলবাদীদের চোখে এই ৯.২৫% মানুষ নাগরিক নয়, ভোট নয়, মানুষও নয়। এরা শুধু রাজনৈতিক স্লোগানের কাঁচামাল।

তাই আমি যখন বলি “৯৯% ভারত–বিরোধী। আমি এই ৯.২৫% মানুষকে সেই সংখ্যার বাইরে রাখি।

কারণ ওদের নাগরিকত্বই যাদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ তাদের কীভাবে ওই হিসাবের ভেতরে নেবো?

কিছু মানুষ ভারতে পালিয়ে গিয়ে হঠাৎ অসাম্প্রদায়িকতার আলোকপ্রাপ্তি হয়।বড় হাস‍্যকর।

আরেকটা ঘটনা আরও রসিক।

বাংলাদেশে নির্যাতন, জমি দখল বা আগুন লেগে পালিয়ে ভারত যাওয়া কিছু মানুষ হঠাৎ করেই সেখানে গিয়ে—

👉 কংগ্রেসে যোগ দেয়,
👉 অসাম্প্রদায়িকতার পবিত্র চাদর মুড়ি দেয়,
👉 আর বলে, “বাংলাদেশ তো সহিংসতার দেশ নয়—সবই মিডিয়ার গল্প!”

মনে হয় যেন বাংলাদেশে ওরা স্পা রিসোর্টে বড় হয়েছে, আর আমরা নাকি গল্প বানাই!

তাই শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্যই এখানে সোজা মাথায় লাগে

শুভেন্দু অধিকারীর সেই বিখ্যাত মন্তব্য—

“এ পারের সাম্যবাদী!”

কথাটা শুধু রসিকই নয় বরং প্রায় শল্যচিকিৎসার মতো সঠিক জায়গায় কাটে।

এই শব্দটি অনেকের অন্ত্র–উদর নাড়া দিয়ে দেয়। কারণ সত্য কথা সবসময়ই একটু তেতো।

আমার হিসাব ঠিক, পেটব্যথা যাদের ওষুধ তাদের লিখে দিচ্ছি। খাবেন কিন্তু। কলকাতাতে পাওয়া যাবে।

আমি যখন বলেছি “বাংলাদেশের ৯৯% ভারত–বিরোধী”—
সেটা বলেছি পরিষ্কার যুক্তিতে।

✔ যে ৯.২৫% মানুষকে মৌলবাদীরা নাগরিকই মনে করে না তাদের আমি ওই তালিকায় রাখিনি।

✔ তারা দেশের প্রকৃত সম্পদ, কিন্তু চরমপন্থীদের চোখে তারা “ফুটনোট”।

✔ আর ভারতে পালিয়ে গিয়ে যারা হঠাৎ অসাম্প্রদায়িকতার গুরু হয়ে যান তাদের জন্যই শুভেন্দু অধিকারীর লাইন যথাযথ, “এ পারের সাম্যবাদী!”

যদি কারও টনক নড়ে, তাহলে বুঝবেন পোস্টটি তার গন্তব্যে পৌঁছেছে।

আর যদি আবার বদহজম হয় তাহলে সত্য কথার ওষুধ সকালে–বিকালে দুই বেলা।

(নোটঃ ছবিটি দুদিন আগে ঢাকায় হিন্দু ধর্ম অবমাননার বিচার চেয়ে হিন্দু ভাই-বোনদের সমাবেশ।সরকার এর পদক্ষেপ নিয়েছে কি? গত ২৪ ঘন্টায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে কি ঘটেছে খবর নিন)

প্রথম দুই বিশ্বযুদ্ধের গোপন সংকেতের অবিশ্বাস্য গল্প

মোবাইল নেই, এসএমএস নেই, ইন্টারনেটের নামগন্ধও নেই— তবুও প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিশাল বিস্তৃত ফ্রন্টলাইনে প্রতিটি মিনিটে হাজারো বার্তা আদান–প্রদান হতো।

আজকের পাঠক ভাবলে অবাক হবেন, কিন্তু এক একটি বার্তার ওপর নির্ভর করত পুরো ব্যাটালিয়নের জীবন, পুরো শহরের নিরাপত্তা, কখনো কখনো যুদ্ধের ভাগ্যও। তখন প্রযুক্তির অভাব ছিল না; প্রযুক্তির মানে ছিল ভিন্ন।

সামরিক ঘাঁটি থেকে যুদ্ধের ট্রেঞ্চ—সবচেয়ে বিশ্বস্ত ছিল একেকটি যুদ্ধকবুতর। গুলির মধ্য দিয়ে উড়ে গিয়ে তারা যে কাগজের টুকরো বহন করত, তাতে লেখা থাকত শত মানুষের জীবন বাঁচানোর নির্দেশ।

এক কবুতর, Cher Ami, গুলিবিদ্ধ, একটি পা হারানো অবস্থাতেও বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল—১৯৪ সৈনিক বাঁচিয়ে সে ইতিহাসে বীর হয়ে আছে। আজকার মোবাইল নেটওয়ার্কও এমন নিষ্ঠা দেখায় না।

রাত নেমে এলে দূরসমুদ্রে আরেক বিস্ময় দেখা যেত—টর্চলাইটের দপদপে আলো। যুদ্ধজাহাজগুলো এক ধরনের আলো–সংকেতের নাচ করত। মর্স কোডের মতো এই আলো জ্বালানো–নেভানো প্যাটার্ন দেখে বোঝা যেত শত্রু সামনে নাকি পাশ কাটিয়ে গেছে। ভুল একটি আলোর ঝলক মানে ভুল দিক, ভুল আক্রমণ, ভুল মৃত্যু—যুদ্ধ কখনো ক্ষমা করত না।

স্থলে তখন সৈনিকরা হাতের দুই পাশে রঙিন পতাকা ধরে অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করত। দূর থেকে দেখলে মনে হতো কেউ বাতাসের সঙ্গে নাচছে। আসলে সেটা ছিল সেমাফোর সিগন্যাল—একটি ভঙ্গি মানে অক্ষর, আরেকটি মানে বিপদ। এমনভাবে বার্তা পাঠানো হতো যে শব্দের দরকারই পড়ত না, শুধু ভঙ্গি আর দৃষ্টিশক্তি।

ট্রেঞ্চের ভেতরে চলত আরেক যুদ্ধ—মাটির নিচে পাতানো তারের টেলিফোন। শেল পড়ে একটি তার কেটে গেলেই পুরো সামনে থাকা ইউনিট অন্ধ হয়ে যেত।

তখন সৈনিকরা গুলির মধ্যেই হামাগুড়ি দিয়ে যেত সেই তার সারাই করতে—নিঃশব্দ সাহসী কাজ, কেউ দেখত না, কেউ জানত না, কিন্তু যুদ্ধ টিকে থাকত তাদের কারণেই।

বিমান হামলার শব্দ ছিল আরেক বড় সংকেত। রাসায়নিক গ্যাস আসছে কিনা, পিছু হটতে হবে নাকি এগোতে—সবই সাইরেন, হুইসেল, কিংবা ড্রামের ছন্দে বুঝে নিতে হতো। এক মুহূর্ত দেরি মানেই শ্বাস না নিতে পারা, চোখ জ্বালা, জীবন ছুটে যাওয়া।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আরেক বিস্ময় ছিল জার্মানির এনিগমা মেশিন। কয়েক সেকেন্ডে কোড বদলে ফেলত, দিনে হাজার হাজার বার্তা পাঠানো হতো যা কেউ ভাঙতে পারত না।

পুরো ইউরোপ যেন সেই রহস্যময় যন্ত্রের ছায়ায় বন্দি ছিল। পরে অ্যালান টুরিং সেই কোড ভেঙে ফেলে যুদ্ধের গতিপথ পাল্টে দেন—একটি যন্ত্র, একটি কোড, আর মানুষের মস্তিষ্কের লড়াই।

যুদ্ধক্ষেত্রে তখন নারীরাও ছিল গোপন শক্তি। অনেক নারী অপারেটর এত দ্রুত মর্স কোড পাঠাতেন যে শত্রুপক্ষ মনে করত কোনো বিশেষ সামরিক যন্ত্র কাজ করছে। আসলে ছিল রিদম, ভাষা, অভিজ্ঞতা। তাদের গতির সঙ্গে মেশিনও হেরে যেত।

শেষে থেকে যেত সবচেয়ে বিপজ্জনক ভূমিকা- ঘোড়সওয়ার, মোটরসাইকেল-রাইডার, বা দৌড়ে বার্তা বহনকারী “রানার”। গুলি–বোমার ঝড়ের মধ্যে শুধু এই কথাটাই ছিল তাদের মাথায়: “বার্তা না পৌঁছালে ইউনিট মরবে।”

অনেকেই পৌঁছাতে পারেননি, ইতিহাস তাদের নাম মনে রাখেনি; কিন্তু তাদের এক একটি দৌড় যুদ্ধের মানচিত্র বদলে দিয়েছে।

আজ আমরা নেটওয়ার্ক একটু কম পেলেই বিরক্ত হয়ে যাই। অথচ এক শতাব্দী আগে যুদ্ধের ভাগ্য নির্ধারিত হতো আলো, পাখি, পতাকা, বা মাটির নিচের একটি পাতলা তার দিয়ে। প্রযুক্তি তখনও ছিল—শুধু যন্ত্রে নয়, মানুষের মস্তিষ্কে। আর সেই মানবিক সংকেতই আজকের ডিজিটাল যুগের ভিত্তি।